শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, কিম্পুরুষবর্ষে হনুমান সর্বদা সেই বর্ষবাসীগণ সহ, লক্ষ্মণাগ্রজ এবং সীতাপতি শ্রীরমচন্দ্রের প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত। গন্ধর্বগণ সর্বদা শ্রীরামচন্দ্রের মহিমা কীর্তনে রত। সেই কীর্তন পরম কল্যাণময়ী। কিম্পুরুষবর্ষপতি আর্ষ্টিষেণ সহ হনুমান নিরন্তর অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে সেই মহিমা শ্রবণ করেন। হনুমান নিম্নলিখিত মন্ত্রগুলি গান করেন। আমি আপনার প্রসন্নতা বিধানের জন্য প্রণব জপ করি। সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আপনাকে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। আপনি আর্যদের সমস্ত সদ্গুণের উৎস। আপনার চরিত্র ও আচরণ সর্বদা অবিচল এবং আপনার ইন্দ্রিয় ও চিত্ত সর্বদা সংযত। একজন সাধারণ মানুষের মতো আচরণ করে, আপনি আপনার আদর্শ চরিত্র প্রদর্শন করে সকলকে শিক্ষা দেন কিভাবে আচরণ করা কর্তব্য। নিকষ পাথরে কেবল স্বর্ণের গুণের পরীক্ষা হয়, কিন্তু আপনি এমনই স্পর্শমণি যাতে সমস্ত উত্তম গুণের পরীক্ষা হয়। আপনি ভক্তগ্রগণ্য ব্রাহ্মণদের দ্বারা উপাসিত। হে পরম পুরুষ, হে রাজাধিরাজ, আমি আপনাকে আমার প্রণতি নিবেদন করি। যাঁর সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ জড় গুণের দ্বারা কলুষিত নয়, সেই ভগবানকে শুদ্ধ চেতনার দ্বারাই দর্শন করা যায়। বেদান্তে তাঁকে এক এবং অদ্বিতীয় বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁর চিন্ময় শক্তির প্রভাবে তিনি জড় কলুষের অতীত এবং যেহেতু তিনি জড় দৃষ্টির বিষয় নন, তাই তিনি ‘প্রত্যক্’ স্বরূপ। তিনি মায়িক চেষ্টা শূণ্য এবং তিনি প্রাকৃত নাম ও রূপ বিবর্জিত। কেবল শুদ্ধ চেতনায় বা কৃষ্ণচেতনায় ভগবানের চিন্ময় রূপ দর্শন করা যায়। সেই ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের শ্রীপাদপদ্মে নিষ্ঠাপরায়ণ হয়ে, আমরা তাঁর চরণ-কমলে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। রাক্ষজরাজ রাবণ মানুষ ব্যতীত অন্য কারোর বধ্য ছিল না এবং সেই জন্য ভগবান শ্রীরামচন্দ্র মনুষ্যরূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু শ্রীরামচন্দ্রের উদ্দেশ্য কেবল রাবণকে বধ করাই ছিল না, স্ত্রীসঙ্গ যে বহু দুঃখের কারণ তা মর্ত্য জীবদের শিক্ষা দেওয়াও তাঁর অবতরণের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। তিনি বিশ্বাত্মা, পরমেশ্বর এবং তিনি স্ব-স্বরূপে আনন্দ উপভোগ করেন। তাঁর শোচনীয় কিছু নেই। অতএব তাঁর সীতাদেবীর বিরহজনিত দুঃখ কি করে হতে পারে? যেহেতু শ্রীরামচন্দ্র হচ্ছেন ভগবান বাসুদেব, তাই তিনি এই ত্রিভুবনের কোন কিছুর প্রতি আসক্ত নন। সমস্ত আত্ম-তত্ত্ববিৎ মহাত্মাদের তিনি প্রিয়তম পরমাত্মা এবং অন্তরঙ্গ সুহৃৎ। তিনি সর্ব ঐশ্বর্যপূর্ণ। তাই তাঁর পক্ষে পত্নীর বিরহে দুঃখিত হওয়া এবং তাঁর পত্নী ও কনিষ্ঠ ভ্রতা লক্ষ্মণকে ত্যাগ করাও সম্ভব নয়। এই দুয়ের কোন একটিও ত্যাগ করা তাঁর পক্ষে সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব। উচ্চকুলে জন্ম, সৌন্দর্য, বাক্চাতুরি, বুদ্ধি বা জাতি, ইত্যাদির দ্বারা ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের সঙ্গে সখ্য স্থাপন করা যায় না। তাঁর সঙ্গে সখ্য স্থাপন করার জন্য এই সমস্ত গুণগুলির আবশ্যকতা হয় না। আমরা অসভ্য বনচর, আমরা উচ্চকুলে জন্মগ্রহণ করিনি, আমাদের দৈহিক সৌন্দর্য নেই এবং আমরা সভ্য মানুষের মতো কথা বলতে পারি না, তবুও ভগবান শ্রীরামচন্দ্র আমাদের তাঁর সখারূপে অঙ্গীকার করেছেন। অতএব দেব, অসুর, মানুষ অথবা পশু-পাখি প্রভৃতি যে কেউ হোক না কেন, সকলেরই কর্তব্য ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের ভজনা করা, যিনি নররূপে এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁর ভজনের জন্য বহু তপস্যার প্রয়োজন হয় না, কারণ তিনি তাঁর ভক্তের অল্প সেবাতেই সন্তুষ্ট হন এবং তিনি সন্তুষ্ট হলে ভক্ত সার্থক হন। শ্রীরামচন্দ্র সমস্ত অযোধ্যাবাসীদের বৈকুন্ঠে নিয়ে গিয়েছিলেন।”
“ভগবানের মহিমা অচিন্ত্য। ভক্তদের কৃপাপূর্বক ধর্ম, জ্ঞান, বৈরাগ্য, ঐশ্বর্য, ইন্দ্রিয়-সংযম ও নিরহঙ্কার শিক্ষা দান করার জন্য তিনি ভারতবর্ষে বদরিকাশ্রম নামক স্থানে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি চিন্ময় ঐশ্বর্যপূর্ণ এবং কল্পান্ত পর্যন্ত তপস্যায় রত। এটিই আত্ম-উপলব্ধির পন্থা। নারদ পঞ্চরাত্র নামক গ্রন্থে ভগবান নারদ অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন কিভাবে জ্ঞান ও যোগের দ্বারা জীবনের পরম লক্ষ্য ভক্তি লাভ করা যায়। তিনি ভগবানের মহিমাও বর্ণনা করেছেন। দেবর্ষি নারদ এই চিন্ময় গ্রন্থের বিষয়বস্তু সাবর্ণি মনুকে উপদেশ দিয়েছিলেন, যাতে তিনি বর্ণাশ্রম-ধর্ম অনুষ্ঠানকারী ভারতবর্ষবাসীদের ভগবদ্ভক্তি লাভের পন্থা প্রদর্শন করতে পারেন। এইভাবে নারদমুনি ভারতবর্ষবাসীদের সঙ্গে সর্বদা নরনারায়ণের সেবায় যুক্ত হয়ে নিম্নলিখিত মন্ত্র কীর্তন করেন। সমস্ত ঋষিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ভগবান নর-নারায়ণকে নমস্কার। তিনি জিতেন্দ্রিয়, নিরহঙ্কার, নিষ্কিঞ্চনের ধন, পরমহংসদের গুরু এবং আত্মারামগণের অধিপতি। তাঁর শ্রীপাদপদ্মে আমি বারবার প্রণতি নিবেদন করি। দেবর্ষি নারদ নিম্নলিখিত মন্ত্রটি কীর্তন করে নর-নারায়নের আরাধনা করেন- “ভগবান এই জগতের সৃষ্টি, পালন এবং সংহারের কর্তা, তবুও তিনি সর্বতোভাবে কর্তৃত্বাভিমানশূণ্য। যদিও মূর্খ মানুষেরা মনে করে যে, তিনি আমাদের মতো একটি জড় শরীর ধারণ করেছেন, কিন্তু তিনি ক্ষুধা, তৃষ্ণা এবং ক্লান্তির দৈহিক ক্লেশের দ্বারা প্রভাবিত হন না। যদিও তিনি সবকিছুর সাক্ষী, তবুও সেই সমস্ত বিষয়ের দ্বারা তার ইন্দ্রিয় কলুষিত হয় না। সেই অনাসক্ত, জগতের সাক্ষী পরমাত্মা শ্রীভগবানকে আমি বারবার প্রণাম করি। হে ভগবান যোগেম্বর, আত্ম-তত্ত্ববিৎ ব্রহ্মা (হিরণ্যগর্ভ) যে যোগের পন্থা বর্ণনা করেছিলেন, এটি তারই পুনরাবৃত্তি। মৃত্যুর সময় যোগীরা আপনার শ্রীপাদপদ্মে তাঁদের চিত্ত স্থাপন করে তাঁদের জড় দেহ ত্যাগ করেন। সেটিই হচ্ছে যোগের পূর্ণতা। বিষয়াসক্ত ব্যক্তিরা সাধারণত তাদের বর্তমান শরীর এবং ভবিষ্যৎ শরীরের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত। তাই তারা সর্বদা তাদের পত্নী, সন্তান, এবং ধন-সম্পদের চিন্তায় সর্বদা মগ্ন থাকে এবং মল-মূত্রে পূর্ণ শরীরটি ত্যাগ করার ব্যাপারে অত্যন্ত ভীত হয়। কিন্তু কৃষ্ণভাবনামৃতের অনুশীলনকারী ব্যক্তিও যদি তাদের মতো মৃত্যুভয়ে ভীত হন, তা হলে শাস্ত্র অধ্যয়ন করে কি লাভ? তা কেবল সময়েরই অপচয় মাত্র। অতএব, হে অধোক্ষজ ভগবান, দয়া করে আপনি আমাদের ভক্তিযোগ সম্পাদন করার শক্তি দিন, যাতে আমরা আমাদের অস্থির মনকে সংযত করে আপনার চিন্তায় তা স্থির করতে পারি। আমরা আপনার মায়ার দ্বারা প্রভাবিত; তাই আমরা মল-মূত্রপূর্ণ এই দেহের প্রতি এবং এই দেহের সঙ্গে সম্পর্কিত যা কিছু সেই সবের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত। ভগবদ্ভক্তি ব্যতীত এই আসক্তি ত্যাগ করার আর কোন উপায় নেই। অতএব দয়া করে আপনি আমাদের এই বর দান করুন।”
“ভারতবর্ষে ইলাবৃতবর্ষের মতো বহু পর্বত এবং নদী রয়েছে। মলয়, মঙ্গলপ্রস্থ, মৈনাক, ত্রিকূট, ঋষভ, কূটক, কোল্লক, সহ্য, দেবগিরি, ঋষ্যমূক, শ্রীশৈল, বেঙ্কট, মহেন্দ্র, বারিধার, বিন্ধ্য, শুক্তিমান, ঋক্ষগিরি, পারিযাত্র, দ্রোণ, চিত্রকূট, গোবর্ধন, রৈবতক, ককুভ, নীল, গোকামুখ, ইন্দ্রকীল, কামগিরি আদি শত-সহস্র পর্বত রয়েছে এবং তাদের সানুদেশ থেকে উৎপন্ন অসংখ্য নদ-নদী রয়েছে। তাদের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র ও শোন- এই দুটি নদ এবং চন্দ্রবশা, তাম্রপর্ণী, অবটোদা, কৃতমালা, বৈহায়সী, কাবেরী, বেণী, পয়স্বিনী, শর্করাবর্তা, তুঙ্গভদ্রা, কৃষ্ণবেণ্যা, ভীমরথী, গোদাবরী, নির্বিন্ধ্যা, পয়োষ্ণী, তাপী, রেবা, সুরসা, নর্মদা, চর্মণ্বতী, মহানদী, বেদস্মৃতি, ঋষিকুল্যা, ত্রিসামা, কৌশিকী, মন্দাকিনী, যমুনা, সরস্বতী, দৃষদ্বতী, গোমতী, সরযূ, রোধস্বতী, সপ্তবতী, সুষোমা, শতদ্রূ, চন্দ্রভাগা, মরুদ্বৃধা, বিতস্তা, অসিক্লী, বিশ্বা- এই সমস্ত মহানদীই প্রধান। ভারতবাসীরা এই সমস্ত নদী স্মরণ করার ফলে পবিত্র। কখনও কখনও তাঁরা এই সমস্ত নদীর নাম মন্ত্ররূপে উচ্চারণ করেন এবং কখনও কখনও তাঁরা সেই নদীর জল স্পর্শ করে তাতে স্নান করেন। এইভাবে ভারতবাসীরা পবিত্র হন। এই বর্ষে যারা জন্মগ্রহণ করে তারা সত্ত্ব, রজ এবং তমোগুণে তাদের কর্ম অনুসারে দৈবী, মানুষী ও নারকী প্রভৃতি নানা প্রকার গতি লাভ করে। কারণ ভারতবর্ষে মানুষ ঠিক তার পূর্বকৃত কর্ম অনুসারে জন্মগ্রহণ করে। কেউ যদি সদ্গুরুর দ্বারা তার স্থিতি সম্বন্ধে অবগত হয়ে, যথাযথভাবে শিক্ষা লাভ করার মাধ্যমে বর্ণাশ্রম-ধর্ম অনুসারে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর সেবায় যুক্ত হয়, তা হলে তার জীবন সার্থক হয়। বহু বহুর জন্মের পর পুণ্যকর্মের ফল যখন পরিপক্ক হয়, তখন শুদ্ধ ভক্তের সঙ্গ করার সৌভাগ্য লাভ হয়। নানা প্রকার সকাম কর্মের ফলে অবিদ্যার যে বন্ধন, তখন সে তা ছেদন করতে সক্ষম হয়। শুদ্ধ ভক্তের সঙ্গ প্রভাবে সর্বভূতের আত্মা, আসক্তি রহিত, মন ও বাক্যের অগোচর এবং সম্পূর্ণরূপে স্বতন্ত্র ভগবান বাসুদেবে ভক্তি লাভ হয়। বাসুদেবের প্রতি এই প্রেমময়ী সেবা বা ভক্তিযোগই হচ্ছে মুক্তির প্রকৃত পথ। যেহেতু মনুষ্যজন্ম আত্ম-উপলব্ধির সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়, তাই স্বর্গের দেবতারা বলেন- আহা, এই ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করেছেন যে মানুষেরা, তাঁরা নিশ্চয়ই মহা পুণ্যজনক তপস্যা করেছেন, অথবা ভগবান নিশ্চয়ই তাঁদের প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছেন। তা না হলে, কিভাবে তাঁরা এমনভাবে ভগবদ্ভক্তিতে যুক্ত হয়েছেন? আমরা ভগবদ্ভক্তি সম্পাদনের সৌভাগ্য লাভের জন্য ভারতবর্ষে মনুষ্যজন্ম লাভ করতে চাই, আর এই মানুষেরা ইতিমধ্যেই সেই সৌভাগ্য লাভ করেছেন।”
দেবতারা বললেন- “দুষ্কর যজ্ঞ, কঠোর তপস্যা, ব্রত ও দানাদির ফলে আমরা স্বর্গ লাভ করেছি, কিন্তু তাতে কি ফল লাভ হল? এখানে আমরা ইন্দ্রিয়সুখ ভোগে প্রবলভাবে লিপ্ত হওয়ার ফলে, ভগবান শ্রীনারায়ণের শ্রীপাদপদ্ম কদাচিৎ স্মরণ করতে পারি। প্রকৃতপক্ষে অত্যধিক ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের পরে, আমরা তাঁর শ্রীপাদপদ্মের কথা প্রায় ভুলেই গেছি। ব্রহ্মলোকে কোটি কোটি বৎসর দীর্ঘ আয়ু লাভ করার থেকে ভারতবর্ষে অল্প আয়ু লাভ করাও শ্রেয়স্কর, কারণ ব্রহ্মলোকে উন্নীত হলেও জন্ম-মৃত্যু সমন্বিত সংসার-চক্রে ফিরে আসতে হয়। অথচ নিম্নতর লোক ভারতবর্ষের আয়ু অল্প হলেও এখানে ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে সর্বতোভাবে শরণাগত হয়ে, পূর্ণ কৃষ্ণভক্তি লাভ করার মাধ্যমে সর্বোচ্চ সিদ্ধি সাধন করা যায়। এইভাবে জন্ম-মৃত্যুর অতীত বৈকুন্ঠলোকে অভয়পদ প্রাপ্ত হওয়া যায়। যে স্থানে ভগবানের কথারূপ অমৃতের গঙ্গা প্রবাহিত হয় না, যে স্থানে সেই রূপ পবিত্র নদীর তটে আশ্রিত ভক্ত-ভাগবতদের অধিষ্ঠান নেই, যে স্থানে ভগবানের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য নৃত্য-গীত ইত্যাদি মহোৎসব সহকারে সংকীর্তন যজ্ঞ হয় না, (যেহেতু এই যুগে সংকীর্তন যজ্ঞ অনুষ্ঠানের নির্দেশ বিশেষভাবে দেওয়া হয়েছে) সেই স্থান ব্রহ্মলোক হলেও প্রকৃত বুদ্ধিমান ব্যক্তি কখনও সেই স্থান আশ্রয় করবেন না।”
“ভারতবর্ষ ভগবদ্ভক্তি সম্পাদনের উপযুক্ত স্থান ও পরিবেশ প্রদান করে, যার ফলে মানুষ জ্ঞান ও কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারে। যদি কেউ সংকীর্তন যজ্ঞ অনুষ্ঠান করার জন্য ভারতবর্ষে নির্মল ইন্দ্রিয় সমন্বিত মনুষ্যদেহ লাভ করা সত্ত্বেও সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার না করে, তা হলে তার অবস্থা ঠিক বনচর পশু-পক্ষীর মতো, অসাবধানতা বশত যারা পুনরায় ব্যাধ কর্তৃক বন্দী হয়। ভারতবর্ষে বহু দেবতা-উপাসক রয়েছেন। ইন্দ্র, চন্দ্র, সূর্য আদি সমস্ত দেবতারা পৃথক্ভাবে উপাসিত হলেও তাঁরা ভগবানের দ্বারা নিযুক্ত দায়িত্বশীল সমস্ত কর্মচারী। সেই সমস্ত উপাসকেরা দেবতাগণকে ভগবানের বিভিন্ন অংশরূপে জেনে তাঁদের উদ্দেশ্যে আহুতি প্রদান করেন। তাই ভগবান সেই সমস্ত নৈবেদ্য গ্রহণ করেন এবং উপাসকদের বাসনা পূর্ণ করে ধীরে ধীরে ভগবদ্ভক্তির স্তরে উন্নীত করেন। ভগবান যেহেতু পূর্ণ, তাঁর চিন্ময় শরীরের অংশমাত্রের পূজা করলেও, তাঁদের অভীষ্ট বর প্রদান করেন। যে ভক্ত জড় বাসনা নিয়ে ভগবানের কাছে যান, ভগবান তাঁর সেই সমস্ত বাসনা পূর্ণ করেন, কিন্তু যে বাসনা থেকে পুনঃ পুনঃ বাসনার উদয় হয়, সেই বাসনা তিনি পূর্ণ করেন না। কিন্তু ভক্ত তাঁর শ্রীপাদপদ্মের অভিলাষ না করলেও ভগবান স্বয়ং তাঁর ভক্তকে শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় প্রদান করেন এবং সেই আশ্রয় তাঁর সমস্ত বাসনা পূর্ণ করে। এটিই ভগবানের বিশেষ কৃপা। আমরা নিঃসন্দেহে যজ্ঞ, বেদ অধ্যয়ন এবং অন্যান্য সৎকর্মের অনুষ্ঠান-জনিত পুণ্যের ফলে এখন স্বর্গলোকে বাস করছি। কিন্তু, একদিন এখানে আমাদের জীবন শেষ হয়ে যাবে। তাই আমরা প্রার্থনা করি যে, যদি আমাদের পুণ্যের কিছুমাত্র অবশিষ্ট থাকে, তার ফলে যে আমরা ভারতবর্ষে ভগবানের শ্রীপাদপদ্ম স্মরণ করার উপযোগী মানবজন্ম লাভ করতে পারি। ভগবান কৃপাপূর্বক স্বয়ং সেই ভারতবর্ষে আবির্ভূত হয়ে, সেই বর্ষবাসীদের কল্যাণ বিস্তার করেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, কোন কোন পণ্ডিতের মতে জম্বূদ্বীপের আটটি উপদ্বীপ রয়েছে। মহারাজ সগরের পুত্রেরা যখন তাঁদের হারিয়ে যাওয়া অশ্বের অণ্বেষণে পৃথিবীর চতুর্দিক খনন করেন, তখন ঐ আটটি দ্বীপের সৃষ্টি হয়। সেই দ্বীপগুলির নাম স্বর্ণপ্রস্থ, চন্দ্রশুক্ল, আবর্তন, রমণক, মন্দরহরিণ, পাঞ্চজন্য, সিংহল এবং লঙ্কা। হে ভারতোত্তম মহারাজ পরীক্ষিৎ, জম্বূদ্বীপের বর্ষবিভাগ সম্বন্ধে আমি যেভাবে উপদেশ প্রাপ্ত হয়েছিলাম, তা তোমার কাছে আমি বর্ণনা করলাম।”
ঊনবিংশতি অধ্যায়- জম্বূদ্বীপের অতিরিক্ত বর্ণনা
27 Oct 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, পঞ্চম স্কন্ধ- কর্মবাসনা