শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “ধর্মরাজের পুত্র ভদ্রশ্রবা ভদ্রাশ্ববর্ষের অধিপতি। ঠিক যেভাবে শিব ইলাবৃতবর্ষে সঙ্কর্ষণের আরাধনা করেন, ভদ্রশ্রবাও তেমনই তাঁর অন্তরঙ্গ সেবক এবং ভদ্রাশ্ববর্ষের অধিবাসীগণ সহ হয়শীর্ষ নামক বাসুদেবের অবতারের আরাধনা করেন। ভগবান হয়শীর্ষ ভক্তদের অত্যন্ত প্রিয় এবং তিনি সমস্ত ধর্মীয় অনুশাসনের নির্দেষ্টা। ভদ্রশ্রবা এবং তাঁর পার্ষদেরা পরম সমাধিযোগে ভগবানের উদ্দেশ্যে তাঁদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করেন এবং সযত্ন উচ্চারণের মাধ্যমে নিম্নরূপ প্রার্থনা কীর্তন করেন।”
শ্রীভদ্রশ্রবা এবং তাঁর অন্তরঙ্গ পার্ষদেরা এইভাবে ভগবানের স্তব করেন- “আমরা সমস্ত ধর্মের উৎস ভগবানকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি, যিনি এই জড় জগতে জীবের মলিনতা দূরীভূত করে তাদের হৃদয় নির্মল করেন। আমরা বারবার তাঁকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। আহা, কি আশ্চর্য! মূর্খ বিষয়াসক্ত মানুষেরা ভয়ঙ্কর মৃত্যুকে দেখেও দেখে না! তারা জানে যে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, তবুও তারা তার প্রতি উদাসীন হয়ে তাকে উপেক্ষা করতে চায়। পিতার মৃত্যু হলে পুত্র তার পিতার ধন-সম্পদ উপভোগ করতে চায় এবং পুত্রের মৃত্যু হলে পিতা সেই পুত্রের ধন-সম্পদ উপভোগ করতে চায়। উভয় ক্ষেত্রেই লব্ধ ধন দ্বারা জড় সুখ ভোগ করার ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়।”
“হে অজ, আত্ম-তত্ত্ববিৎ বেদজ্ঞ পণ্ডিতেরা, বিবেকীরা এবং দার্শনিকেরা নিশ্চিতভাবে জানেন যে, এই জড় জগৎ নশ্বর। সমাধিস্থ অবস্থায় তাঁরা এই জগতের প্রকৃত স্থিতি উপলব্ধি করতে পারেন এবং সেই তত্ত্ব তাঁরা প্রচারও করেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা কখনও কখনও আপনার মায়ার দ্বারা মোহিত হন। এটিই আপনার অতি অদ্ভুত লীলা। তাই আমি বুঝতে পারি যে, আপনার মায়া অতি অদ্ভুত। আপনাকে সশ্রদ্ধ প্রণাম।”
“হে ভগবান, যদিও আপনি এই জড় জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়কার্য থেকে সম্পূর্ণরূপে পৃথক এবং এই সমস্ত কার্যকলাপের দ্বারা আপনি কখনও প্রভাবিত হন না, তবুও তা আপনার দ্বারাই সম্পাদিত হয়েছে বলে স্বীকৃত হয়। তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই কারণ আপনার অচিন্ত্য শক্তির প্রভাবে আপনি হচ্ছে সর্বকারণের পরম কারণ। আপনি সমস্ত কার্যের কারণ, যদিও আপনি সবকিছু থেকেই স্বতন্ত্র। এইভাবে আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে, আপনার অচিন্ত্য শক্তির দ্বারাই সবকিছু সংঘটিত হচ্ছে। কল্পান্তে মূর্তিমান অজ্ঞানরূপী দৈত্য যখন সমস্ত বেদ অপহরণ করে রসাতলে নিয়ে গিয়েছিল, তখন ভগবান হয়গ্রীব-মূর্তি প্রকট করে বেদ উদ্ধার করেছিলেন এবং ব্রহ্মা প্রার্থনা করলে তিনি তাঁকে তা প্রদান করেছিলেন। সেই সত্যসংকল্প পরমেশ্বর ভগবানকে সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, ভগবান নৃসিংহদেব হরিবর্ষে অবস্থান করেন। আমি পরে (শ্রীমদ্ভাগবতের সপ্তম স্কন্ধে) বর্ণনা করব কিভাবে প্রহ্লাদ মহারাজের জন্য নৃসিংহ মূর্তিতে ভগবান আবির্ভূত হয়েছিলেন। মহাপুরুষদের সমস্ত সৎগুণের আধার প্রহ্লাদ মহারাজ হচ্ছে ভগবানের শ্রেষ্ঠ ভক্ত। তাঁর চরিত্র এবং কার্যকলাপ তাঁর বংশের সমস্ত দৈত্যদের উদ্ধার করেছিল। ভগবান নৃসিংহদেব তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। তাই প্রহ্লাদ মহারাজ তাঁর সমস্ত পার্ষদ এবং হরিবর্ষবাসীদের নিয়ে নিম্নলিখিত মন্ত্র জপের দ্বারা ভগবান নৃসিংহদেবের আরাধনা করেছেন। সমস্ত তেজের উৎস ভগবান নৃসিংহদেবকে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। হে ভগবান আপনার নখ এবং আপনার দন্ত বজ্রের মতো, দয়া করে আপনি আমাদের সমস্ত আসুরিক কর্মবাসনার বিনাশ করুন। দয়া করে আপনি আমাদের হৃদয়ে আবির্ভূত হয়ে, আমাদের সমস্ত অজ্ঞান দূর করুন যাতে আপনার কৃপায় আমরা জীবন-সংগ্রামে নির্ভীক হতে পারি। সারা জগতের মঙ্গল হোক; খল ব্যক্তিরা অনুকূল হোক। সমস্ত জীবেরা ভক্তিযোগ অনুশীলনের ফলে, পরস্পরের মঙ্গল চিন্তা করে শান্ত হোক। তাই আমরা যেন অধোক্ষজ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চিন্তায় মগ্ন হয়ে সর্বদা তাঁর সেবায় যুক্ত থাকতে পারি।”
“হে ভগবান, আমরা প্রার্থনা করি যেন গৃহ, স্ত্রী, পুত্র, বিত্ত, আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধব সমন্বিত সংসাররূপ কারাগারের প্রতি যেন কখনও আসক্তি অনুভব না করি। যদি আসক্তি থাকে, তাহলে তা যেন ভগবৎ-প্রিয় ভক্তদের প্রতিই উদিত হয়। প্রকৃতপক্ষে যিনি আত্ম-তত্ত্ববিৎ এবং যিনি তাঁর মনকে সংযত করেছেন, তিনি কেবলমাত্র প্রাণ ধারণের উপযোগী বস্তু নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেন। এই প্রকার ব্যক্তি অচিরেই কৃষ্ণভক্তির মার্গে উন্নতি সাধন করেন, কিন্তু অন্যেরা, যারা জড় বিষয়ের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত, তাদের পক্ষে তা অত্যন্ত কঠিন। যাঁদের কাছে ভগবান মুকুন্দই হচ্ছেন সব, তাঁদের সঙ্গ প্রভাবে ভগবানে বীর্যবতী কার্যকলাপের কথা শোনা যায় এবং বোঝা যায়। মুকুন্দের কার্যকলাপ এমনই বীর্যবতী যে, তা কেবল শ্রবণ করার ফলেই তৎক্ষণাৎ ভগবানের সঙ্গ করা যায়। যে ব্যক্তি নিরন্তর অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে ভগবানের বীর্যবতী কার্যকলাপের বর্ণনা শ্রবণ করেন, শব্দরূপে পরমেশ্বর ভগবান তাঁর হৃদয়ে প্রবেশ করে অন্তরের সমস্ত মল দূর করেন। গঙ্গার স্নানের ফলে যদিও দেহের মল এবং রোগ দূর হয়, কিন্তু সেটি সম্ভব হয় দীর্ঘকাল ধরে বারবার তা সেবন করার ফলে। তাই জীবনকে সার্থক করার জন্য কোন্ বুদ্ধিমান ব্যক্তি ভগবদ্ভক্তের সঙ্গ করবেন না? যিনি ভগবান বাসুদের প্রতি শুদ্ধ ভক্তি লাভ করেছেন, তাঁর শরীরে সমস্ত দেবতা এবং তাঁদের ধর্ম, জ্ঞান, বৈরাগ্য ইত্যাদি সমস্ত সদ্গুণ বিরাজ করে। পক্ষান্তরে, যারা ভক্তিবিহীন এবং জড়-জাগতিক কার্যকলাপে লিপ্ত, তাদের মধ্যে কোন সদ্গুণ নেই। তারা যোগ অভ্যাসে পারদর্শী হতে পারে অথবা সদ্ভাবে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের ভরণ-পোষণ করতে পারে, কিন্তু তারা অবশ্যই মনোধর্মের দ্বারা পরিচালিত হয়ে অসৎ বহির্বিষয়ে ধাবিত হয় এবং মায়ার দাসত্ব করে। তাদের মধ্যে মহৎ গুণের সম্ভাবনা কোথায়? জলচর প্রাণী যেমন বিশাল জলাশয়ে থাকতে চায়, তেমনই জীব স্বাভাবিকভাবেই পরমেশ্বর ভগবানের মহান অস্তিত্বে থাকার বাসনা করে। তাই জড়-জাগতিক বিচারে অত্যন্ত মহৎ ব্যক্তিও যদি পরমাত্মা ভগবানকে পরিত্যাগ করে গৃহের প্রতি আসক্ত হয়, তাহলে তার মহত্ত্ব শূদ্রাদি নীচ জাতিতেও স্ত্রী-পুরুষের মধ্যে কেবলমাত্র বয়স দ্বারা যে মহত্ত্ব নিরূপিত হয়, ঠিক সেই রকম। যারা বিষয় জীবনের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত, তারা সমস্ত আধ্যাত্মিক গুণ হারিয়ে ফেলে। অতএব হে অসুরগণ, গৃহস্থ জীবনের তথাকথিত সুখ পরিত্যাগ করে নির্ভীকতার প্রকৃত আশ্রয় শ্রীনৃসিংহদেবের শ্রীপাদপদ্মের শরণ গ্রহণ কর। গৃহস্থ জীবনের প্রতি আসক্তিই রাগ, বিষয়তৃষ্ণা, বিষাদ, ক্রোধ, স্পৃহা, ভয়, মান, প্রভৃতির মূল কারণ, যার ফল হচ্ছে জন্ম-মৃত্যুর সংসার চক্র।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “কেতুমালবর্ষে ভগবান শ্রীবিষ্ণু কেবল তাঁর ভক্তদের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য কামদেব রূপে বিরাজমান। তাঁর সেই ভক্তদের মধ্যে রয়েছেন লক্ষ্মীদেবী, প্রজাপতি সংবৎসর এবং সংবৎসরের পুত্র ও কন্যাগণ। প্রজাপতির কন্যারা হচ্ছেন রাত্রির অধিষ্ঠাত্রী এবং তাঁর পুত্রেরা দিনের অধিষ্ঠাতা। প্রজাপতির সন্তানদের সংখ্যা ছত্রিশ হাজার। তারা মানুষের আয়ুষ্কালের (একশ বছরের) প্রতিটি দিন এবং রাত্রির নিয়ন্তা। বৎসরান্তে প্রজাপতির কন্যারা ভগবানের অত্যন্ত জ্যোতির্ময় চক্র দর্শন করে উদ্বিগ্ন হওয়ার ফলে তাদের সকলের গর্ভপাত হয়। কেতুমালবর্ষে ভগবান কামদেব (প্রদ্যুম্ন) অত্যন্ত সুললিত গতিবিলাস এবং সুন্দর মৃদুমধুর হাস্যসহ অবলোকন লীলা প্রকাশপূর্বক ভ্রূযুগল ঈষৎ উন্নত করে তাঁর বদন-কমলের শোভার দ্বারা লক্ষ্মীদেবীর আনন্দ বিধান করেন। এইভাবে তিনি তাঁর নিজের দিব্য ইন্দ্রিয়ের আনন্দ উপভোগ করেন। লক্ষ্মীদেবী সংবৎসর কালের দিবাভাগে দিনের অধিষ্ঠাতৃ দেবতা প্রজাপতির পুত্রদের সঙ্গে মিলিত হয়ে এবং রাত্রে রাত্রির অধিষ্ঠাত্রী দেবী প্রজাপতি-কন্যাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে ভগবানের পরম কৃপাময় রূপ কামদেবের আরাধনা করেন। ভগবদ্ভক্তিতে পূর্ণরূপে মগ্ন হয়ে লক্ষ্মীদেবী নিম্নলিখিত মন্ত্রগুলি উচ্চারণ করেন। আমার সমস্ত ইন্দ্রিয়ের নিয়ন্তা এবং সবকিছুর উৎস ভগবান হৃষীকেশকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। দেহ, মন এবং বুদ্ধির সমস্ত কার্যকলাপের তিনিই হচ্ছেন পরম অধিপতি। তাদের সমস্ত কার্যকলাপের তিনিই হচ্ছেন একমাত্র ভোক্তা। পঞ্চতন্মাত্র এবং মনসহ একাদশ ইন্দ্রিয় তাঁরই আংশিক প্রকাশ। তিনি জীবনের সমস্ত আবশ্যকতাগুলি পূর্ণ করেন, যা তাঁর শক্তি হওয়ার ফলে তাঁর থেকে অভিন্ন। তিনি সকলের দৈহিক এবং মানসিক শক্তির কারণ, যা তাঁর থেকে অভিন্ন। প্রকৃতপক্ষে তিনিই হচ্ছেন সমস্ত জীবের পরম গতি এবং তিনিই তাদের সমস্ত আবশ্যকতাগুলি পূর্ণ করেন। সমস্ত বেদের উদ্দেশ্য হচ্ছে তাঁর আরাধনা করা। তাই আমরা তাঁর প্রতি আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। তিনি ইহলোকে এবং পরলোকে সর্বদা আমাদের প্রতি অনুকূল হোন।”
“হে ভগবান, আপনি সম্পূর্ণরূপে স্বতন্ত্র ইন্দ্রিয়ের অধীশ্বর। তাই যে সমস্ত রমণীরা তাদের ইন্দ্রিয়তৃপ্তির জন্য পতি কামনা করে নিষ্ঠা সহকারে ব্রত পালন করে, তারা অবশ্যই মোহাচ্ছন্ন। তারা জানে না যে, সেই প্রকার পতি তাদের অথবা তাদের সন্তান-সন্ততিদের প্রকৃতপক্ষে রক্ষা করতে পারে না। এমনকি তারা তাদের নিজেদের ধন অথবা আয়ুও রক্ষা করতে পারে না, কারণ তারা নিজেরাই কাল, কর্ম এবং গুণের অধীন। কিন্তু এই কাল, কর্ম এবং গুণ আপনার অধীন। যিনি কখনও ভীত হন না, পক্ষান্তরে যিনি সমস্ত ভয়ার্ত ব্যক্তিদের পূর্ণরূপে আশ্রয় প্রদান করতে পারেন, তিনিই কেবল পতি অথবা রক্ষক হতে পারেন। তাই, হে ভগবান, আপনিই হচ্ছেন একমাত্র পতি এবং অন্য কেউ সেই পদ দাবি করতে পারে না। আপনি যদি একমাত্র পতি না হন, তা হলে আপনি অন্যদের ভয়ে ভীত হতেন। তাই যাঁরা বৈদিক তত্ত্বজ্ঞান সমন্বিত, তাঁরা কেবল আপনাকেই সকলের পতি বলে স্বীকার করেন এবং তাঁরা মনে করেন যে, আপনার থেকে শ্রেষ্ঠ পতি বা রক্ষক আর কেউ হতে পারে না।”
“হে ভগবান, যে রমণী বিশুদ্ধ প্রেমে আপনার শ্রীপাদপদ্মের আরাধনা করেন, আপনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর সমস্ত বাসনা পূর্ণ করেন। তবে যে রমণী অন্য কোন অভিলাষ নিয়ে আপনার আরাধনা করেন, আপনি অচিরেই তার বাসনা পূর্ণ করেন, কিন্তু চরমে তিনি ভগ্নহৃদয় হয়ে অনুশোচনা করেন। তাই কোন জড় উদ্দেশ্য নিয়ে আপনার শ্রীপাদপদ্মের আরাধনা করা উচিত নয়। হে পরম অজিত ভগবান! ব্রহ্মা, শিব এবং অন্যান্য সুর ও অসুরেরা যখন ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের চিন্তায় মগ্ন হন, তখন তাঁরা আমার বর লাভ করার জন্য কঠোর তপস্যা করেন। কিন্তু আপনার শ্রীপাদপদ্মের সেবায় সর্বতোভাবে যুক্ত না হলে, আমি কাউকেই কৃপা করি না, তা তিনি যত মহৎই হোন না কেন। যেহেতু আমি আপনাকে সর্বদা আমার হৃদয়ে ধারণ করি, তাই ভক্ত ব্যতীত অন্য কাউকে আমি কৃপা করতে পারি না। হে অচ্যুত আপনার করকমল সমস্ত আশীর্বাদের উৎস। তাই আপনার শুদ্ধ ভক্তেরা সেই করকমলের বন্দনা করেন এবং আপনি কৃপাপূর্বক তা তাদের মস্তকে স্থাপন করেন। কৃপাপূর্বক আপনি আমার মস্তকেও সেই করকমল স্থাপন করুন। যদিও আপনি স্বর্ণরেখা চিহ্নরূপে আমাকে আপনার বক্ষস্থলে ধারণ করেন তবু আমার মনে হয় আপনি কেবল আমাকে বাহ্যে আদর প্রদর্শন করেন। আপনার প্রকৃত কৃপা আপনি আপনার অন্তরঙ্গ ভক্তদের দান করেন, আমাকে নয়। আপনি পরমেশ্বর, আপনার উদ্দেশ্য কেউই বুঝতে পারে না।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “রম্যকবর্ষে, যেখানকার অধিপতি হচ্ছেন বৈবস্বত মনু, সেখানে ভগবান পূর্বে (চাক্ষুষ মন্বন্তরের অন্তে) মৎস্যরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বৈবস্বত মনু এখনও শুদ্ধ ভক্তি সহকারে নিম্নলিখিত মন্ত্রটি জপ করে মৎস্য অবতারের আরাধনা করেন। আমি শুদ্ধ সত্ত্ব স্বরূপ ভগবানকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। আমি প্রাণ, বল, ওজস এবং ইন্দ্রিয়ের সামর্থ্যরে ইৎস। সমস্ত অবতারদের মধ্যে তিনিই প্রথম মহামৎস্য অবতার রূপে আবির্ভূত হয়েছেন। আমি পুনরায় তাঁকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। হে ভগবান, বাজীকর যেভাবে তার পুতুলদের নাচায় এবং পতি যেভাবে তার পত্নীকে নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনই আপনি ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, আদি নাম সমন্বিত ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত জীবদের নিয়ন্ত্রণ করছেন। যদিও আপনি পরম সাক্ষী এবং নির্দেষ্টারূপে সকলের হৃদয়ে রয়েছেন, সেই সঙ্গে আপনি তাদের বাইরেও রয়েছেন, তবুও সমাজ, জাতি, দেশ ইত্যাদি তথাকথিত সমস্ত নেতারা আপনাকে বুঝতে পারে না। কেবল যাঁরা বৈদিক মন্ত্রের শব্দতরঙ্গ শ্রবণ করেন, তাঁরাই আপনাকে জানতে পারেন। হে ভগবান, ব্রহ্মা আদি দেবতাদের থেকে শুরু করে এই পৃথিবীর রাজনৈতিক নেতারা পর্যন্ত সমস্ত লোকপালেরা আপনার আধিপত্যের প্রতি মাৎসর্য পরায়ণ। আপনার সাহায্য ব্যতীত তারা স্বতন্ত্রভাবে অথবা মিলিতভাবে এই ব্রহ্মাণ্ডের অসংখ্য জীবদের পালন করতে পারে না। সমস্ত মানুষদের, পশুদের, বৃক্ষ, সরীসৃপ, পক্ষী, পাহাড়-পর্বত- এই জড় জগতে যা কিছু দেখতে পাওয়া যায়, তার সবেরই একমাত্র পালক হচ্ছেন আপনি। হে সর্বশক্তিমান। সমস্ত লতা, ওষধি এবং বৃক্ষের আশ্রয়-স্বরূপ এই বসুন্ধরা যখন কল্পান্তে উত্তর তরঙ্গসঙ্কুল প্রলয়-বারিতে নিমগ্ন হয়েছিল, তখন আমাকে সহ এই পৃথিবীকে ধারণ করে, আপনি প্রবল বেগে সমুদ্রে বিচরণ করেছিলেন। হে অজ, আপনি সমগ্র জগতের প্রকৃত নিয়ন্তা, তাই আপনি সমস্ত জীবের আশ্রয়। আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হিরণ্ময়বর্ষে ভগবান শ্রীবিষ্ণু কূর্মশরীর ধারণ করে বিরাজ করেন। হিরণ্ময়বর্ষের অধিপতি অর্যমা সেই বর্ষবাসী পুরুষদের সঙ্গে ভগবানের সেই প্রিয়তম শ্রীমূর্তির উপাসনা করেন। তাঁরা নিরন্তর এই মন্ত্রটি জপ করেন। হে প্রভু, কূর্মরূপ ধারণকারী আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম। আপনি সমস্ত দিব্য গুণের উৎস এবং সমস্ত জড় প্রভাব থেকে সর্বতোভাবে মুক্ত আপনি শুদ্ধ সত্ত্বময়। আপনি জলে বিচরণ করেন, কিন্তু আপনার স্থিতি কেউই লক্ষ্য করতে পারে না। তাই আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। আপনার চিন্ময় স্থিতির জন্য আপনি অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের দ্বারা সীমিত নন। আপনি সবকিছুর আশ্রয়রূপে সর্বত্র বিরাজমান এবং তাই আপনাকে বারবার আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। হে ভগবান, এই দৃশ্য জগৎ আপনার সৃজনী শক্তির অভিব্যক্তি। এই জগতে যে অন্তহীন রূপ রয়েছে তা কেবল আপনার বহিরঙ্গা শক্তিরই প্রদর্শন মাত্র। এই বিরাটরূপ আপনার প্রকৃত স্বরূপ নয়। চিন্ময় চেতনাসম্পন্ন আপনার ভক্তেরা ছাড়া অন্য কেউই আপনার প্রকৃত রূপ দর্শন করতে পারে না। তাই আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। হে ভগবান! জরায়ুজ, অণ্ডজ, স্বেদজ এবং উদ্ভিজ প্রভৃতি চরাচর জীব, দেবতা ঋষি, পিতৃ, ভূত ও ইন্দ্রিয়, অন্তরীক্ষ, স্বর্গ, পৃথিবী, পর্বত, নদী, সমুদ্র, দ্বীপ, গ্রহ এবং নক্ষত্র- এই সবই আপনারই বিভিন্ন শক্তির প্রকাশ, কিন্তু আপনি এক এবং অদ্বিতীয়। তাই আপনার অতীত আর কিছু নেই। এই সমগ্র জগৎ তাই মিথ্যা নয়, তা আপনার অচিন্ত্য শক্তির সাময়িক প্রকাশ। হে ভগবান, আপনার নাম, রূপ এবং আকৃতি অসংখ্য রূপে প্রকাশিত হয়। আপনি যে কত রূপে বিরাজ করেন তা কেউই সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে না, তবুও আপনি কপিলদেব রূপে এই জগৎকে চব্বিশটি তত্ত্বে বিশ্লেষণ করেছেন। তাই কেউ যদি সাংখ্য-দর্শন সম্বন্ধে আগ্রহী হন, যার দ্বারা বিভিন্ন তত্ত্ব নিরূপণ করা যায়, তা হলে তাঁর অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে আপনার কাছ থেকে তা শ্রবণ করা। দুর্ভাগ্যবশত অভক্তেরা আপনার প্রকৃত রূপ সম্বন্ধে অজ্ঞ থেকে কেবল বিভিন্ন উপাদানেরই গণনা করে। আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, জম্বূদ্বীপের উত্তরভাগে কুরুবর্ষে ভগবান যজ্ঞপুরুষ বরাহরূপ প্রকট করে বিরাজ করছেন। সেখানে কুরুবর্ষবাসীদের সঙ্গে ধরিণীদেবী অবিচলিত ভক্তিযোগে নিম্নলিখিত উপনিষদ মন্ত্র বারংবার জপ করে তার আরাধনা করেন। হে ভগবান, বিরাটপুরুষ রূপে আমরা আপনাকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। কেবল মন্ত্র উচ্চারণের দ্বারা আমরা আপনাকে পূর্ণরূপে জানতে পারব। আপনি যজ্ঞ এবং আপনি ক্রতু। তাই সমস্ত যজ্ঞ অনুষ্ঠান আপনারই চিন্ময় দেহের অঙ্গ এবং আপনিই সমস্ত যজ্ঞের ভোক্তা। আপনার রূপ শুদ্ধ সত্ত্বময়। আপনি ত্রিযুগ নামে পরিচিত কারণ কলিযুগে আপনি আপনার রূপ প্রচ্ছন্ন রেখে অবতরণ করেন। এই নামের আর একটি কারণ হচ্ছে আপনি ত্রিযুগল ঐশ্বর্যবিশিষ্ট অর্থাৎ আপনি ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ।”
“মুনি-ঋষিরা অরণি কাষ্ঠ মন্থনের দ্বারা কাষ্ঠাভ্যন্তরস্থিত অগ্নিকে প্রকাশিত করতে পারেন। তেমনই, হে ভগবান, যাঁরা পরমতত্ত্ব সম্বন্ধে অবগত, তাঁরা সবকিছুতে আপনাকে দর্শন করার চেষ্টা করেন, এমনকি তাঁদের নিজেদের শরীরেও। তবুও আপনি প্রচ্ছন্ন থাকেন। মানসিক অথবা দৈহিক পরোক্ষ কার্যকলাপের দ্বারা আপনাকে জানা যায় না। কারণ আপনি স্বয়ংপ্রকাশ। যখন আপনি দেখেন যে, কেউ সর্বান্তঃকরণে আপনার অন্বেষণ করছে, তখন আপনি তার কাছে আপনার স্বরূপ প্রকাশ করেন। তাই আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ এই সমস্ত ইন্দ্রিয়সুখের বিষয়, ইন্দ্রিয়ের কার্যকলাপ, ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাতৃ দেবতা, শরীর, কাল ও অহঙ্কার- এই সবই আপনার মায়া শক্তি দ্বারা সৃষ্ট। অষ্টাঙ্গ-যোগর অনুশীলনের দ্বারা যাঁদের বুদ্ধিবৃত্তি স্থির হয়েছে, তাঁরা দেখতে পান যে, এই সমস্ত তত্ত্ব আপনার মায়া-শক্তির পরিণাম। তাঁরা সবকিছুর পটভূমিতে আপনার চিন্ময় পরমাত্মা রূপও দর্শন করেন। তাই আপনাকে বারবার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। হে ভগবান, এই জড় জগতের সৃষ্টি, স্থিতি এবং সংহার আপনার বাঞ্ছিত নয়; কিন্তু আপনার সৃজনী শক্তির দ্বারা বদ্ধ জীবদের জন্য আপনি সেই কার্য করেন। চুম্বকের প্রভাবে লৌহখণ্ড যেভাবে গতিশীল হয়, ঠিক সেইভাবে প্রকৃতির প্রতি আপনার দৃষ্টিপাতের ফলে জড় জগত সক্রিয় হয়। হে ভগবান, এই ব্রহ্মাণ্ডে আদি বরাহরূপে আপনি মহা দৈত্য হিরণ্যাক্ষের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন এবং তাকে সংহার করেছিলেন। তারপর, হস্তী যেভাবে জল থেকে পদ্ম তুলে খেলা করে, ঠিক সেইভাবে আপনি আমাকে আপনার দশনাগ্রে ধারণ করে গর্ভোদক সমুদ্র থেকে উদ্ধার করেছিলেন। আমি আপনাকে আমার প্রণতি নিবেদন করি।”
অষ্টাদশ অধ্যায়- ভগবানের প্রতি জম্বূদ্বীপবাসীদের প্রার্থনা
22 Oct 2025 Leave a comment
in গ্রন্থসমূহ, পঞ্চম স্কন্ধ- কর্মবাসনা