মহর্ষি শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এরপর আমি প্লক্ষ আদি ছয়টি দ্বীপের পরিমাণ, লক্ষণ এবং আকার বর্ণনা করব।”
“সুমেরু পর্বত জম্বূদ্বীপ দ্বারা পরিবেষ্টিত, জম্বূদ্বীপ লবণ সমুদ্র দ্বারা পরিবেষ্টিত। জম্বূদ্বীপের বিস্তার ১,০০,০০০ যোজন (৮,০০,০০০ মাইল) এবং লবণ সমুদ্রের বিস্তারও সেই পরিমাণ। দুর্গের চতুষ্পার্শ্বস্থ পরিখা যেমন কখনও কখনও উপবনের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে, তেমনই জম্বূদ্বীপকে বেষ্টনকারী লবণ সমুদ্র প্লক্ষদ্বীপ দ্বারা পরিবেষ্টিত। প্লক্ষদ্বীপের বিস্তার লবন সমুদ্রের দ্বিগুন, অর্থাৎ ২,০০,০০০ যোজন (১৬,০০,০০০ মাইল)। প্লক্ষদ্বীপে স্বর্ণের মতো উজ্জ্বল একটি প্লক্ষ বৃক্ষ রয়েছে এবং তা জম্বূদ্বীপের জম্বূবৃক্ষের মতো উচ্চ। সেই বৃক্ষের মূলে সাতটি শিখা সমন্বিত আগুন রয়েছে। এই প্লক্ষ বৃক্ষের নাম অনুসারে এই দ্বীপের প্লক্ষদ্বীপ নামকরণ হয়েছে। প্লক্ষ দ্বীপের অধিপতি হচ্ছেন মহারাজ প্রিয়ব্রতের পুত্র ইধ্মজিহ্ব। তিনি দ্বীপকে তাঁর সাতটি পুত্রের নাম অনুসারে সাতটি বর্ষে বিভাগ করেন এবং এক-একটি বর্ষ এক-একটি পুত্রকে দান করেন। তারপর তিনি ভগবদ্ভক্তিতে যুক্ত হওয়ার জন্য সংসার-জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন। শিব, যবস, সুভদ্র, শান্ত, ক্ষেম, অমৃত এবং অভয়- এই সাত পুত্রের নাম অনুসারে সাতটি বর্ষের নামকরণ হয়েছে। সেই সাতটি বর্ষে সাতটি পর্বত এবং সাতটি নদী রয়েছে। পর্বতগুলির নাম মণিকূট, বজ্রকূট, ইন্দ্রসেন, জ্যোতিষ্মান্, সুপর্ণ, হিরণ্যষ্ঠীব ও মেঘমাল এবং সাতটি নদীর নাম অরুণা, নৃম্ণা, আঙ্গিরসী, সাবিত্রী, সুপ্রভাতা, ঋতম্ভরা ও সত্যম্ভরা। সেই নদীর জল স্পর্শ ও স্নান করার ফলে তৎক্ষণাৎ জড় কলুষ থেকে মুক্ত হওয়া যায় এবং হংস, পতঙ্গ, ঊধ্বায়ন ও সত্যাঙ্গ নামক চারটি বর্ণের মানুষ যারা প্লক্ষদ্বীপে বাস করেন, তাঁরা এইভাবে তাঁদের কলুষ থেকে মুক্ত হন। সেখানকার অধিবাসীদের আয়ু এক হাজার বছর। তাঁরা দেবতাদের মতো সুন্দর এবং তাঁদের সন্তান উৎপাদনের প্রকারও দেবতাদের মতো। তাঁরা বেদোক্ত কর্মমার্গ অবলম্বনপূর্বক, সূর্যরূপী ভগবানের আরাধনা করে সূর্যলোকরূপ স্বর্গ প্রাপ্ত হন। (এই মন্ত্রের দ্বারা প্লক্ষ দ্বীপবাসীরা ভগবানের উপাসনা করেন-) আমরা সূর্যদেবের শরণ গ্রহণ করি, যিনি পুরাণ পুরুষ, সর্বব্যাপী ভগবান শ্রীবিষ্ণুর প্রতিবিম্ব-স্বরূপ। শ্রীবিষ্ণুই একমাত্র আরাধ্য ভগবান। তিনি বেদ, তিনি ধর্ম এবং তিনি সমস্ত শুভ ও অশুভ ফলের অধিষ্ঠাতা।”
“হে রাজন্, প্লক্ষ আদি পাঁচটি দ্বীপের অধিবাসীদের আয়ু ইন্দ্রিয়ের বল, দৈহিক ও মানসিক শক্তি, বুদ্ধি এবং বিক্রম সকলেরই সমান। প্লক্ষদ্বীপ নিজের সমান বিস্তৃত ইক্ষুরস-সমুদ্রের দ্বারা পরিবেষ্টিত, তেমনই প্লক্ষদ্বীপের দ্বিগুন (৪,০০,০০০ যোজন ৩২,০০,০০০ মাইল) শাল্মলীদ্বীপ সমান বিস্তার সমন্বিত সুরাসাগর দ্বারা পরিবৃত। শাল্মলীদ্বীপে একটি শাল্মলী বৃক্ষ রয়েছে, যার থেকে সেই দ্বীপটির নামকরণ হয়েছে। সেই বৃক্ষটি প্লক্ষ বৃক্ষটির মতনই ১০০ যোজন (৮০০ মাইল) বিস্তৃত এবং ১,১০০ যোজন (৮,৮০০ মাইল)) উন্নত। পণ্ডিতেরা বলেন যে, সেই বিশাল বৃক্ষটিতে পক্ষীরাজ গরুড় বাস করেন। সেখানে তিনি বেদমন্ত্রের দ্বারা ভগবান বিষ্ণুর স্তব করেন। মহারাজ প্রিয়ব্রতের পুত্র যজ্ঞবাহু শাল্মলী-দ্বীপের অধিপতি। তিনি সেই দ্বীপটিকে সাতটি বর্ষে ভাগ করে তাঁর সাত পুত্রকে প্রদান করেছেন। তাঁর সাত পুত্রের নাম অনুসারে সেই বর্ষগুলির নাম- সুরোচন, সৌমনস্য, রমণক, দেববর্ষ, পরিভদ্র, আপ্যায়ন এবং অবিজ্ঞাত। সেই বর্ষে স্বরস, শতশৃঙ্গ, বামদেব, কুন্দ, মুকুন্দ, পুষ্পবর্ষ এবং সহস্যশ্রুতি নামক সাতটি পর্বত রয়েছে। সেখানে অনুমতি, সিনীবালী, সরস্বতী, কুহূ, রজনী, নন্দা এবং রাকা নামক সাতটি নদীও রয়েছে। সেগুলি এখনও বর্তমান। শ্রুতিধর, বীর্যধর, বসুন্ধর এবং ইষন্ধর নামে বিখ্যাত এই বর্ষব্যাপী পুরুষেরা কঠোর নিষ্ঠা সহকারে বর্ণাশ্রম ধর্ম পালন করে ভগবানের প্রকাশ সোম নামক চন্দ্রদেবকে উপাসনা করেন। (শাল্মলী-দ্বীপবাসীরা নিম্নলিখিত স্তবের দ্বারা চন্দ্রদেবের আরাধনা করেন-) পিতৃদেব এবং দেবতাদের অন্ন প্রদান করার উদ্দেশ্যে চন্দ্রদেব তাঁর কিরণের দ্বারা শুক্ল ও কৃষ্ণ নামক দুটি পক্ষে মাসকে বিভক্ত করেছেন। চন্দ্রদেব কালের বিভাগ কর্তা এবং তিনি সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডবাসীদের রাজা। তাই আমরা তাঁর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের অধিপতি এবং পথপ্রদর্শক রূপে থাকেন। আমরা তাঁকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।”
“সুরা-সমুদ্রের বহির্ভাগে কুশদ্বীপ নামক আর একটি দ্বীপ রয়েছে যা ৮,০০,০০০ যোজন (৬৪,০০,০০০ মাইল) বিস্তৃত, অর্থাৎ সুরা-সমুদ্রের দ্বিগুন বিস্তৃত। শাল্মলী দ্বীপ যেমন সুরা-সমুদ্রের দ্বারা পরিবেষ্টিত, কুশদ্বীপ তেমন ঘৃত-সমুদ্রের দ্বারা বেষ্টিত। এই সমুদ্রের বিস্তারও কুশদ্বীপেরই সমান। কুশদ্বীপে একটি কুশস্তম্ভ আছে এবং তার থেকেই এই দ্বীপটির নামকরণ হয়েছে। সেই কুশস্তম্ভ ভগবানের ইচ্ছায় দেবতাদের দ্বারা নির্মিত এবং তা দ্বিতীয় অগ্নির স্বরূপ। তার কোমল এবং স্নিগ্ধ শিখার দ্বারা সর্বদিক উদ্ভাসিত। হে রাজন্, মহারাজ প্রিয়ব্রতের আর এক পুত্র হিরণ্যরেতা এই দ্বীপের অধিপতি। তিনি এই দ্বীপটিকে সাতটি বর্ষে বিভাগ করে তাঁর সাত পুত্রদের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রদান করেন এবং তারপর স্বয়ং তপস্যায় প্রবৃত্ত হন। হিরণ্যরেতার সাতটি পুত্রের নাম- বসু, বসুদান, দৃঢ়রুচি, নাভিগুপ্ত, স্তুত্যব্রত, বিবিক্ত এবং বামদেব। সেই সাতটি বর্ষে চক্র, চতুঃশৃঙ্গ, কপিল, চিত্রকূট, দেবানীক, ঊর্ধ্বরোমা এবং দ্রবিণ নামক সাতটি সীমা নির্ধারক পর্বত রয়েছে। সেখানে রমকুল্যা, মধুকুল্যা, মিত্রবিন্দা, শ্রুতবিন্দা, দেবগর্ভা, ঘৃতচ্যুতা এবং মন্ত্রমালা নামক সাতটি নদীও রয়েছে। কুশল, কোবিদ, অভিযুক্ত এবং কুলক নামে বিখ্যাত কুশদ্বীপবাসীরা সেই সমস্ত নদীর জলে স্নান করে পবিত্র হয়ে, বৈদিক শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে কর্ম অনুষ্ঠান করতে অত্যন্ত পারদর্শী। তাঁরা এইভাবে অগ্নিদেব রূপে ভগবানের উপাসনা করেন। (কুশদ্বীপবাসীরা এই মন্ত্রের দ্বারা অগ্নিদেবের উপাসনা করেন-) হে অগ্নিদেব, আপনি পরম পুরুষ ভগবান শ্রীহরির অঙ্গ এবং আপনি যজ্ঞের সমস্ত হবি তাঁর কাছে বহন করে নিয়ে যান। তাই আমরা আপনার কাছে প্রার্থনা করি, এই যজ্ঞের সমস্ত আহুতি যা আমরা দেবতাদের মাধ্যমে যজ্ঞের পরম ভোক্তা ভগবানকে নিবেদন করছি, দয়া করে তা আপনি ভগবানের কাছে বহন করে নিয়ে যান।”
“ঘৃত-সাগরের বাইরে ক্রৌঞ্চ নামক আর একটি দ্বীপ রয়েছে, যার বিস্তার ১৬,০০,০০০ যোজন (১,২৮,০০,০০০ মাইল), অর্থাৎ ঘৃত-সমুদ্রের বিস্তারের দ্বিগুন। কুশদ্বীপ যেমন ঘৃত সাগরের দ্বারা পরিবেষ্টিত, ক্রৌঞ্চদ্বীপ তার সমান বিস্তার সমন্বিত ক্ষীর-সাগরের দ্বারা পরিবেষ্টিত। ক্রৌঞ্চদ্বীপে ক্রৌঞ্চ নামক একটি বিশাল পর্বত রয়েছে, যা থেকে এই দ্বীপটির নামকরণ হয়েছে। যদিও কৌঞ্চ পর্বতের তটপ্রদেশের কুঞ্জগুলি কার্তিকের অস্ত্রের দ্বারা বিধ্বস্ত হয়েছিল, তবুও সেই পর্বত চতুর্দিকস্থ ক্ষীর-সমুদ্রের জলে অভিসিঞ্চিত হয়ে এবং বরুণদেব কর্তৃক সুরক্ষিত হয়ে ভয়শূণ্য হয়েছে। এই দ্বীপের অধিপতি ঘৃতপৃষ্ঠ নামক মহারাজ প্রিয়ব্রতের আর এক পুত্র, যিনি ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞানবান। এই ঘৃতপৃষ্ঠ তাঁর সাত পুত্রের নাম অনুসারে সাতটি বর্ষ বিভাগ করে প্রত্যেক পুত্রকে এক-একটি বর্ষে আধিপত্যে নিযুক্ত করেছিলেন এবং তিনি স্বয়ং গৃহস্থ-জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করে সমস্ত আত্মার আত্মা, সমস্ত কল্যাণকর গুণ সমন্বিত ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের শরণাগত হয়েছিলেন। এইভাবে তিনি সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। মহারাজ ঘৃতপৃষ্ঠের পুত্রদের নাম ছিল আম, মধুরুহ, মেঘপৃষ্ঠ, সুধামা, ভ্রাজিষ্ঠ, লোহিতার্ণ এবং বনস্পতি। সেই দ্বীপে সাতটি বর্ষের সীমা নির্ধারণকারী সাতটি পর্বত রয়েছে এবং সাতটি নদীও রয়েছে। সেই পর্বতগুলির নাম শুক্ল, বর্ধমান, ভোজন, উপবর্হিণ, নন্দ, নন্দন এবং সর্বতোভদ্র। সেই নদীগুলির নাম অভয়া, অমৃতৌঘা, আর্যকা, তীর্থবর্তী, রূপবতী, পবিত্রবতী এবং শুক্লা। ক্রৌঞ্চদ্বীপের অধিবাসীরা পুরুষ, ঋষভ, দ্রবিণ এবং দেবক- এই চারটি বর্ণে বিভক্ত। তাঁরা সেই পবিত্র নদীর জল সেবা করে থাকেন। তাঁরা জলে অঞ্জলিপূর্ণ করে ভগবানের জলময় মূর্তি বরুণের উপাসনা করেন। (ক্রৌঞ্চদ্বীপের অধিবাসীরা এই মন্ত্রের দ্বারা উপাসনা করেন-) হে নদীর জল, আপনি পরমেশ্বর ভগবানের শক্তি প্রাপ্ত হয়েছেন। তাই আপনি ভূর্লোক, ভূবর্লোক এবং স্বর্লোক পবিত্র করেন। আপনার স্বরূপের দ্বারা আপনি পাপ নাশ করেন এবং তাই আমরা আপনাকে স্পর্শ করছি। দয়া করে আপনি আমাদের পবিত্র করতে থাকুন।”
“ক্ষীর-সমুদ্রের পরে ৩২,০০,০০০ যোজন বিস্তৃত (২,৫৬,০০,০০০ মাইল) শাকদ্বীপ নামক আর একটি দ্বীপ রয়েছে। ক্রৌঞ্চদ্বীপ যেমন ক্ষীর-সমুদ্রের দ্বারা পরিবেষ্টিত, শাকদ্বীপও তেমনই সেই দ্বীপের সমান বিস্তার সমন্বিত দধি-সমুদ্রের দ্বারা পরিবেষ্টিত। শাকদ্বীপে একটি বিশাল শাকবৃক্ষ রয়েছে, যার থেকে সেই দ্বীপটির নামকরণ হয়েছে। সেই বৃক্ষটির সৌরভে সমগ্র দিক সুরভিত থাকে। এই দ্বীপের অধিপতিও প্রিয়ব্রতের এক পুত্র মেধাতিথি। তিনিও তাঁর দ্বীপটিকে সাতটি বর্ষে বিভক্ত করে তাঁর পুত্রদের নাম অনুসারে তাদের নামকরণ করেছিলেন এবং তাঁর পুত্রদের তিনি সেই সমস্ত বর্ষের অধিপতি করেছিলেন। তাঁর সাত পুত্রের নাম- পুরোজব, মনোজব, পবমান, ধূম্রানীক, চিত্ররেফ, বহুরূপ এবং বিশ্বধার। দ্বীপটিকে বিভক্ত করে তাঁর পুত্রদের সেখানকার অধিপতি রূপে প্রতিষ্ঠিত করার পর মেধাতিথি অবসর গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর মনকে সর্বতোভাবে ভগবান অনন্তের শ্রীপাদপদ্মে মগ্ন করার উদ্দেশ্যে তপোবনে প্রবেশ করেছিলেন। এই বর্ষগুলিতেও সাতটি সীমা নির্ধারণকারী পর্বত এবং সাতটি নদী রয়েছে। সেই পর্বতগুলি হচ্ছে ঈশান, উরুশৃঙ্গ, বলভদ্র, শতকেসর, সহস্রস্রোত, দেবপাল এবং মহানস। নদীগুলি হচ্ছে অনঘা, আয়ুর্দ, উভয়স্পৃষ্টি, অপরাজিতা, পঞ্চনদী, সহস্রস্রুতি এবং নিজধৃতি। এই বর্ষবাসীরাও ঋতব্রত, সত্যব্রত, দানব্রত এবং অনুব্রত নামক চারটি বর্ণে বিভক্ত, যা ঠিক ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র- এই চারটি বর্ণ বিভাগের অনুরূপ। তাঁরা প্রাণায়াম ও অষ্টাঙ্গযোগ অনুশীলন করেন এবং রজ ও তমোগুণের কলুষ থেকে মুক্ত হয়ে পরম সমাধি যোগে বায়রূপী ভগবানের আরাধনা করেন। (শাকদ্বীপবাসীরা নিম্নলিখিত মন্ত্রের দ্বারা বায়ুরূপী ভগবানের আরাধনা করেন-) হে পরম পুরুষ, দেহের অভ্যন্তরে পরমাত্মা রূপে বিরাজ করে আপনি প্রাণ আদি বায়ুর ক্রিয়া পরিচালনা করেন এবং এইভাবে আপনি সমস্ত জীবদের পালন করেন। হে ভগবান, হে সর্বান্তর্যামী, হে জগদীশ্বর, আপনি আমাদের সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা করুন।”
“সেই দধি-সমুদ্রের বাইরে পুষ্করদ্বীপ নামক আর একটি দ্বীপ রয়েছে, যা ৬৪,০০,০০০ যোজন বিস্তৃত (৫,১২,০০,০০০ মাইল) অর্থাৎ দধি সমুদ্রের দ্বিগুন বিস্তার সমন্বিত। তা সেই দ্বীপেরই সমান বিস্তার সমন্বিত অত্যন্ত স্বাদু জলের সমুদ্রের দ্বারা পরিবেষ্টিত। সেই পুষ্করদ্বীপে অযুত অযুত (১০,০০,০০,০০০) বিশুদ্ধ স্বর্ণপত্র সমন্বিত একটি বিশাল পদ্ম রয়েছে, যা জ্বলন্ত অগ্নিশিখার মতো উজ্জ্বল। সেই পদ্ম ফুলটিকে ব্রহ্মার উপবেশনের স্থান বলে মনে করা হয় এবং পরম শক্তিমান জীব হওয়ার ফলে, ব্রহ্মাকে কখনও কখনও ভগবান বলে সম্বোধন করা হয়। সেই দ্বীপের মধ্যে মানসোত্তার নামক একটি পর্বত রয়েছে, যা সেই দ্বীপের অন্তরভাগ এবং বহিরভাগের সীমা নির্ধারণ করে। সেই পর্বতের বিস্তার এবং উচ্চতা ১০,০০০ যোজন (৮০,০০০ মাইল)। সেই পর্বতের চারদিকে ইন্দ্রাদি লোকপালদের চারটি পুরী রয়েছে। সেই পর্বতের উপর সংবৎসর নামক চক্রে সূর্যদেব তাঁর রথে পরিভ্রমণ করে সুমেরু পর্বতকে প্রদক্ষিণ করেন। সূর্যের উত্তর দিকের পথকে বলা হয় উত্তরায়ণ এবং দক্ষিণ দিকের পথকে বলা হয় দক্ষিণায়ন। তার একদিক দেবতাদের দিন এবং অন্য দিক দেবতাদের রাত্রি। বীতিহোত্র নামক মহারাজ প্রিয়ব্রতের পুত্র হচ্ছেন এই দ্বীপের অধিপতি। তাঁর দুই পুত্র রমণক এবং ধাতকি। তিনি তাঁর দুই পুত্রকে সেই দ্বীপের দুটি দিকের দুটি বর্ষের অধিপতি নিযুক্ত করে, স্বয়ং জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মেধাতিথির মতো ভগবানের উপসনায় রত হয়েছিলেন। তাঁদের জড় বাসনা চরিতার্থ করার জন্য সেই বর্ষবাসীরা ব্রহ্মারূপী ভগবানের আরাধনা করেন। তাঁরা নিম্নলিখিত স্তোত্রে ভগবানের স্তুব করেন। ব্রহ্মা কর্মময় নামে পরিচিত, কারণ বৈদিক কর্ম অনুষ্ঠানের দ্বারা তাঁর পদ প্রাপ্ত হওয়া যায় এবং বৈদিক কর্ম অনুষ্ঠানের মন্ত্র তাঁর থেকে প্রকাশিত হয়। তিনি অবিচলভাবে ভগবানের প্রতি ভক্তিপরায়ণ এবং তাই একদিক দিয়ে তিনি ভগবান থেকে অভিন্ন। কিন্তু তা সত্ত্বেও অদ্বয়বাদীরা যেভাবে তাঁর উপাসনা করে, সেভাবে তাঁর উপাসনা করা উচিত নয়, পক্ষান্তরে দ্বৈত ভাব নিয়ে তাঁর উপাসনা করা উচিত। সর্বদা পরম আরাধ্য পরমেশ্বর ভগবানের সেবকরূপে তাঁর সেবা করা উচিত। তাই সাক্ষাৎ বৈদিক জ্ঞানরূপে প্রকাশিত হয়েছেন যে ভগবান ব্রহ্মা, তাঁকে আমরা সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।”
“তারপর, স্বাদুজলের সমুদ্রের পরে এবং তাঁকে পূর্ণরূপে পরিবেষ্টন করে রয়েছে লোকালোক পর্বত, যা সূর্যের আলোকে পূর্ণ দেশ এবং আলোকবিহীন দেশগুলিকে বিভক্ত করেছে। সুমেরু পর্বত থেকে মানসোত্তার পর্বত পর্যন্ত বিস্তৃতি সমন্বিত একটি ভূমি স্বাদু জলের সমুদ্রের পরে রয়েছে। সেখানে বহু প্রাণীও বাস করে। তারপর লোকালোক পর্বত ও দধি-সমুদ্রের অন্তরালে এক কাঞ্চনময়ী ভূমি রয়েছে। সেই ভূমি স্বর্ণময় হওয়ার ফলে তা দর্পণের মতো আলোক প্রতিফলিত করে এবং কোন বস্তু সেখানে পতিত হলে তাকে আর দেখা যায় না। তাই সমস্ত প্রাণী সেই স্থান বর্জন করেছে। প্রাণী অধ্যুষিত এবং প্রাণী বর্জিত স্থান দুটির মাঝখানে এক বিশাল পর্বত রয়েছে যা এই দুটি স্থানকে পৃথক করেছে, তাই তা লোকালোক নামে বিখ্যাত। শ্রীকৃষ্ণের পরম ইচ্ছার প্রভাবে লোকালোক পর্বত ভূর্লোক, ভুবর্লোক ও স্বর্লোক- এই তিন লোকের সীমা নির্ধারক পর্বতরূপে সংস্থাপিত হয়েছে। সূর্যলোক থেকে ধ্রুবলোক পর্যন্ত সমস্ত জ্যোতিষ্ক এই পর্বতের দ্বারা নির্ণীত সীমার মধ্যে ত্রিলোক জুড়ে তাদের কিরণ বিতরণ করে। এই পর্বত অত্যন্ত উচ্চ, এমনকি ধ্রুবলোক থেকেও উচ্চ, তাই সমস্ত জ্যোতিষ্কের কিরণ তার বাইরে যেতে পারে না। ভ্রম, প্রমাদ, বিপ্রলিপ্সা এবং করণাপাটব- এই চারটি ত্রুটি থেকে মুক্ত পণ্ডিতেরা বিভিন্ন লোকের লক্ষণ, পরিমাপ এবং অবস্থিতি বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বিচার পূর্বক স্থির করেছেন যে, সুমেরু পর্বত থেকে লোকালোক পর্বতের দূরত্ব ১২,৫০,০০,০০০ যোজন (১০০,০০,০০,০০০ মাইল) অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ড-গোলকের এক-চতুর্থাংশ। লোকালোক পর্বতের উপরে চারটি গজপতি জগদ্গুরু ব্রহ্মা কর্তৃক স্থাপিত হয়েছে। তাদের নাম ঋষভ, পুষ্করচূড়, বামন এবং অপরাজিত। তারা ব্রহ্মাণ্ডের এই সমস্ত লোক ধারণ করেন। পরমেশ্বর ভগবান সমস্ত দিব্য ঐশ্বর্যের ঈশ্বর এবং পরব্যোমের অধিপতি। তিনি পরমপুরুষ ভগবান এবং সকলের পরমাত্মা। ইন্দ্রাদি লোকপালেরা তাঁরই নির্দেশে জড় জগতের বিভিন্ন বিষয়ের তত্ত্বাবধান করেন। সমস্ত লোকের সমস্ত জীবের কল্যানের জন্য এবং সেই গজপতিদের ও দেবতাদের শক্তি বৃদ্ধি করার জন্য ভগবান সেই পর্বতের উপরে তাঁর এক বিশুদ্ধ সত্ত্বময় রূপ প্রকাশ করেছেন। বিষ্বক্সেন আদি পার্ষদ পরিবৃত হয়ে তিনি ধর্ম, জ্ঞান আদি পূর্ণ ঐশ্বর্য এবং অণিমা, লঘিমা, মহিমা আদি যোগসিদ্ধি প্রকাশ করেন। তাঁর চার হাতে বিভিন্ন অস্ত্র দ্বারা সুসজ্জিত হয়ে তিনি অত্যন্ত সুন্দররূপে বিরাজমান। নারায়ণ, বিষ্ণু আদি ভগবানের বিভিন্ন রূপ বিভিন্ন অস্ত্রের দ্বারা অতি সুন্দরভাবে অলংকৃত। ভগবান তাঁর চিৎশক্তি যোগমায়ার দ্বারা সৃষ্ট সমস্ত গ্রহলোক পালন করার জন্য সেই সমস্ত রূপ প্রকাশ করেন।”
“হে রাজন্, লোকালোক পর্বতের বাইরে অলোকবর্ষ রয়েছে, যার বিস্তার পর্বতের অভ্যন্তর ভাগের বিস্তারের সমান, অর্থাৎ ১২,৫০,০০,০০০ যোজন (১০০ কোটি মাইল)। অলোকবর্ষের পথ মুক্তিকামী ব্যক্তিদের গন্তব্যস্থান। সেই স্থান জড়া প্রকৃতির গুণের অতীত, সুতরাং, বিশুদ্ধ। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ব্রহ্মাণ-পুত্রদের ফিরিয়ে আনার জন্য অর্জুনকে নিয়ে এই স্থানের মধ্যে দিয়ে গিয়েছিলেন। সূর্য ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। ভূর্লোক এবং ভূবর্লোকের মধ্যবর্তী স্থান অন্তরীক্ষ এবং তাই তা ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যস্থল। সূর্য ও ব্রহ্মাণ্ডের পরিধির দূরত্ব পঁচিশ কোটি যোজন (২০০ কোটি মাইল)। সূর্যদেব বৈরাজ নামেও পরিচিত, অর্থাৎ তিনি সমস্ত জীবের সমষ্টি-শরীর। যেহেতু তিনি সৃষ্টির সময় ব্রহ্মাণ্ডরূপ অচেতন অণ্ডে প্রবিষ্ট হন, তাই তিনি মার্তণ্ড নামেও পরিচিত। তাঁর আরেক নাম হিরণ্যগর্ভ, কারণ তিনি হিরণ্যগর্ভ (ব্রহ্মা) থেকে তাঁর স্থূল শরীর প্রাপ্ত হয়েছেন।”
“হে রাজন, সূর্যদেব এবং সূর্যলোক ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত দিক বিভাগ করেছে। সূর্যের উপস্থিতির ফলে আমরা আকাশ, স্বর্গ, পৃথিবী এবং অন্যান্য নিম্নতর লোক সম্বন্ধে বুঝতে পারি। সূর্যের কারণেই আমরা বুঝতে পারি কোন্ স্থান জড় সুখভোগের জন্য, কোন্ স্থান মুক্তির জন্য, কোন্ স্থান নরক এবং কোন্ স্থান পাতাল। দেব, নর, পশু, পক্ষী, কীটপতঙ্গ, সরীসৃপ, লতা এবং বৃক্ষ সকলেই সূর্যলোক থেকে সূর্যদেব কর্তৃক প্রদত্ত তাপ এবং আলোকের উপর নির্ভরশীল। সূর্যের উপস্থিতির ফলেই সমস্ত জীব দেখতে পায় এবং তাই তাঁকে বলা হয় দৃগ্-ঈশ্বর বা দৃষ্টির ঈশ্বর।”
বিংশতি অধ্যায়- ব্রহ্মাণ্ডের গঠন বর্ণনা
28 Oct 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, পঞ্চম স্কন্ধ- কর্মবাসনা