মহারাজ পরীক্ষিৎ শুকদেব গোস্বামীকে বললেন- “হে ব্রাহ্মণ, আপনি পূর্বেই বলেছেন যে যতদূর পর্যন্ত সূর্যদেব তাপ ও আলোক প্রদান করে এবং চন্দ্র ও অন্যান্য জ্যোতিষ্কদের দেখা যায়, ততদূর পর্যন্ত ভূমণ্ডলের বিস্তার। হে ভগবান, মহারাজ প্রিয়ব্রতের রথচক্রে সে সাতটি পরিখার সৃষ্টি হয়েছিল, তার দ্বারা সপ্ত সমুদ্র রচিত হয়েছে। এই সাতটি সমুদ্রের ফলে ভূমণ্ডল সপ্ত দ্বীপে বিভক্ত হয়েছে। আপনি সাধারণভাবে সেগুলির মাপ, নাম এবং বৈশিষ্ট বর্ণনা করেছেন। এখন আমি বিস্তারিতভাবে সেই সম্বন্ধে জানতে চাই। দয়া করে আপনি আমার সেই বাসনা পূর্ণ করুন। মন যখন ভগবানের গুণময় স্থূল স্বরূপে অর্থাৎ বিরাট রূপে নিবিষ্ট হয়, তখন তা বিশুদ্ধ সত্ত্বের স্থিতি প্রাপ্ত হয়। সেই চিন্ময় স্থিতিতে ভগবান বাসুদেবকে হৃদয়ঙ্গম করা যায়, যিনি তাঁর সূক্ষ্ম স্বরূপে স্বয়ং প্রকাশ এবং গুণাতীত। হে গুরুদেব, দয়া করে আপনি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করুন কিভাবে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে ব্যপ্ত সেই রূপ দর্শন করা যায়।”
“মহর্ষি শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, ভগবানের মায়াশক্তির বিস্তারের অন্ত নেই। এই জড় জগৎ প্রকৃতির গুণের (সত্ত্বগুণ, রজোগুণ এবং তমোগুণ) রূপান্তর, তবু ব্রাহ্মার মতো দীর্ঘ আয়ু প্রাপ্ত হলেও তা পুর্ণরূপে বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। এই জড় জগতে কেউই পূর্ণ নয় এবং অপূর্ণ ব্যক্তি সতত চিন্তা করার পরেও এই ব্রহ্মাণ্ডের যথাযথ বর্ণনা করতে পারে না। হে রাজন্, তা সত্ত্বেও আমি কেবল ভূলোক আদি প্রধান প্রধান স্থানগুলির নাম, রূপ, পরিমাপ এবং লক্ষণ-সমূহের উল্লেখ করে সেগুলির বর্ণনা করার চেষ্টা করব।”
“ভূমণ্ডল একটি পদ্ম ফুলেল মতো এবং সপ্ত দ্বীপ সেই ফুলের কোষ। সেই কোষের মধ্যবর্তী জম্বূদ্বীপের বিস্তার দশ লক্ষ যোজন (আশি লক্ষ মাইল)। জম্বূদ্বীপ পদ্মপাতার মতো গোলাকার। এই জম্বূদ্বীপে নয়টি বর্ষ রয়েছে। এক-একটি বর্ষের দৈর্ঘ্য ৯,০০০ যোজন (৭২,০০০ মাইল)। আটটি সীমানা নির্দেশক পর্বত দ্বারা ঐ নয়টি বর্ষ সুন্দরভাবে বিভক্ত হয়েছে। এই বর্ষগুলির মধ্যে ইলাবৃত নামক বর্ষটি সেই পদ্মকোষের মধ্যভাগে অবস্থিত। ইলাবৃতবর্ষের মধ্যে রয়েছে সুবর্ণময় সুমেরু পর্বত। এই সুমেরু পর্বত ভূমণ্ডলরূপ পদ্মের কর্ণিকার মতো অবস্থিত। এই পর্বতের উচ্চতা জম্বূদ্বীপের বিস্তারের সমান, অর্থাৎ ১,০০,০০০ যোজন (৮,০০,০০০ মাইল)। তার ১৬,০০০ যোজন (১,২৮,০০০ মাইল) পৃথিবীর অভ্যন্তরে রয়েছে এবং তাই পৃথিবীর উপরে এই পর্বতের উচ্চতা ৮৪,০০০ যোজন (৬,৭২,০০০ মাইল)। এই পর্বতের শিখরের বিস্তার ৩২,০০০ যোজন এবং পাদদেশ ১৬০০০ যোজন। ইলাবৃতবর্ষের ক্রমশ উত্তরে নীল, শ্বেত ও শৃঙ্গবান- এই তিনটি পর্বত ক্রমান্বয়ে রম্যক, হিরন্ময় ও কুরুবর্ষকে বিভক্ত করেছে। এই পর্বতগুলি ২,০০০ যোজন (১৬,০০০ মাইল) প্রস্থ। পূর্ব এবং পশ্চিম উভয় দিকেই তারা লবণ সমুদ্রের তট পর্যন্ত বিস্তৃত। পূর্ব পূর্ব পর্বতগুলি থেকে পর পর পর্বতগুলির দৈর্ঘ্য এক-দশাংশ কম, কিন্তু উচ্চতায় তারা সকলেই সমান। তেমনই, ইলাবৃতবর্ষের দক্ষিণে পূর্ব থেকে পশ্চিমে বিস্তৃত নিষধ, হেমকূট এবং হিমালয় নামক তিনটি পর্বত রয়েছে। তাদের প্রতিটি ১০,০০০ যোজন (৮০,০০০ মাইল) উন্নত। সেই পর্বত তিনটি যথাক্রমে হরিবর্ষ, কিম্পুরুষবর্ষ এবং ভারতবর্ষের সীমা নিরূপণ করছে। ঠিক সেইভাবে ইলাবৃতবর্ষের পশ্চিমে এবং পূর্বে মাল্যবান ও গন্ধমাদন নামক যথাক্রমে দুটি পর্বত রয়েছে। এই পর্বত দুটি ২,০০০ যোজন (১৬,০০০ মাইল) উঁচু এবং তা উত্তরে নীল পর্বত এবং দক্ষিণে নিষধ পর্যন্ত বিস্তৃত। তারা কেতুমাল এবং ভদ্রাশ্ববর্ষের সীমা নির্দেশ করে। সুমেরু পর্বতের চারদিকে মন্দর, মেরুমন্দর, সুপার্শ্ব এবং কৃমুদ এই চারটি পর্বত মেখলার মতো বিন্যস্ত রয়েছে। এই পর্বতগুলির উচ্চতা এবং বিস্তার ১০,০০০ যোজন (৮০,০০০ মাইল)। সেই চারটি পর্বতের শিখরে ধ্বজার মতো একটি আম গাছ, একটি জাম গাছ, একটি কদম্ব গাছ এবং একটি বটবৃক্ষ রয়েছে। এই বৃক্ষগুলির বিস্তার ১০০ যোজন (৮০০ মাইল) এবং উচ্চতা ১,১০০ যোজন (৮,৮০০ মাইল)। তাদের শাখাগুলিও ১,১০০ যোজন বিস্তৃত।”
“হে ভরতশ্রেষ্ঠ মহারাজ পরীক্ষিৎ! এই চারটি পর্বতের মধ্যে চারটি বিশাল হৃদ রয়েছে। প্রথমটির জলের স্বাদ ঠিক দুধের মতো; দ্বিতীয়টির স্বাদ ঠিক মধুর মতো এবং তৃতীয়টির স্বাদ ঠিক ইক্ষুরসের মতো। চতুর্থ হৃদটি বিশুদ্ধ জলে পূর্ণ। সিদ্ধ, চারণ, গন্ধর্ব আদি উপদেবতারা এই চারটি হৃদের সুবিধা উপভোগ করেন। তার ফলে তাঁরা অণিমা, মহিমা আদি যোগসিদ্ধি অনায়াসে লাভ করেছেন। সেখানে নন্দন, চৈত্ররথ, বৈভ্রাজক এবং সর্বতোভদ্র নামক চারটি দিব্য উদ্যানও রয়েছে। সেই উদ্যানে শ্রেষ্ঠ দেবতাগণ স্ত্রীরত্নসদৃশ তাঁদের সুন্দরী পত্নীদের নিয়ে আনন্দে বিহার করেন। তখন গন্ধর্ব নামক উপদেবতারা তাঁদের মহিমা কীর্তন করেন। মন্দর পর্বতের পাদদেশে দেবচূত নামক একটি আম্রবৃক্ষ রয়েছে। তার উচ্চতা একাদশ শত যোজন। পর্বতের শৃঙ্গের মতো স্থূল এবং অমৃতের মতো মধুর ফলগুলি সেই বৃক্ষের অগ্রভাগ থেকে দেবতাদের উপভোগের জন্য পতিত হয়। অতি উচ্চ স্থান থেকে পতিত হওয়ার ফলে, সেই সমস্ত ফলগুলি ফেটে যায়। তখন তাদের ভিতর থেকে অতি মধুর সৌরভযুক্ত অরুণবর্ণ রস প্রচুর পরিমাণে নির্গত হয় এবং অন্য বস্তুর সুগন্ধের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে অধিকতর সুরভিত হয়ে ওঠে। সেই রস জলের মতো প্রবাহিত হয়ে অরুণোদা নামে এক নদী হয়েছে। সেই নদী পূর্বদিকে ইলাবৃতবর্ষ পর্যন্ত প্রবাহিত হচ্ছে। শিবপত্নী ভবানীর অনুচরী যক্ষদের পূণ্যবতী পত্নীদের দেহ সেই অরুণোদা নদীর জল পান করার ফলে সুরভিত হয়ে ওঠে এবং বায়ু সেই সৌরভ বহন করার ফলে, দশ যোজন পর্যন্ত চতুর্দিক সুরভিত হয়ে ওঠে। তেমনই, জম্বু বৃক্ষের হস্তী-শরীরের মতো বিশাল রসপূর্ণ এবং অতি ক্ষুদ্র বীজ সমন্বিত ফলগুলি অতি উচ্চ স্থান থেকে পতিত হওয়ার ফলে বিদীর্ণ হয়। তাদের রসে জম্বু নদী নামক একটি নদী উৎপন্ন হয়েছে। জম্বু নদী মেরু পর্বতের দশ যোজন উচ্চ শিখরদেশ থেকে অবনীতলে পতিত হয়ে, তার উৎপত্তি স্থান ইলাবৃতের দক্ষিণাংশ থেকে আরম্ভ করে সমগ্র ইলাবৃতবর্ষ-ব্যাপী প্রবাহিত হয়েছে। জম্বু নদীর উভয় তীরবর্তী মৃত্তিকা সেই রসের দ্বারা আর্দ্র হয়ে এবং বায়ু ও সূর্যকিরণের দ্বারা পরিপক্ক হয়ে জাম্বুনদ নামক স্বর্ণে পরিণত হয়। স্বর্গের দেবতারা সেই স্বর্ণের দ্বারা বিবিধ প্রকার অলঙ্কার নির্মান করেন। তাই স্বর্গের দেবতারা এবং তাঁদের চির যৌবনাসম্পন্না পত্নীরা স্বর্ণমুকুট, বলয়, মেখলা, আদি অলঙ্কারের দ্বারা পূর্ণরূপে সজ্জিত থাকেন। এইভাবে তাঁরা তাঁদের জীবন উপভোগ করেন। সুপার্শ্ব পর্বতের পার্শ্বদেশে মহাকদম্ব নামে একটি প্রসিদ্ধ বৃক্ষ রয়েছে। সেই বৃক্ষের কোটর থেকে পাঁচটি মধুর ধারা নির্গত হয়েছে। সেগুলির প্রতিটির পরিমাণ পাঁচ ব্যাম। এই মধুর ধারা সুপার্শ্ব পর্বতের শিখার থেকে পতিত হয়ে, ইলাবৃতবর্ষের পশ্চিম দিক থেকে আরম্ভ করে ইলাবৃতবর্ষের সর্বত্র প্রবাহিত হচ্ছে। তার ফলে সমগ্র ইলাবৃতবর্ষ মনোরম সৌরভে পূর্ণ হয়েছে। যাঁরা সেই মধু পান করেন, বায়ু তাঁদের মুখনিঃসৃত সৌরভ বহন করে শত যোজন পর্যন্ত স্থানকে সুবাসিত করে। তেমনই, কুমুদ পর্বতে শতবল্শ নামক একটি বিশাল বটবৃক্ষ রয়েছে। তার একশত স্কন্ধ রয়েছে বলে তার এই নাম। সেই সমস্ত স্কন্ধ থেকে কতকগুলি নদ প্রবাহিত হয়েছে। এই সমস্ত নদগুলি কুমুদ পর্বতের শীর্ষদেশ থেকে পতিত হয়ে ইলাবৃতবর্ষের অধিবাসীদের উপকারের জন্য ইলাবৃতবর্ষের উত্তর দিকে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এই নদগুলি থেকে সেখানকার অধিবাসীরা তাঁদের ইচ্ছামতো দুধ, দই, মধু, ঘি, গুড়, অন্ন, বস্ত্র, শয্যা, আসন, আভরণ প্রভৃতি সমস্ত দ্রব্য প্রাপ্ত হয়। তাদের অভিলষিত সমস্ত দ্রব্য যথেষ্ট পরিমাণে লাভ করার ফলে তারা সেখানে অত্যন্ত সুখী। এই জড় জগতের যে সমস্ত অধিবাসী সেই নদী থেকে উৎপন্ন দ্রব্যসমূহ উপভোগ করেন, তাঁদের দেহে কখনও বলীরেখা দেখা যায় না এবং তাঁদের চুল পাকে না। তাঁরা কখনও ক্লান্তি অনুভব করেন না এবং গাত্রে ঘর্মজনিত দুর্গন্ধ হয় না। তাঁদের কখনও জরা, ব্যাধি অথবা অপমৃত্যু হয় না। তাঁরা কখনও শীত ও গ্রীষ্মের ক্লেশ অনুভব করেন না এবং তাঁদের গায়ের জ্যোতি কখনও নিষ্প্রভ হয় না। তাঁরা মৃত্যু পর্যন্ত অত্যন্ত সুখে জীবনযাপন করেন। সুমেরু পর্বতের পাদদেশে, পদ্মকোষের চারপাশে কেশরের মতো আরও কুড়িটি পর্বত রয়েছে। সেগুলির নাম কুরঙ্গ, কুরর, কুসুম্ভ, বৈকঙ্ক, ত্রিকুট, শিশির, পতঙ্গ, রুচক, নিষধ, শিনীবাস, কপিল, শঙ্খ, বৈদূর্য, জারুধি, হংস, ঋষভ, নাগ, কালঞ্জর এবং নারদ ইত্যাদি। সুমেরু পর্বতের পূর্বদিকে জঠর এবং দেবকূট নামক দুটি পর্বত রয়েছে। এই পর্বত দুটি উত্তর থেকে দক্ষিণে ১৮,০০০ যোজন (১,৪৪,০০০ মাইল) বিস্তৃত। তেমনই, সুমেরু পর্বতের পশ্চিম দিকে পবন এবং পারিযাত্র নামক দুটি পর্বত রয়েছে। সেগুলিও উত্তর এবং দক্ষিণে ১৮,০০০ যোজন বিস্তৃত। সুমেরু পর্বতের দক্ষিণ দিকে কৈলাস এবং করবীর নামক দুটি পর্বত রয়েছে। এই পর্বত দুটি পূর্ব-পশ্চিমে ১৮,০০০ যোজন বিস্তৃত এবং সুমেরু পর্বতের উত্তর দিকে ত্রিশৃঙ্গ এবং মকর নামক দুটি পর্বত রয়েছে এবং সেই দুটি পর্বতও পূর্ব-পশ্চিমে ১৮,০০০ যোজন বিস্মৃত। এই সব কয়টি পর্বতেরই বিস্তার এবং উচ্চতা ২,০০০ যোজন (১৬,০০০ মাইল)। অগ্নির মতো উজ্জ্বল স্বর্ণময় সুমেরু পর্বত এই আটটি পর্বতের দ্বারা পরিবেষ্টিত। মেরু পর্বতের শিখরে মধ্যস্থলে ভগবান ব্রহ্মার পুরী বিরাজমান। তার চতুর্দিক এক হাজার অযুত যোজন (আট কোটি মাইল) বিস্তৃত। সেই পুরী স্বর্ণনির্মিত এবং তাই পণ্ডিত ও ঋষিরা সেই পুরীটিকে শাতকৌম্ভী পুরী বলেন। সেই ব্রহ্মপুরীর চতুর্দিকে ইন্দ্র আদি অষ্ট লোকপালদের আটটি পুরী রয়েছে। সেই সমস্ত পুরী ঠিক ব্রহ্মপুরীর মতো কিন্তু তাদের আয়তন ব্রহ্মপুরীর এক-চতুর্থাংশ।”
ষোড়শ অধ্যায়- জম্বূদ্বীপের বর্ণনা
19 Oct 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, পঞ্চম স্কন্ধ- কর্মবাসনা