পঞ্চদশ অধ্যায়- মহারাজ প্রিয়ব্রতের বংশধরদের মহিমা

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “মহারাজ ভরতের পুত্র সুমতি ঋষভদেবের মার্গ অনুসরণ করেছিলেন, কিন্তু কতকগুলি পাষণ্ডী তাঁকে স্বয়ং ভগবান বুদ্ধদেব বলে কল্পনা করেছিল। এই সমস্ত দুর্জন যারা প্রকৃতপক্ষে নাস্তিক, তারা বৈদিক নির্দেশকে কল্পিত বলে মনে করে এবং তাদের স্বকপোলকল্পিত মতবাদের দ্বারা তাদের কার্যকলাপের সমর্থন করে। এই সমস্ত পাপাচারী ব্যক্তিরা সুমতিকে বুদ্ধদেব বলে স্বীকার করে প্রচার করেছিল যে, সকলেরই কর্তব্য সুমতির পন্থা অনুসরণ করা। এইভাবে তারা মনোধর্মের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়েছিল। বৃদ্ধসেনা নামক পত্নীর গর্ভে সুমতির দেবতাজিৎ নামক একটি পুত্র উৎপন্ন হয়। তারপর, দেবতাজিতের পত্নী আসুরীর গর্ভে দেবদ্যুম্ন নামক এক পুত্র হয়। দেবদ্যুম্নের পত্নী ধেনুমতীর গর্ভে পরমেষ্ঠী নামক পুত্র জন্মগ্রহণ করে। পরমেষ্ঠী সুবর্চলা নাম্নী পত্নীর গর্ভে প্রতীহ নামক এক পুত্র জন্মগ্রহণ করে। মহারাজ প্রতীহ স্বয়ং আত্ম-তত্ত্বজ্ঞান প্রচার করেছিলেন। তার ফলে তিনি স্বয়ং বিশুদ্ধ হয়েছিলেন এবং ভগবান শ্রীবিষ্ণুর এক মহান ভক্তে পরিণত হয়ে সাক্ষাৎভাবে তাঁকে উপলব্ধি করেছিলেন। সুবর্চলা নাম্নী পত্নীর গর্ভে প্রতীহের প্রতিহর্তা, প্রস্তোতা এবং উদ্‌গাতা নামক তিন পুত্রের জন্ম হয়। তাঁর এই তিন পুত্র বৈদিক যজ্ঞ অনুষ্ঠানে অত্যন্ত নিপুণ ছিলেন। স্তুতী নামক পত্নীর গর্ভে প্রতিহর্তার অজ এবং ভূমা নামক দুই পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। ঋষিকুল্যা নামক পত্নীর গর্ভে মহারাজ ভূমার উদ্‌গীথ নামক পুত্রের জন্ম হয়। দেবকুল্যা নামক পত্নীর গর্ভে উদ্‌গীথের প্রস্তাব নামক পুত্র জন্মগ্রহণ করে এবং নিযুৎসা নামক পত্নীর গর্ভে প্রস্তাবের বিভু নামক একটি পুত্র জন্মগ্রহণ করে। রতী নামক পত্নীর গর্ভে বিভুর পৃথুষেণ নামক পুত্রের জন্ম হয়। আকূতী নামক পত্নীর গর্ভে পৃথুষেণের নক্ত নামক এক পুত্রের জন্ম হয়। নক্তের পত্নী ছিলেন দ্রুতি এবং তাঁর গর্ভে মহারাজ গয় জন্মগ্রহণ করেন। গয় ছিলেন অত্যন্ত বিখ্যাত এবং পুণ্যবান রাজা এবং তাই তিনি রাজর্ষিদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে বিখ্যাত হয়েছিলেন। বিষ্ণু এবং তাঁর অংশ-প্রকাশেরা যাঁরা ব্রহ্মাণ্ডের পালনকার্য করেন, তাঁরা সর্বদাই বিশুদ্ধ সত্ত্বে অবস্থিত। ভগবান বিষ্ণুর অবতার হওয়ার ফলে, মহারাজ গয়ও বিশুদ্ধ সত্ত্বে অবস্থিত ছিলেন। সেই জন্য মহারাজ গয় পূর্ণরূপে দিব্য জ্ঞান সমন্বিত ছিলেন। তাই তাঁকে মহাপুরুষ বলা হত। মহারাজ গয় তাঁর প্রজাদের পূর্ণরূপে সুরক্ষা প্রদান করেছিলেন, যাতে সমাজের অবাঞ্ছিত ব্যক্তিরা তাদের সম্পত্তি অপহরণ করতে না পারে। সমস্ত প্রজাদের যাতে কোন রকম খাদ্যাভাব না হয়, সেই জন্য তিনি সচেতন ছিলেন (তাকে বলা হয় পোষণ)। প্রজাদের আনন্দ বিধানের জন্য তিনি কখনও কখনও তাদের উপহার বিতরণ করতেন (একে বলা হয় প্রীণন)। তিনি কখনও কখনও প্রজাদের সভায় আহ্বান করে মধুর বাক্যের দ্বারা তাদের উৎসাহিত করতেন (একে বলা হয় উপলালন)। কিভাবে সর্বোচ্চ স্তরের নাগরিক হওয়া যায়, সেই সম্বন্ধে তিনি তাদের সদুপদেশ দিতেন (তাকে বলা হয় অনুশাসন)। এই রকমই ছিল মহারাজ গয়ের রাজোচিত চরিত্র। আর তা ছাড়া রাজা গয় গৃহস্থরূপে গার্হস্থ্য জীবনের সমস্ত নিয়ম কঠোরতা সহকারে পালন করতেন। তিনি যজ্ঞ অনুষ্ঠান করতেন এবং তিনি ছিলেন ভগবানের একনিষ্ঠ শুদ্ধ ভক্ত। তাঁকে মহাপুরুষ বলা হত, কারণ তিনি রাজারূপে তাঁর প্রজাদের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতেন এবং একজন গৃহস্থরূপে তিনি তার সমস্ত কর্তব্য সম্পাদন করতেন যাতে চরমে তিনি ভগবানের ঐকান্তিক ভক্ত হতে পারেন। ভগবদ্ভক্তরূপে তিনি সর্বদা অন্য ভক্তদের সম্মান প্রদর্শনে প্রস্তুত থাকতেন এবং ভক্তদের ভগবানের সেবায় নিযুক্ত করতেন। একে বলা হয় ভক্তিযোগের পন্থা। তাঁর এই সমস্ত দিব্য কার্যাবলীর প্রভাবে মহারাজ পৃথু সর্বদা দেহাত্মবুদ্ধি থেকে মুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন ব্রহ্মজ্ঞ এবং তাই সর্বদা তিনি আনন্দময় ছিলেন। তিনি কখনও জড়-জাগতিক শোক অনুভব করেননি। যদিও তিনি সর্বতোভাবে পূর্ণ ছিলেন, তবুও তাঁর মধ্যে কোন রকম গর্ব ছিল না এবং তিনি রাজ্য শাসনের প্রতি আসক্ত ছিলেন না।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, পুরাণবিদ্ পণ্ডিতেরা মহারাজ গয়ের এই সকল মহিমা কীর্তন করেন। মহারাজ গয় সর্বপ্রকার বৈদিক কর্ম অনুষ্ঠান করতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং সমস্ত বৈদিক শাস্ত্র অধ্যয়নে পারদর্শী। তিনি ধর্মরক্ষক এবং সর্বপ্রকার ঐশ্বর্য সমন্বিত ছিলেন। তিনি ছিলেন সজ্জনদের নায়ক এবং ভক্তদের সেবক এবং তিনি সর্বগুণে গুণান্বিত ভগবানের কলা অবতার ছিলেন। তাই মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠানে কে তাঁর সমকক্ষ হতে পারে? মহারাজ দক্ষের শ্রদ্ধা, মৈত্রী, দয়া প্রভৃতি সাধ্বী কন্যারা, যাঁদের আশীর্বাদ অব্যর্থ, তাঁরা পবিত্র জল দিয়ে মহারাজ গয়ের অভিষেক করেছিলেন। পৃথিবী গাভীরূপ ধারণ করে সেখানে এসেছিলেন এবং মহারাজ গয়ের সমস্ত সদ্‌গুণ দর্শন করে যেন তিনি তাঁর বৎসকে দর্শন করেছিলেন এবং তাঁর স্তন থেকে তখন দুগ্ধ ক্ষরিত হয়েছিল। অর্থাৎ মহারাজ গয় পৃথিবী থেকে সমস্ত সম্পদ সংগ্রহ করে তাঁর প্রজাদের বাসনা চরিতার্থ করতে সক্ষম ছিলেন। কিন্তু তাঁর নিজের কোন বাসনা ছিল না। যদিও মহারাজ গয়ের নিজের ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের কোন বাসনা ছিল না, তবুও বৈদিক শাস্ত্রবিহিত কর্ম অনুষ্ঠানের ফলে তাঁর সমস্ত বাসনা পূর্ণ হত। অন্য যে সমস্ত রাজারা মহারাজ গয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন, তাঁরা সকলে ধর্মীয় অনুশাসন অনুসারে যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই ধর্মযুদ্ধে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে তাঁরা তাঁকে বহুবিধ উপহার প্রদান করতেন। তেমনই, তাঁর রাজ্যের সমস্ত ব্রাহ্মণেরা তাঁর উদার দানের ফলে পরম সন্তুষ্ট ছিলেন। তার ফলে ব্রাহ্মণেরা তাঁদের পুণ্যকর্মের এক-ষষ্ঠাংশ পরলোকে উপভোগের জন্য মহারাজ গয়কে দান করেছিলেন। মহারাজ গয়ের যজ্ঞে প্রচুর পরিমাণে সোমরস পান হত এবং ইন্দ্র সেই যজ্ঞে এসে প্রচুর পরিমাণে সোমপান করে মত্ত হতেন। যজ্ঞপুরুষ ভগবান শ্রীবিষ্ণুও সাক্ষাৎ অবতীর্ণ হয়ে বিশুদ্ধ ভক্তিযোগ সহকারে সমর্পিত যজ্ঞের ফল গ্রহণ করতেন। ভগবান যখন কারও কার্যকলাপে সন্তুষ্ট হন, তখন আপনা থেকেই সমস্ত দেবতা, মানুষ, পশু, পক্ষী, লতা, গুল্ম, তৃণ আদি এবং ব্রহ্মা থেকে শুরু করে সমগ্র জগতের জীবদের সন্তোষ উৎপাদিত হয়। সকলের অন্তর্যামী পরমেশ্বর ভগবান স্বাভাবিকভাবেই পরম সন্তুষ্ট। কিন্তু তিনিও মহারাজ গয়ের যজ্ঞক্ষেত্রে এসে বলেছিলেন, ‘আমি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছি।’ গয়ন্তীর গর্ভে মহারাজ গয়ের তিন পুত্র উৎপন্ন হয়েছিল, যাঁদের নাম ছিল- চিত্ররথ, সুগতি এবং অবরোধন। চিত্ররথ তাঁর পত্নী ঊর্ণার গর্ভে সম্রাট্ নামক এক পুত্র প্রাপ্ত হন। তাঁর পত্নী উৎকলার গর্ভে সম্রাটের মরীচি নামক এক পুত্র উৎপন্ন হয়। মরীচি তাঁর পত্নী বিন্দুমতীর গর্ভে বিন্দু নামক এক পুত্র প্রাপ্ত হন। বিন্দুর পত্নী সরঘার গর্ভে মধু নামক এক পুত্র জন্মগ্রহণ করে। মধু তাঁর পত্নী সুমনার গর্ভে বীরব্রত নামক এক পুত্র প্রাপ্ত হন। বীরব্রতের পত্নী ভোজার গর্ভে মন্থু এবং প্রমন্থু নামক দুই পুত্র জন্মগ্রহণ করে। মন্থুর পত্নী সত্যার গর্ভে ভৌবন নামক এক পুত্র হয় এবং ভৌবন তাঁর পত্নী দূষণার গর্ভে ত্বষ্টা নামক এক পুত্র সন্তান লাভ করেন। ত্বষ্টা তাঁর পত্নী বিরোচনার গর্ভে বিরৎ নামক এক পুত্র সন্তান প্রাপ্ত হন। বিরজের পত্নী ছিলেন বিষুচী এবং তাঁর গর্ভে বিরজের শতজিৎ প্রমুখ এক শত পুত্র এবং একটি কন্যা জন্মগ্রহণ করে। মহারাজ বিরজ সম্বন্ধে একটি বিখ্যাত শ্লোক রয়েছে- ‘ভগবান শ্রীবিষ্ণু যেমন তাঁর দিব্য প্রভাবের দ্বারা দেবতাদের অলঙ্কৃত করেন, ঠিক তেমনই মহারাজ বিরৎ তাঁর মহৎ গুণাবলী এবং বিপুল যশোরাশির দ্বারা প্রিয়ব্রতের বংশকে ভূষিত করেছিলেন।’ ”

Leave a Reply

October 2025
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

Blog Stats

  • 140,943 hits