মহারাজ রহূগণ বললেন- “হে অবধূত, আপনি ভগবান থেকে অভিন্ন। আপনার স্বরূপের প্রভাবে সমস্ত শাস্ত্রবিরোধ দূর হয়েছে। আপনি ব্রহ্মবন্ধুর বেশে আপনার দিব্য আনন্দময় স্বরূপ গোপন করে রেখেছেন। আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। হে ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ, আমার দেহ কুৎসিৎ বস্তুতে পূর্ণ এবং গর্বরূপ সর্প আমার বিবেককে দংশন করেছে। জড় ভাবনার প্রভাবে আমি রোগাক্রান্ত। আপনার অমৃতময় উপদেশ এই প্রকার ব্যাধির উপযুক্ত ঔষধ এবং তা সূর্যের তাপে পীড়িত ব্যক্তির কাছে সুশীতল জলের মতো। যে বিষয়ে আমার সংশয় রয়েছে, সেই বিষয়ে আমি আপনাকে পরে জিজ্ঞাসা করব। কিন্তু এখন আত্মতত্ত্ব সম্বন্ধে যে উপদেশ আপনি দিয়েছেন, তা আমার কাছে অত্যন্ত দুর্বোধ্য বলে মনে হচ্ছে। দয়া করে আপনি সরলভাবে তার পুনরাবৃত্তি করুন, যাতে আমি তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারি। আমার মন তা সরলভাবে হৃদয়ঙ্গম করার জন্য অত্যন্ত উৎসুক হয়েছে। হে যোগেশ্বর, আপনি বলেছেন যে, দেহের গমনাদির ফলে যে শ্রান্তি হয় তা প্রত্যক্ষ অনুভূতির দ্বারা অবগত হওয়া যায়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শ্রান্তি নেই। তার অস্তিত্ব কেবল ব্যবহারমূলক। এই প্রকার প্রশ্ন এবং উত্তরের দ্বারা পরম তত্ত্ব নির্ণয় করা যায় না। আপনার এই বাক্যে আমার মন কিছুটা বিচলিত হয়েছে।”
ব্রহ্মজ্ঞ জড় ভরত বললেন- “জড় বস্তুর সমন্বয়ের ফলে নানা প্রকার প্রার্থিব বিকার সাধিত হয় এবং রূপের উদ্ভব হয়। কোন কারণ তারা ভূপৃষ্ঠে বিচরণ করে এবং শিবিকাবাহক ইত্যাদি নামে পরিচিত হয়। আর যা চলাফেরা করে না, তাই পাষাণ ইত্যাদি নামে খ্যাত হয়। সেই সমস্ত সচল প্রার্থিব বিকৃতির চরণদ্বয়ের উপরিভাগে ক্রমশ গুল্ফ, জঙ্ঘা, জানু, উরু, কোমর, বক্ষঃস্থল, গলদেশ ও স্কন্ধ- এই সমস্ত রয়েছে। আবার স্কন্ধের উপর দারুময়ী শিবিকা এবং শিবিকার মধ্যে রয়েছে তথাকথিত সৌবীরের রাজা। সেই রাজার শরীরও আর এক প্রকার প্রার্থিব বিকার, সেই বিকারময় দেহেই আপনি অবস্থিত এবং ভ্রান্তভাবে নিজেকে সৌবীর দেশের রাজা বলে মনে করে মদান্ধ হয়েছেন। কিন্তু, বিনা বেতনে এই সমস্ত নিরীহ ব্যক্তিরা যে আপনার শিবিকা বহন করছে, আপনার অন্যায় আচরণের ফলে তাদের নিশ্চয়ই কষ্ট হচ্ছে। তাদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়, কেননা আপনি তাদের বলপূর্বক আপনার শিবিকা বহনকার্যে নিযুক্ত করেছেন। তা থেকে প্রমাণিত হয় যে, আপনি অত্যন্ত নিষ্ঠুর এবং নির্দয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও আপনি মনে করছেন যে, আপনি আপনার প্রজাদের রক্ষক। তা অত্যন্ত হাস্যকর। আপনি অত্যন্ত মূর্খ এবং জ্ঞানী ব্যক্তিদের সভায় শোভা পাওয়ার যোগ্য নন। এই পৃথিবীতে আমরা সকলে বিভিন্ন রূপসমন্বিত জীব। আমাদের মধ্যে কেউ স্থাবর ও কেউ জঙ্গম। আমাদের সকলেরই উৎপত্তি হয়, কিছুকালের জন্য স্থিতি হয় এবং তারপর বিনাশ হয়। তখন এই শরীর পুনরায় মাটিতে মিশে যায়। আমরা কেবল মাটির রূপান্তর। বিভিন্ন শরীর এবং কার্যকলাপের ক্ষমতা কেবল মাটিরই রূপান্তর এবং নামে মাত্র ভিন্ন, কারণ সবকিছুরই মাটি থেকে উৎপত্তি হয় এবং বিনামের পর পুনরায় মাটিতেই মিশে যায়। পক্ষান্তরে বলা যায় যে, আমরা কেবল ধূলি এবং পুনরায় ধুলিতেই মিশে যাব। এই কথা সকলেই বিচার করে দেখতে পারেন। কেউ বলতে পারে যে, এই ভূলোকেই কেবল বৈচিত্র রয়েছে। কিন্তু, ব্রহ্মা- সাময়িকভাবে সত্য বলে প্রতীত হলেও চরমে তার বাস্তব অস্তিত্ব নেই। এই জগতের সৃষ্টি হয়েছে পরমাণু থেকে, কিন্তু সেই পরমাণুও অনিত্য। যদিও কোন কোন দার্শনিক এই ধারণা পোষণ করে, তবুও পরমাণু কখনই ব্রহ্মাণ্ডের কারণ নয়। পরমাণুর সমন্বয়ের ফলে যে এই জড় জগতের বৈচিত্রের সৃষ্টি হয়েছে তা সত্য হয়। যেহেতু এই ব্রহ্মাণ্ডের কোন বাস্তবিক অস্তিত্ব নেই, তাই কৃশ, স্থূল, ক্ষুত্র, বৃহৎ, কার্য, কারণ, চেতন, অচেতন যে সমস্ত বস্তু এই ব্রহ্মাণ্ডে রয়েছে, সে সবই কাল্পনিক। সেগুলি একই মাটির দ্বারা রচিত বিভিন্ন রূপ এবং নামে মাত্রই সেগুলি ভিন্ন। দ্রব্য, স্বভাব, আশয়, কাল এবং কর্মের দ্বারা বস্তুর পার্থক্য নিরূপিত হয়। আপনার জানা উচিত যে, সেগুলি কেবল জড়া প্রকৃতির দ্বারা রচিত যান্ত্রিক অভিব্যক্তি। তাহলে পরম সত্য কি? তার উত্তর হচ্ছে যে, অদ্বয় জ্ঞানই হচ্ছে পরম সত্য। তা জড়া প্রকৃতির কলুষ থেকে মুক্ত। তা আমাদের মুক্তি প্রদান করে। তা অদ্বয়, সর্বব্যাপ্ত এবং কল্পনার অতীত। সেই জ্ঞানের প্রথম উপলব্ধি হচ্ছে ব্রহ্ম। তারপর দ্বিতীয় উপলব্ধি হচ্ছে পরমাত্মা, যাঁকে যোগীরা নির্মল অন্তঃকরণে দর্শন করার চেষ্টা করেন। চরমে, সেই পরম জ্ঞানের পূর্ণ উপলব্ধি হয় পরম পুরুষ ভগবানরূপে। সমস্ত তত্ত্বজ্ঞানী মহাপুরুষেরা সেই পরম পুরুষকে ব্রহ্ম, পরমাত্মা আদির পরম কারণ বাসুদেবরূপে বর্ণনা করেন।”
“হে মহারাজ রহূগণ, মহাভাগবতের চরণরেণুর দ্বারা অভিষিক্ত না হলে, কখনই পরমতত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করা যায় না। ব্রহ্মচর্য পালনের দ্বারা, গার্হস্থ্য-জীবনের বিধিবিধান কঠোর নিষ্ঠা সহকারে পালন করার দ্বারা, বানপ্রস্থ-আশ্রমে গৃহত্যাগ করার দ্বারা, সন্ন্যাস-আশ্রম অবলম্বনের দ্বারা অথবা শীতের সময় জলমগ্ন হয়ে অথবা গ্রীষ্মে অগ্নি পরিবেষ্টিত হয়ে কিংবা প্রখর সূর্যকিরণে অবস্থান করে তপস্যা করার দ্বারা তাঁকে জানা যায় না। পরম সত্যকে হৃদয়ঙ্গম করার অন্য পন্থা থাকলেও, মহাভাগবতের কৃপার প্রভাবেই কেবল পরম সত্য প্রকাশিত হয়। যে শুদ্ধ ভক্তদের কথা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁরা কারা? শুদ্ধ ভক্তদের সভায় রাজনীতি, সমাজনীতি ইত্যাদি জড় বিষয়ের আলোচনার কোন সম্ভাবনা থাকে না। শুদ্ধ ভক্তদের সভায় কেবল পরমেশ্বর ভগবানের রূপ, গুণ এবং লীলার বিষয়েই আলোচনা হয়। সর্বান্তঃকরণে তাঁরা ভগবানের মহিমা কীর্তন করেন এবং তাঁর আরাধনা করেন। শুদ্ধ ভক্তদের সঙ্গে শ্রদ্ধা সহকারে এই সমস্ত বিষয়ে নিরন্তর শ্রবণ করার ফলে, সাযুজ্য মুক্তির প্রয়াসী মুমুক্ষুরাও তাঁদের মোক্ষবাসনা পরিত্যাগ করে ধীরে ধীরে বাসুদেবের সেবার প্রতি আসক্ত হন। পূর্বে এক জন্মে আমি ছিলাম মহারাজ ভরত। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং বৈদিক জ্ঞানের পরোক্ষ অনুভবের দ্বারা আমি সমস্ত জাগতিক কার্যকলাপ থেকে পূর্ণরূপে অনাসক্ত হয়ে সিদ্ধিলাভ করেছিলাম। আমি পূর্ণরূপে ভগবানের সেবায় যুক্ত ছিলাম, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমি একটি হরিণ শাবকের প্রতি এতই আসক্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, আমি আমার পারমার্থিক কর্তব্য সম্পাদনে অবহেলা করেছিলাম। সেই হরিণ-শিশুটির প্রতি গভীর স্নেহের ফলে আমাকে পরবর্তী জীবনে একটি হরিণ-শরীর ধারণ করতে হয়।”
“হে বীর রাজা, পূর্বে যে আমি ঐকান্তিকভাবে ভগবানের সেবা করেছিলাম, তার ফলে হরিণ-শরীর পাওয়া সত্ত্বেও আমি আমার পূর্ব জীবনের সব কথা স্মরণ করতে পেরেছিলাম। যেহেতু আমার পূর্ব জীবনের অধঃপতনের কথা আমার মনে আছে, তাই আমি সাধারণ মানুষদের সঙ্গ থেকে সর্বদা দূরে থাকি। তাদের বিষয়াসক্ত অসৎ-সঙ্গের ভয়ে ভীত হয়ে, সকলের অগোচরে একাকী বিচরণ করি। উত্তম ভক্তের সঙ্গ প্রভাবের ফলে যে কোন ব্যক্তি পূর্ণজ্ঞান লাভ করতে পারেন এবং জ্ঞানরূপ তরবারির দ্বারা জড় জগতের মোহের বন্ধন ছিন্ন করতে পারেন। ভগবদ্ভক্তের সঙ্গ প্রভাবে শ্রবণ-কীর্তনের ফলে, ভগবানের সেবায় যুক্ত হওয়া যায়। তার ফলে জীবের সুপ্ত কৃষ্ণভাবনামৃত জাগরিত হয় এবং এই কৃষ্ণভক্তির অনুশীলনের ফলে, তিনি এই জীবনেই তাঁর প্রকৃত আলয় ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে পারেন।”
দ্বাদশ অধ্যায়- মহারাজ রহূগণ এবং জড় ভরতের বার্তালাপ
08 Oct 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, পঞ্চম স্কন্ধ- কর্মবাসনা