একাদশ অধ্যায়- মহারাজ রহূগণের প্রতি জড় ভরতের উপদেশ

ব্রহ্মজ্ঞ জড় ভরত বললেন- “হে রাজন্, যদিও আপনি বিজ্ঞ নন, তবুও আপনি বিজ্ঞের মতো কথা বলছেন। অতএব আপনি বিজ্ঞদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি নন। অভিজ্ঞ ব্যক্তি কখনও আপনার মতো প্রভু-ভৃত্য অথবা জড় সুখ-দুঃখের সম্পর্কের কথা বলেন না। এইগুলি কেবল বাহ্যিক কার্যকলাপ। তত্ত্বজ্ঞান সমন্বিত অভিজ্ঞ ব্যক্তি কখনও এইভাবে কথা বলেন না। হে রাজন্, প্রভু-ভৃত্য, রাজা-প্রজা ইত্যাদির প্রসঙ্গে যে কথা তা কেবল জড়-জাগতিক বিষয়ের কথা। যারা বেদবিহিত জড় কার্যকলাপে আগ্রহী, তারা কেবল যজ্ঞ অনুষ্ঠান করে এবং জড়-জাগতিক বিষয়ের প্রতি শ্রদ্ধালু থেকে সন্তুষ্ট থাকে। এমন প্রকার ব্যক্তিদের অবশ্যই আধ্যাত্মিক উন্নতি হয় না। স্বপ্নদৃষ্ট ভোগ্যবস্তুর মিথ্যাত্ব বা নিরর্থকতা যেমন আপনা থেকেই অনুভূত হয়, তেমনই এই পৃথিবীতে অথবা স্বর্গলোকে এই জীবনের বা পরবর্তী জীবনের যে সুখ, তা অবশেষে তুচ্ছ বলে উপলব্ধি করা যায়। কেউ যখন তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে, তখন বেদ তত্ত্বজ্ঞানের এক অপূর্ব উৎস হওয়া সত্ত্বেও, যথেষ্ট নয় বলে মনে হয়। জীবের মন যতক্ষণ জড়া প্রকৃতির তিন গুণের দ্বারা (সত্ত্ব, রজ এবং তম) কলুষিত থাকে, ততক্ষণ তার মন ঠিক একটি মত্ত হস্তীর মতো স্বতন্ত্র হয়ে, জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কর্মেন্দ্রিয়ের দ্বারা পাপ এবং পুণ্যকর্মের ক্ষেত্র বিস্তার করে। তার ফলে জীব তার কর্মের ফলস্বরূপ সুখ এবং দুঃখ ভোগ করার জন্য জগ জগতের বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। মন যতক্ষণ পাপ এবং পুণ্য কর্মের বাসনায় মগ্ন থাকে, ততক্ষণ তা স্বাভাবিকভাবেই কাম, ক্রোধ আদির দ্বারা বিকারগ্রস্ত হয়। এইভাবে, তা ইন্দ্রিয় সুখভোগের প্রতি আকৃষ্ট হয়। অর্থাৎ মন সত্ত্ব, রজ এবং তমোগুণের দ্বারা পরিচালিত হয়। একাদশ ইন্দ্রিয় এবং পঞ্চ মহাভূত- এই ষোড়শ উপাদানের মধ্যে মন হচ্ছে প্রধান। তাই মনেরই জন্য দেব, নর, পশু, তির্যক আদি বিভিন্ন প্রকার শরীর লাভ হয়। উৎকৃষ্ট অথবা নিকৃষ্ট স্তরে মনের স্থিতি অনুসারে জীবের জড় দেহ লাভ হয়। মায়া রচিত মন জীবকে আচ্ছন্ন করে বিভিন্ন যোনিতে ভ্রমণ করায়। তাকে বলা হয় সংসার-চক্র। এই মনের কারণে জীব জড় জগতের দুঃখ এবং সুখ ভোগ করে। জীবকে এইভাবে মোহাচ্ছন্ন করে মন পাপ এবং পুণ্যকর্মের ফলসমূহ সৃষ্টি করে এবং তার ফলে আত্মা জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। মন জীবকে এই সংসারে বিভিন্ন যোনিতে ভ্রমণ করায় এবং তার ফলে জীব মানুষ, দেবতা, স্থূল, কৃশ ইত্যাদি অবস্থা অনুভব করে। পণ্ডিতেরা বলেন যে, দেহের আকৃতি, বন্ধন এবং মুক্তির কারণ হচ্ছে মন। মন বিষয়-ভোগ আসক্ত হওয়ার ফলে জীব সংসার-বন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করে। কিন্তু মন যখন জড় সুখভোগের প্রতি অনাসক্ত হয়, তখন তা তার মুক্তির কারণ হয়। দীপের পলতে যখন ঠিকমতো জ্বলে না তখন তা থেকে কালো ধোঁয়া বেরোয়, কিন্তু তা যখন ঘৃতপূর্ণ হয়ে যথাযথভাবে জ্বলতে থাকে, তখন তা থেকে উজ্জ্বল শুভ্র দীপ্তি প্রকাশিত হয়। তেমনই, মন যখন ইন্দ্রিয় সুখভোগের প্রতি আসক্ত থাকে, তখন তা দুঃখ-দুর্দশার কারণ হয় এবং মন যখন বিষয়-বাসনা থেকে মুক্ত হয়, তখন কৃষ্ণভাবনার দীপ্তি প্রকাশ পায়। পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং অহঙ্কার- এগুলি মনের একাদশ বৃত্তি। হে বীর! শব্দ, স্পর্শ আদি পঞ্চতন্মাত্র জ্ঞানেন্দ্রিয়ের বিষয়ে, মলত্যাগ আদি পঞ্চ ব্যাপার কর্মেন্দ্রিয়ের বিষয়ে এবং দেহ, গৃহ, সমাজ ইত্যাদিতে আত্মবুদ্ধি অভিমানের বিষয়ে। পণ্ডিতেরা এগুলিকে মনের কর্মক্ষেত্র বলে থাকেন। শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস এবং গন্ধ- এগুলি পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়ের বিষয়। প্রজল্প, শিল্প, গতি, মলত্যাগ এবং স্ত্রীসম্ভোগ- এগুলি পঞ্চকর্মেন্দ্রিয়ের বিষয়। এ ছাড়া, ‘এটি আমার দেহ, এটি আমার সমাজ, এটি আমার পরিবার, এটি আমার দেশ’ ইত্যাদি যে ধারণা, মনের এই একাদশতম বৃত্তিটিকে বলা হয় অহঙ্কার। কোন কোন দার্শনিকের মতে এটি দ্বাদশতম বৃত্তি এবং তার কার্যক্ষেত্র হচ্ছে এই শরীর। দ্রব্য, স্বভাব, সংস্কার, অদৃষ্ট এবং কাল- এইগুলি নিমিত্ত কারণ। এই সমস্ত নিমিত্ত কারনের দ্বারা ক্ষোভিত হয়ে, এই একাদশ প্রকার চিত্ত বিকারে প্রথমে শত প্রকার, তারপর সহস্র প্রকার এবং তারপর কোটি প্রকার হয়ে থাকে। কিন্তু এই সমস্ত বিকার আপনা থেকেই পরস্পর সমন্বয়ের ফলে হয় না। পক্ষান্তরে তা হয় ভগবানের নির্দেশনায়। কৃষ্ণভক্তি-রহিত জীবের মনে মায়ার দ্বারা রচিত বহু ধারণা এবং বৃত্তি রয়েছে। সেগুলি অনাদিকাল থেকে বর্তমান। কখনও কখনও সেগুলি জাগ্রত অবস্থায় প্রকাশিত হয় এবং কখন স্বপ্নাবস্থায়, কিন্তু সুযুপ্তি ও সমাধি অবস্থায় সেগুলি তিরোহিত হয়। যে ব্যক্তি জীবন্মুক্তি তিনি এই প্রকার বিষয় স্পষ্টভাবে দর্শন করতে পারেন।”
“দুই প্রকার ক্ষেত্রজ্ঞ রয়েছে- জীবাত্মা, যা পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে এবং পরমেশ্বর ভগবান, যাঁর কথা এখানে বর্ণনা করা হচ্ছে। তিনি হচ্ছেন সৃষ্টির সর্বব্যাপক কারণ। তিনি পূর্ণ এবং অন্য কারোর উপর নির্ভরশীল নন। তাঁকে শ্রবণের মাধ্যমে এবং প্রত্যক্ষরূপে দর্শন করা যায়। তিনি স্বতঃপ্রকাশ এবং তাঁর জন্ম, মৃত্যু, জরা অথবা ব্যাধ নেই। তিনি ব্রহ্মা আদি সমস্ত দেবতাদের নিয়ন্তা। তিনি নারায়ণ অর্থাৎ সমস্ত জীবের আশ্রয়। তিনি ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ ভগবান এবং তিনি সর্বভূতের আবাস বাসুদেব। তিনি তাঁর স্বীয় শক্তির দ্বারা সমস্ত জীবের হৃদয়ে বর্তমান। বায়ু যেভাবে প্রাণরূপে স্থাবর-জঙ্গম আদি সর্বভূতের অভ্যন্তরে প্রবিষ্ট হয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনই তিনি বিশ্বপ্রপঞ্চে প্রবিষ্ট হয়ে তার উপর আধিপত্য করেন।”
“হে রাজা রহূগণ, দেহধারী বদ্ধ জীব যতক্ষণ পযন্ত জড় সুখভোগের কলুষ থেকে মুক্ত না হয় এবং তার ছয়টি শত্রুকে জয় করে আত্মজ্ঞান জাগরিত করার মাধ্যমে আত্মতত্ত্ব অবগত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে এই জড় জগতে বিভিন্ন যোনিতে ভ্রমণ করতে হয়। আত্মার উপাধি মন হচ্ছে সমস্ত জড়-জাগতিক দুঃখ-দুর্দশার কারণ। বদ্ধ জীব যতক্ষণ পর্যন্ত এই তথ্য না জানে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে জড় দেহজনিত দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে করতে এই জগতে ভ্রমণ করতে হয়। মন যেহেতু রোগ, শোক, মোহ, আসক্তি, লোভ, শত্রুতা ইত্যাদির দ্বারা প্রভাবিত, তাই সে এই জড় জগতের বন্ধনের দ্বারা আবদ্ধ হয়ে মমতা উৎপাদন করে। এই অসংযত মন জীবের পরম শত্রু। তাকে উপেক্ষা করলে অথবা সুযোগ দিলে তা প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে দুর্দমনীয় হয়ে ওঠে। যদিও তা বাস্তব নয়, তবুও তা অত্যন্ত বলবান। তা জীবের স্বরূপ আচ্ছাদিত করে রাখে। হে রাজন্, দয়া করে শ্রীগরুদেব এবং পরমেশ্বর ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের সেবারূপ অস্ত্রের দ্বারা এই মনকে জয় করার চেষ্টা করুন। অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে এই কর্তব্য সম্পাদন করুন।”

Leave a Reply

October 2025
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

Blog Stats

  • 140,963 hits