শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্, তারপর, সিন্ধু-সৌবীরের রাজা রহূগণ যখন কপিলাশ্রমে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁর প্রধান শিবিকা-বাহক ইক্ষুমতী নদীর তীরে উপস্থিত হয়ে আর একজন শিবিকা-বাহকের অন্বেষণ করতে করতে দৈবক্রমে জড় ভরতকে সেখানে পেয়েছিল। সে জড় ভরতকে যুবক, বলিষ্ঠ, দৃঢ় অঙ্গ সমন্বিত দেখে, তাঁকে গরু এবং গাধার মতো ভার বহনে সমর্থ বলে বিবেচনা করেছিল। মহাত্মা জড় ভরত যদিও এই প্রকার কার্যের উপযুক্ত ছিলেন না, তবু তারা কোন রকম দ্বিধা না করে, তাঁকে বলপূর্বক শিবিকা বহনের কার্যে নিযুক্ত করেছিল। জড় ভরত তাঁর অহিংস মনোভাবের জন্য শিবিকা ঠিকভাবে বহন করছিলেন না। তিনি তাঁর সম্মুখে এক গজ পরিমিত স্থান নিরীক্ষণ করে তারপর পদবিক্ষেপ করছিলেন, যাতে তাঁর পায়ের চাপে কোন পিপীলিকার মৃত্যু না হয়। কিন্তু তার ফলে অন্য বাহকদের সঙ্গে তাঁর পা না মেলায় শিবিকা আন্দোলিত হচ্ছিল এবং রাজা রহূগণ তখন বাহকদের জিজ্ঞাসা করছিলেন, ‘তোমরা কেন অসমানভাবে শিবিকা বহন করছ? ভালভাবে তা বহন কর।’ শিবিকা-বাহকেরা রাজার তিরস্কার বাক্য শ্রবণ করে, দণ্ডভয়ে ভীত হয়ে রাজার কাছে নিবেদন করেছিল- হে রাজন্, আমরা আমাদের কার্য সম্পাদনের মোটেই অবহেলা করছি না। আপনার আজ্ঞা অনুসারে আমরা সুষ্ঠুভাবেই শিবিকা বহন করছি। কিন্তু, সম্প্রতি যে ব্যক্তি নিযুক্ত হয়েছে সে দ্রুত চলতে পারছে না বলে, আমরা তার সঙ্গে শিবিকা বহন করতে পারছি না। দ-ভয়ে ভীত বাহকদের কথা শুনে রাজা রহূগণ বুঝতে পারলেন যে, কেবল একজনের দোষের ফলে শিবিকা যথাযথভাবে বাহিত হচ্ছে না। সে-কথা খুব ভালভাবে বুঝতে পেরে এবং তাদের আবেদন শুনে, তাঁর ঈষৎ ক্রোধের উদ্রেক হয়েছিল। যদিও তিনি ছিলেন রাজনীতি শাস্ত্রে পারদর্শী এবং অত্যন্ত অভিজ্ঞ, তবু তাঁর রাজ-স্বভাববশত তাঁর চিত্তে ক্রোধের উদয় হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে রাজা রহূগণের চিত্ত রজোগুণের দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল, তাই তিনি ভস্মাচ্ছাদিত অগ্নির মতো প্রচ্ছন্ন ব্রহ্মতেজসম্পন্ন জড় ভরতকে বললেন- আহা কী কষ্ট! ওহে ভাই, তুমি নিশ্চয়ই একাকী অনেকক্ষণ ধরে অনেক পথ এই শিবিকা বহন করে অত্যন্ত ক্লান্ত হয়েছ। আর তা ছাড়া তোমার বার্ধক্যবশত তুমি অত্যন্ত পরিশ্রান্ত হয়েছ। হে সখে, তোমার শরীর তো দৃঢ় নয় এবং তুমিও তেমন বলবান নও। তোমার সঙ্গের বাহকেরা কি তোমার সঙ্গে সহযোগীতা করছে না?”
“এইভাবে রাজা বক্রোক্তির দ্বারা জড় ভরতকে তিরস্কার করলেও জড় ভরত অভিমানশূন্যই ছিলেন। তিনি তাঁর চিন্ময় শরীর উপলব্ধি করার ফলে অবগত ছিলেন যে, তিনি তাঁর দেহ নন। তিনি স্থূল অথবা কৃশ ছিলেন না, পঞ্চমহাভূত এবং তিন সূক্ষ্ম উপাদানের সমন্বয়ে রচিত জড় পিণ্ডটির সঙ্গে তাঁর কোন সম্পর্ক ছিল না। হস্ত, পদ সম্বন্বিত জড় দেহটির সঙ্গে তাঁর কোন সম্পর্ক ছিল না। অর্থাৎ তিনি সম্পূর্ণরূপে তাঁর চিন্ময় স্বরূপ (অহং ব্রহ্মাস্মি) উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তিনি রাজার পরিহাসপূর্ণ তিরস্কারে বিচলিত হননি। নীরবে তিনি পূর্বের মতোই শিবিকা বহন করতে লাগলেন। তারপর রাজা যখন দেখলেন যে, শিবিকা পুনরায় আন্দোলিত হচ্ছে, তখন তিনি অত্যন্ত ক্রোধাবিষ্ট হয়ে বললেন- ওরে দুষ্ট, তুই কি করছিস? তুই কি জীবিত অবস্থায়ও মৃত নাকি? তুই জানিস না যে আমি তোর প্রভু? তুই আমার আদেশ অবজ্ঞা করছিস। তোর এই অবজ্ঞার ফলে, আমি তোকে যমরাজের মতো দণ্ড দেব। আমি তোর উপযুক্ত শাস্তি বিধান করব, যাতে তুই প্রকৃতিস্থ হোস। নিজেকে একজন রাজা বলে মনে করায়, রহূগণ দেহাত্মবুদ্ধিগ্রস্ত ছিলেন এবং রজ ও তমোগুণের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। মদভরে তিনি জড় ভরতকে অশালীন বাক্যের দ্বারা তিরস্কার করেছিলেন। জড় ভরত ছিলেন পরম ভাগবত এবং ভগবানের প্রিয় নিকেতন। রাজা যদিও নিজেকে একজন মস্ত বড় পণ্ডিত বলে মনে করতেন, কিন্তু তিনি পরম ভাগবতের স্থিতি অবগত ছিলেন না এবং তাঁর চরিত্রও তাঁর জানা ছিল না। জড় ভরত সর্বদা ভগবানকে তাঁর হৃদয়ে বহন করতেন বলে তিনি ছিলেন ভগবানের বাসস্থান সদৃশ। তিনি ছিলেন সমস্ত জীবের সুহৃৎ এবং তিনি কোন প্রকার দেহাত্মবুদ্ধি পোষণ করতেন না।”
তাই মহান ব্রাহ্মণ জড় ভরত ঈষৎ হেসে বললেন- “হে বীর রাজা, আপনি যা বলেছেন তা সত্য। প্রকৃতপক্ষে সেগুলি কেবল তিরস্কার বাক্য নয়, কারণ দেহটি হচ্ছে বাহক। ভারবহনকারী দেহটি আমার নয়, কারণ আমি হচ্ছি চিন্ময় আত্মা। আপনার উক্তিতে কোন বিরোধ নেই, কারণ আমি দেহ থেকে ভিন্ন। আমি শিবিকার বাহক নই; এই দেহটি হচ্ছে বাহক। নিশ্চিতভাবে, যে কথা আপনি বলেছেন, আমি এই শিবিকা বহনে পরিশ্রম করিনি, কারণ আমি এই দেহটি থেকে পৃথক। আপনি বলেছেন যে, আমি হৃষ্টপুষ্ট নই। এই বাক্যটি তার পক্ষেই উপযুক্ত, যে ব্যক্তি দেহ এবং আত্মার পার্থক্য জানে না। দেহ স্থূল অথবা কৃশ হতে পারে, কিন্তু কোন বিজ্ঞ ব্যক্তি আত্মা সম্বন্ধে সেই কথা বলবে না। আত্মা স্থূলও নয় অথবা কৃশও নয়; তাই আপনি যখন বলেছেন যে, আমি হৃষ্টপুষ্ট নই, তা সত্য। অধিকন্তু এই ভ্রমণের উদ্দেশ্য এবং গন্তব্যস্থলের পথ যদি আমার হত, তাহলে আমার পক্ষে বহু অসুবিধা হত, কিন্তু যেহেতু সেগুলি আমার সম্পর্কে বলা হয়নি, বলা হয়েছে আমার দেহের সম্পর্কে, তাই তাতে মোটেই কোন রকম অসুবিধা হয়নি। স্থূলতা, কৃশতা, দেহিক ও মানসিক ক্লেশ, তৃষ্ণা, ক্ষুধা, ভয়, কলহ, জড় সুখভোগের বাসনা, জরা, নিদ্রা, বিষয়াসক্তি, ক্রোধ, শোক এবং দেহাত্মবুদ্ধি- এই সবই আত্মার জড় আবরণের বিকার। দেহাত্মবুদ্ধিতে মগ্ন ব্যক্তিরাই এগুলির দ্বারা প্রভাবিত হয়, কিন্তু আমি সর্বপ্রকার দেহাত্মবুদ্ধি থেকে মুক্ত। তাই আমি স্থূল অথবা কৃশ নই অথবা আপনি যে কথাগুলি বলেছেন, আমি তার কোনটিই নই।”
“হে রাজন্, আপনি অনর্থক আমাকে জীবস্মৃত বলে অভিযোগ করেছেন। সেই সম্পর্কে আমি কেবল এই বলতে পারি যে, এই জড় জগতে সবকিছুরই আদি এবং অন্ত রয়েছে। আর আপনি যে মনে করছেন আপনি রাজা ও প্রভু এবং তাই আমাকে আদেশ দেওয়ার চেষ্টা করছেন, সেটিও ঠিক নয়। কারণ এই সমস্ত পদগুলি অনিত্য। আজ আপনি রাজা এবং আমি আপনার ভৃত্য, কিন্তু কাল তার পরিবর্তন হতে পারে এবং আপনি ভৃত্যতে এবং আমি প্রভুতে পরিণত হতে পারি। এই সমস্ত অনিত্য পরিস্থিতিগুলি দৈবের দ্বারা সৃষ্ট হয়। হে রাজন্, আপনি যদি এখনও মনে করেন যে, আপনি হচ্ছেন রাজা এবং আমি হচ্ছি আপনার ভৃত্য, তাহলে আপনি আদেশ করুন এবং আপনার আদেশ আমাকে পালন করতে হবে। কিন্তু আমি এই কথা বলতে পারি যে, এই পার্থক্য অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী এবং ব্যবহার অথবা প্রথা থেকেই তার উৎপত্তি। এ ছাড়া তার অন্য কোন কারণ আমি দেখি না। সেই ক্ষেত্রে প্রভু কে? এবং ভৃত্যই বা কে? সকলেই জড়া প্রকৃতির নিয়মের বাধ্য; তাই কেউই প্রভু নয় এবং কেউই ভৃত্য নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও, আপনি যদি মনে করেন যে, আপনি প্রভু এবং আমি আপনার ভৃত্য, তাহলে আমি তা স্বীকার করে নেব। আপনি দয়া করে আমাকে আদেশ দিন। বলুন, আমি আপনার জন্য কি করতে পারি?”
“হে রাজন্, আপনি বলেছেন, ‘ওরে উন্মত্ত, মত্ত, জড়! আমি তোকে দ-দান করব, তাহলে তুই প্রকৃতিস্থ হবি।” সেই সম্পর্কে আমি বলতে চাই যে জড়, মুক এবং বধিরের মতো অবস্থান করলেও আমি ব্রহ্মাত্মানিষ্ঠা লাভ করেছি। আমাকে দ- দিয়ে আপনার কি লাভ হবে? আর আপনার অনুমান যদি ঠিক হয় এবং আমি যদি সত্যি সত্যিই উন্মত্ত হই, তাহলে আমাকে দণ্ড দেওয়া পিষ্টবস্তু পোষণ করার মতোই হবে। তার ফলে কোন লাভ হবে না। কারণ উন্মত্ত ব্যক্তিকে দণ্ডদান করা হলেও তার উন্মত্ততার উপশম হয় না।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, রাজা রহূগণ পরম ভাগবত জড় ভরতকে কর্কশ বাক্যে যখন তিরস্কার করেছিলেন, তখন শান্তচিত্ত মুনিবার তা সহ্য করে তার যথাযথ উত্তর দিয়েছিলেন। অবিদ্যার কারণ দেহাত্মবুদ্ধি, কিন্তু জড় ভরত সেই ভ্রান্ত ধারণার দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন না। তাঁর স্বাভাবিক দৈন্যবশত তিনি নিজেকে একজন মহান ভক্ত বলে মনে করতেন না, তিনি নীরবে তাঁর পূর্বকৃত কর্মের ফল ভোগ করে যেতেন। একজন সাধারণ মানুষের মতো তিনি মনে করেছিলেন যে, শিবিকা বহন করে তিনি তাঁর পূর্বকৃত দুষ্কমের ফল বিনষ্ট করছেন। এইভাবে বিচার করে তিনি পূর্ববৎ শিবিকা বহন করতে লাগলেন।”
“হে পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ (মহারাজ পরীক্ষিৎ), সিন্ধু-সৌবীরের রাজা মহারাজ রহূগণেরও পরম তত্ত্ব বিচারে গভীর শ্রদ্ধা ছিল। জড় ভরতের যোগশাস্ত্র-সম্মত এবং হৃদয়গ্রন্থি ছেদনকারী বাক্য শ্রবণ করে তাঁর রাজ-অভিমান বিদূরিত হয়েছিল। তিনি শীঘ্র শিবিকা থেকে অবতরণপূর্বক ভরতের শ্রীপাদপদ্মে তাঁর মস্তক স্থাপন করে প্রণতি নিবেদন করলেন এবং সেই মহাভাগবতের চরণে অপরাধ করার ফলে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেছিলেন- হে ব্রাহ্মণ, আপনি সকলের অজ্ঞাতসারে প্রচ্ছন্নভাবে এই সংসারে বিচরণ করছেন। আপনি কে? আপনি কি বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ এবং মহাপুরুষ? আপনি যজ্ঞোপবীত ধারণ করেছেন। আপনি কি দত্তাত্রেয় আদি অবধূতদের মধ্যে কেউ? আপনি কোন মহাত্মার শিষ্য? আপনি কোথায় অবস্থান করেন? আপনি এই স্থানে কেন এসেছেন? আমাদের মঙ্গল সাধনের উদ্দেশ্যেই কি আপনি এসেছেন? আপনি দয়া করে বলুন, আপনি কে?
“হে মহানুভব, আমি দেবরাজ ইন্দ্রের বজ্রের ভয়ে ভীত নই, শিবের ত্রিশূলের ভয়েও ভীত নই, যমরাজের দণ্ড অথবা অগ্নি, সূর্য, চন্দ্র, বায়ু ও কুবেরের অস্ত্র থেকেও আমার ভয় উৎপন্ন হয় না। কিন্তু আমি ব্রহ্মজ্ঞকুলের অবমাননারূপ অপরাধকে অত্যন্ত ভয় করি।”
“হে মহানুভব, মনে হচ্ছে যেন আপনার মহান আধ্যাত্মিক জ্ঞানের প্রভাব আপনি গোপন করে রেখেছেন। প্রকৃতপক্ষে আপনি সমস্ত জড় সংসর্গ থেকে মুক্ত এবং পূর্ণরূপে ভগবানের চিন্তায় মগ্ন। তাই আপনার দিব্য জ্ঞান অনন্ত। দয়া করে আপনি আমাকে বলুন, কেন আপনি এইভাবে একজন জড়ের মতো বিচরণ করছেন। হে মহাপুরুষ, আপনি যোগসম্মত কথা বলেছেন, কিন্তু আমাদের পক্ষে তা হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব নয়। তাই দয়া করে তা বিশ্লেষণ করুন। আমি আপনাকে যোগেশ্বর, আত্ম-তত্ত্বজ্ঞ মুনিদেরও পরম গুরু বলে মনে করি। মানব-সমাজের কল্যাণের জন্য আপনি অবতীর্ণ হয়েছেন। আপনি ভগবানের জ্ঞনরূপী অবতার কপিলদেবের সাক্ষাৎ প্রতিনিধি রূপে দিব্য জ্ঞান প্রদান করতে এসেছেন। তাই আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করি, হে গুরুদেব, এই জগতে সব চাইতে নিরাপদ আশ্রয় কি? আপনি যে ভগবানের অবতার কপিলদেবের সাক্ষাৎ প্রতিনিধি, তা কি সত্য নয়? কে প্রকৃত মানুষ এবং কে নয়, তা পরীক্ষা করার জন্য আপনি মূক এবং বধিরের মতো অভিনয় করছেন। আপনি কি সেই জন্য এই পৃথিবীপৃষ্ঠে এইভাবে বিচরণ করছেন না? আমি অত্যন্ত বিষয়াসক্ত এবং জ্ঞানান্ধ, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি আপনার কাছে জ্ঞানের আলোক প্রাপ্ত হওয়ার জন্য উপস্থিত হয়েছি। কিভাবে আমি পারমার্থিক জীবনে উন্নতি সাধন করতে পারি? আপনি বলেছেন, ‘আমি শ্রান্ত নই।’ যদিও আত্মা দেহ থেকে ভিন্ন, তবু দৈহিক পরিশ্রমের ফলে শ্রান্তি হয় এবং তখন মনে হয় যে আত্মাই যেন শ্রান্ত হয়েছে। আপনি যখন শিবিকা বহন করছিলেন, তখন নিশ্চয়ই আত্মারও পরিশ্রম হয়েছে। এটিই আমার অনুমান। আপনি এও বলেছেন যে, প্রভু এবং ভৃত্যের যে বাহ্য আচরণ তা বাস্তবিক নয়, কিন্তু যদিও এই প্রাপঞ্চিক জগতে তা বাস্তবিক নয়, তবুও এই প্রাপঞ্চিক জগতের বিষয়গুলি তো বস্তুকে প্রভাবিত করে। তা প্রত্যক্ষভাবে দেখা যায় এবং অনুভব করা যায়। যদিও জড়-জাগতিক কার্যকলাপ অনিত্য কিন্তু তাহলেও তা মিথ্যা বলা যায় না।”
রাজা রহূগণ বলতে লাগলেন- “হে মহানুভব, আপনি বলেছেন যে শরীরের স্থূলতা এবং কৃশতা আত্মার ধর্ম নয়। তা ঠিক নয়, কারণ সুখ এবং দুঃখের অনুভূতি আত্মারই হয়ে থাকে। পাত্রস্থিত দুধ এবং চাল আগুনের তাপে আপনা থেকেই উত্তপ্ত হয় এবং তার ফলে চালের অন্তরভাগ সিদ্ধ হয়। তেমনই, দেহের দুঃখ এবং সুখ ইন্দ্রিয়, মন এবং আত্মাকে প্রভাবিত করে। আত্মা এই অবস্থা থেকে অনাসক্ত থাকতে পারে না।”
“হে মহদাশয়, আপনি বলেছেন রাজা এবং প্রজা অথবা প্রভু এবং ভৃত্যের মধ্যে যে সম্পর্ক তা নিত্য নয়, কিন্তু যদিও এই সম্পর্ক অনিত্য তবুও কেউ যখন রাজার পদ গ্রহণ করেন, তখন তাঁর কর্তব্য হচ্ছে প্রজাদের শাসন করা এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের দণ্ডদান করা। তাদের দণ্ডদান করে তিনি প্রজাদের রাজ্যের আইন মেনে চলার শিক্ষা দেন। পুনরায়, আপনি বলেছেন যে, মূক এবং বধির ব্যক্তিকে দণ্ড দেওয়া পিষ্ট বস্তুকে পেষণ করার মতো; অর্থাৎ, তার ফলে কোন লাভ হয় না। কিন্তু কেউ যদি ভগবানের নির্দেশ অনুসারে তাঁর স্বধর্মে যুক্ত থাকেন, তাহলে অবশ্যই তাঁর পাপকর্মের লাঘব হয়। অতএব কাউকে যদি বলপূর্বক তাঁর স্বধর্মে নিযুক্ত করা হয়, তার ফলে তাঁর মঙ্গল হয়, কারণ তখন তাঁর সমস্ত পাপ থেকে তিনি মুক্ত হতে পারেন। আপনি যা বলেছেন তা আমার কাছে বিপরীত বলে মনে হচ্ছে। হে আর্তবন্ধু, আমি রাজা হওয়ার অভিমানে মত্ত হয়ে আপনার মতো পরম ভাগবতকে অপমান করে মহা অপরাধ করেছি। তাই আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করি, দয়া করে আপনি আমার প্রতি অহৈতুকী কৃপা প্রদর্শন করুন। তাহলেই কেবল আমি এই অপরাধ থেকে মুক্ত হতে পারব। হে প্রভু, আপনি সমস্ত জীবের পরম সুহৃৎ ভগবানের সখা। তাই আপনি সকলের প্রতি সমদৃষ্টিসম্পন্ন এবং আপনি দেহাত্মবুদ্ধি থেকে মুক্ত। আমি যে আপনাকে অপমান করেছি, তাতে যদিও আপনার কোন বিকার হয়নি, তবুও সেই অপরাধের ফলে আমার মতো ব্যক্তি যদি শিবের মতোও শক্তিশালী হয়, তাহলেও অচিরেই বিনষ্ট হবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।”
দশম অধ্যায়- জড় ভরতের সঙ্গে মহারাজ রহূগণের সাক্ষাৎ
05 Oct 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, পঞ্চম স্কন্ধ- কর্মবাসনা