ভগবান ঋষভদেব তাঁর পুত্রদের বললেন- “হে পুত্রগণ, এই জগতে দেহধারী প্রাণীদের মধ্যে এই নরদেহ লাভ করে, কেবল ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের জন্য দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করা উচিত নয়। ঐ প্রকার ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ বিষ্ঠাভোজী কুকুর ও শূকরদেরও লাভ হয়ে থাকে। ভগবৎ সেবাপর অপ্রাকৃত তপস্যা করাই উচিত, কারন তার ফলে হৃদয় নির্মল হয় এবং হৃদয় নির্মল হলে জড় সুখের অতীত অন্তহীন চিন্ময় আনন্দ লাভ হয়। পণ্ডিতগণ ব্রহ্ম-উপাসক এবং ভগবৎ-উপাসক ভেদে দ্বিবিধ। ব্রহ্মসাযুজ্য এবং ভগবানের পার্ষদত্ব লাভরূপ দ্বিবিধ মুক্তিরই উপায় হচ্ছে মহাত্মাদের সেবা করা। পক্ষান্তরে স্ত্রীসঙ্গীদের সঙ্গ নরকের দ্বারস্বরূপ। যাঁরা সমদর্শী, ভগবানে নিষ্ঠাপরায়ণ, ক্রোধহীন এবং সমস্ত জীবের হিতসাধনে রত এবং যাঁরা কখনও অন্যায় আচরন করেন না, তাঁরাই মহাত্মা নামে পরিচিত। যাঁরা তাঁদের কৃষ্ণভাবনামৃত পুনর্জাগরিত করে তাঁদের ভগবৎ-প্রেম বিকশিত করতে চান, তাঁরা কৃষ্ণসম্বন্ধবিহীন কোন কিছু করতে চান না। যারা কেবল আহার, নিদ্রা, ভয় এবং মৈথুন চর্চা করে তাদের দেহটি পালন করতে ব্যস্ত, তাঁরা তাদের সঙ্গে মেলামেশা করতে চান না। তাঁরা গৃহস্থ হলেও তাঁদের গৃহের প্রতি আসক্ত নন। এমনকি তাঁরা তাঁদের পত্নী, সন্তান, বন্ধুবান্ধব, এবং ধন-সম্পদের প্রতিও আসক্ত নন। সেই সঙ্গে তাঁরা তাঁদের কর্তব্য কর্মেরও অবহেলা করেন না। এই প্রকার মানুষেরা কেবল তাঁদের দেহ ধারণ করার জন্য যতটুকু অর্থের প্রয়োজন কেবল ততটুকুই সংগ্রহ করেন। জীব যখন ইন্দ্রিয়সুখ ভোগকেই জীবনের চরম লক্ষ্য বলে বিবেচনা করে, তখন সে অবশ্যই জড়-জাগতিক জীবনের প্রতি উন্মত্তের মতো আসক্ত হয়ে নানা প্রকার পাপকর্মে প্রবৃত্ত হয়। সে জানে না যে তার পূর্বকৃত পাপকর্মের ফলে সে একটি শরীর প্রাপ্ত হয়েছে, যা অনিত্য এবং সমস্ত দুঃখ-দুর্দশার কারণ। প্রকৃতপক্ষে জীবের জড় দেহ ধারণ করার কথা নয়, কিন্তু ইন্দ্রিয়সুখের আকাঙ্ক্ষা করার ফলে, সে জড় দেহ লাভ করে। তাই আমি মনে করি যে, বুদ্ধিমান মানুষের পক্ষে ইন্দ্রিয়তৃপ্তি সাধনে প্রবৃত্ত হওয়া উচিত নয়, যার ফলে সে একটির পর একটি জড় শরীর প্রাপ্ত হয়। জীব যতক্ষণ পর্যন্ত আত্মতত্ত্ব সম্বন্ধে জানতে অভিলাষ না করে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে জড়া প্রকৃতির প্রভাবে পরাস্ত হয়ে অবিদ্যাজনিত ক্লেশ ভোগ করে। পাপ অথবা পুণ্য উভয় প্রকার কর্মই কর্মফল উৎপন্ন করে। যে কোন প্রকার কর্মে রুচি থাকলেই মন কর্মাত্মক হয়, অর্থাৎ সকাম কর্মের বাসনায় আসক্ত হয়। মন যতক্ষণ কলুষিত থাকে, ততক্ষণ চেতনা আচ্ছাদিত থাকে এবং তার ফলে জীব সকাম কর্মে প্রবৃত্ত হয় এবং তাকে একের পর এক জড় দেহ ধারণ করতে হয়। জীব যতক্ষণ তমোগুণের দ্বারা আচ্ছাদিত থাকে, ততক্ষণ সে আত্মা এবং পরমাত্মাকে উপলব্ধি করতে পারে না। তার মন তখন সকাম কর্মে বশীভূত থাকে। তাই, আমার থেকে অভিন্ন বাসুদেবে যতক্ষণ না প্রীতির উদয় হয়, ততক্ষণ সে জড় দেহের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারে না। জ্ঞানবান হওয়া সত্ত্বেও জীব যতক্ষণ ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের চেষ্টাকে অনর্থ বলে উপলব্ধি না করে, ততক্ষণ তার স্বরূপ বিস্মৃতির ফলে সে মৈথুন সুখপ্রধান গৃহের প্রতি আসক্ত থাকে নানা প্রকার দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করে। তার অবস্থা একটি মূর্খ পশুর থেকে কোন অংশে শ্রেয় নয়। স্ত্রী ও পুরুষের পরস্পরের প্রতি আকর্ষন জড়-জাগতিক জীবনের ভিত্তি। এই ভ্রান্ত আসক্তিই স্ত্রী-পুরুষের পরস্পরের হৃদয়গ্রন্থি-স্বরূপ এবং তার ফলেই জীবের দেহ, গৃহ, সম্পত্তি, সন্তান, আত্মীয়স্বজন ও ধন-সম্পদাদিতে ‘আমি এবং আমার’ বুদ্ধিরূপ মোহ উৎপন্ন হয়। যখন মানুষের কর্মফল জনিত সুদৃঢ় হৃদয়গ্রন্থি শিথিল হয়, তখন সে গৃহ, কলত্র, সন্তান ইত্যাদি প্রতি অনাসক্ত হয়। এইভাবে সে তার সংসার বন্ধনের মূল কারণ ‘আমি ও আমার’ রূপ অহঙ্কারাদি পরিত্যাগ করে বিমুক্ত হয় এবং পরম পদ প্রাপ্ত হয়।”
“হে পুত্রগণ, আধ্যাত্মিক চেতনায় অতি উন্নত পরমহংসকে গুরুদেবরূপে বরণ করা উচিত। এইভাবে পরমেশ্বর ভগবান আমার প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভক্তিপরায়ণ হও। ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের প্রতি বিরক্ত হয়ে সুখ-দুঃখ, শীত-উষ্ণ- এই দ্বন্দ্বভাব সহ্য কর। স্বর্গলোকে উন্নীত হলেও জীব যে দুঃখ-দুর্দশার বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারে না, সেই কথা হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা কর। তত্ত্বানুসন্ধান কর। তারপর ভগবদ্ভক্তি লাভের জন্য সব রকম তপস্যা কর। ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের সমস্ত প্রচেষ্টা পরিত্যাগ করে ভগবানের সেবায় যুক্ত হও। ভগবানের কথা শ্রবণ কর এবং এবং সর্বদা ভগবদ্ভক্তের সঙ্গ কর। ভগবানের মহিমা কীর্তন কর এবং চিন্ময় স্তরে সকলকে সমদৃষ্টিতে দর্শন কর। শত্রুতা বর্জন কর এবং ক্রোধ ও শোক দমন কর। দেহ, গেহ ইত্যদিতে মমত্ববুদ্ধি পরিত্যাগ করে শাস্ত্র অধ্যয়ন কর। নির্জন স্থানে বাস কর এবং প্রাণ, মন ও ইন্দ্রিয় সর্বতোভাবে সংযত করার অভ্যাস কর। শাস্ত্রের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাপরায়ণ হও এবং সর্বদা ব্রহ্মচর্য পালন কর। অনর্থক বাক্যালাপন বর্জন করে কর্তব্যকর্ম সম্পাদন কর। সর্বদা ভগবানের কথা চিন্তা কর এবং উপযুক্ত পাত্র থেকে জ্ঞান অর্জন কর। এইভাবে ভক্তিযোগ সাধন করে ধৈর্য, যত্ন ও বিবেক যুক্ত হলে, তোমরা অহঙ্কার থেকে মুক্ত হতে পারবে।”
“হে পুত্রগণ, আমি তোমাদের যে উপদেশ দিলাম অত্যন্ত সাবধানতা সহকারে সেই উপদেশ অনুসারে আচরণ কর। তার ফলে তোমরা সকাম কর্মের বাসনারূপ অবিদ্যা থেকে মুক্ত হবে এবং হৃদয়গ্রন্থি সম্যক্রূপে ছিন্ন হবে। তারপর অধিক উন্নতি সাধনের জন্য তোমাদের এই মুক্তির উপায়ও ত্যাগ করতে হবে। অর্থাৎ, মুক্তির উপায়ের প্রতিও তোমরা আসক্ত হয়ো না। কেউ যদি ভগবদ্ধামে ফিরে যাবার জন্য ঐকান্তিকভাবে আগ্রহী হন, তাহলে ভগবানের কৃপা লাভই জীবনের চরম লক্ষ্য বলে তাঁকে মনে করতে হবে। পিতা পুত্রদের, গুরু শিষ্যদের এবং রাজা প্রজাদের এই প্রকার শিক্ষাই দান করবেন। শিষ্য, পুত্র অথবা প্রজা যদি সেই আদেশ অনুসরণ করতে কখনও অক্ষমও হয়, তাহলে ক্রুদ্ধ না হয়ে তাদের উপদেশ দান করতে থাকা উচিত। যে সমস্ত মূঢ় ব্যক্তি পাপ এবং পুণ্য কর্মে যুক্ত, তাদের কর্তব্য হচ্ছে সর্বতোভাবে ভগবানের সেবায় যুক্ত হওয়া। সর্বদাই সকাম কর্ম পরিত্যাগ করা কর্তব্য। মোহান্ধ শিষ্য, পুত্র ও প্রজাদের যদি সকাম কর্মে নিযুক্ত করে সংসার-কূপে নিক্ষেপ করা হয়, তাহলে তারা কি পুরুষার্থ লাভ করবে? তা অন্ধের দ্বারা পরিচালিত হয়ে অন্ধকূপে পতিত হওয়ার মতো। অজ্ঞানতাবশত বিষয়াসক্ত ব্যক্তিরা তাদের মঙ্গল লাভের উপায় অবগত নয়। তারা নিতান্ত কামাসক্ত হয়ে ভোগ্য বিষয়সমূহের জন্যই সর্বদা অভিলাষ করে। সেই সমস্ত মূঢ় ব্যক্তিরা অনিত্য ইন্দ্রিয়সুখের জন্য পরস্পরের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হয় এবং তার ফলে অন্তহীন দুঃখকষ্ট ভোগ করে। কিন্তু তারা এতই মূর্খ যে, সেই কথা তারা বুঝতে পারে না। কেউ যদি অজ্ঞানী হয় এবং সংসার মার্গে আসক্ত হয়, তাহলে যথার্থ জ্ঞানবান, কৃপালু এবং পারমার্থিক মার্গে উন্নত কোনও ব্যক্তি কিভাবে তাকে সকাম কর্মে প্রবৃত্ত করে জড় জগতের বন্ধনে আরও বেশি করে আবদ্ধ করতে পারেন? কোন অন্ধ ব্যক্তি যদি বিপথে গমন করে, তাহলে কি কোন সজ্জন ব্যক্তি তাকে সেই বিপদের দিকে অগ্রসর হতে দিতে পারেন? কোন জ্ঞানবান অথবা দয়ালু ব্যক্তি কখনও তা হতে দেন না। যিনি তাঁর আশ্রিত জনকে সমুপস্থিত মৃত্যুরূপ সংসার মার্গ থেকে উদ্ধার করতে না পারেন, তাঁর গুরু, পিতা, পতি, জননী অথবা পূজ্য দেবতা হওয়া উচিত নয়।”
“আমার চিন্ময় দেহ (সচ্চিদানন্দময় বিগ্রহ) ঠিক একটি মানুষের মতো, কিন্তু তা মনুষ্য-শরীর নয়। এই তত্ত্ব অচিন্তনীয়। আমি জড়া প্রকৃতির দ্বারা বাধ্য হয়ে কোন বিশেষ প্রকার শরীর ধারণ করি না; আমি স্বেচ্ছায় এই শরীর গ্রহণ করি। আমার হৃদয় শুদ্ধ সত্ত্বময় এবং আমি সর্বদা আমার ভক্তদের কল্যাণের কথা চিন্তা করি। তাই প্রকৃত দর্শন যে ভক্তির পন্থা তা আমার হৃদয়ে রয়েছে এবং তা আমার ভক্তদের জন্য। অধর্মকে আমি আমার হৃদয় থেকে বহু দূরে পরিত্যাগ করেছি। যারা অধার্মিক বা অভক্ত, তাদের প্রতি আমার কোন অনুরাগ নেই। আমার এই সমস্ত দিব্য গুণাবলীর জন্য আর্যগণ আমাকে ঋষভদেব অর্থাৎ সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ বা ভগবান বলে সম্বোধন করেন।”
“হে পুত্রগণ, সমস্ত চিন্ময় গুণের আধার আমার হৃদয় থেকে তোমরা জন্মগ্রহণ করেছ। তাই তোমাদের মাৎসর্য পরায়ণ বিষয়ীদের মতো হওয়া উচিত নয়। তোমরা তোমাদের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ভক্তশ্রেষ্ঠ ভরতের আনুগত্যে থেকো। তোমরা যদি ভরতের সেবায় যুক্ত হও, তাহলে তার ফলে আমারও সেবা হবে এবং তোমাদের প্রজাপালনাদি কর্তব্যসমূহও সাবলীলভাবে সম্পাদিত হবে। চিৎ এবং অচিৎ- এই দুই প্রকার প্রকাশিত শক্তির মধ্যে পাথরাদি জড় পদার্থ থেকে সজীব বৃক্ষ ইত্যাদি (বনস্পতি, তৃণ, গুল্ম এবং বৃক্ষ) শ্রেষ্ঠ। স্থাবর বৃক্ষ থেকে গমনক্ষম সরীসৃপ শ্রেষ্ঠ। সরীসৃপ থেকে উন্নততর বুদ্ধমত্তাসম্পন্ন পশুরা শ্রেষ্ঠ। পশুদের থেকে মানুষ শ্রেষ্ঠ এবং মানুষ থেকে ভূত-প্রেত শ্রেষ্ঠ কারণ তাদের স্থূল দেহ নেই। তাদের থেকে শ্রেষ্ঠ গন্ধর্ব এবং গন্ধর্বদের থেকে শ্রেষ্ঠ সিদ্ধ। সিদ্ধদের থেকে শ্রেষ্ঠ কিন্নর এবং তাঁদের থেকে শ্রেষ্ঠ অসুর। অসুরদের থেকে দেবতারা শ্রেষ্ঠ এবং দেবতাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন ইন্দ্র। ইন্দ্রের থেকে শ্রেষ্ঠ দক্ষ আদি ব্রহ্মার পুত্রগণ এবং ব্রহ্মার পুত্রদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছেন শিব। শিব ব্রহ্মার পুত্র বলে ব্রহ্মা তাঁর থেকে শ্রেষ্ঠ, কিন্তু ব্রহ্মাও আমার অধীন। কিন্তু আমি ব্রাহ্মণদের আমার পূজ্য বলে মনে করি, তাই ব্রাহ্মণেরা হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ।”
“হে ব্রাহ্মণগণ, আমি এই জগতের কোন প্রাণীকে ব্রাহ্মণের সমতুল্য বা ব্রাহ্মণের থেকে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করি না। আমার মনোভাব সম্বন্ধে অবগত ব্যক্তিরা যজ্ঞ অনুষ্ঠানের পর, শ্রদ্ধা ও প্রীতি সহকারে ব্রাহ্মণের মুখে অন্ন প্রদান করার মাধ্যমে আমাকে ভোজন করায়। যখন এইভাবে আমাকে অন্ন নিবেদন করা হয়, তখন তা আমি পূর্ণ তৃপ্তি সহকারে আহার করি। প্রকৃতপক্ষে, এইভাবে প্রদত্ত ভোজন আমি অগ্নিহোত্র যজ্ঞে নিবেদিত ভোজন থেকে অধিক তৃপ্তি সহকারে গ্রহণ করি। শব্দরূপে বেদ আমার শাশ্বত অবতার। তাই বেগ হচ্ছে শব্দব্রহ্ম। এই জগতে ব্রাহ্মণেরা সমস্ত বেদ অধ্যয়ন করেন এবং যেহেতু তাঁরা বৈদিক জ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করেন, তাই তাঁদের মূর্তিমান বেদ বলে মনে করা হয়। ব্রাহ্মণেরা সত্ত্বগুণে অবস্থিত তাই তাঁরা শম, দম, সত্য, অনুগ্রহ, তপস্যা, সহিষ্ণুতা, অনুভব- এই আটটি গুণের দ্বারা গুণান্বিত। অতএব সমস্ত জীবের মধ্যে কেউই ব্রাহ্মণের থেকে শ্রেষ্ঠ নয়। আমি সর্ব ঐশ্বর্যপূর্ণ, সর্ব শক্তিমান এবং ব্রহ্মা, ইন্দ্র ইত্যাদি দেবতাদের থেকেও শ্রেষ্ঠ। আমি স্বর্গসুখ ও মুক্তি প্রদানকারী। কিন্তু তা সত্ত্বেও ব্রাহ্মণেরা আমার কাছ থেকে কোন রকম জড়-জাগতিক সুখস্বাচ্ছন্দ্য প্রাথনা করেন না। তাঁরা অত্যন্ত পবিত্র এবং অকিঞ্চন। তাঁরা কেবল আমাতেই ভক্তি করেন। অন্য কারোর কাছে জাগতিক লাভের জন্য তাঁদের প্রার্থনা করার আর কি প্রয়োজন?”
“হে পুত্রগণ, স্থাবর অথবা জঙ্গম কোন জীবের প্রতিই মাৎসর্য পরায়ণ হয়ো না। আমি তাদের সকলের মধ্যে বিরাজ করছি জেনে সর্বদা তাদের সম্মান করো, তাহলে আমার প্রতিই সম্মান প্রদর্শন করা হবে। মন, চক্ষু, বাক্য ও অন্যান্য সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলির যথার্থ কার্য হচ্ছে আমারই সেবায় পূর্ণরূপে নিযুক্ত হওয়া। জীবের ইন্দ্রিয় যদি এইভাবে নিযুক্ত না হয়, তাহলে জীব যমরাজের পাশসদৃশ সংসার বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার কথা কল্পনাও করতে পারে না।”
শ্রীশুকদেব গোস্বামী বললেন- “এইভাবে সকলের পরম সুহৃৎ ভগবান ঋষভদেব লোকশিক্ষার জন্য তাঁর পুত্রদের শিক্ষা প্রদান করেছিলেন, যদিও তাঁরা সকলে সুশিক্ষিত ছিলেন। বানপ্রস্থ আশ্রম গ্রহণ করার পূর্বে, পিতার পুত্রদের কিভাবে উপদেশ দেওয়া উচিত, সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করার জন্য তিনি তাঁদের উপদেশ দিয়েছিলেন। কর্মবন্ধন মুক্ত নির্গুণ ভক্তিপরায়ণ সন্ন্যাসীরাও এই উপদেশ থেকে শিক্ষালাভ করতে পারেন। ঋষভদেব তাঁর শত পুত্রদের এই উপদেশ দিয়েছিলেন, যাঁদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ভরত ছিলেন পরম ভাগবত এবং বৈষ্ণবদের অনুগত। সারা পৃথিবী শাসনের জন্য ভগবান ঋষভদেব তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রকে রাজসিংহাসনে অভিষিক্ত করেছিলেন। তারপর অনিকেত হয়েও শরীরমাত্র পরিগ্রহ করে, উন্মত্তের মতো দিগম্বর ও বিমুক্ত কেশ হয়ে, আহবনীয় অগ্নিকে নিজের মধ্যে স্থাপন করে তিনি ব্রহ্মাবর্ত থেকে পরিব্রজে গমন করলেন।”
“ভগবান ঋষভদেব অবধূত বেশ ধারণ করে মানব সমাজের মধ্যে জড়, অন্ধ, মূক, বধির ও পিশাচের মতো বিচরণ করতেন। মনুষ যদিও তাঁকে সেই সমস্ত নামে সম্ভাষণ করত, তবুও তিনি মৌনাবলম্বন করে, কারোর সঙ্গে বাক্যালাপ করতেন না। ঋষভদেব নগরী, গ্রাম, খনি, কৃষিক্ষেত্র, উপত্যকা, উদ্যান, সেনানিবাস, গোনিবাস, গোপপল্লী, যাত্রীনিবাস, পর্বত, অরণ্য, আশ্রম ইত্যাদি স্থানে ভ্রমন করতে লাগলেন। তাঁর ভ্রমণের সময় মাছিরা যেমন বনহস্তীকে ঘিরে উত্যক্ত করে, সেইভাবে দুর্জনেরা ভয় প্রদর্শন, তাড়ন, গায়ে প্রস্রাব ও থুতু পরিত্যাগ, পাথর, বিষ্ঠা ও ধুলি নিক্ষেপ, অধোবায়ু ত্যাগ এবং দুর্বাক্য প্রয়োগ প্রভৃতির দ্বারা তাঁকে নানাভাবে ক্লেশ প্রদান করলেও তিনি সেই সমস্ত গ্রাহ্য করতেন না। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, জড় শরীরের পরিণতিই তাই। তিনি চিন্ময় স্তরে স্বমহিমায় অধিষ্ঠিত ছিলেন, তাই তিনি এই সমস্ত অবমাননা গ্রাহ্য করতেন না। পক্ষান্তরে বলা যায় যে, তিনি চিৎ এবং অচিৎ-এর পার্থক্য সম্পূর্ণরূপে হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন এবং তাই তাঁর কোন রকম দেহাত্মবুদ্ধি ছিল না। এইভাবে কারোর প্রতি ক্রুদ্ধ না হয়ে একাকী সারা পৃথিবী পর্যটন করতে লাগলেন।”
“ভগবান ঋষভদেবের কর, চরণ এবং বক্ষস্থল ছিল অত্যন্ত দীর্ঘ। তাঁর স্কন্ধদ্বয়, মুখমণ্ডল প্রভৃতি অবয়ব অত্যন্ত সুকোমল এবং সুগঠিত ছিল। তাঁর মুখমণ্ডল স্বভাবসিদ্ধ হাসিতে নিরন্তর শোভিত ছিল। তাঁর নয়নযুগল ছিল প্রভাতের শিশিরসিক্ত নবীন পদ্মফুলের পাপড়ির মতো স্নিগ্ধ এবং অরুণ বর্ণ। তাঁর চোখের তারা এত মনোহর ছিল যে, তা দর্শকের সমস্ত সন্তাপ হরণ করত। তাঁর কপাল, কর্ণ, কন্ঠ, নাক এবং অন্য সমস্ত অবয়ব অত্যন্ত সুন্দর ছিল। তাঁর মধুর হাসি সর্বদা তাঁর মুখকে অধিকতর সৌন্দর্যে মণ্ডিত করত। তা এতই সুন্দর ছিল যে, বিবাহিতা রমণীদের হৃদয়ও তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হত। তারা যেন কামবাণে জর্জরিত হতেন। তাঁর মাথা জুড়ে ছিল কুঞ্চিত জটাযুক্ত পিঙ্গল বর্ণ কেশ। তাঁর অবিন্যস্ত চুল, মলিন শরীর দেখে তাঁকে পিশাচগ্রস্ত বলে মনে হত।”
“ভগবান ঋষভদেব যখন দেখলেন যে, জনসাধারণ তাঁর যোগ সাধনের প্রতিবন্ধকতা করছে, তখন তিনি তার প্রতিকারের জন্য আজগর বৃত্তি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি একস্থানে শয়ন করেই আহার, পান এবং মল-মূত্র পরিত্যাগ করতেন এবং সেখানেই অবলুন্ঠন করতেন। তার ফলে তাঁর শরীর তাঁর নিজের বিষ্ঠা এবং মূত্রে লিপ্ত হয়েছিল, যাতে বিরোধী দুর্জনেরা এসে তাঁকে বিরক্ত না করে। যেহেতু ঋষভদেব সেই অবস্থায় ছিলেন, তাই মানুষ আর তাঁকে বিরক্ত করেনি। কিন্তু তাঁর মল-মূত্রে কোন দুর্গন্ধ ছিল না। পক্ষান্তরে, তাঁর মল-মূত্র এতই সুগন্ধিত ছিল যে, তার সৌরভে চতুর্দিকে দশ যোজন পর্যন্ত স্থান সুরভিত হয়েছিল। এইভাবে ঋষভদেব গাভী, মৃগ এবং কাকের বৃত্তি অনুগমন করেছিলেন। কখনও গমন করে, কখনও বা একস্থানে অবস্থান করে, কখনও উপবেশন করে এবং কখনও শয়ন করে তিনি গাভী, মৃগ ও কাকের মতো আচরণ করে পান, ভোজন ও মল-মূত্রাদি পরিত্যাগ করতেন। হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, ভগবান ঋষভদেব যোগীদের আচরণ প্রদর্শন করার জন্যই এইভাবে বিবিধ যোগের অনুষ্ঠান করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলের মুক্তির অধীশ্বর এবং মুক্তির আনন্দ থেকেও শত-সহস্র গুণ অধিক চিন্ময় আনন্দে তিনি মগ্ন ছিলেন। বাসুদেব কৃষ্ণই হচ্ছেন ঋষভদেবের অংশী, তাই তাঁদের স্বরূপে কোন ভেদ ছিল না এবং তার ফলে ঋষভদেবের অশ্রু, পুলক, কম্পাদি লক্ষণ সমন্বিত ভগবৎ-প্রেম জাগরিত করেছিলেন। তিনি সর্বদাই ভগবানের দিব্য প্রেমে মগ্ন ছিলেন। তার ফলে অন্তরীক্ষে বিচরণ, মনের গতিতে ভ্রমণ, অন্তর্ধান, অন্য দেহে প্রবেশ, দূরদর্শন প্রভৃতি যোগসিদ্ধি যদিও আপনা থেকেই উপস্থিত হয়েছিল, তবুও তিনি সেগুলি ব্যবহার করেননি।”
পঞ্চম অধ্যায়- পুত্রদের প্রতি ভগবান ঋষভদেবের উপদেশ
21 Sep 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, পঞ্চম স্কন্ধ- কর্মবাসনা