শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “নাভির পুত্ররূপে ভগবান যখন জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তখন তাঁর পদতলে ধ্বজ, বজ্র ইত্যাদি ভগবানের চিহ্নসমূহ প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি ছিলেন সর্বভূতে সমদর্শী, শান্ত, জিতেন্দ্রিয়, ঐশ্বর্য সমন্বিত এবং বিষয়-বিতৃষ্ণ। এই সমস্ত গুণাবলীতে বিভূষিত হয়ে নাভিনন্দন প্রতিদিন বর্ধিত হতে লাগলেন। তাই প্রজাবর্গ, ব্রাহ্মণগণ, দেবতাগণ এবং অমাত্যেরা সকলেই অভিলাষ করেছিলেন যে, ঋষভদেব যেন পৃথিবী শাসনে প্রবৃত্ত হন। মহারাজ নাভির পুত্র যখন প্রকট হয়েছিলেন, তখন তাঁর মধ্যে কবিকুলের বর্ণিত সমস্ত উত্তম গুণ- যথা, ভগবৎ-লক্ষণ সমন্বিত সুগঠিত দেহ, তেজ, বীর্য, সৌন্দর্য, কীর্তি, প্রভাব এবং উৎসাহ দেখা গিয়েছিল। তাঁর পিতা এই সমস্ত গুণ দর্শন করে, তাঁকে পরম শ্রেষ্ঠ পুরুষ বলে বিবেচনা করে ‘ঋষভ’ নামে তাঁর নামকরণ করেছিলেন। অত্যন্ত ঐশ্বর্যশালী দেবরাজ ইন্দ্র মহারাজ ঋষভদেবের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হয়েছিলেন। তাই তিনি ভারতবর্ষ নামক ঋষভদেবের ম-লে বৃষ্টি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তখন যোগেশ্বর ভগবান ঋষভদেব ইন্দ্রের অভিপ্রায় বুঝতে পেরে, ঈষৎ হেসে তাঁর যোগমায়ার প্রভাবে তাঁর নিজভূমি অজনাভমণ্ডলকে বৃষ্টির দ্বারা সর্বতোভাবে সিঞ্চিত করেছিলেন। মহারাজ নাভি তাঁর বাসনা অনুসারে শ্রেষ্ঠ পুত্র লাভ করে আনন্দাতিশয্যে বিহ্বলচিত্ত হয়েছিলেন। তিনি অনুরাগভারে গদ্গদ স্বরে তাঁকে ‘হে বৎস, হে তাত’ বলে সম্বোধন করতেন। যোগমায়ার প্রভাবে তিনি এই মনোভাব প্রাপ্ত হয়েছিলেন, যার ফলে তিনি পরম পিতা পরমেশ্বর ভগবানকে তাঁর পুত্র বলে মনে করেছিলেন। ভগবানই স্বেচ্ছাক্রমে তাঁর পুত্র হয়েছিলেন এবং একজন সাধারণ মানুষের মতো সকলের সঙ্গে ব্যবহার করেছিলেন। এইভাবে মহারাজ নাভি তাঁর দিব্য পুত্রকে গভীর স্নেহে লালনপালন করতে লাগলেন এবং তার ফলে তিনি চিন্ময় আনন্দ, হর্ষ এবং ভক্তিতে বিহ্বল হয়েছিলেন। মহারাজ নাভি বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁর পুত্র ঋষভদেব নাগরিকদের, রাজকর্মচারীদের এবং মন্ত্রীদের অত্যন্ত প্রিয়। তাঁর পুত্রের এই জনপ্রিয়তা দর্শন করে, বৈদিক ধর্ম অনুসারে প্রজাপালন করার জন্য, তাঁকে সারা পৃথিবীর সম্রাটরূপে অভিষিক্ত করেছিলেন। সেই জন্য, তিনি তাঁর রাজকার্যে যাঁরা তাকে পরিচালিত করবে, সেই তত্ত্বজ্ঞ ব্রাহ্মণদের হস্তে ঋষভদেবকে সমর্পণ করেছিলেন। তরপর মহারাজ নাভি তাঁর পত্নী মেরুদেবী-সহ বদরিকাশ্রমে গিয়েছিলেন এবং অত্যন্ত প্রসন্নতা এবং নিপুণতা সহকারে তিনি তপস্যায় রত হয়েছিলেন। পূর্ণ সমাধিযোগে তিনি শ্রীকৃষ্ণের অংশ ভগবান নর-নারায়ণের আরাধনা করেছিলেন। তার ফলে যথাসময়ে মহারাজ নাভি বৈকুন্ঠধাম প্রাপ্ত হয়েছিলেন।”
হে মহারাজ পরীক্ষিৎ, মহারাজ নাভির মহিমা কীর্তন করে প্রাচীন ঋষিরা দুটি শ্লোক রচনা করেছেন। তার একটি হচ্ছে- “মহারাজ নাভির মতো সাফল্য কে অর্জন করতে পারে? তাঁর মতো কার্যকলাপ কে করতে পারে? তাঁর ভক্তির বশে আকৃষ্ট হয়ে ভগবান তাঁর পুত্রত্ব বরণ করেছিলেন।” (দ্বিতীয় শ্লোকটি হচ্ছে) “মহারাজ নাভির থেকে ব্রাহ্মাণদের শ্রেষ্ঠ পূজক (ভক্ত) আর কে আছে? কারণ তিনি যোগ্য ব্রাহ্মণদের পূজা করে তাঁদের পূর্ণরূপে সন্তুষ্ট করেছিলেন এবং সেই ব্রাহ্মণেরা তখন তাঁদের ব্রহ্মণ্যোচিত তেজের দ্বারা মহারাজ নাাভির সমক্ষে পরমেশ্বর ভগবান নারায়ণকে প্রত্যক্ষভাবে দর্শন করিয়েছিলেন।” মহারাজ নাভি বদরিকাশ্রমে প্রস্থান করলে, ভগবান ঋষভদেব তাঁর রাজ্যকে তাঁর কর্মানুষ্ঠানের ক্ষেত্র বলে মনে করেছিলেন। তারপর স্বয়ং আচরণ করে জীবকে শিক্ষা প্রদান করার জন্য প্রথমে গুরুকুলে বাস করেছিলেন এবং গুরুর নির্দেশ অনুসারে ব্রহ্মচর্য পালন করে গৃহস্থদের কর্তব্য শিক্ষা দিয়েছিলেন। তাঁর শিক্ষা সমাপ্ত হওয়ার পর, তিনি গুরুদক্ষিণ প্রদান করে গৃহস্থ-আশ্রমে প্রবেশ করেছিলেন। তিনি জয়ন্তী নামক পত্নীর পাণিগ্রহণ করে, তাঁর মাধ্যমে আত্মসদৃশ শত পুত্র উৎপাদন করেছিলেন। তাঁর পত্নী জয়ন্তীকে দেবরাজ ইন্দ্র তাঁকে দান করেছিলেন। ঋষভদেব এবং জয়ন্তী শ্রুতি এবং স্মৃতি শাস্ত্রের দ্বারা নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান পালন করে, গৃহস্থ জীবনের এক আদর্শ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। ঋষভদেবের শত পুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ভরত ছিলেন শ্রেষ্ঠ গুণসম্পন্ন মহান ভগবদ্ভক্ত। তাঁরই নাম অনুসারে এই বর্ষকে লোকে ভারতবর্ষ বলে। ভরতের কনিষ্ঠ আরও নিরানব্বই জন ভ্রাতা ছিল। তাঁদের মধ্যে কুশাবর্ত, ইলাবর্ত, ব্রহ্মাবর্ত, মলয়, কেতু, ভদ্রসেন, ইন্দ্রস্পৃক্, বিদর্ভ এবং কীকট- এই নয় জন জ্যেষ্ঠ। তাঁর পরবর্তী কবি, হবি, অন্তরীক্ষ, প্রবুদ্ধ, পিপ্পলায়ন, আবির্হোত্র, দ্রুমিল, চমস ও করভাজন- এই নয় জন মহাভাগবত। তাঁরা ছিলেন শ্রীমদ্ভাগবতের মহান প্রচারক। পরমেশ্বর ভগবান বাসুদেবের প্রতি সুদৃঢ় ভক্তির জন্য তাঁরা মহিমান্বিত। তাই তাঁরা অতি উন্নত স্তরে অধিষ্ঠিত। চিত্তের শান্তি বিধানকারী তাঁদের সেই সুন্দর চরিত্র আমি (শুকদেব গোস্বামী) পরে (একাদশ স্কন্ধে) বসুদেব ও নারদ সংবাদের বর্ণনা করব। ঋষভদেব ও জয়ন্তীর উপরোক্ত ঊনবিংশতি পুত্রের কনিষ্ঠ আরও একাশি জন পুত্র ছিল। তাঁদের পিতার আদেশ অনুসারে, তারা অত্যন্ত বিনীত, বেদনিপুণ, যজ্ঞপরায়ণ এবং সদাচাররত আদর্শ ব্রাহ্মণ হয়েছিলেন।”
“পরমেশ্বর ভগবানের অবতার ঋষভদেব সম্পূর্ণরূপে স্বতন্ত্র ছিলেন কারণ তাঁর রূপ ছিল সচ্চিদানন্দঘন। চার প্রকার ভৌতিক ক্লেশের (জন্ম, মৃত্যু, জরা এবং ব্যাধি) সঙ্গে তাঁর কোন সংস্পর্শ ছিল না। তাঁর কোন রকম জড় আসক্তি ছিল না। তিনি সর্বদা সকলের প্রতি সমদর্শী ছিলেন। তিনি পরদুঃখে দুঃখী ছিলেন এবং সমস্ত জীবের শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। পরম ঈশ্বর বা পরম পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও, তিনি একজন সাধারণ বদ্ধ জীবের মতো আচরণ করতেন। তাই তিনি কঠোর নিষ্ঠা সহকারে বর্ণাশ্রম-ধর্মের অনুশীলন করতেন। কালক্রমে বর্ণাশ্রম-ধর্মের অবহেলা হতে থাকে; তাই তিনি নিজে আচরণ করে, অজ্ঞনাচ্ছন্ন জনসাধারণকে বর্ণাশ্রম-ধর্ম আচরণের শিক্ষা দান করেন। এইভাবে তিনি জনসাধারণকে ধর্ম, অর্থ, যশ, পুত্র-কন্যা, জড় সুখ এবং অবশেষে নিত্য জীবন লাভ করার শিক্ষা প্রদান করেন। তাঁর উপদেশের দ্বারা তিনি মানুষদের শিক্ষা দিয়েছিলেন, কিভাবে গৃহস্থ আশ্রমে থেকেও বর্ণাশ্রম-ধর্ম অনুশীলন করার ফলে সিদ্ধি লাভ করা যায়। মহৎ ব্যক্তিরা যেভাবে আচরণ করেন, সাধারণ মানুষ তা অনুসরণ করে। যদিও ঋষভদেব সমস্ত ধর্ম প্রতিপাদক বৈদিক রহস্য স্বয়ংই অবগত ছিলেন, তবুও তিনি নিজেকে একজন ক্ষত্রিয় বলে মনে করে, ব্রাহ্মণদের নির্দেশ অনুসারে শম, দম, তিতিক্ষাদি সদ্গুণের অনুশীলন করেছিলেন। এইভাবে তিনি বর্ণাশ্রম-ধর্ম অনুসারে রাজ্য শাসন করেছিলেন, যেই প্রথায় ব্রাহ্মণ ক্ষয়িদের উপদেশ দেন এবং ক্ষত্রিয়-শাসক বৈশ্য ও শূদ্রের মাধ্যমে রাজ্য পরিচালনা করেন। ভগবান ঋষভদেব শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে সর্ববিধ যজ্ঞের দ্বারা এক শতবার যজ্ঞেশ্বর বিষ্ণুর আরাধনা করেছিলেন। তাঁর সেই সমস্ত যজ্ঞ উপযুক্ত দ্রব্যে সমৃদ্ধ ছিল। যৌবন এবং শ্রদ্ধা সমন্বিত ঋত্বিকদের দ্বারা পুণ্যস্থানে ও শ্রেষ্ঠকালে সেগুলি সম্পন্ন হয়েছিল। এইভাবে ভগবান বিষ্ণু প্রসন্ন হয়েছিলেন এবং তাঁর প্রসাদ সমস্ত দেবতাদের নিবেদন করা হয়েছিল। এইভাবে সেই অনুষ্ঠান এবং উৎসব সর্বতোভাবে সফল হয়েছিল। কেউই আকাশকুসুম আকাঙ্ক্ষা করে না, কারণ সকলেই ভালভাবে জানে যে, তার কোন অস্তিত্ব নেই। ভগবান ঋষভদেব যখন ভারতবর্ষ শাসন করছিলেন, তখন একজন সাধারণ মানুষও কোন সময়ে অথবা কোনভাবে কোন কিছুর আকাক্সক্ষা করত না। অর্থাৎ সকলেই পূর্ণরূপে প্রসন্ন ছিল এবং তাই কারোরই কোন কিছু চাওয়ার প্রয়োজন ছিল না। সকলেই রাজার প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিল এবং যেহেতু তাদের এই স্নেহ সর্বদা বর্ধিত হচ্ছিল, তাই তাদের আর অন্য কোন কামনা ছিল না। কোন এক সময় ভগবান ঋষভদেব ভ্রমণ করতে করতে ব্রহ্মাবর্তে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেখানে শ্রেষ্ঠ মহর্ষিদের সভায় তাঁর পুত্রেরা অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে ব্রহ্মর্ষিদের উপদেশ শ্রবণ করেছিলেন। সেই সভায় সমস্ত প্রজাদের সম্মুখে ঋষভদেব তাঁর পুত্রদের শিক্ষা দান করেছিলেন, যদিও তাঁরা ছিলেন সংযতচিত্ত এবং প্রণয়-বিনয়াদি গুণান্বিত। তিনি তাঁদের উপদেশ দিয়েছিলেন যাতে ভবিষ্যতে তাঁরা খুব ভালভাবে পৃথিবী শাসন করতে পারেন।”
চতুর্থ অধ্যায়- ভগবান ঋষভদেবের চরিত্রকথা
17 Sep 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, পঞ্চম স্কন্ধ- কর্মবাসনা