তৃতীয় অধ্যায়- মহারাজ নাভির পত্নী মেরুদেবীর গর্ভে ঋষভদেবের আবির্ভাব

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “আগ্নীধ্রের পুত্র মহারাজ নাভি পুত্র লাভের বাসনা করেছিলেন এবং তাই তিনি সমাহিত চিত্তে যজ্ঞেশ্বর বিষ্ণুর আরাধনা করেছিলেন। মহারাজ নাভির পত্নী পুত্রহীনা মেরুদেবীও তাঁর পতির সঙ্গে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর আরাধনা করেছিলেন। যজ্ঞে ভগবানের কৃপা লাভ করার জন্য সাতটি দিব্য সাধন রয়েছে- (১) মূল্যবান বস্তু বা আহার্য নিবেদন; (২) দেশ বা স্থান অনুসারে কার্য করা; (৩) কাল বা সময় অনুসারে কার্য করা; (৪) মন্ত্র উচ্চারণ; (৫) ঋত্বিকবরণ; (৬) দক্ষিণা দান এবং (৭)বিধি পালন। কিন্তু এই সমস্ত উপায়ের দ্বারা সর্বদা ভগবানকে পাওয়া যায় না। কিন্তু ভগবান ভক্তবৎসল, তাই তাঁর ভক্ত মহারাজ নাভি যখন শুদ্ধ এবং নির্মল চিত্তে প্রবর্গ্য নামক যজ্ঞ অনুষ্ঠান করে গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তি সহকারে ভগবানের আরাধনা এবং স্তব করেছিলেন, তখন পরম দয়ালু পরমেশ্বর ভগবান তাঁর ভক্তবাৎসল্য-হেতু, তাঁর অপরাজিত পরম আকর্ষণীয় চতুর্ভুজ মূর্তিতে মহারাজ নাভির সম্মুখে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এইভাবে তাঁর ভক্তের বাসনা পূর্ণ করার জন্য, পরমেশ্বর ভগবান তাঁর অপূর্ব সুন্দর রূপ নিয়ে তাঁর ভক্তের সম্মুখে আবির্ভূত হয়েছিলেন। ভগবানের এই রূপ ভক্তের মন এবং নয়নের আনন্দ প্রদান করে।”
“ভগবান শ্রীবিষ্ণু তাঁর চতুর্ভুজ রূপে রাজার সম্মুখে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি তেজোময় পুরুষোত্তম রূপে প্রকাশিত হয়েছিলেন। তাঁর কটিদেশ পীত পট্টবস্ত্রে বেষ্টিত ছিল, বক্ষস্থলে শ্রীবৎস চিহ্ন শোভা বিস্তার করছিল, তাঁর চার হাতে ছিল শঙ্খ, পদ্ম, চক্র ও গদা এবং তাঁর গলদেশে বনফুলের মালা ও কৌস্তভ মণি শোভা পাচ্ছিল। মুকুট, কুণ্ডল, বলয়, কটিসূত্র, মুক্তাহার, কেয়ূর ও নূপুর আদি উজ্জ্বল রত্নখচিত অঙ্গভূষণে তিনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে সজ্জিত ছিলেন। দরিদ্র ব্যক্তি যেমন অকস্মাৎ প্রচুর ধনরাশি লাভ করে অবর্ণনীয় আনন্দ অনুভব করে, মহারাজ নাভি, তাঁর পুরোহিত এবং পার্ষদগণও ভগবানকে তাঁদের সম্মুখে উপস্থিত দেখে, সেই প্রকার আনন্দ অনুভব করেছিলেন। তাঁরা গভীর শ্রদ্ধা সহকারে অবনত মস্তকে পূজার উপকরণ নিবেদন করে তাঁর আরাধনা করেছিলেন।”
ঋত্বিকগণ ভগবানের স্তুতি করে বললেন- “হে পূজ্যতম, আমরা আপনার ভৃত্য। যদিও আপনি পরিপূর্ণ, তবুও দয়া করে আপনার অহৈতুকী কৃপার প্রভাবে, আপনার নিত্যদাস আমাদের যৎকিঞ্চিত সেবা গ্রহণ করুন। আমরা আপনার দিব্যরূপ সম্বন্ধে বাস্তবিকই অবগত নই, কিন্তু বৈদিক শাস্ত্র এবং আচার্যদের শিক্ষা অনুসারে আমরা কেবল বারবার আপনাকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। বিষয়াসক্ত জীবেরা জড়া প্রকৃতির গুণের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত এবং তাই তারা কখনও পূর্ণ নয়, কিন্তু আপনি সমস্ত জড় ধারাণার অতীত। আপনার নাম, রূপ, গুণ- সবই চিন্ময় এবং ব্যবহারিক জ্ঞানের অতীত। বাস্তবিকপক্ষে, কে আপনাকে জানতে পারে? জড় জগতে আমরা কেবল জড় নাম এবং গুণই অনুভব করতে পারি। পরম পুরুষ আপনাকে সশ্রদ্ধ প্রণতি এবং প্রার্থনা নিবেদন করা ছাড়া আমাদের আর কোন সামর্থ্য নেই। আপনার সর্ব মঙ্গলময় দিব্য গুণাবলীর কীর্তন সমগ্র মানব-জাতির সমস্ত পাপ নিরসন করতে পারে। আপনার সেই মহিমা কীর্তনই আমাদের পক্ষে সব চাইতে পবিত্র কর্তব্য এবং তার ফলে আমরা আপনার অলৌকিক স্থিতির অংশ মাত্র জানতে পারব।”
“হে পরমেশ্বর ভগবান, আপনি সর্বতোভাবে পূর্ণ। আপনার ভক্ত যখন বাষ্প-গদ্‌গদ স্বরে আপনার স্তুতি করেন এবং অনুরাগ ভরে জল, শুদ্ধ পল্লব, তুলসী ও দূর্বাঙ্কুর দ্বারা আপনার পূজা সম্পাদন করেন, তখন আপনি নিশ্চয়ই সেই পূজার দ্বারা বিশেষভাবে সন্তুষ্ট হন। আমরা বহু উপচার সহকারে আপনার পূজা করেছি এবং আপনার উদ্দেশ্যে যজ্ঞ করেছি, কিন্তু আমাদের মনে হয় যে, আপনার প্রসন্নতা বিধানের জন্য এত সমস্ত আয়োজনের কোন প্রয়োজন নেই। আপনার মধ্যে সমস্ত পুরুষার্থ সাক্ষাৎভাবে, স্বতঃসিদ্ধরূপে, অপ্রতিহত গতিতে এবং প্রচুরভাবে প্রতিক্ষণই উৎপন্ন হচ্ছে। সেই অশেষ পুরুষার্থরূপ আনন্দই আপনার স্বরূপ। কিন্তু, হে ভগবান, আমরা নিরন্তর জড় সুখভোগের বাসনা করছি। এই সমস্ত যজ্ঞের আপনার কোন প্রয়োজন নেই, কিন্তু আপনার আশীর্বাদে যাতে আমাদের জড়সুখ ভোগ হয়, সেই জন্যই প্রকৃতপক্ষে এই সমস্ত যজ্ঞের অনুষ্ঠান হয়। আমাদের সকাম কর্মের উদ্দেশ্যেই এই সমস্ত যজ্ঞ অনুষ্ঠান হয়, আপনার সেগুলিতে প্রকৃতপক্ষে কোন প্রয়োজন নেই। হে ভগবান, আমরা ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মোক্ষ লাভের উপায় সম্বন্ধে সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞ, কারণ জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য যে কি তা আমরা জানি না। আপনি যেন স্বয়ং পূজা গ্রহণ করবার জন্য আমাদের সম্মুখে উপস্থিত হয়েছেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমাদের দর্শন দান করবার জন্যই আপনি এসেছেন। আপনি আপনার অসীম করুণাবশত অপবর্গ নামক স্বীয় মাহাত্ম্য প্রদান করার জন্য, আমাদের অজ্ঞতাজনিত কারণে যথাযথভাবে পূজিত না হয়েও এখানে এসেছেন। হে পূজ্যতম, আপনি সমস্ত বরদাতাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং আমাদের বর প্রদান করবার জন্যই আপনি মহারাজ নাভির যজ্ঞস্থলে আবির্ভূত হয়েছেন। আপনি যেহেতু আমাদের নয়নপথের পথিক হয়েছেন, সেটিই আমাদের পক্ষে পরম বরস্বরূপ। হে ভগবান, মুনি-ঋষিগণ নিরন্তর আপনার গুণগান করেন। বৈরাগ্যের দ্বারা শাণিত জ্ঞানানলে তাঁদের হৃদয়ের মলরাশি বিধ্বংস হয়েছে। তার ফলে তাঁরা আত্মারাম হয়েছেন এবং আপনারই স্বভাব প্রাপ্ত হয়েছেন। তাঁরা যদিও আপনার মহিমা কীর্তন করে দিব্য আনন্দ অনুভব করেন, তবুও তাঁদের পক্ষেও আপনার দর্শন দুর্লভ। হে ভগবান, আমরা বিপথগামী, ক্ষুধার্ত, পতিত, অজ্ঞানাচ্ছন্ন, দুরবস্থাগ্রস্ত, পীড়িত এবং মৃত্যুর সময়ে প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার ফলে, আপনার নাম, রূপ ও গুণাবলী স্মরণ করতে সক্ষম নাও হতে পারি। তাই আমরা আপনার কাছে প্রার্থনা করছি, হে ভক্তবৎসল ভগবান, আপনার যে দিব্য নাম, গুণ এবং লীলাসমূহ সমস্ত পাপ থেকে মানুষকে মুক্ত করতে পারে, তা স্মরণ করতে আপনি আমাদের সাহায্য করুন। হে ভগবান, এই মহারাজ নাভি আপনার মতো একটি পুত্র লাভ করাকেই তাঁর জীবনের চরম লক্ষ্য বলে মনে করেছেন। হে ভগবান, দরিদ্র ব্যক্তি যেমন মহা ধনবান ব্যক্তির কাছে গিয়ে কেবল একটু শস্যকণা ভিক্ষা করে, তেমনই স্বর্গ ও অপবর্গ প্রদানে সক্ষম আপনার কাছে মহারাজ নাভি কেবল একটি পুত্র লাভের আকাক্সক্ষা করছেন। হে ভগবান, মহাজনের চরণ সেবা না করে কোন্ পুরুষই বা এই সংসারে আপনার মায়ার দ্বারা মোহিতচিত্ত, বশীভূত এবং বিষয়-বিষের বেগে আচ্ছাদিত না হয়েছেন? আপনার মায়া দুর্জয়া। তার গতি কেউই লক্ষ্য করতে পারে না অথবা কেউই বলতে পারে না কিভাবে তিনি কার্য করেন। হে ভগবান, আপনি বহু অদ্ভুত কার্য করেন। এই মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠানে আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্যে হচ্ছে পুত্র লাভ করা; তাই আমাদের বুদ্ধি মোটেই তীক্ষ্ণ নয়। জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে আমরা অভিজ্ঞ নই। জড় উদ্দেশ্যে সাধনের জন্য এই তুচ্ছ যজ্ঞে আপনাকে আহ্বান করে আমরা নিশ্চয়ই আপনার শ্রীপাদপদ্মে মহা অপরাধ করেছি। তাই, হে ভগবান, আপনার সমদর্শিতা গুণে কৃপাপূর্বক আমাদের ক্ষমা করুন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “ভারতবর্ষের অধিপতি নাভির সম্মানিত ঋত্বিকেরা এইভাবে গদ্যাত্মক স্তোত্রের দ্বারা দেবশ্রেষ্ঠ ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে বন্দনা নিবেদন করলেন। দেবশ্রেষ্ঠ, পরম ঈশ্বর ভগবান তখন তাঁদের প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে বলেছিলেন- হে মহর্ষিগণ, আপনাদের স্তবে আমি প্রসন্ন হয়েছি। আপনারা সকলেই সত্যবাক। আপনারা প্রার্থনা করেছেন যে, মহারাজ নাভির যেন আমার মতো পুত্র হয়। কিন্তু আমি যেহেতু অদ্বিতীয় পুরুষ এবং কেউই আমার সমতুল্য নয়, তাই আমার মতো আর কাউকে পাওয়া সম্ভব নয়। যাই হোক, যেহেতু আপনারা যোগ্য ব্রাহ্মণ, তাই আপনাদের বচন মিথ্যা হওয়া উচিত নয়। ব্রাহ্মণোচিত গুণাবলী সমন্বিত ব্রাহ্মণদের আমি আমার মুখ বলে মনে করি। যেহেতু আমার তুল্য কেউ নেই, তাই আমিই আমার অংশ-কলার দ্বারা আগ্নীধ্রপুত্র মহারাজ নাভির পত্নী মেরুদেবীর গর্ভে আবির্ভূত হব। এই কথা বলে ভগবান অন্তর্হিত হয়েছিলেন। মহারাজ নাভির পত্নী মেরুদেবী তাঁর পতির পাশেই বসে ছিলেন, তাই তিনি ভগবানের সমস্ত কথাই শুনতে পেয়েছিলেন। হে বিষ্ণুদত্ত পরীক্ষিৎ মহারাজ, সেই যজ্ঞের মহর্ষিদের প্রতি ভগবান প্রসন্ন হয়েছিলেন। তাই তিনি ব্রহ্মাচারী, সন্ন্যাসী, বানপ্রস্থ এবং যাজ্ঞিক গৃহস্থদের নিজে আচরণ করে ধর্ম অনুষ্ঠানের তত্ত্ব শিক্ষা দেওয়ার জন্য এবং মহারাজ নাভির বাসনা পূর্ণ করার জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন। সেই জন্য তিনি তাঁর গুণাতীত চিন্ময় স্বরূপে মেরুদেবীর পুত্ররূপে আবির্ভূত হন।”

Leave a Reply

September 2025
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  

Blog Stats

  • 140,943 hits