শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “পিতা মহারাজ প্রিয়ব্রত পারমার্থিক পথ অবলম্বন করে তপস্যা করার জন্য যখন গৃহত্যাগ করেছিলেন, তখন মহারাজ আগ্নীধ্র তাঁর পিতার আজ্ঞা অনুসারে জম্বুদ্বীপের শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন। কঠোর নিষ্ঠা সহকারে ধর্মীয় অনুশাসন পালন করে, তিনি জম্বুদ্বীপের অধিবাসীদের পুত্রবৎ পালন করেছিলেন। সুযোগ্য পুত্র লাভ করে পিতৃলোকবাসী হওয়ার বাসনায়, মহারাজ আগ্নীধ্র এক সময় সুরবনিতাদের ক্রীড়াস্থল মন্দর পর্বতের উপত্যকায় পুষ্প ও অন্যান্য পূজার উপকরণ সংগ্রহ করে তপস্যা পরায়ণ হয়ে, একাগ্র চিত্তে জড় সৃষ্টির অধ্যক্ষ মহা ঐশ্বর্যশালী ব্রহ্মার আরাধনায় প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। আদি পুরুষ ঐশ্বর্যশালী ব্রহ্মা আগ্নীধ্রের মনোবাসনা জানতে পেরে, তাঁর সভার শ্রেষ্ঠ অপ্সরা পূর্বচিত্তিকে রাজার কাছে পাঠিয়েছিলেন। যে সুন্দর উপবনে রাজা তপস্যা করছিলেন এবং আরাধনা করছিলেন, ব্রহ্মা কর্তৃক প্রেরিত অপ্সরা সেখানে বিচরণ করতে লাগলেন। তপোবনটি ঘন সন্নিবিষ্ট শ্যামল তরুরাজি এবং স্বর্ণাভ লতিকা সমন্বিত হওয়ায় অত্যন্ত সুন্দর ছিল। সেই বৃক্ষের উপর ময়ুরাদি স্থল-বিহঙ্গম কূজন করছিল এবং সরোবরে জলকুক্কুট, কারণ্ডব, কলহংসাদি জলচর পক্ষীগণও মধুর রব করছিল। এইভাবে শ্যামল বনানী, নির্মল জল, প্রস্ফূটিত কমল এবং বিভিন্ন পক্ষীর কূজনে সেই তপোবনটি অপূর্ব সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়েছিল। পূর্বচিত্তির সুন্দর গমনে শৃঙ্গার-লক্ষণ শোভা পাচ্ছিল এবং তাঁর প্রতি পদবিক্ষেপে নূপুরের মনোহর রুনুঝুনু ধ্বনি হচ্ছিল। রাজকুমার আগ্নীধ্র যদিও অর্ধনিমীলিত নেত্রে যোগ অভ্যাস করে ইন্দ্রিয় সংযম করছিলেন, তবুও তিনি স্বীয় কমলসদৃশ নয়ন-যুগলের দ্বারা তাঁকে দর্শন করলেন এবং তাঁর নূপুরের মধুর কিঙ্কিণী শ্রবণপূর্বক তাঁর চক্ষু ঈষৎ উন্মীলিত করে তিনি অতি নিকটে তাঁকে দেখতে পেলেন। সেই অপ্সরা মধুকরীর মতো পুষ্পসমূহের ঘ্রাণ গ্রহণ করছিলেন। দেবতা এবং মানুষদের মন এবং নয়নের আনন্দ প্রদানকারী তাঁর গতি, বিহার, লজ্জা ও বিনয়ান্বিতা দৃষ্টি, সুমধুর স্বর, বাক্য এবং নেত্রাদি অবয়বসমূহ যেন মানুষদের মনে কুসুম-আয়ুধ কন্দর্পের প্রবেশদ্বার করে দিচ্ছিল। তিনি যখন কথা বলছিলেন, তখন মনে হচ্ছিন যেন তাঁর মুখ থেকে অমৃত নিঃসৃত হচ্ছে। তিনি যখন শ্বাস ত্যাগ করছিলেন, তখন তাঁর নিঃশ্বাসের গন্ধে উন্মত্ত হয়ে মৌমাছিরা তাঁর সুন্দর নয়ন-কমলের চারপাশে উড়ছিল। তার ফলে সেই কামিনী ভয়ে ব্যাকুলা হয়ে দ্রুত পদবিক্ষেপ করায় তাঁর স্তন-কলস এমনভাবে কম্পিত হচ্ছিল যে তাঁকে অত্যন্ত সুন্দর ও আকর্ষণীয় লাগছিল। বাস্তবিকপক্ষে তখন মনে হচ্ছিল, তিনি যেন মানুষের হৃদয়ে কামদেবের প্রবেশদ্বার তৈরী করছেন। তাই তাঁকে দেখে সম্পূর্ণভাবে বশীভূত হয়ে, রাজকুমার তাঁকে বলতে লাগলেন।”
রাজকুমার ভ্রান্তিবশত অপ্সরাকে সম্বোধন করে বললেন- “হে মুনিশ্রেষ্ঠ, তুমি কে? তুমি এই পর্বতে কেন এসেছ এবং এখানে কি করতে চাইছ? তুমি কি ভগবানের মায়া? মনে হচ্ছে যেন তুমি দুটি জ্যারহিত ধনুক ধারণ করেছ। সেগুলি ধারণ করার কারণ কি? তুমি কি নিজের জন্য না তোমার সখার জন্য সেগুলি ধারণ করেছ? হয়তো তুমি বনের পশুদের শিকার করার জন্য সেগুলি বহন করছ।”
তারপর আগ্নীধ্র পূর্বচিত্তির কটাক্ষের প্রতি লক্ষ করে বললেন- “হে সখে! তোমার নয়নের চাহনি অতি শক্তিশালী দুটি বাণের মতো। সেই বাণের পক্ষ পদ্মফুলের পাপড়ির মতো। যদিও তাদের শলাকা নেই, তবু তারা অত্যন্ত সুন্দর এবং তাদের অগ্রভাগ অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। তাদের দেখে মনে হয় তারা যেন অত্যন্ত শান্ত এবং তাই আমার মনে হয় যে, সেগুলি কারও প্রতি নিক্ষেপ করা হবে না। তুমি নিশ্চয়ই সেই বাণের দ্বারা কাউকে বিদ্ধ করার জন্য এই অরণ্যে বিচরণ করছ, কিন্তু আমি জানি না কাকে তুমি বিদ্ধ করবে। আমার বুদ্ধি মন্দ এবং আমি তোমার সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারব না। বাস্তবিকপক্ষে বিক্রমে কেউই তোমার সমকক্ষ নয় এবং তাই আমি প্রার্থনা করি, তোমার এই বিক্রম যেন আমার মঙ্গলের নিমিত্তই হয়।”
পূর্বচিত্তির অনুগমনকারী ভ্রমরদের দেখে মহারাজ আগ্নীধ্র বললেন- “হে প্রভু, এই সমস্ত ভ্রমরেরা আপনার শিষ্যের মতো আপনাকে বেষ্টন করে রয়েছে। তারা নিরন্তর সামবেদ ও উপনিষদের মন্ত্র গান করছে এবং এইভাবে তারা আপনার বন্দনা করছে। ঋষিগণ যেভাবে বেদের শাখা ভজনা করেন, তেমনই আপনার শিষ্যরাও আপনার কেশদাম থেকে পতিত পুষ্পবৃষ্টি উপভোগ করছ। হে ব্রাহ্মণ! আমি তোমার নূপুরের কিঙ্কিণীর ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। সেই নূপুরের মধ্যে তিত্তিরী পক্ষী রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। যদিও আমি তাদের দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু আমি তাদের কূজন শুনতে পাছি। তোমার সুন্দর নিতম্ব-মণ্ডল কদম্ব কুসুমের মতো পীত বর্ণ এবং তোমার কটিদেশ বেষ্টন করে রয়েছে অলাতচক্রের মতো মেখলা। তুমি কি তোমার পরিধেয় বস্ত্র ধারণ করতে ভুলে গেছ?”
আগ্নীধ্র তখন পূর্বচিত্তির উন্নত স্তনযুগলের প্রশংসা করে বললেন- “হে ব্রাহ্মণ, তোমার কটিদেশ কৃশ, তবুও তুমি অতি কষ্টে দুটি শৃঙ্গ বহন করছ, যার উপর আমার চক্ষুদ্বয় আকৃষ্ট হয়েছে। সেই দুটি সুন্দর শৃঙ্গের অভ্যন্তরে কি রয়েছে? তুমি তার উপর অরুণবর্ণ সুগন্ধ পঙ্ক লেপন করেছ। হে সুভগ, সেই সুরভিত পঙ্ক যা আমার আশ্রমকে সুরভিত করেছে তা তুমি কোথায় পেলে? হে সুহৃৎতম, তুমি কি দয়া করে আমাকে তোমার বাসস্থান দেখবে? সেখানকার অধিবাসীদের বক্ষঃস্থলের দ্বারা এমন অপূর্ব অবয়ব ধারণ করে যে, তা দর্শনে আমার মতো ব্যক্তির মন ও নয়ন উভয়েই ক্ষুব্ধ হয়। তাদের মধুর বাণী এবং মৃদুমন্দ হাসির কথা বিচার করে আমার মনে হয় যে, তাদের মুখে না জানি কত অমৃত রয়েছে। হে সখে. তোমার দেহ ধারণ করার জন্য তুমি কি আহার কর? কারণ তাম্বূল চর্বণ-জনিত তোমার মুখ থেকে যে সুগন্ধ বিনির্গত হচ্ছে, তার ফলে মনে হয় তুমি সর্বদা বিষ্ণুর ভুক্তাবশিষ্টই গ্রহণ কর। তুমি নিশ্চয়ই বিষ্ণুর অংশসম্ভূত। তোমার মুখমণ্ডল নির্মল সরোবরের মতো সুন্দর। তোমার কর্ণযুগলে যে দুটি রত্নখচিত মকরাকৃতি কুণ্ডল বিরাজ করছে, সেগুলির নেত্র বিষ্ণুর চক্ষের মতো অপলক। তোমার নেত্রযুগল মীনের মতো চঞ্চল। সুতরাং তোমার মুখমণ্ডলরূপ সরোবরে যেন দুটি অনিমেষ মকর এবং চঞ্চল মীন বিহার করছে। তোমার দন্তপঙ্ক্তি রাজহংসের মতো শোভা বিস্তার করছে এবং তোমার কেশকলাপ যেন অলিকুলের মতো তোমার মুখের সৌন্দর্য অনুসরণ করছে। আমার মন ইতিমধ্যেই অস্থির হয়েছে এবং তুমি তোমার করকমলের দ্বারা যে কন্দুকটিকে চালিত করছ তা আমার নয়ন যুগলটিকেও অস্থির করছে। তোমার কুটিল কেশদাম যে আলুলায়িত হয়েছে, তা কি তুমি পুনরায় বন্ধন করবে না? লম্পট পুরুষের মতো পবন তোমার প্রতি আসক্ত হয়ে তোমার কটিবন্ধন হরণ করছে, তাও কি তোমার স্মরণ হচ্ছে না? হে তপোধন, তপস্বীদের তপোবিঘ্নকারক এই রূপ তুমি কোন্ তপস্যার দ্বারা লাভ করেছ? এই কলা তুমি কোথায় শিখেছ? হে সখে, কোন্ তপস্যার দ্বারা তুমি এই সৌন্দর্য লাভ করেছ? আমি চাই যে তুমিও আমার সঙ্গে তপস্যা কর, কারণ ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা হয়তো আমার প্রতি প্রসন্ন হয়ে, আমার ভার্যা হওয়ার জন্য তোমাকে এখানে পাঠিয়েছেন। ব্রাহ্মণদের দ্বারা পূজিত ব্রহ্মা আমার প্রতি অত্যন্ত কৃপাপরবশ হয়ে তোমাকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন এবং তাই তোমার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। তোমার সঙ্গ আমি ত্যাগ করতে চাই না কারণ আমার মন ও নয়ন তোমাতে নিবিষ্ট হয়েছে এবং কোন মতেই আমি তা অপসারিত করতে পারছি না। হে চারুশৃঙ্গিন্, আমি তোমার অনুগত। তোমার যেখানে ইচ্ছা সেখানে আমাকে নিয়ে চল, তোমার সখীগণও অনুকূলা হয়ে আমার অনুগমন করুক।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “মহারাজ আগ্নীধ্র যাঁর বুদ্ধিমত্তা ছিল স্বর্গের দেবতাদের মতো, মনোহর বাক্যের দ্বারা স্ত্রীবশীকরণ বিষয়ে তিনি অত্যন্ত নিপুণ ছিলেন। তিনি তাঁর কামোদ্দীপক বাক্যের দ্বারা দেবকন্যার প্রসন্নতা বিধান করে তাঁর অনুগ্রহ লাভ করেছিলেন। জম্বুদ্বীপের অধিপতি বীরশ্রেষ্ঠ আগ্নীধ্রের বুদ্ধি, বিদ্যা, যৌবন, সৌন্দর্য, ব্যবহার, ঐশ্বর্য এবং ঔদার্যে আকৃষ্ট হয়ে, পূর্বচিত্তি বহু বৎসর ধরে তাঁর সঙ্গে পার্থিব এবং স্বর্গীয় সুখ উপভোগ করেছিলেন। সমস্ত রাজাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মহারাজ আগ্নীধ্র পূর্বচিত্তির গর্ভে নাভি, কিম্পুরুষ, হরিবর্ষ, ইলাবৃত, রম্যক, হিরন্ময়, কুরু, ভদ্রাশ্ব এবং কেতুমাল নামক নয়টি পুত্র উৎপাদন করেছিলেন। পূর্বচিত্তি প্রতি বৎসর এক-একটি করে নয়টি পুত্র প্রসব করেছিলেন, কিন্তু তারা যখন বড় হয়েছিল, তখন তিনি তাদের গৃহে পরিত্যাগ করে, পুনরায় ব্রহ্মার উপাসনা করার জন্য তাঁর কাছে ফিরে গিয়েছিলেন। পূর্বচিত্তির সেই নয়টি পুত্রই মাতার স্তন পান করে স্বাভাবিকভাবেই বলবান ও সুগঠিত শরীর লাভ করেছিলেন। তাঁদের পিতার তাঁদের প্রত্যেককে জম্বুদ্বীপের বিভিন্ন অংশ শাসন করার দায়িত্বভার অর্পণ করেছিলেন। তাঁদের নাম অনুসারে তাঁদের রাজ্যগুলির নামকরণ হয়েছিল। এইভাবে আগ্নীধ্রের পুত্রগণ তাঁদের পিতার কাছ থেকে প্রাপ্ত রাজ্য শাসন করেছিলেন। পূর্বচিত্তির প্রস্থানের পর, রাজা আগ্নীধ্র তাঁর কামবাসনা তৃপ্ত না হওয়ায় সর্বক্ষণ তাঁর কথা চিন্তা করতেন। তাই, বেদোক্ত ফল অনুসারে তিনি তাঁর মৃত্যুর পর, সেই অপ্সরালোকই প্রাপ্ত হয়েছিলেন। সেই লোকে পিতৃগণও আনন্দ ভোগ করেন। তাঁদের পিতার পরলোক প্রাপ্তি হলে, নয়জন ভ্রাতা মেরুদেবী, প্রতিরূপা, উগ্রদংষ্ট্রী, লতা, রম্যা, শ্যামা, নারী, ভদ্রা এবং দেববীতি নামক মেরুর নয়টি কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন।”
দ্বিতীয় অধ্যায়- মহারাজ আগ্নীধ্রের চরিত্রকথা
15 Sep 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, পঞ্চম স্কন্ধ- কর্মবাসনা