প্রথম অধ্যায়- মহারাজ প্রিয়ব্রতের কার্যকলাপ

মহারাজ পরীক্ষিত শুকদের গোস্বামীকে জিজ্ঞাসা করলেন- “হে মহর্ষি! মহারাজ প্রিয়ব্রত ছিলেন আত্মজ্ঞানী পরম ভগবদ্ভক্ত, তিনি কেন গৃহস্থ-আশ্রমে রত হয়েছিলেন? কারণ গৃহই সকাম কর্মের বন্ধনের মূল কারণ এবং মানব-জীবনের পরম উদ্দেশ্য সাধনে মানুষকে অকৃতকার্য করে। হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ? ভগবদ্ভক্তেরা নিশ্চিতভাবে মুক্ত পুরুষ, তাই তাঁদের পক্ষে গৃহের প্রতি এই প্রকার আসক্তি সম্ভব নয়। হে ব্রহ্মর্ষি! যে মহাত্মাগণ পরমেশ্বর ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন, সেই শ্রীপাদপদ্মের ছায়ায় তাঁদের চিত্ত সম্পূর্ণরূপে প্রশান্ত হয়েছে। তাঁদের চেতনা কখনই আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি আসক্ত হতে পারে না। হে মহান ব্রাহ্মণ, মহারাজ প্রিয়ব্রতের মতো ব্যক্তি, যিনি তাঁর পত্নী, সন্তান-সন্তনি এবং গৃহের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত ছিলেন, তাঁর পক্ষে কৃষ্ণভাবনায় সর্বোচ্চ সিদ্ধি লাভ করা কি করে সম্ভব হয়েছিল, সে সম্বন্ধে আমার মহাসংশয় উপস্থিত হয়েছে।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “আপনি যা বলেছেন তা ঠিক। ব্রহ্মাদি মহান ব্যক্তিরা দিব্য শ্লোকের দ্বারা যাঁর বন্দনা করেন, সেই পরমেশ্বর ভগবানের মহিমা মহাভাগবত এবং মুক্ত পরমহংসদের কাছে অত্যন্ত মনোহর। যিনি ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের মকরন্দের প্রতি আসক্ত হয়েছেন এবং যাঁর চিত্ত সর্বদা তাঁর মহিমায় আবিষ্ট, তিনি কখনও কখনও কোন প্রকার প্রতিবন্ধকতার দ্বারা প্রতিহত হলেও, তিনি যে পরম পদ প্রাপ্ত হয়েছেন তা কখনই পরিত্যাগ করেন না।”
“হে রাজন্! রাজপুত্র প্রিয়ব্রত তাঁর গুরুদেব নারদ মুনির শ্রীপাদপদ্মের সেবা করার ফলে, পরম তত্ত্বজ্ঞান লাভ করে পরম ভাগবত হয়েছিলেন। এই উন্নত জ্ঞানের প্রভাবে তিনি সর্বদা আধ্যাত্মিক বিষয়ের আলোচনায় যুক্ত ছিলেন এবং তাঁর চেতনা অন্য কোন বিষয়ে বিক্ষিপ্ত হয়নি। তাঁর পিতা তখন তাঁকে পৃথিবী পালনের দায়িত্বভার গ্রহণ করার আদেশ দেন। তিনি প্রিয়ব্রতকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন যে, শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে সেটিই হচ্ছে তাঁর কর্তব্য। রাজপুত্র প্রিয়ব্রত কিন্তু ভক্তিযোগের অনুশীলনের দ্বারা নিরন্তর ভগবানকে স্মরণ করছিলেন এবং এইভাবে তিনি তাঁর সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলিকে ভগবানের সেবায় যুক্ত করছিলেন। যদিও পিতার আজ্ঞা লঙ্ঘন করা উচিত নয়, তবুও তিনি তা স্বীকার করেননি। তার ফলে তিনি গভীরভাবে বিবেচনা করছিলেন, পৃথিবী পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করলে, তিনি ভগবদ্ভক্তি থেকে বিচ্যুত হবেন কি না।”
“এই ব্রহ্মাণ্ডের আদিদেব এবং পরম শক্তিমান ব্রহ্মা, যিনি সর্বদা ব্রহ্মাণ্ডের সমৃদ্ধি সাধনের জন্য চিন্তাশীল, যিনি সরাসরিভাবে পরমেশ্বর ভগবান থেকে জন্মগ্রহণ করেছেন, যিনি ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টির কারণ সম্বন্ধে অবগত হওয়ার ফলে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের মঙ্গল সাধনে তৎপর, সেই পরম শক্তিমান ব্রহ্মা তাঁর নিজজন এবং মূর্তিমান বেদসমূহের দ্বারা পরিবৃত হয়ে, তাঁর ধাম সত্যলোক থেকে রাজপুত্র প্রিয়ব্রত যেখানে ধ্যান করছিলেন, সেখানে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ব্রহ্মা যখন তাঁর বাহন হংসে উপবিষ্ট হয়ে অবতরণ করছিলেন, তখন সিদ্ধ, গন্ধর্ব, সাধ্য, চারণ, মহর্ষিগণ এবং দেবতারা তাঁদের বিমানে আরোহণ করে আকাশরূপে চাঁদোয়ার নীচে ব্রহ্মাকে সম্বর্ধনা করার জন্য এবং পূজা করার জন্য সমবেত হয়েছিলেন। বিভিন্ন লোকের অধিবাসীদের দ্বারা পূজিত হয়ে, ব্রহ্মা নক্ষত্র পরিবৃত পূর্ণ চন্দ্রের মতো শোভা পাচ্ছিলেন এবং তারপর তাঁর বাহন হংস তাঁকে নিয়ে গন্ধমাদন পর্বতের প্রান্তে উপস্থিত হয়েছিলেন, যেখানে রাজপুত্র প্রিয়ব্রত উপবিষ্ট ছিলেন। নারদ মুনির পিতা ব্রহ্মা এই ব্রহ্মাণ্ডের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি। নারদ মুনি সেই মহান হংসকে দর্শন করা মাত্র, বুঝতে পেরেছিলেন যে ব্রহ্মা এসেছেন। তাই তিনি তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়েছিলেন এবং স্বায়ম্ভুব মনু ও তাঁর পুত্র প্রিয়ব্রত, যাঁকে নারদ মুনি শিক্ষা দিয়েছিলেন, তাঁরাও উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। তারপর তারা কৃতাঞ্জলিপুটে গভীর শ্রদ্ধা সহকারে ব্রহ্মার পূজা করতে শুরু করেছিলেন।”
“হে মহারাজ পরীক্ষিৎ! এইভাবে ব্রহ্মা সত্যলোক থেকে ভূলোকে অবতরণ করলে, নারদ মুনি, রাজপুত্র প্রিয়ব্রত এবং স্বায়ম্ভুব মনু তাঁকে পূজার সামগ্রী নিবেদন করার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন এবং বৈদিক শিষ্টাচার অনুসারে অতি মধুর বাক্যে তাঁর স্তুতি করেছিলেন। তখন এই ব্রহ্মাণ্ডের আদি পুরুষ ব্রহ্মা প্রিয়ব্রতের প্রতি অনুকম্পা অনুভব করেছিলেন এবং প্রসন্ন বদনে তাঁর প্রতি দৃষ্টিপাত করে, তাঁকে বলেছিলেন- হে বৎস প্রিয়ব্রত! আমি তোমাকে যা বলব তা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর। আমাদের ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানের অতীত যে পরমেশ্বর ভগবান, তাঁর প্রতি ঈর্ষাপরায়ন হয়ো না। শিব, তোমার পিতা, মহর্ষি নারদ, আমাদের সকলকেই সেই পরমেশ্বরের আদেশ পালন করতে হয়। আমরা কেউই তাঁর আদেশ লঙ্ঘন করতে পারি না। কোন জীবই কঠোর তপস্যার বলে, উন্নত বৈদিক শিক্ষার বলে, অষ্টাঙ্গ-যোগের প্রভাবে, দৈহিক শক্তির প্রভাবে অথবা বুদ্ধির দ্বারা পরমেশ্বর ভগবানের আদেশ লঙ্ঘন করতে পারে না। এমন কি ধর্মের বলে, অথবা জড় ঐশ্বর্যের প্রভাবে অথবা অন্য কোন উপায়েই, কিংবা স্বীয় শক্তির বলে অথবা অন্যদের সহায্যের বলে, ভগবানের আদেশ অমান্য করা যায় না। ব্রহ্মা থেকে শুরু করে একটি ক্ষুত্র পিপীলিকা পর্যন্ত কারও পক্ষেই ভগবানের আদেশ অমান্য করা সম্ভব নয়। হে প্রিয়ব্রত? ভগবানের নির্দেশে সমস্ত জীবাত্ম জন্ম, মৃত্যু, কর্ম, শোক, মোহ, ভয়, সুখ এবং দুঃখের জন্য বিভিন্ন প্রকার শরীর ধারণ করে। হে বৎস! আমরা সকলেই আমাদের গুণ এবং কর্ম অনুসারে বৈদিক নির্দেশের দ্বারা বর্ণাশ্রম বিভাগে আবদ্ধ। এই বিভাগগুলি অবহেলা করা অত্যন্ত কঠিন, কারণ তা বিজ্ঞানসম্মতভাবে আয়োজন করা হয়েছে। তাই, বলীবর্দ যেমন নাসিকায় রজ্জুবদ্ধ হয়ে চালকের পরিচালনা অনুসারে চালিত হতে বাধ্য হয়, আমাদেরও তেমন বর্ণাশ্রম ধর্মেল কর্তব্য পালন করতে হয়। হে প্রিয়ব্রত! জড়া প্রকৃতির বিভিন্ন গুণের সঙ্গ আমাদের সঙ্গ অনুসারে ভগবান আমাদের বিশেষ শরীর প্রদান করেন এবং সেই অনুসারে আমরা সুখ ও দুঃখ ভোগ করি। তাই অন্ধ যেভাবে চক্ষুষ্মান ব্যক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়, ঠিক সেইভাবে যে অবস্থাতে আমরা রয়েছি, সেই অবস্থাতেই থেকে ভগবানের দ্বারা আমাদের পরিচালিত হওয়া উচিত। মুক্ত হলেও মানুষকে পূর্বকৃত কর্ম অনুসারে দেহ ধারণ করতে হয়। কিন্তি তিনি তখন অভিমানশূণ্য হয়ে, সুপ্তোত্থিত ব্যক্তি যেভাবে স্বপ্নে দৃষ্ট বিষয় স্মরণ করেন, তেমনই তাঁর সুখ এবং দুঃখকে তাঁর পূর্বকৃত কর্মের ফল বলে মনে করেন। এইভাবে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকেন এবং প্রকৃতির তিন গুণের বশীভূত হয়ে অন্য আর একটি জড় শরীর প্রাপ্ত হওয়ার জন্য কর্ম করেন না। অজিতেন্দ্রিয় ব্যক্তি যদি বনে বনে বিচরণ করে তবুও তাকে জড় বন্ধনের ভয়ে সর্বদা ভীত থাকতে হয়, কারণ সে তার মন এবং জ্ঞানেন্দ্রিয়- এই ছয়জন সতীনের সঙ্গে সর্বদা বিরাজ করে। কিন্তু গৃহস্থ-আশ্রমও আত্মতৃপ্ত জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তির কোন ক্ষতিসাধন করতে পারে না। যে ব্যক্তি গৃহস্থ-আশ্রমে অবস্থিত হয়ে সুসংবদ্ধভাবে তাঁর মন এবং পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে জয় করেন, তিনি দুর্গের আশ্রয়ে পরাক্রমশালী শক্রুকে জয়কারী রাজার মতো। যিনি গৃহস্থ-আশ্রমে যথাযথভাবে শিক্ষা লাভ করেছেন এবং যাঁর কামবাসনা ক্ষীণ হয়েছে, তিনি নির্ভয়ে সর্বত্র বিচরণ করতে পারেন।”
“হে প্রিয়ব্রত! পদ্মনাভ শ্রীভগবানের পাদপদ্ম-কোষরূপ দুর্গের আশ্রয় গ্রহণ করে তুমি ছয় ইন্দ্রিয়রূপ শত্রুদের জয় কর। তুমি জড়সুখ ভোগ কর কারণ ভগবান বিশেষভাবে তোমাকে তা করার আদেশ দিয়েছেন। তার ফলে তুমি সর্বদা জড় সঙ্গ থেকে মুক্ত থাকবে এবং তোমার স্বরূপে অবস্থিত হয়ে ভগবানের আদেশ পালন করতে পারবে।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এইভাবে ত্রিভুবনের গুরু ব্রহ্মার দ্বারা পূর্ণরূপে উপদিষ্ট হয়ে, প্রিয়ব্রত তাঁর লঘুতা হেতু তাঁকে প্রণতি নিবেদন করেছিলেন এবং তাঁর সেই আদেশ গভীর শ্রদ্ধা সহকারে পালন করেছিলেন। তারপর মনু ব্রহ্মার সন্তুষ্টি-বিধানের জন্য যথাসাধ্য শ্রদ্ধা সহকারে তাঁর পূজা করেছিলেন। প্রিয়ব্রত এবং নারদও অবিষম অর্থাৎ অক্ষুণ্ন দৃষ্টিতে ব্রহ্মাকে দর্শন করতে লাগলেন। প্রিয়ব্রতকে তাঁর পিতার আদেশ পালনে নিযুক্ত করে ব্রহ্মা তাঁর ধাম সত্যলোকে ফিরে গিয়েছিলেন, যে স্থান মন অথবা বাণীর বর্ণনার অতীত। এইভাবে ব্রহ্মার সহায়তায় স্বায়ম্ভুব মনুর মনোবাসনা পূর্ণ হয়েছিল। দেবর্ষি নারদের অনুমতিক্রমে, তিনি তাঁর পুত্রকে নিখিল ভূমণ্ডল পালন এবং রক্ষা করার জন্য রাজকীয় দায়িত্বভার অর্পণ করেছিলেন। এইভাবে তিনি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর বিষয়রূপ বিষের সমুদ্র থেকে উদ্ধার লাভ করেছিলেন। পরমেশ্বর ভগবানের আদেশ অনুসারে, মহারাজ প্রিয়ব্রত জাগতিক কার্যকলাপে পূর্ণরূপে যুক্ত হওয়া স্বত্ত্বেও সর্বদা সমস্ত জড় বন্ধন থেকে মুক্তির কারণ-স্বরূপ ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। মহারাজ প্রিয়ব্রত যদিও সমস্ত জড় কলুষ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ছিলেন, তবুও মহৎ ব্যক্তিদের মান বৃদ্ধি করার জন্য তিনি এই জড় জগৎ শাসন করেছিলেন। তারপর মহারাজ প্রিয়ব্রত বিশ্বকর্মা নামক প্রজাপতির কন্যা বর্হিষ্মতীকে বিবাহ করেন। তাঁর গর্ভে তিনি দশটি পুত্র উৎপন্ন করেন, যাঁরা সৌন্দর্যে, চরিত্রে, উদারতায় এবং অন্যান্য গুণাবলীতে তাঁরই সমান ছিলেন। তাঁর একটি কন্যাও হয়েছিল, যে ছিল সব চাইতে ছোট এবং তার নাম ছিল ঊর্জস্বতী। মহারাজ প্রিয়ব্রতের দশ পুত্রের নাম ছিল আগ্নীধ্র, ইধ্‌মজিহ্ব, যজ্ঞবাহু, মহাবীর, হিরণ্যরেতা, ঘৃতপৃষ্ট, সবন, মেধাতিথি, বীতিহোত্র এবং কবি। অগ্নিদেবের নাম অনুসারে এদের নামকরণ হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে তিনজন- কবি, মহাবীর এবং সবন নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী হয়েছিলেন। এইভাবে জীবনের শুরু থেকেই ব্রহ্মবিদ্যায় পরিনিষ্ঠিত হয়ে, তাঁরা মানব-জীবনের সর্বোচ্চ সিদ্ধি পরমহংস-আশ্রমের ভজনা করেছিলেন। জীবনের শুরু থেকেই সন্ন্যাস আশ্রমে অবস্থিত হয়ে, তাঁরা তিনজন ইন্দ্রিয়ের কার্যকলাপ সম্পূর্ণরূপে সংযত করে পরমহংসত্ব লাভ করেছিলেন তাঁদের চিত্ত সর্বদা পরমেশ্বর ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের ধ্যানে মগ্ন ছিল, যিনি সমস্ত জীবের পরম আশ্রয় হওয়ার ফলে বাসুদেব নামে প্রসিদ্ধ। যারা সংসার ভয়ে ভীত, ভগবান বাসুদেবই হচ্ছেন তাদের একমাত্র আশ্রয়। নিরন্তর তাঁর শ্রীপাদপদ্মের ধ্যান করার ফলে, মহারাজ প্রিয়ব্রতের তিন পুত্র শুদ্ধ ভক্তে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁদের ভক্তির প্রভাবে তাঁরা সকলের হৃদয়ে বিরাজমান পরমাত্মাকে প্রত্যক্ষভাবে দর্শন করতে পারতেন এবং তাঁরা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, তাঁর সঙ্গে তাঁদের গুণগতভাবে কোন পার্থক্য নেই। মহারাজ প্রিয়ব্রতের আরও একজন পত্নী ছিলেন। তাঁর গর্ভে উত্তম, তামস ও রৈবত নামক তিন পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। এঁরা তিনজনই মন্বন্তরের অধিপতি হয়েছিলেন। এইভাবে কবি, মহাবীর, সবন পরমহংস-আশ্রম আশ্রয় করলে, মহামনা প্রিয়ব্রত একাদশ অর্বুদ বৎসর ব্রহ্মাণ্ড শাসন করেছিলেন। তিনি যখন তাঁর অত্যন্ত শক্তিশালী বাহুযুগলের দ্বারা তাঁর ধনুকে শর যোজন করতেন, তখন ধর্মদ্রোহীরা তাঁর ভয়ে পলায়ন করত। এইভাবে পরম বিক্রমে তিনি ব্রহ্মাণ্ড শাসন করেছিলেন। তিনি তাঁর পত্নী বর্হিষ্মতীকে অত্যন্ত ভালবাসতেন এবং দিনে দিনে তাঁদের প্রণয় বর্ধিত হয়েছিল। মহারাণী বর্হিষ্মতী তাঁর স্ত্রীসুলভ বেশভূষা, গমনভঙ্গি, হাস্য, লাস্য এবং কটাক্ষের দ্বারা তাঁর শক্তি বর্ধিত করেছিলেন। এইভাবে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছিল, যেন একজন মহাত্মা হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাঁর পত্নীর প্রেমে মগ্ন হয়ে রয়েছেন। তিনি তাঁর পত্নীর সঙ্গে ঠিক একজন সাধারণ মানুষের মতো আচরণ করতেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন একজন মহাত্মা।”
“এইভাবে ব্রহ্মাণ্ড শাসন করার সময়, মহারাজ প্রিয়ব্রত একবার পরম শক্তিমান সূর্যদেবের কক্ষপথে বিচরণের ব্যাপারে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। নিজের রথে চড়ে সুমেরু পর্বত প্রদক্ষিণ করার সময়, সূর্যদেব সমস্ত গ্রহলোকগুলিকে আলোকিত করেন। কিন্তু, সূর্যদেব যখন পর্বতের উত্তর ভাগ আলোচিত করেন, তখন অবনীতলের দক্ষিণ ভাগ অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে, আবার সূর্য যখন দক্ষিণ ভাগকে আলোকিত করেন, তখন উত্তর ভাগ অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে। এই ব্যবস্থা মহারাজ প্রিয়ব্রতের কাছে অরুচিকর বলে মন হওয়ায়, তিনি রজনীকেও দিবাভাগে পরিণত করতে মনস্থ করেছিলেন। এই অভিপ্রায়ে তিনি তাঁর জ্যোতির্ময় রথে সূর্যদেবের কক্ষপথে পরিভ্রমণ করেছিলেন। তার পক্ষে এই প্রকার অলৌকিক কার্য সম্পাদন করা সম্ভব হয়েছিল, কেননা পরমেশ্বর ভগবানের আরাধনার ফলে তিনি এই প্রকার অলৌকিক শক্তি প্রাপ্ত হয়েছিলেন। প্রিয়ব্রত যখন সূর্যের পিছনে তাঁর রথ চালিয়েছিলেন, তখন তাঁর রথের প্রান্তর দ্বারা যে খাত সৃষ্টি হয়েছিল তা সপ্ত সমুদ্রে পরিণত হয়েছিল এবং ভূমণ্ডল সপ্ত দ্বীপে বিভক্ত হয়েছিল। সেই দ্বীপগুলির নাম জম্বু, প্লক্ষ, শাল্মলি, কুশ, ক্রৌঞ্চ, শাক এবং পুষ্কর। এই সমস্ত দ্বীপের পরিমাণ ক্রমানুসারে পূর্ব পূর্ব দ্বীপ থেকে পরবর্তী দ্বীপ দ্বিগুণ পরিমাণ। এক-একটি দ্বীপ এক-একটি তরল পদার্থের সমুদ্রের দ্বারা বেষ্টিত এবং তার পরে রয়েছে আর একটি দ্বীপ। সেই সপ্ত সমুদ্র যথাক্রমে লবন, ইক্ষু, সুরা, ঘৃত, দুগ্ধ, দধি এবং শুদ্ধ পানীয় জল- এই সপ্তবিধ তরল পদার্থে পূর্ণ। সব কয়টি দ্বীপ এই সমস্ত সমুদ্রের দ্বারা বেষ্টিত রয়েছে এবং সেই দ্বীপসমূহের যেরূপ পরিমাণ, সেই জলধিসমূহের পরিমাণও পর্যায়ক্রমে সেইরূপ। মহারাণী বর্হিষ্মতীর পতি মহারাজ প্রিয়ব্রত তাঁর পুত্র আগ্নীধ্র, ইধ্‌মজিহ্ব, যজ্ঞবাহু, হিরণ্যরেতা, ঘৃতপৃষ্ট, মেধাতিথি ও বীতিহোত্র নামক সপ্ত পুত্রের এক-একজনকে সপ্ত দ্বীপের এক-একটির রাজা করেছিলেন। মহারাজ প্রিয়ব্রত তাঁর কন্যা ঊর্জস্বতীকে শুক্রাচার্যের হস্তে সম্প্রদান করেছিলেন। এই কন্যার গর্ভে দেবযানী নামক শুক্রাচার্যের একটি কন্যা জন্মগ্রহণ করেছিল।”
“হে রাজন্! যে ভক্ত ভগবানের পদরজের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন, তিনি ক্ষুধা, তৃষ্ণা, শোক, মোহ, জরা এবং মৃত্যু- এই ছয় প্রকার কষাঘাতের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেন এবং মন ও পঞ্চ ইন্দ্রিয় জয় করতে পারেন। কিন্তু ভগবানের শুদ্ধ ভক্তের কাছে এগুলি মোটেই আশ্চর্যজনক নয়, কারণ চার বর্ণের বহির্ভূত কোন অস্পৃশ্য ব্যক্তিও ভগবানের নাম একবার মাত্র স্মরণ করা প্রভাবে সমস্ত জড় বন্ধন থেকে অচিরেই মুক্ত হতে পারে।”
“মহারাজ প্রিয়ব্রত যখন তাঁর পূর্ণ শক্তি এবং প্রভাবের দ্বারা তাঁর জড় ঐশ্বর্য উপভোগ করছিলেন, তখন এক সময় তিনি বিবেচনা করতে শুরু করেছিলেন যে, যদিও তিনি দেবর্ষি নারদর কাছে পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করেছেন এবং কৃষ্ণভাবনামৃতের পন্থা অবলম্বন করেছেন, তবুও তিনি পুনরায় জড়-জাগতিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়েছেন। তার ফলে তাঁর মন তখন অশান্ত হয়ে উঠেছিল এবং বৈরাগ্যযুক্ত হয়ে নিজের নিন্দা করে তিনি বলতে শুরু করেছিলেন- হায়! ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের জন্য আমি কত অধঃপতিত হয়েছি! আমি জড়সুখ ভোগের জন্য বিষয়রূপ অন্ধকূপে নিমজ্জিত হয়েছি। যথেষ্ট হয়েছে! আমি আর ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ করতে চাই না। আমি আমার পত্নীর ক্রীড়ামৃগতুল্য হয়ে পড়েছি। আমাকে ধিক্! আমাকে ধিক্!”
“পরমেশ্বর ভগবানের কৃপায়, মহারাজ প্রিয়ব্রতের স্বরূপ-উপলব্ধি পুনর্জাগরিত হয়েছিল। তিনি তাঁর পুত্রদের মধ্যে তাঁর বিষয়-সম্পত্তি ভাগ করে দিয়েছিলেন। যাঁর সঙ্গে তিনি বহু ইন্দ্রিয়সুখ উপভোগ করেছিলেন সেই পত্নী এবং তাঁর মহান ঐশ্বর্যসমন্বিত রাজ্যসহ তিনি সবকিছু পরিত্যাগ করেছিলেন এবং সম্পূর্ণরূপে বন্ধনমুক্ত হয়েছিলেন। সম্পূর্ণরূপে নির্মল তাঁর হৃদয় তখন ভগবানের লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছিল। এইভাবে তিনি কৃষ্ণভক্তির চিন্ময় মার্গের প্রত্যাবর্তন করেছিলেন এবং দেবর্ষি নারদের কৃপায় যে পদ প্রাপ্ত হয়েছিলেন তা পুনরায় গ্রহণ করেছিলেন। মহারাজ প্রিয়ব্রতের কার্যকলাপ সম্বন্ধে অনেক প্রসিদ্ধ শ্লোক রয়েছে- “মহারাজ প্রিয়ব্রত যে-সমস্ত কার্যকলাপ সম্পাদন করেছিলেন, তা পরমেশ্বর ভগবান ব্যতীত অন্য কেউ করতে পারে না। মহারাজ প্রিয়ব্রত রাত্রির অন্ধকার দূর করেছিলেন এবং তাঁর মহান রথের চাকার দ্বারা সাতটি সমুদ্র খনন করেছিলেন।” “বিভিন্ন মানুষদের মধ্যে বিবাদ বন্ধ করার জন্য মহারাজ প্রিয়ব্রত প্রতি দ্বীপে নদী, পর্বত ও বন ইত্যাদির সীমারেখা নির্ধারিত করেছিলেন, যাতে একে অন্যের সম্পত্তিতে অনধিকার প্রবেশ না করে।” নারদ মুনির মহান অনুগামী এবং ভক্ত মহারাজ প্রিয়ব্রত তাঁর কর্ম এবং যোগশক্তির প্রভাবে যে ঐশ্বর্য প্রাপ্ত হয়েছিলেন, তা অধোলোকের, স্বর্গলোকের বা নরলোকের হলেও তিনি তা নরকতুল্য বলে মনে করেছিলেন।”

Leave a Reply

September 2025
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  

Blog Stats

  • 140,959 hits