মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “প্রচেতারা বহু সহস্র বৎসর গৃহে অবস্থান করেছিলেন এবং তারপর তাঁদের দিব্য জ্ঞান উদিত হয়েছিল। তখন তাঁরা ভগবানের আশীর্বাদ স্মরণ করে এবং তাঁদের ভার্যাকে আদর্শ পুত্রের হস্তে সমর্পণপূর্বক গৃহ থেকে বহির্গত হয়েছিলেন। প্রচেতারা পশ্চিম দিকে সমুদ্রতটে গিয়েছিলেন, যেখানে জীবন্মুক্ত মহর্ষি জাজলি অবস্থান করছিলেন। যেই দিব্য জ্ঞানের দ্বারা সর্বভূতে সমদৃষ্টি-সম্পন্ন হওয়া যায়, পূর্ণরূপে সেই জ্ঞান লাভ করে প্রচেতারা কৃষ্ণভক্তিতে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। প্রচেতারা যোগাসন অভ্যাস করে তাঁদের প্রাণবায়ু, মন, বাণী এবং বাহ্যদৃষ্টি সংযত করেছিলেন। এইভাবে প্রাণায়ামের দ্বারা তঁরা সম্পূর্ণরূপে সমস্ত জড় আসক্তি থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। ঋজুভাবে উপবিষ্ট হয়ে তাঁরা পরমব্রহ্মে তাঁদের মনকে একাগ্রীভূত করেছিলেন। তাঁরা যখন এইভাবে প্রাণায়াম অভ্যাস করছিলেন, তখন দেবতা এবং অসুর উভয়েরই দ্বারা পূজিত নারদ মুনি তাঁদের দেখতে এসেছিলেন। নারদ মুনিকে আসতে দেখে প্রচেতারা তৎক্ষণাৎ তাঁদের আসন থেকে উত্থিত হয়েছিলেন। বিধিপূর্বক তাঁরা প্রণতি নিবেদন করে তাঁর পূজা করেছিলেন এবং যখন তাঁরা দেখলেন যে তিনি সুখে আসন গ্রহণ করেছেন, তখন তাঁরা তাঁকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে শুরু করেছিলেন।”
প্রচেতারা নারদ মুনিকে সম্বোধন করে বললেন- “হে দেবর্ষি, হে ব্রাহ্মণ! আশা করি এখানে আসার সময় আপনার কোন অসুবিধা হয়নি। আমাদের পরম সৌভাগ্যের ফলে আমরা আপনার দর্শন লাভ করেছি। সূর্যদেবের ভ্রমণ যেমন মানুষকে রাত্রির অন্ধকারের ভয় থেকে, দস্যু-তস্করদের ভয় থেকে মুক্ত করে, তেমনই আপনার পর্যটনও সূর্যের মতো, কারণ আপনি সমস্ত ভয় দূর করেন। হে প্রভু! গৃহের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত হওয়ার ফলে, শিব এবং ভগবান শ্রীবিষ্ণুর কাছ থেকে আমরা যে উপদেশ প্রাপ্ত হয়েছিলাম, তা প্রায় ভুলে গেছি। হে প্রভু! দয়া করে আমাদের দিব্য জ্ঞানের আলোক প্রদান করুন, যা প্রদীপস্বরূপ এবং যার দ্বারা আমরা অজ্ঞানের অন্ধকারে আচ্ছন্ন ভবসাগর উত্তীর্ণ হতে পারি।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “হে বিদুর! প্রচেতাদের দ্বারা এইভাবে জিজ্ঞাসিত হয়ে পরম ভাগবত নারদ মুনি, যিনি সর্বদা উত্তমশ্লোক ভগবানে আসক্তচিত্ত, তিনি বলতে লাগলেন যখন কোন জীব পরমেশ্বর ভগবানের প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত হওয়ার জন্য জন্মগ্রহণ করেন, তখন তাঁর জন্ম, তাঁর সমস্ত কর্ম, তাঁর আয়ু, তাঁর মন এবং তাঁর বাণী- সবই প্রকৃতপক্ষে সার্থক হয়। সভ্য মানুষদের তিন প্রকার জন্ম হয়। প্রথম জন্মটি হচ্ছে শুদ্ধ পিতামাতা থেকে এবং এই জন্মকে বলা শৌত্রু জন্ম। শ্রীগুরুদেবের কাছ থেকে যখন দীক্ষালাভ হয়, সেই জন্মকে বলা হয় সাবিত্র জন্ম। যখন ভগবান শ্রীবিষ্ণুর আরাধনা করার সুযোগ হয়, তখন তাকে বলা হয় যাজ্ঞিক জন্ম। এই প্রকার জন্মগ্রহণের সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও, দেবতাদের মতো দীর্ঘ আয়ু লাভ করা সত্ত্বেও, কেউ যদি ভগবানের সেবায় যুক্ত না হয়, তা হলে সবকিছুই ব্যর্থ হয়ে যায়। তেমনই কারও কার্যকলাপ পার্থিব অথবা আধ্যাত্মিক হতে পারে, কিন্তু তা যদি ভগবানের সন্তুষ্টিবিধানের জন্য না হয়, তা হলে তা সম্পূর্ণরূপে অর্থহীন। ভগবদ্ভক্তি ব্যতীত কঠোর তপস্যা, বেদ-শ্রবণ, শাস্ত্র-ব্যাখাদি, বাক্-বিলাস, মনোধর্মী জ্ঞান, উন্নত বুদ্ধিমত্তা, বল এবং ইন্দ্রিয়- পটুতার কি ফল? যে আধ্যাত্মিক অনুশীলনে চরমে ভগবানকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে না, তা সে যোগ অভ্যাস হোক, সাংখ্য- দর্শন অধ্যয়ন হোক, কঠোর তপস্যা হোক, সন্ন্যাস গ্রহন হোক অথবা বৈদিক শাস্ত্র অধ্যয়ন হোক তা সম্পূর্ণরূপে অর্থহীন। এগুলি আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হতে পারে, কিন্তু যদি তা ভগবান শ্রীহরিকে জানতে সাহায্য না করে তা হলে সেগুলি সম্পূর্ণরূপে অর্থহীন।
প্রকৃতপক্ষে ভগবানই সমস্ত আত্ম-উপলব্ধির মূল উৎস। তাই কর্ম, জ্ঞান, যোগ, ভক্তি ইত্যাদি সমস্ত শুভ কার্যের চরম লক্ষ্য হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান। বৃক্ষের মূলদেশে জল সিঞ্চন করা হলে তার স্কন্ধ, শাখা ইত্যাদি সঞ্জীবিত হয় এবং উদরে আহার্যদ্রব্য প্রদান করলে যেমন সমস্ত ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তি সাধন হয়, তেমনই ভগবদ্ভক্তির মাধ্যমে ভগবানের আরাধনা করা হলে, ভগবানেরই বিভিন্ন অংশ দেবতারাও আপনা থেকেই তৃপ্ত হন। বর্ষার জলের উদ্ভব হয় সূর্য থেকে, কালক্রমে গ্রীষ্মকালে সূর্যই আবার জল শোষণ করে নেয়। তেমনই, স্থাবর ও জঙ্গম সমস্ত জীব পৃথিবী থেকে উদ্ভুত হয়েছে এবং কিছুকাল পর তারা পুনরায় পৃথিবীর ধুলিতেই মিশে যাবে। তেমনই সবকিছুই পরমেশ্বর ভগবান থেকে উদ্ভুত হয়েছে এবং কালক্রমে সবই আবার ভগবানে লীন হয়ে যাবে। সূর্যকিরণ যেমন সূর্য থেকে অভিন্ন, এই জগৎও তেমন পরমেশ্বর ভগবান থেকে অভিন্ন। তাই ভগবান এই জড় জগতে সর্বব্যাপ্ত। ইন্দ্রিয়গুলি যখন সক্রিয় থাকে, তখন সেইগুলিকে দেহের বিভিন্ন অংশ বলে মনে হয়, কিন্তু দেহ যখন নিদ্রিত থাকে, তখন তাদের কার্যকলাপ প্রকট হয় না। তেমনই সারা জগৎ ভগবান থেকে ভিন্ন বলে প্রতীত হলেও তা ভিন্ন নয়।”
“হে রাজাগণ! আকাশে যেমন কখনও মেঘ, কখনও অন্ধকার এবং কখনও বা আলোক পর্যায়ক্রমে হয়ে থাকে, তেমনই পরমব্রহ্মে রজ, তম ও সত্ত্বগুণ শক্তিরূপে প্রকাশিত হয়। কখনও তাদের প্রকাশ হয় এবং কখনও তা লীন হয়ে থাকে। যেহেতু পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন সর্বকারণের পরম কারণ, তাই তিনি সমস্ত জীবের পরমাত্মা এবং নিমিত্ত ও উপাদান কারণ। যেহেতু তিনি গুণ-প্রবাহরূপ সংসার থেকে পৃথক, তাই তিনি তাঁর মিথষ্ক্রিয়া থেকে মুক্ত এবং জড়া প্রকৃতির ঈশ্বর। অতএব, তোমাদের কর্তব্য হচ্ছে, গুণগতভাবে নিজেদের তাঁর সঙ্গে এক বলে মনে করে, তাঁর প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত হওয়া। সর্বভূতে দয়া, যথালাভে সন্তোষ এবং বিষয় থেকে সমস্ত ইন্দ্রিয়ের নিগ্রহ- এই সবের দ্বারা ভগবান জনার্দন শ্রীঘ্রই প্রসন্ন হন। জড় বাসনার কলুষ থেকে সম্পূর্ণরূপে নির্মল হয়ে, ভগবদ্ভক্ত সমস্ত জড় কলুষ থেকে মুক্ত হন। এইভাবে তারা নিরন্তর ভগবানের চিন্তা করতে পারেন এবং আন্তরিক অনুভূতি সহকারে তাঁকে সম্বোধন করতে পারেন। ভগবান তখন তাঁর ভক্তের বশীভূত হয়ে ক্ষণিকের জন্যও তাঁকে ত্যাগ করেন না, ঠিক যেমন আকাশ কখনও অদৃশ্য হয়ে যায় না। যাঁদের কাছে কোন ধন নেই, কিন্তু যাঁরা ভগবদ্ভক্তিরূপ সম্পদ লাভ করার ফলে সম্পূর্ণরূপে প্রসন্ন, সেই ভক্তরা ভগবানের অত্যন্ত প্রিয়। প্রকৃতপক্ষে, ভগবান এই প্রকার ভক্তের, ভক্তি তৃপ্তিসহকারে আস্বাদন করেন। যারা পাণ্ডিত্য, ধন, আভিজাত্য এবং কর্মের অহঙ্কারে মত্ত হয়ে কখনও কখনও ভক্তদের উপহাস করে, তারা যদি ভগবানের পূজাও করে, তবুও ভগবান কখনই সেই পূজা গ্রহণ করেন না। যদিও পরমেশ্বর ভগবান স্বয়ংসম্পূর্ণ, তবুও তিনি তাঁর ভক্তদের বশ্যতা স্বীকার করেন। তিনি লক্ষ্মীদেবীর, শ্রীকামী রাজা এবং দেবতাদেরও অনুবর্তন করেন না। এমন্ কোন ব্যক্তি রয়েছেন, যিনি প্রকৃতপক্ষে কৃতজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও, সেই ভগবানের আরাধনা করবেন না?”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “হে মহারাজ বিদুর! ব্রহ্মার পুত্র নারদ মুনি এইভাবে প্রচেতাদের ভগবান সম্বন্ধীয় কথা উপদেশ দিয়ে ব্রহ্মলোকে ফিরে গিয়েছিলেন। নারদ মুনির শ্রীমুখ থেকে জগতের দুর্ভাগ্য বিনাশকারী ভগবানের মহিমা শ্রবণ করে, প্রচেতারাও ভগবানের প্রতি আসক্ত হয়েছিলেন। তাঁর শ্রীপাদপদ্মের ধ্যান করতে করতে, তাঁরা ভগবদ্ধামে গমন করেছিলেন। হে বিদুর! ভগবানের মহিমা বর্ণনাকারী নারদ এবং প্রচেতাদের কথোপকথন সম্বন্ধে তুমি যা জানতে চেয়েছিলে, সেই সম্বন্ধে আমি সবকিছু তোমাকে বললাম। আমি যথাসাধ্য তা বর্ণনা করেছি।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে নৃপশ্রেষ্ঠ (মহারাজ পরীক্ষিৎ)! আমি স্বায়ম্ভুব মনুর প্রথম পুত্র উত্তানপাদের বংশ বর্ণনা করলাম। এখন আমি স্বায়ম্ভুব মনুর দ্বিতীয় পুত্র প্রিয়ব্রতের বংশধরদের কার্যকলাপ বর্ণনা করার চেষ্টা করছি। দয়া করে মনোযোগ সহকারে তা শ্রবণ করুন। মহারাজ প্রিয়ব্রত যদিও নারদ মুনির কাছ থেকে আত্মবিদ্যা লাভ করেছিলেন, তবুও তিনি পৃথিবীর শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন। পূর্ণরূপে জড়সুখ ভোগ করার পর, তিনি তাঁর পুত্রদের মধ্যে রাজ্য বিভাগ করে ভগবদ্ধামে ফিরে গিয়েছিলেন। হে রাজন্! এইভাবে মহর্ষি মৈত্রেয়ের কাছে ভগবান এবং তাঁর ভক্তের চিন্ময় আখ্যান শ্রবণ করে বিদুর আনন্দে বিহ্বল হয়েছিলেন। অশ্রুসিক্ত নয়নে তিনি তখন তাঁর গুরুদেবের শ্রীপাদপদ্মে পতিত হয়েছিলেন এবং তাঁর হৃদয়ে ভগবানকে ধারণ করেছিলেন।”
শ্রীবিদুর বললেন- “হে পরম যোগী, হে শ্রেষ্ঠ ভক্ত! আপনার অহৈতুকী কৃপার প্রভাবে আমি এই তমসাচ্ছন্ন জগৎ থেকে মুক্তির পথ দর্শন করতে পেরেছি। এই পথ অনুসরণ করে, ভব-বন্ধনমুক্ত পুরুষ ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে পারেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এইভাবে মহর্ষি মৈত্রেয়কে প্রণতি নিবেদন করে তাঁর অনুমতি নিয়ে, সমস্ত জড় বাসনা থেকে মুক্ত হওয়া সত্ত্বেও, বিদুর তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের দর্শন করার জন্য হস্তিনাপুরে গমন করেছিলেন। হে রাজন্! যারা পরমেশ্বর ভগবানে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পিত রাজাদের এই সমস্ত আখ্যান শ্রবণ করেন, তারা অনায়াসে দীর্ঘায়ু, ঐশ্বর্য, যশ ও সৌভাগ্য লাভ করেন এবং চরমে ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পান।”
একত্রিংশতি অধ্যায়- প্রচেতাদের প্রতি নারদের উপদেশ
11 Sep 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, চতুর্থ স্কন্ধ- ভগবদ্ভক্তদের প্রতি অনুগ্রহ