ত্রিংশতি অধ্যায়- প্রচেতাদের কার্যকলাপ

বিদুর মৈত্রেয়কে জিজ্ঞাসা করলেন- “হে ব্রাহ্মণ! পূর্বে আপনি প্রাচীনবর্হির পুত্রদের কথা বর্ণনা করে বলেছিলেন যে, তাঁরা রুদ্রগীত নামক স্তোত্রের দ্বারা পরমেশ্বর ভগবানের সন্তুষ্টিবিধান করেছিলেন। এইভাবে তাঁরা কি লাভ করেছিলেন? হে বার্হস্পত্য! রাজা বর্হিষতের প্রচেতা নামক পুত্রগণ ভগবানের প্রিয় পার্ষদ এবং মুক্তিদাতা মহাদেবের সাক্ষাৎ লাভ করার পর, কি লাভ করেছিলেন? নিশ্চিতভাবে তাঁরা চিৎ-জগতে উন্নীত হয়েছিলেন, কিন্তু তা ছাড়া, এই জড় জগতে, এই জীবনে অথবা পরবর্তী জীবনে তাঁরা কি ফল প্রাপ্ত হয়েছিলেন?”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “মহারাজ প্রাচীনবর্হির পুত্র প্রচেতাগণ তাঁদের পিতার আদেশ পালন করার জন্য সমুদ্রগর্ভে কঠোর তপস্যা করেছিলেন। দেবাদিদেব মহাদেব প্রদত্ত মন্ত্র জপের দ্বারা তাঁরা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণুর প্রসন্নতা-বিধান করতে সক্ষম হন। প্রচেতারা দশ হাজার বছর ধরে কঠোর তপস্যা করেছিলেন, তখন পরমেশ্বর ভগবান তাঁদের পুরস্কৃত করার জন্য তাঁর অত্যন্ত মনোহর রূপে তাঁদের সম্মুখে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তার ফলে প্রচেতাদের তপক্লেশ প্রশমিত হয়েছিল এবং তাঁরা তাঁদের তপস্যা সার্থক হয়েছে বলে মনে করেছিলেন। পরমেশ্বর ভগবান তখন গরুড়ের স্কন্ধে আরোহণ করে সুমেরু-শিখরলগ্ন মেঘের মতো শোভা পাচ্ছিলেন। ভগবানের দিব্য শরীর অত্যন্ত মনোহর পীত বসনে আচ্ছাদিত ছিল এবং তাঁর গলদেশ কৌস্তভ-মণির দ্বারা সুশোভিত ছিল। তাঁর দেহনির্গত রশ্মিচ্ছটা ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত অন্ধকার দূর করেছিল। ভগবানের মুখমণ্ডল অত্যন্ত সুন্দর, তাঁর মস্তক অতি উজ্জ্বল মুকুট এবং স্বর্ণ অলংকারে বিভূষিত ছিল। তাঁর মুকুটটি উজ্জ্বল জ্যোতি বিস্তার করছিল এবং অত্যন্ত সুন্দরভাবে তাঁর মস্তকে শোভা পাচ্ছিল। তাঁর আট হাতে আট প্রকার অস্ত্র। তিনি দেববৃন্দ, মুনিগণ এবং অন্যান্য পার্ষদের দ্বারা পরিবৃত ছিলেন। তাঁরা সকলেই তাঁর সেবায় রত ছিলেন। ভগবানের বাহন গরুড় তাঁর পক্ষধ্বনির দ্বারা বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করে ভগবানের মহিমা কীর্তন করছিলেন। গরুড়কে তখন ঠিক কিন্নরের মতো মনে হচ্ছিল। ভগবানের গলদেশের বনমালা তাঁর জানু পর্যন্ত প্রলম্বিত ছিল। মালার দ্বারা শোভিত তাঁর আটটি বলিষ্ঠ ও আয়ত বাহু লক্ষ্মীদেবীর সৌন্দর্যকে স্পর্ধা করছিল। করুণায়ত দৃষ্টির দ্বারা অবলোকন করে ভগবান তাঁর অত্যন্ত শরণাগত মহারাজ প্রাচীনবর্হির পুত্রদের জলদগম্ভীর স্বরে সম্বোধন করে বলতে লাগলেন।”
পরমেশ্বর ভগবান বললেন- “হে রাজপুত্রগণ! আমি তোমাদের পরস্পরের সৌহার্দ্য দর্শন করে অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছি। তোমরা সকলেই একই ধর্ম- ভগবদ্ভক্তিতে নিযুক্ত। তোমাদের সৌহার্দ্য দর্শন করে আমি এত প্রসন্ন হয়েছি যে, আমি তোমাদের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ কামনা করি। এখন তোমরা আমার কাছে বর প্রার্থনা কর। যারা প্রতিদিন সন্ধ্যাকালে তোমাদের স্মরণ করবে, তারা তাদের ভ্রাতাদের প্রতি এবং সমস্ত জীবদের প্রতি সৌহার্দ্য-পরায়ণ হবে। যারা একাগ্রচিত্তে সকালে এবং সন্ধ্যায় রুদ্রগীতের দ্বারা আমার স্তব করবে, আমি তাদের অভিলষিত বর প্রদান করি। এইভাবে তাদের সমস্ত বাসনা পূর্ণ হবে এবং তারা সদ্বুদ্ধি লাভ করতে পারবে। যেহেতু তোমরা আনন্দিত চিত্তে তোমাদের পিতার আদেশ শিরোধার্য করেছ এবং নিষ্ঠা সহকারে তা অনুষ্ঠান করেছ, তাই তোমাদের মনোহর কীর্তি সারা জগতে পরিব্যাপ্ত হবে। তোমাদের একটি অতি উত্তম পুত্র হবে, যার গুণ ব্রহ্মার থেকে কোন অংশে ন্যূন হবে না। অতএব সেই পুত্র সারা ব্রহ্মাণ্ডে বিশেষভাবে খ্যাতি লাভ করবে এবং তার পুত্র ও পৌত্রেরা ত্রিভুবন পূর্ণ করবে।”
“হে রাজা প্রাচীনবর্হিষতের পুত্রগণ! প্রম্লোচা নামক অপ্সরা ক-ু ঋষির সহযোগে একটি কমল-নয়না কন্যা লাভ করে, তাকে বনের বৃক্ষদের তত্ত্বাবধানে রেখে স্বর্গলোকে ফিরে যান। তারপর বৃক্ষের তত্ত্বাবধানে পরিত্যাক্ত শিশুটি যখন ক্ষুধায় কাতর হয়ে ক্রন্দন করতে শুরু করেছিল, তখন বনে রাজা অর্থাৎ চন্দ্রলোকের রাজা সদয় হয়ে তাঁর তর্জনী শিশুটির মুখের মধ্যে স্থাপন করে অমৃত বর্ষণ করেছিলেন। এইভাবে শিশুটি চন্দ্রদেবের কৃপায় প্রতিপালিত হয়েছিল। যেহেতু তোমরা সকলে আমার অত্যন্ত অনুগত, তাই আমি তোমাদের আদেশ দিচ্ছি, তোমরা এখনই সেই অত্যন্ত গুনবতী এবং অপূর্ণ সুন্দরী কন্যাটিকে বিবাহ কর এবং তোমাদের পিতার আদেশ অনুসারে তার থেকে প্রজা সৃষ্টি কর। তোমরা সমস্ত ভাইয়েরা সকলেই ভগবদ্ভক্ত এবং পিতার আজ্ঞাকারী পুত্র হওয়ার ফলে সমশীল। তেমনই সেই কন্যাটিও তোমাদের সকলের প্রতি চিত্ত সমর্পণ করার ফলে, ধর্মে ও চরিত্রে তোমাদেরই অনুরূপ। সেই সুমধ্যমা সুন্দরীকে তোমাদের পত্নীরূপে গ্রহণ কর।”
ভগবান তখন প্রচেতাদের আশীর্বাদ করে বলেছিলেন- “হে রাজপুত্রগণ! আমার কৃপায়, তোমরা দিব্য সহস্র-সহস্র বর্ষ অপ্রতিহত প্রভাবসম্পন্ন হয়ে, প্রার্থিব ও দিব্য ভোগসমূহ উপভোগ করতে পারবে। তারপর আমার প্রতি অবিচলিত ভক্তির প্রভাবে তোমরা সমস্ত জড় কলুষ থেকে মুক্ত হবে। তখন তথাকথিত স্বর্গীয় এবং নারকীয় সমস্ত জড় সুখের প্রতি সম্পূর্ণরূপে অনাসক্ত হয়ে, তোমরা আমার ধামে ফিরে আসবে।”
“যাঁরা ভগবদ্ভক্তির শুভ কর্মে যুক্ত হয়েছেন, তাঁরা নিশ্চিতভাবে জানেন যে, সমস্ত কর্মের পরম ভোক্তা হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান। তাই এই প্রকার ব্যক্তি যখনই কোন কার্য করেন, তখন সেই কর্মের ফল তিনি ভগবানকে অর্পণ করেন। তাঁর সমস্ত জীবন তিনি ভগবানের কথা আলোচনা করে অতিবাহিত করেন। এই প্রকার ব্যক্তি গৃহস্থ-আশ্রমে থাকলেও, গৃহ তাঁর বন্ধনের কারণ হয় না। সর্বদা ভগিবদ্ভক্তিতে যুক্ত হওয়ার ফলে, ভগবদ্ভক্ত তাঁর সমস্ত কার্যকলাপে নব-নবায়মান আনন্দ অনুভব করেন। সর্বজ্ঞ পরমেশ্বর ভগবান ভক্তের হৃদয় থেকে তাঁর জন্য সবকিছুই নব-নবায়মান করে তোলেন। পরম তত্ত্ববেত্তা পুরুষেরা এই অবস্থাকে ব্রহ্মভূত বলেন। এই ব্রহ্মভূত (মুক্ত) স্তরে মানুষ কখনও মোহাচ্ছন্ন হন না। তিনি কোন কিছুর জন্য অনর্থক শোক করেন না অথবা হরষিত হন না। এটিই হচ্ছে ব্রহ্মভূত স্তরে অধিষ্ঠিত হওয়ার ফল।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “ভগবান এইভাবে বললে প্রচেতাগণ তাঁর প্রার্থনা করতে শুরু করেছিলেন। ভগবান হচ্ছেন জীবনের সমস্ত সিদ্ধি প্রদানকারী এবং পরম মঙ্গল প্রদাতা। তিনি সকলের পরম বন্ধু, যিনি ভক্তের দুঃখ-দুর্দশা দূর করেন। আনন্দে গদ্‌গদ স্বরে প্রচেতারা তাঁদের প্রার্থনা নিবেদন করতে শুরু করেছিলেন। ভগবানের সাক্ষাৎ দর্শন লাভের ফলে তাঁরা পবিত্র হয়েছিলেন।”
প্রচেতাগণ বললেন- “হে ভগবান! আপনি সমস্ত ক্লেশের বিনাশকর্তা। আপনার উদার গুণ এবং নাম সর্বমঙ্গল প্রদানকারী বলে নিরূপিত হয়েছে। আপনি মন ও বাক্যের থেকেও দ্রুত গতিতে গমন করতে পারেন। আপনি প্রাকৃত ইন্দ্রিয়ের অগোচর। তাই আমরা আপনাকে বার বার আমাদের প্রণতি নিবেদন করি। হে ভগবান! আমরা আপনাকে আমাদের প্রণতি নিবেদন করি। মন যখন আপনাতে স্থির হয়, তখন এই জড় জগৎ যা জড়সুখ ভোগের দ্বৈতভাব সমন্বিত স্থান, তা অর্থহীন বলে মনে হয়। আপনার চিন্ময় রূপ দিব্য আনন্দময়। তাই আমরা আপনাকে আমাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করি। এই জগতের সৃষ্টি, পালন এবং বিনাশের জন্য আপনি ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং শিব রূপে আবির্ভূত হন। হে ভগবান! আমরা আপনাকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি, কারণ আপনি সমস্ত জড় প্রভাব থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। আপনি সর্বদা ভক্তদের দুঃখকষ্ট হরণ করেন, কারণ আপনার মেধা তা সম্পাদন করার পরিকল্পনা করে। পরমাত্মারূপে আপনি সর্বত্র বিরাজমান, তাই আপনি বাসুদেব নামে পরিচিত। আপনি বসুদেবকে আপনার পিতারূপে গ্রহণ করেছিলেন, সেই জন্য আপনার নাম বাসুদেব এবং আপনি শ্রীকৃষ্ণ নামে প্রসিদ্ধ। আপনি এতই দয়ালু যে, আপনি আপনার সর্বপ্রকার ভক্তদের প্রভাব সর্বদা বর্ধন করেন। হে ভগবান! আমরা আপনাকে আমাদের প্রণতি নিবেদন করি, কারন আপনার নাভি থেকে সমস্ত জীবের উৎসস্বরূপ পদ্মফুল উদ্‌গত হয়েছে। আপনি সর্বদা পদ্মফুলের মালায় শোভিত এবং আপনার পদযুগল সুরভিত পদ্মফুলের মতো। আপনার নয়নও পদ্মফুলের পাপড়ির মতো। তাই আমরা সর্বদা আপনাকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। হে ভগবান! আপনার বসন পদ্মফুলের কেশরের মতো পীতবর্ণ, কিন্তু তা কোন জড় পদার্থ দিয়ে তৈরী হয়নি। আপনি সকলের হৃদয়ে বিরাজ করেন এবং আপনি সমস্ত জীবের সমস্ত কার্যকলাপের সাক্ষী। আমরা বারংবার আপনাকে আমাদের প্রণতি নিবেদন করি । হে ভগবান! বদ্ধ জীব আমরা দেহাত্মবুদ্ধির অন্ধকারে সর্বদা আচ্ছন্ন। তাই আমরা সংসার ক্লেশকে সর্বদা প্রিয় বলে মনে করি। আমাদের এই দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা থেকে উদ্ধার করার জন্য আপনি এই দিব্য রূপে আবির্ভূত হয়েছেন। আমাদের মতো যারা এইভাবে কষ্টভোগ করছে, তাদের প্রতি আপনার এটি অন্তহীন কৃপার প্রকাশ। অতএব যে সমস্ত ভক্তদের প্রতি আপনি সর্বদা কৃপাপরায়ণ, তাদের আর কি কথা? হে ভগবান! আপনি সমস্ত অমঙ্গল বিনাশ করেন। আপনি আপনার অর্চাবিগ্রহ প্রকাশ করে আপনার দীন ভক্তদের কৃপা করেন। আপনি দয়া করে আমাদের আপনার নিত্য সেবক বলে মনে করুন। ভগবান যখন তার স্বাভাবিক করুণার প্রভাবে তাঁর ভক্তের কথা চিন্তা করেন, তখন তাঁর নবীন ভক্তের সমস্ত বাসনা পূর্ণ হয়ে যায়। ভগবান প্রতিটি জীবের হৃদয়ে বিরাজমান, তা সেই জীব যত নগণ্যই হোক না কেন। ভগবান জীবের সবকিছু জানেন, এমন কি তার অন্তরের বাসনাগুলি পর্যন্ত জানেন। আমরা যদিও অত্যন্ত নগণ্য, তবুও ভগবান আমাদের ইচ্ছাগুলি কেন জানবেন না? হে ব্রহ্মাণ্ডপতি! আপনি ভক্তিযোগের প্রকৃত গুরু। আপনি যে আমাদের জীবনের চরম লক্ষ্য হয়েছেন, তাই আমরা অত্যন্ত প্রসন্নতা অনুভব করছি এবং আমরা প্রার্থনা করি যে, আপনি আমাদের প্রতি প্রসন্ন হোন। সেটিই আমাদের প্রার্থনা। আপনার প্রসন্নতা বিধান ব্যতীত অন্য আর কোন বাসনা আমাদের নেই।”
“হে ভগবান! আপনি সর্বকারণেরও কারণ পরাৎপর পুরুষ এবং যেহেতু আপনার বিভূতির অন্ত নেই বলে আপনি অনন্ত নামে কীর্তিত, তাই আমরা আপনার কাছে একটি বর প্রার্থনা করব। হে ভগবান! ভ্রমর যেমন পারিজাত ফুল প্রাপ্ত হলে আর অন্য ফুলে যায় না, তেমনই আমরা যখন আপনার শ্রীপাদপদ্ম প্রাপ্ত হয়ে তার আশ্রয় গ্রহণ করেছি, তখন আর কি বর প্রার্থনা করব? হে ভগবান! জড় জগতের কলুষের ফলে, যতদিন আমাদের এই জড় জগতে বিভিন্ন লোকে বিভিন্ন যোনিতে ভ্রমণ করতে হবে, ততদিন যেন আমরা আপনার লীলা শ্রবণ-কীর্তনে মগ্ন ভক্তদের সঙ্গ লাভ করতে পারি। জন্ম-জন্মান্তরে আমরা কেবল এই প্রার্থনাই করি। ভগবৎ সঙ্গী ভক্তদের লবমাত্র সময়ের সঙ্গ প্রভাবে জীবের যে অসীম মঙ্গল হয়, তার সঙ্গে স্বর্গলোক প্রাপ্তি এমন কি ব্রহ্মজ্যোতিতে লীন হয়ে যাওয়ার মুক্তিরও তুলনা করা যায় না। কারণ মরণশীল জীবের পক্ষে সর্বশ্রেষ্ঠ বর হচ্ছে শুদ্ধ ভক্তের সঙ্গ। যখনই চিৎ-জগতের বিশুদ্ধ কথা আলোচনা হয়, তখন শ্রোতৃমণ্ডলী অন্তত তখনকার মতো সমস্ত জড় আকাঙক্ষার কথা ভুলে যান। কেবল তাই নয়, তাঁদের তখন আর পরস্পরের প্রতি বৈরীভাব থাকে না এবং তাঁদের কোন রকম উদ্বেগ বা উৎকন্ঠা থাকে না। যেখানে ভক্তদের মধ্যে ভগবানের দিব্যনাম শ্রবণ এবং কীর্তন হয়, সেখানে ভগবান নারায়ণ উপস্থিত থাকেন। নারায়ণ হচ্ছেন সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীদের পরম গতি এবং যাঁরা জড় কলুষ থেকে মুক্ত, তাঁরা সংকীর্তন যজ্ঞের মাধ্যমে নারায়ণের পূজা করেন। তাঁরা বাস্তবিকপক্ষে পুনঃ পুনঃ তাঁর পবিত্র নাম উচ্চারণ করেন।”
“হে ভগবান! আপনার পার্ষদ এবং ভক্তরা পৃথিবীর সর্বত্র বিচরণ করে তীর্থস্থানগুলিকে পর্যন্ত পবিত্র করেন। অতএব সংসার ভয়ে ভীত কোন্ ব্যক্তি তাঁদের সমাগমে অভিরুচি প্রকাশ করবে না? হে ভগবান! আপনার অত্যন্ত প্রিয় সখা শিবের ক্ষণকাল মাত্র সঙ্গ প্রভাবে আপনাকে লাভ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। আপনি সর্বশ্রেষ্ঠ বৈদ্য এবং আপনি দুশ্চিকিৎস্য ভবরোগের নিরাময় করতে পারেন। আমাদের পরম সৌভাগ্যের ফলে, আমরা আপনার শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয়গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছি। হে ভগবান! আমরা বেদ অধ্যয়ন করেছি, সদ্‌গুরুর আশ্রয় গ্রহণ করেছি এবং ব্রাহ্মণদের, ভক্তদের ও পারমার্থিক জ্ঞানে অতি উন্নত বৃদ্ধদের শ্রদ্ধা নিবেদন করেছি। আমরা ভ্রাতা, বন্ধু, অথবা অন্য কারও প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হইনি। আমরা দীর্ঘকাল কোন কিছু আহার না করে, জলের মধ্যে কঠোর তপস্যা করেছি। আমাদের এই সমস্ত পারমার্থিক সম্পদগুলি কেবল আপনার প্রসন্নতা বিধানের জন্য আপনাকে উৎসর্গ করতে চাই, এটিই আমাদের একমাত্র প্রার্থনা। এ ছাড়া আমরা আর কিছু চাই না। হে ভগবান! তপস্যা ও জ্ঞানের দ্বারা বিশুদ্ধচিত্ত যোগীগণ, এমন কি মনু, ব্রহ্মা, শিবাদি মহাপুরুষগণও আপনার মহিমা এবং শক্তি পূর্ণরূপে উপলব্ধি করতে পারেন না। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা যথাসাধ্য আপনার স্তব করেছেন। এই সমস্ত মহাপুরুষদের থেকে অনেক নিকৃষ্ট হলেও আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুসারে আপনার স্তব করছি। হে ভগবান! কেউই আপনার শত্রু নয় অথবা মিত্র নয়। তাই আপনি সকলের প্রতি সমদর্শী। আপনি পাপকর্মের দ্বারা কখনও কলুষিত হতে পারেন না এবং আপনার চিন্ময় রূপ জড়া প্রকৃতির অতীত । আপনি পরমেশ্বর ভগবান কারণ আপনি সর্বব্যাপ্ত। তাই আপনি বাসুদেব নামে পরিচিত। আমরা আপনাকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “হে বিদুর! শরণাগত-বৎসল ভগবান প্রচেতাদের দ্বারা এইভাবে বন্দিত এবং পূজিত হয়ে বলেছিলেন, “তোমরা যা প্রার্থনা করেছ তা পূর্ণ হবে।” তারপর সেই অকুন্ঠপ্রভাব ভগবান সেখান থেকে প্রস্থান করেছিলেন। প্রচেতারা ভগবান থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাননি, কারণ তাঁদের চক্ষু তখনও তাঁর দর্শনে অতৃপ্ত ছিল।”
“তারপর প্রচেতারা সিন্ধুসলিল থেকে বেরিয়ে এসে দেখলেন যে, সমস্ত বৃক্ষগুলি অত্যন্ত উন্নত হয়ে যেন স্বর্গলোকে যাওয়ার পথ রোধ করতে উদ্যত হয়েছে এবং সেই বৃক্ষাদির দ্বারা মহীমণ্ডল আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে। তখন প্রচেতারা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। হে রাজন্! প্রলয়কালে রুদ্র যেভাবে তাঁর মুখ থেকে অগ্নি নির্গমণ করেন, প্রচেতারাও তেমন মহীমণ্ডলকে সম্পূর্ণরূপে তরুলতাশূণ্য করবার উদ্দেশ্যে, ক্রোধভরে তাঁদের মুখ থেকে অগ্নি এবং বায়ু নির্গমন করতে লাগলেন। পৃথিবীর সমস্ত বৃক্ষ ভস্মসাৎ হচ্ছে দেখে, পিতামহ ব্রহ্মা তৎক্ষণাৎ সেখানে এসে যুক্তিযুক্ত বাক্যের দ্বারা রাজা বর্হিষ্মানের পুত্রদের শান্ত করেছিলেন। সেই বৃক্ষদের মধ্যে যেগুলি অবশিষ্ট ছিল, তারা ভীত হয়ে ব্রহ্মার উপদেশে তাদের কন্যাটিকে প্রচেতাদের সমর্পণ করেছিল। ব্রহ্মার আদেশে প্রচেতারা কন্যাটিকে বিবাহ করেছিলেন। তাঁর গর্ভে ব্রহ্মার পুত্র দক্ষ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। দক্ষ মহাদেবকে অবজ্ঞা ও অপমান করেছিলেন বলে মারিষার গর্ভে তাঁকে জন্মগ্রহণ করতে হয়েছিল। তার ফলে তাঁকে দুবার দেহত্যাগ করতে হয়েছিল। তাঁর পূর্বদেহ বিনষ্ট হয়েছিল, কিন্তু তিনি, সেই দক্ষই চাক্ষুষ মন্বন্তরে ভগবানের ইচ্ছার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর অভিলষিত প্রজা সৃষ্টি করেছিলেন। দক্ষ তাঁর জন্মের পর, তাঁর দেহের জ্যোতির দ্বারা অন্য সমস্ত তেজস্বীদের তেজ আচ্ছাদিত করেছিলেন। সকাম কর্ম অনুষ্ঠানে অত্যন্ত দক্ষ হওয়ার ফলে, তাঁকে দক্ষ বলা হত। ব্রহ্মা তাই তাঁকে প্রজাসৃষ্টি ও রক্ষণকার্যে নিযুক্ত করেছিলেন। পরে দক্ষ অন্যান্য প্রজাপতিদেরও প্রজাসৃষ্টি এবং রক্ষণকার্যে নিযুক্ত করেছিলেন।”

Leave a Reply

September 2025
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  

Blog Stats

  • 140,959 hits