ঊনত্রিংশতি অধ্যায়- নারদ ও রাজা প্রাচীনবর্হির কথোপকথন

মহারাজ প্রাচীনবর্হি বললেন- “হে প্রভু! রাজা পুরঞ্জনের রূপক কাহিনীর তাৎপর্য আমরা পূর্ণরূপে বুঝতে পারিনি। প্রকৃতপক্ষে যাঁরা পারমার্থিক জ্ঞানের পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়েছেন তাঁরা বুঝতে পারেন, কিন্তু সকাম কর্মের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত আমাদের মতো মানুষদের পক্ষে আপনার এই কাহিনীর তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করা অত্যন্ত কঠিন।”
দেবর্ষি নারদ বললেন- “পুরঞ্জনকে জীব বলে জানবেন। সে তার কর্ম অনুসারে এক পদ, দ্বিপদ, ত্রিপদ, চতুষ্পদ, বহু পদ অথবা পদহীন বিভিন্ন শরীরে দেহান্তরিত হয়। এই সমস্ত শরীরে দেহান্তরিত হয় বলে জীব তথাকথিত ভোক্তরূপে পুরঞ্জন নামে পরিচিত হয়। অবিজ্ঞাত বলে আমি যাঁকে বর্ণনা করেছি, তিনি হচ্ছেন জীবের নিত্য সুহৃৎ এবং প্রভু। জীব যেহেতু জড় নাম, কার্যকলাপ অথবা গুণের দ্বারা পরমেশ্বর ভগবানকে উপলব্ধি করতে পারে না, তাই ভগবান বদ্ধ জীবের কাছে চিরকাল অবিজ্ঞাত থাকেন। জীব যখন পূর্ণরূপে জড়া প্রকৃতির গুণগুলি ভোগ করতে চায়, তখন সে বহু শরীরের মধ্যে সেই শরীরটি প্রাপ্ত হতে চায়, যাতে নয়টি দ্বার, দুটি হাত এবং দুটি পা রয়েছে। এইভাবে সে মানুষ অথবা দেবতা হতে চায়।”
“এই প্রসঙ্গে উল্লিখিত প্রমদা শব্দটি জড়-বুদ্ধি বা অবিদ্যাকে বোঝায়। বুঝতে হবে যে, কেউ যখন এই বুদ্ধির আশ্রয় গ্রহণ করে, তখন সে তার জড় দেহটিকে তার স্বরূপ বলে মনে করে। “আমি” এবং “আমার” এই জড় ভাবনার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, সে তার ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সুখ এবং দুঃখ ভোগ করতে শুরু করে। এইভাবে জীব বদ্ধ হয়। পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয় এবং পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় পুরঞ্জনীর সখা। এই সমস্ত ইন্দ্রিয়ের দ্বারা জীব জ্ঞান প্রাপ্ত হয় এবং কর্মে প্রবৃত্ত হয়। ইন্দ্রিয়ের বৃত্তিগুলি হচ্ছে তার সখী এবং যে পঞ্চশিরার সর্পের কথা বলা হয়েছে, তা হচ্ছে পঞ্চবৃত্তিশালী প্রাণবায়ু। একাদশতম সেবক হচ্ছে অন্যদের অধিপতি মন। এই মন কর্মেন্দ্রিয় এবং জ্ঞানেন্দ্রিয় উভয়েরই অধিপতি। পঞ্চালরাজ্য হচ্ছে সেই পরিবেশ, যেখানে পঞ্চেন্দ্রিয়ের বিষয় উপভোগ করা হয়। এই পঞ্চালরাজ্যের ভিতর রয়েছে নবদ্বার সমন্বিত এই দেহরূপ নগরী। চক্ষু, নাসিকা এবং কর্ণ- এই দ্বারগুলি দুটি দুটি করে একস্থানে অবস্থিত। মুখ, উপস্থ এবং পায়ুও হচ্ছে বিভিন্ন দ্বার। এই নবদ্বার সমন্বিত শরীরে স্থিত হয়ে জীব এই জড় জগতে বহির্মুখী কার্য করে এবং রূপ, রস আদি ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহ উপভোগ করে। দুটি চক্ষু, দুটি নাসারন্দ্র এবং একটি মুখ, এই পাঁচটি দ্বার সম্মুখ ভাগে অবস্থিত। দক্ষিণ কর্ণকে দক্ষিণ দিকস্থ দ্বার বলে মনে করা হয়, বাম কর্ণকে উত্তর দিকস্থ দ্বার বলা হয়। পশ্চিম দিকস্থ দুটি দ্বার হচ্ছে পায়ু এবং উপস্থ। খদ্যোতা এবং আবির্মুখী নামক যে দুটি দ্বারের কথা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলি হচ্ছে শরীরের এক স্থানে পাশাপাশি অবস্থিত দুটি চক্ষু। বিভ্রাজিত নামক যে জনপদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তাকে রূপ বলে জানবে। এইভাবে চক্ষু দুটি সর্বদা বিভিন্ন প্রকার রূপ দর্শনে মগ্ন। নলিনী এবং নালিশী নামক যে দুটি দ্বারের কথা বলা হয়েছে, তা হচ্ছে দুটি নাসারন্ধ্র। সৌরভদেশ বলে যার বর্ণনা করা হয়েছে তা হচ্ছে গন্ধ। অবধূত নামে তার যে সঙ্গীর কথা বলা হয়েছে তা হচ্ছে ঘ্রাণেন্দ্রিয়। মুখ্যা নামক যে দ্বারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা হচ্ছে মুখ এবং বিপণ হচ্ছে বাগিন্দ্রিয়। রসজ্ঞ হচ্ছে রসনেন্দ্রিয়। আপণ শব্দের অর্থ হচ্ছে ভাষণ এবং বহূদন শব্দের অর্থ হচ্ছে বিভিন্ন প্রকার খাদ্য। দক্ষিণ কর্ণকে বলা হয় পিতৃহূ দ্বার এবং বাম কর্ণকে বলা হয় দেবহূ দ্বার।”
নারদ মুনি বললেন- “দক্ষিণ পঞ্চাল নামক যে নগরীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার দ্বারা সকাম কর্মজনিত ইন্দ্রিয়সুখ-ভোগের কর্মকাণ্ডাত্মক প্রবৃত্তি মার্গের শাস্ত্রসমূহকে বুঝানো হয়েছে। উত্তর পঞ্চাল নামক অন্য নগরীটির দ্বারা নিবৃত্তি প্রতিপাদক জ্ঞানকাণ্ডীয় শাস্ত্রসমূহকে বোঝানো হয়েছে। জীব দুই কর্ণের দ্বারা বিভিন্ন প্রকার জ্ঞান প্রাপ্ত হয় এবং কোন জীব পিতৃলোকে এবং কোন জীব দেবলোকে উন্নীত হয়। তা সম্ভব হয় দুটি কর্ণের দ্বারা। আসুরী (মেঢ্র) নামক নিম্নবর্তী দ্বার দিয়ে গ্রামক নামক যে জনপদে গমন করা হয়, তা হচ্ছে স্ত্রীসঙ্গজনিত সুখ, যা মূর্খ ও নীচ সাধারণ মানুষদের কাছে অত্যন্ত আনন্দদায়ক। জননেন্দ্রিয়কে বলা হয় দুর্মদ এবং পায়ুকে বলা হয় নির্ঋতি। পুরঞ্জন বৈশস নামক স্থানে যেতে বলতে বোঝানো হয়েছে যে, তিনি নরকে যেতেন। তাঁর সহচর লুব্ধক হচ্ছে পায়ু নামক কর্মেন্দ্রিয়। পূর্বে আমি দুজন অন্ধ সহচরের কথাও বলেছি। তারা হচ্ছে হাত এবং পা। হাত এবং পায়ের সাহায্যে জীব সব রকম কর্ম করে এবং ইতস্তত বিচরণ করে। অন্তঃপুর বলতে হৃদয়কে বোঝানো হয়েছে। বিষূচীন শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘সর্বত্রগামী’ এবং তা এখানে মনকে বুঝাচ্ছে। জীব তার মনের মধ্যে প্রকৃতির গুণের প্রভাবসমূহ ভোগ করে। এই প্রভাবগুলি কখনও মোহ, কখনও সন্তোষ এবং কখনও হর্ষ উৎপাদন করে। পূর্বে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যে, মহিষী হচ্ছেন বুদ্ধি। স্বপ্নে অথবা জাগ্রত অবস্থায় থেকে বুদ্ধি বিভিন্ন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। কলুষিত বুদ্ধির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, জীব দর্শকরূপে বুদ্ধিরই ক্রিয়া এবং প্রতিক্রিয়া অনুকরণ করে।”
“যাকে আমি রথ বলে বর্ণনা করেছি, প্রকৃতপক্ষে তা হচ্ছে এই শরীর। ইন্দ্রিয়গুলি হচ্ছে সেই রথের ঘোড়া। সংবৎসরের মতো তাদের গতি অপ্রতিহত, কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে তাদের কোন গতি নেই। পাপ এবং পুন্য হচ্ছে সেই রথের দুটি চাকা। জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণ সেই রথের পতাকা। পঞ্চ প্রাণেন্দ্রিয় জীবের বন্ধন এবং মন হচ্ছে তার রশি। বুদ্ধি সেই রথের সারথি। হৃদয় রথের উপবেশন স্থান এবং সুখ-দুঃখরূপ দ্বন্দ্বভাব যুপবন্ধনের স্থান। সপ্তধাতু সেই রথের আবরণ এবং পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় তার বাহ্য বিক্রম। একাদশ ইন্দ্রিয় সেই পুরুষের সৈনিক। ইন্দ্রিয়সুখে মগ্ন হয়ে জীব সেই রথে আরূঢ় হয়ে তার ভ্রান্ত বাসনা চরিতার্থ করার আকাঙক্ষা করে এবং জন্ম-জন্মান্তর ধরে ইন্দ্রিয় সুখভোগের প্রতি ধাবিত হয়। যাকে চণ্ডবেগ বলে বর্ণনা করা হয়েছে, তা হচ্ছে অত্যন্ত শক্তিশালী কাল। দিন ও রাত্রিকে যথাক্রমে গন্ধর্ব, এবং গন্ধর্বী বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তিন শত ষাট দিন এবং রাত্রি সমন্বিত সংবৎসর ক্রমশ মানুষের আয়ু হরণ করে। যাকে কালকন্যা বলে বর্ণনা করা হয়েছে তা হচ্ছে বৃদ্ধাবস্থা। কেউই জরাগ্রস্ত হতে চায না, কিন্তু সাক্ষাৎ যবনরাজ মৃত্যু জরাকে তাঁর ভগিনীরূপে স্বীকার করেছেন। যবনেশ্বরের (যমরাজের) অনুচরদের বলা হয় মৃত্যুসেনা এবং সেগুলি হচ্ছে দেহ ও মন সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকার পীড়া। প্রজ্বার হচ্ছে দুই প্রকার জ্বর- অত্যধিক গরম এবং অত্যধিক ঠান্ডা- যেমন টাইফয়েড এবং নিউমোনিয়া। শরীরের ভিতরে শায়িত জীব আধিদৈবিক, আধিভৈাতিক এবং আধ্যাত্মিক বিভিন্ন প্রকার ক্লেশের দ্বারা বিচলিত। সর্বপ্রকার ক্লেশ সত্ত্বেও জীব দেহধর্ম, মনোধর্ম ও ইন্দ্রিয়ধর্মের বশীভূত হয়ে এবং বিভিন্ন প্রকার ব্যাধির দ্বারা ক্লিষ্ট হয়ে, এই জড় জগৎকে ভোগ করার বাসনায় বহু পরিকল্পনা করে। যদিও সে নির্গুণ, তবুও অজ্ঞানের বশে জীব ‘আমি’ ও ‘আমার’ অহঙ্কারের দ্বারা প্রভাবিত হযে, নানা রকম দুঃখকষ্ট ভোগ করে। এইভাবে সেই তার জড় শরীরে একশ বছর অবস্থান করে।”
“জীবের নিজের ভাল অথবা মন্দ ভাগ্য বেছে নেওয়ার অল্প একটু স্বাধীনতা রয়েছে, কিন্তু সে যখন তার পরম প্রভু পরমেশ্বর ভগবানকে ভুলে যায়, তখন সে জড়া প্রকৃতির গুণের বশীভূত হয়। জড়া প্রকৃতির গুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, সে তার দেহকে তার স্বরূপ বলে মনে করে এবং দেহের জন্য নানা প্রকার কর্মে আসক্ত হয়। কখনও সে তমোগুণের দ্বারা, কখনও রজোগুণের দ্বারা এবং কখনও সত্ত্বগুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এইভাবে জীব জড়া প্রকৃতির গুণের প্রভাবে বিভিন্ন প্রকার শরীর প্রাপ্ত হয়। যাঁরা সত্ত্বগুণে অবস্থিত তাঁরা বৈদিক নির্দেশ অনুসারে পূর্ণকর্ম করেন এবং তার ফলে তাঁরা স্বর্গলোকে উন্নীত হন, যেখানে দেবতারা বাস করেন। যাঁরা রজোগুণের দ্বারা প্রভাবিত, তাঁরা মনুষ্যলোকে বিভিন্ন প্রকার উৎপাদনশীল কার্য করেন। আর যারা তমোগুণের দ্বারা প্রভাবিত, তারা বিভিন্ন প্রকার কষ্টভোগ করে এবং পাশবিক জগতে বাস করে। অজ্ঞানের দ্বারা আচ্ছাদিত হয়ে জীব কখনও পুরুষ, কখনও স্ত্রী, কখনও নপুংসক, কখনও মানুষ, কখনও দেবতা, কখনও পশু, কখনও পক্ষী ইত্যাদি হয়। এইভাবে সে এই জড় জগতে ভ্রমণ করতে থাকে। প্রকৃতির গুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তার কর্ম অনুসারে সে বিভিন্ন প্রকার শরীর ধারণ করে। ক্ষুধায় কাতর, দীন কুকুর যেমন গৃহে গৃহে ভ্রমণ করে তার প্রারব্ধ অনুসারে কোথাও বা দণ্ড দ্বারা তাড়িত হয় এবং কোথায়ও একমুষ্টি অন্ন প্রাপ্ত হয়, তেমনই বিভিন্ন বাসনার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, জীব তার অদৃষ্ট অনুসারে বিভিন্ন যোনিতে ভ্রমণ করে। কখনও সে উচ্চতর জীবন প্রাপ্ত হয় এবং কখনও নিম্নতর জীবন। কখনও সে স্বর্গলোকে উন্নীত হয়, কখনও নরকে অধঃপতিত হয়, আবার কখনও মধ্যবর্তী লোকে অবস্থান করে। এইভাবে সে কখনও সুখ এবং কখনও দুঃখ ভোগ করে। জীব তার ভাগ্যজনিত ক্লেশ, অন্যান্য জীবের দ্বারা প্রদত্ত ক্লেশ অথবা তার দেহ অথবা মন সম্পর্কিত ক্লেশ থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা সর্বদা করে। কিন্তু, প্রতিকারের সমস্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, প্রকৃতির নিয়মের দ্বারা তাদের বদ্ধ থাকতে হয়। মানুষ মস্তকে গুরুভার বহন করতে করতে যখন অত্যন্ত শ্রান্ত হয়ে পড়ে, তখন সেই ভার কাঁধে বহন করে সে মস্তককে আরাম দেওয়ার চেষ্টা করে। এইভাবে সে তার ভার বহনের শ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করে। কিন্তু ভার বহনের শ্রান্তি দূর করার যত কিছু উপায় আছে, সেগুলির মাধ্যমে সে কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বোঝার ভার স্থানান্তরিত করা ছাড়া অতিরিক্ত আর কিছুই করতে পারে না।”
নারদ মুনি বললেন- “হে নিষ্পাপ! কেউই কৃষ্ণভক্তি ব্যতীত অন্য কোন কর্মের দ্বারা তার সকাম কর্মের ফল থেকে মুক্ত হতে পারে না। অজ্ঞানতাবশত মানুষ সেই সমস্ত কার্যকলাপে লিপ্ত হয়। দুঃস্বপ্নের প্রতিকার যেমন কেবল জাগরণের দ্বারাই হয়ে থাকে, তেমনই কৃষ্ণভক্তির দ্বারা আমাদের স্বরূপে জেগে ওঠা ব্যতীত অজ্ঞান এবং মোহজনিত সংসার-দুঃখ থেকে নিবৃত্তির আর কোন উপায় নেই, কারণ সমস্ত সমস্যার চরম সমাধান হচ্ছে কৃষ্ণভাবনায় জেগে ওঠা। কখনও কখনও আমরা স্বপ্নে একটি বাঘ অথবা সাপ দেখে ভয় পাই, কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে সেখানে বাঘ অথবা সাপ নেই। তেমনই আমরা সুক্ষ্মরূপে কোন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, তার পরিণামে দুঃখকষ্ট ভোগ করি। স্বপ্ন থেকে জেগে ওঠা ব্যতীত এই সমস্ত দুঃখ-দুর্দশার নিবৃত্তিসাধন সম্ভব নয়। জীবের প্রকৃত পুরুষার্থ হচ্ছে, যে অজ্ঞান তাকে পুনঃ পুনঃ জন্মমৃত্যুর ক্লেশ প্রদান করে, সেই অজ্ঞান থেকে মুক্ত হওয়া। তার প্রতিকারের একমাত্র উপায় হচ্ছে ভগবানের প্রতিনিধির মাধ্যমে ভগবানের শরণাগত হওয়া। যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ ভগবান শ্রীবাসুদেবের প্রতি ভক্তি না করে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার পক্ষে এই জড় জগতের প্রতি সম্পূর্ণরূপে বিরক্ত হওয়া এবং পূর্ণ জ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয়।”
“হে রাজর্ষি! যে ব্যক্তি শ্রদ্ধাবান, যিনি সর্বদা ভগবানের মহিমা শ্রবণ করেন, যিনি সর্বদা কৃষ্ণভক্তির অনুশীলনে যুক্ত এবং যিনি সর্বদা ভগবানের কার্যকলাপ শ্রবণ করেন, তিনি অচিরেই প্রত্যক্ষভাবে ভগবানকে দর্শন করার যোগ্যতা অর্জন করেন। হে রাজন, যে স্থানে সদাচার-সম্পন্ন বিশুদ্ধ চিত্ত এবং ভগবানের মহিমা শ্রবণ ও কীর্তনে ব্যাকুলিত চিত্ত শুদ্ধ ভক্তগণ অবস্থান করেন, সেই স্থানে যদি কেউ অমৃত ধারাবাহিনী সরিৎস্বরূপ ভগবানের লীলামৃত শ্রবণ করার সুযোগ প্রাপ্ত হন, তা হলে তিনি ক্ষুধা, তৃষ্ণা আদি জীবনের সমস্ত প্রয়োজনগুলি বিস্মৃত হন এবং তিনি সমস্ত ভয়, শোক ও মোহন থেকে মুক্ত হন। যেহেতু বদ্ধ জীবেরা সর্বদাই ক্ষুধা, তৃষ্ণা আদি দেহের আবশ্যকতাগুলির দ্বারা উপদ্রুত, তাই ভগবানের অমৃতময় কথা শ্রবণে আসক্তি উৎপাদনের জন্য তাদের সময় প্রায় নেই। সমস্ত প্রজাপতিদের পিতা পরম শক্তিমান ব্রহ্মা; মহাদেব, মনু, দক্ষ প্রভৃতি প্রজাপতিগণ; সনক, সনাতন আদি সর্বোচ্চ স্তরের নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারীগণ; মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, ভৃগু, বসিষ্ঠ আদি মহর্ষিগণ; এবং আমার মতো অন্যান্য ব্রহ্মবাদী ও বাচস্পতিগণ তপস্যা, বিদ্যা ও সমাধি প্রভৃতি উপায় দ্বারা নিরন্তর অনুসন্ধান করেও আজ পর্যন্ত সর্বসাক্ষী পরমেশ্বর ভগবানকে জানতে পারে নি। অনন্ত বৈদিক জ্ঞানের অনুশীলন এবং বৈদিক মন্ত্রের লক্ষণের দ্বারা বিভিন্ন দেবতাদের পূজা করা সত্ত্বেও, তাঁরা পরম শক্তিমান পরমেশ্বর ভগবানকে জানতে পারেননি। কেউ যখন পূর্ণরূপে ভগবদ্ভক্তিতে যুক্ত হন, তখন তিনি ভগবানের অহৈতুকী কৃপারূপ অনুগ্রহ লাভ করেন। তখন চিন্ময় চেতনায় জাগরিত হয়ে, ভগবদ্ভক্ত বেদের কর্মকান্ডে বর্ণিত সমস্ত জাগতিক কার্যকলাপ এবং আচার অনুষ্ঠান পরিত্যাগ করেন।”
“হে মহারাজ বর্হিষ্মান! বৈদিক কার্যকলাপের অনুষ্ঠান অথবা সকাম কর্ম যতই শ্রুতিমধুর অথবা জীবনের পরম লক্ষ বলে মনে হোক না কেন, কখনও সেই সমস্ত কার্যকলাপে লিপ্ত হবেন না। সেগুলিকে কখনই পরমার্থ বলে মনে করা উচিত নয়। যারা অল্পবুদ্ধি-সম্পন্ন তারা বৈদিক কর্মকাণ্ডীয় অনুষ্ঠানগুলিকে বেদের চরম লক্ষ্য বলে মনে করে। তারা জানে না যে, বেদের প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে তাদের প্রকৃত আলয় ভগবদ্ধাম সম্বন্ধে জানিয়ে দেওয়া। তাদের প্রকৃত আবাসের কথা ভুলে গিয়ে, মোহবশত তারা অন্য গৃহের অন্বেষণ করে। হে রাজন! সারা পৃথিবী পূর্বমুখী তীক্ষ্ণাগ্র কুশের দ্বারা আচ্ছাদিত হয়েছে এবং তার ফলে যজ্ঞে বহু পশু বধ করার দরুন আপনি অত্যন্ত গর্বিত হয়েছেন। আপনার এই মূর্খতাবশত আপনি জানেন না যে, ভক্তিই হচ্ছে ভগবানকে সন্তুষ্ট করার একমাত্র উপায়। ভগবানের সন্তুষ্টিবিধানই আপনার একমাত্র কর্তব্যকর্ম হওয়া উচিত। ভগবদ্ভক্তির স্তরে উন্নীত হওয়াই হচ্ছে যথার্থ বিদ্যার ফল। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরি পরমাত্মারূপে এই জগতে জড় দেহধারী সমস্ত জীবের পথপ্রদর্শক। তিনি হচ্ছেন জড়া প্রকৃতিতে সমস্ত জড়-জাগতিক কার্যকলাপের পরম নিয়ন্তা। তিনিই আমাদের পরম বন্ধু এবং সকলেরই কর্তব্য হচ্ছে তাঁর শ্রীপাদপদ্মে আশ্রয় গ্রহণ করা। তা করা হলে, মানুষের জীবন মঙ্গলময় হয়ে ওঠে। যিনি ভগবদ্ভক্তিতে যুক্ত, তাঁর এই সংসারে ভয়ের লেশমাত্র থাকে না। তার কারণ পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন পরমাত্মা এবং সকলের পরম সুহৃৎ। যিনি এই রহস্য জানেন তিনিই প্রকৃত বিদ্বান এবং এই বিদ্যার প্রভাবেই তিনি সারা জগতের গুরু হতে পারেন। যিনি প্রকৃতপক্ষে সদ্‌গুরু, তিনি শ্রীকৃষ্ণের প্রতিনিধি এবং শ্রীকৃষ্ণ থেকে অভিন্ন।”
দেবর্ষি নারদ বললেন- “হে পুরুষশ্রেষ্ঠ! আপনি যে প্রশ্ন করেছিলেন, তার উত্তর আমি প্রদান করলাম। এখন সাধুসম্মত এবং অত্যন্ত গোপনীয় আর একটি বিষয় আমি বলছি, সেই কথা শ্রবণ করুন।”
“হে রাজন! ঐ হরিণটিকে দেখুন, যে সুন্দর পুষ্পোদ্যানে তার স্ত্রীর সঙ্গে মনের আনন্দে ঘাস খাচ্ছে। সেই উদ্যানে সে লুব্ধকর্ণ হয়ে ভ্রমরের মধুর গীত শ্রবণ করছে। তার অবস্থা একবার বিবেচনা করে দেখুন। সে জানে না তার সম্মুখে একটি বাঘ, যে অন্যের মাংস আহার করে জীবন ধারণ করে। সেই হরিণটির পশ্চাতে এক ব্যাধ, যে তার তীক্ষ্ণ বাণের দ্বারা তাকে বিদ্ধ করতে উদ্যত হয়েছে। এই সেই হরিণের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। হে রাজন! স্ত্রীলোকেরা ঠিক পুষ্পের মতো প্রথমে অত্যন্ত আকর্ষণীয় কিন্তু চরমে অত্যন্ত ক্লেশদায়ক। জীব স্ত্রীলোকের প্রতি কামাসক্ত হয়ে জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। মানুষ যেভাবে ফুলের সৌরভ উপভোগ করে, ঠিক সেইভাবে সে মৈথুনসুখ উপভোগ করে। এইভাবে সে জিহ্বা থেকে উপস্থ পর্যন্ত ইন্দ্রিয়সুখের জীবন উপভোগ করে এবং তার ফলে সে তার গৃহস্থ-জীবনকে অত্যন্ত সুখদায়ক বলে মনে করে। পত্নীর সঙ্গে মিলিত হয়ে সে সর্বদা ইন্দ্রিয়সুখের চিন্তায় মগ্ন থাকে। তার পত্নী ও শিশুদের আলাপ তার কাছে অত্যন্ত শ্রুতিমধুর বলে মনে হয়, যা ঠিক ফুলে ফুলে মধু আহরণকারী ভ্রমরের মধুর গুঞ্জনের মতো। সে ভুলে যায় যে তার সম্মুখে রয়েছে কাল, যা দিন ও রাত্রির মাধ্যমে তার আয়ু হরণ করছে। সে দেখতে পায় না যে, ধীরে ধীরে তার আয়ু ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে এবং সে মৃত্যুর নিয়ন্তা যমরাজকে একেবারেই গ্রাহ্য করে না, যিনি পশ্চাৎ দিক থেকে তাকে হত্যা করার চেষ্টা করছেন। এই কথা হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করুন। আপনি অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে রয়েছেন এবং চতুর্দিক থেকে সঙ্কটাপন্ন হয়েছেন। হে রাজন! আপনি হরিণের রূপকটি কেবল হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করুন। আত্মচেতনায় মগ্ন হয়ে, সকাম কর্মের দ্বারা স্বর্গলোকে উন্নীত হওয়া শ্রবণসুখ পরিত্যাগ করুন। মৈথুন আকাঙ্ক্ষায় পূর্ণ গৃহস্থ-জীবন পরিত্যাগ করুন এবং স্ত্রী পুরুষের আখ্যান শ্রবণের বাসনা পরিত্যাগ করে জীবন্মুক্ত ভগবদ্ভক্তের কৃপায় ভগবানের আশ্রয় অবলম্বন করুন। এইভাবে জড় জগতের আসক্তি থেকে মুক্ত হোন।”
রাজা বললেন- “হে ব্রাহ্মণ! আপনি যা বলেছেন তা আমি অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করেছি এবং সেই সম্বন্ধে বিচার করে আমি স্থির করেছি যে, কর্মকাণ্ড অনুষ্ঠান করতে উপদেশ দিয়েছিলেন যে-সমস্ত আচার্যগণ, তাঁরা এই গুহ্য জ্ঞান সম্বন্ধে অবগত নন। তাঁরা যদি সেই সম্বন্ধে অবগত হতেন, তা হলে কেন তাঁরা আমাকে সেই সম্বন্ধে উপদেশ দেননি? হে ব্রাহ্মণ! আমার কর্ম-উপদেষ্টা গুরুগণের বাক্যের সঙ্গে আপনার বাক্যের বিরোধ রয়েছে। আমি এখন ভক্তি, জ্ঞান এবং বৈরাগ্যের পার্থক্য হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছি। পূর্বে আমার সেই সম্বন্ধে কিছু সংশয় ছিল, কিন্তু আপনি কৃপাপূর্বক সেই সমস্ত সংশয় ছিন্ন করেছেন। আমি এখন বুঝতে পারছি মহান ঋষিরাও কিভাবে জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্বন্ধে মোহাচ্ছন্ন। নিঃসন্দেহে, ইন্দ্রিয়তৃপ্তিসাধনের কোন প্রশ্নই ওঠে না। জীব এই জীবনে যা কিছু করে, তার ফল সে পরবর্তী জীবনে ভোগ করে। বেদবিদ্দের সিদ্ধান্ত হচ্ছে যে, জীব তার পূর্বকৃত কর্মের ফল ভোগ করে। কিন্তু ব্যবহারিকভাবে এও দেখা যায় যে, পূর্ববর্তী জন্মে যে শরীরের দ্বারা কর্ম করা হয়েছে তা ইতিমধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে। অতএব অন্য শরীরে তার ফলভোগ করা কি করে সম্ভব?”
দেবর্ষি নারদ বললেন- “জীব এই জীবনে স্থূল শরীরের মাধ্যমে কর্ম করে। এই স্থূল শরীর মন, বুদ্ধি এবং অহঙ্কার দ্বারা গঠিত সূক্ষ্ম দেহের দ্বারা কর্ম করতে বাধ্য হয়। স্থূল শরীরের বিনাশের পরেও সূক্ষ্ম শরীর থাকে এবং তা সুখ ও দুঃখ ভোগ করে। এইভাবে কোন পরিবর্তন হয় না। স্বপ্নাবস্থায় জীব তার প্রকৃত শরীর ত্যাগ করে। তার মন এবং বুদ্ধির কার্যকলাপের দ্বারা সেই অন্য একটি দেব-শরীরে অথবা পশু-শরীরে সক্রিয় হয়। ঠিক তেমনই স্থ’ল শরীর পরিত্যাগ করার পর, জীব এই লোকে অথবা অন্য লোকে দেব, তির্যক আদি যোনি প্রাপ্ত হয়। এইভাবে সে তার পূর্ব জন্মের কর্মফল ভোগ করে। জীব দেহাত্মবুদ্ধির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে “আমি এই, আমি ঐ, এটি আমার কর্তব্য, তাই আমি এটি করব”- এই প্রকার ধারণার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কর্ম করে। এগুলি সবই হচ্ছে মনোধর্ম এবং এই সমস্ত কার্যকলাপ অনিত্য; তা সত্ত্বেও ভগবানের কৃপায় জীব তার সমস্ত মনোরথ পূর্ণ করার সুযোগ পায়। এইভাবে সে আর একটি শরীর প্রাপ্ত হয়। জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং কর্মেন্দ্রিয়- এই দুই প্রকার ইন্দ্রিয়ের কার্যকলাপের দ্বারা জীবের চেতনা বা মনোভাব বোঝা যায়। তেমনই মনোবৃত্তি বা চেতনার দ্বারা মানুষের পূর্ববর্তী জীবনের কার্যকলাপ অনুমান করা যায়। কখনও কখনও হঠাৎ এমন কোন অনুভূত হয়, যা বর্তমান শরীরের মাধ্যমে কখনও দেখা বা শোনা যায়নি। কখনও কখনও হঠাৎ স্বপ্নে আমরা তা দর্শন করি। অতএব হে রাজন্! সূক্ষ্ম মানসিক আবরণ সমন্বিত জীব তার পূর্বদেহ সম্বন্ধজনিত নানা প্রকার চিন্তা এবং অনুভূতি অনুভব করে। নিশ্চিতভাবে জেনে রাখুন যে, পূর্ববর্তী শরীরের অভিজ্ঞতা ব্যতীত মনের দ্বারা কোন কিছুর কল্পনা করা সম্ভব নয়।”
“হে রাজন্! আপনার মঙ্গল হোক! প্রকৃতির সঙ্গ অনুসারে এই মন জীবের বিশেষ প্রকার শরীর প্রাপ্ত হওয়ার কারণ। মানুষের মানসিক অবস্থা থেকে বোঝা যায় সে পূর্ব জন্মে কি রকম ছিল এবং ভবিষ্যতে কি প্রকার শরীর প্রাপ্ত হবে। এইভাবে মন অতীত এবং ভবিষ্যৎ শরীরসমূহ ইঙ্গিত করে। কখনও স্বপ্নে আমরা এমন কিছু দর্শন করি, যা এই জীবনে কখনও দেখা যায়নি অথবা শোনা যায়নি, কিন্তু ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন স্থানে এবং ভিন্ন পরিস্থিতিতে এই সমস্ত ঘটনাগুলির অভিজ্ঞতা হয়েছে। জীবের মন বিভিন্ন স্থূল শরীরে অবস্থান করে এবং ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের বাসনা অনুসারে মন বিভিন্ন চিন্তা অঙ্কিত করে। মনে সেগুলি বিভিন্ন প্রকার সমন্বয়ের মাধ্যমে আবির্ভূত হয়; তাই এই সমস্ত দৃশ্যগুলি এমনভাবে প্রকট হয়, যেন মনে হয় পূর্বে কখনও সেগুলি দেখা যায়নি অথবা শোনা যায়নি। কৃষ্ণভক্তির অর্থ হচ্ছে এমন মানসিক অবস্থা নিয়ে নিরন্তর পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গ করা, যাতে ভগবান যেভাবে জড় জগৎকে দর্শন করেন, ঠিক সেইভাবে ভক্ত তা দর্শন করতে পারেন। এই প্রকার দর্শন সর্বদা সম্ভব নয়, কিন্তু তা ঠিক তমসাবৃত গ্রহ রাহুর মতো, যা কেবল পূর্ণ চন্দ্রের উপস্থিতিইে দেখা যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত বুদ্ধি, মন, ইন্দ্রিয়, তন্মাত্র এবং জড়া প্রকৃতির গুণসমূহের পরিনাম সূক্ষ্ম দেহ বর্তমান থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত অহঙ্কার এবং স্থূল দেহ বর্তমান থাকে। গভীর নিদ্রা, মূর্ছা, প্রবল ক্ষতির ফলে প্রচণ্ড শোক, মৃত্যুর সময়, অথবা যখন প্রবল জ্বর হয় তখন প্রাণবায়ুর সঞ্চারণ প্রতিহত হয়। তখন জীবের দেহাত্মবুদ্ধি হারিয়ে যায় অর্থাৎ সে তার দেহকে তার স্বরূপ বলে মনে করে না। যৌবনে দশটি ইন্দ্রিয় এবং মন সম্পূর্ণরূপে ব্যক্ত হয়। কিন্তু মাতৃগর্ভে ও বাল্যাবস্থায় সেই সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলি এবং মন অমাবস্যার চাঁদের মতো আবৃত থাকে। জীব যখন স্বপ্ন দেখে, তখন ইন্দ্রিয়ের বিষয়গুলি প্রকৃতপক্ষে থাকে না, কিন্তু তা সত্ত্বেও ইন্দ্রিয়ের বিষয়ের সঙ্গের ফলে সেগুলি প্রকাশিত হয়। তেমনই, অবিকশিত ইন্দ্রিয়-সমন্বিত জীব প্রকৃতপক্ষে ইন্দ্রিয়ের বিষয়ের সংস্পর্শে না থাকলেও, সংসার থেকে তার মুক্তি হয় না। পঞ্চ তন্মাত্র, পঞ্চ ইন্দ্রিয়, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং মন- এই ষোলটি জড় বিস্তার। এগুলি জীবের সঙ্গে একত্রে প্রকৃতির তিনটি দ্বারা প্রভাবিত হয়। এটিই হচ্ছে বদ্ধ জীবের অস্তিত্ব। সূক্ষ্ম শরীরের দ্বারা জীব স্থ’ল শরীর প্রাপ্ত হয় এবং তা ত্যাগ করে। তাকে বলা হয় আত্মার দেহান্তর। এইভাবে আত্মা বিভিন্ন প্রকার হর্ষ, শোক, ভয়, সুখ এবং দুঃখ ভোগ করে। শুঁয়াপোকা যেমন একটি পাতা অবলম্বন করে পূর্ববর্তী পাতা পরিত্যাগ করে, তেমনই, জীব তার পূর্ববর্তী কর্ম অনুসারে, অন্য আর একটি শরীর অবলম্বন করে তার বর্তমান শরীর ত্যাগ করে। তার কারণ, মন হচ্ছে সর্বপ্রকার বাসনার আগার। যতক্ষণ পযন্ত আমরা ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ করতে চাই, ততক্ষণ অঅমরা জড়-জাগতিক কার্যকলাপ সৃষ্টি করি। জীব যখন জড় ক্ষেত্রে কর্ম করে, তখন সে ইন্দ্রিয়সুখ উপভোগ করতে চায় এবং ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ করার সময় সে জড় কর্মের শৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। এইভাবে জীব জড়-জগতের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকে। সর্বদা মনে রাখুন যে, এই জগতের সৃষ্টি, স্থিতি এবং প্রলয় পরমেশ্বর ভগবানের ইচ্ছার দ্বারা সংঘঠিত হয়। তার ফলে এই জগতের সমস্ত বস্তুই ভগবানের নিয়ন্ত্রণাধীন। এই দিব্য জ্ঞানের আলোক প্রাপ্ত হয়ে সর্বদা ভগবানের সেবায় যুক্ত হওয়া উচিত।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “মহাভাগবত ভগবান নারদ এইভাবে মহারাজ প্রাচীনবর্হির কাছে জীব এবং ভগবানের স্বরূপ সম্বন্ধে উপদেশ দিয়ে, রাজাকে আমন্ত্রণ করে সিদ্ধলোকে গমন করলেন। তাঁর মন্ত্রীদের উপস্থিতিতে রাজর্ষি প্রাচীনবর্হি তাঁর পুত্রদের জন্য নাগরিকদের রক্ষা করার আদেশ রেখে, গৃহত্যাগ করে তপস্যা করার জন্য কপিলাশ্রম তীর্থে গমন করেছিলেন। কপিলাশ্রমে তপস্যা করে রাজা প্রাচীনবর্হি সমস্ত জড় উপাধি থেকে পূর্ণরূপে মুক্ত হয়েছিলেন। তিনি নিরন্তর ভগবানের প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত হয়ে, ভগবৎসারূপ্য লাভ করেছিলেন।”
“হে বিদুর! জীবের আধ্যাত্মিক স্থিতি সম্বন্ধে দেবর্ষি নারদ বর্ণিত এই আখ্যান যিনি শ্রবণ করেন এবং কীর্তন করেন, তিনি দেহাত্মবুদ্ধি থেকে মুক্ত হবেন। দেবর্ষি নারদের মুখনিঃসৃত এই উপাখ্যান ভগবান মুকুন্দের যশে পরিপূর্ণ। তাই এই উপাখ্যান যখন বর্ণিত হয়, তখন তা নিশ্চিতভাবেই এই জড় জগৎকে পবিত্র করে। তা জীবের হৃদয় পবিত্র করে এবং তাকে তার চিন্ময় স্বরূপ লাভ করতে সাহায্য করে। যিনি এই দিব্য আখ্যান বর্ণনা করেন, তিনি সমস্ত জড় বন্ধন থেকে মুক্ত হন এবং তাঁকে আর এই জড় জগতে ভ্রমণ করতে হয় না। আধ্যাত্মিক তত্ত্বজ্ঞানে পূর্ণ মহারাজ পুরঞ্জনের এই প্রামাণিক রূপকটি আমি আমার গুরুদেবের কাছে শ্রবণ করেছি। কেউ যদি এই রূপকের উদ্দেশ্য হৃদয়ঙ্গম করতে পারে, তা হলে তিনি অবশ্যই দেহাত্মবুদ্ধি থেকে মুক্ত হবেন এবং পারলৌকিক জীবন সম্বন্ধে স্পষ্টভাবে অবগত হতে পারবেন। কেউ যদি আত্মার দেহান্তর সম্বন্ধে অজ্ঞও হন, তবুও তিনি এই আখ্যানটি অধ্যয়ন করার ফলে তা পূর্ণরূপে হৃদয়ঙ্গম করতে পারবেন। শরীর, স্ত্রী এবং সন্তান-সন্ততিদের প্রতিপালনের চেষ্টা পশুদের মধ্যেও দেখা যায়। এই সমস্ত ব্যাপার সামলানোর বুদ্ধি পশুদের মধ্যেও পূর্ণরূপে রয়েছে। মানুষ যদি কেবল এই সমস্ত বিষয়ে উন্নত হয়, তা হলে তার সঙ্গে একটি পশুর পার্থক্য কোথায়? ক্রমবিবর্তনের পন্থায় বহু জন্ম-জন্মান্তরের পর যে এই মনুষ্য-জীবন লাভ হয়েছে, তা অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে হৃদয়ঙ্গম করা উচিত। যে বুদ্ধিমান মানুষ স্থূল এবং সূক্ষ্ম শরীরের দেহাত্মবুদ্ধি ত্যাগ করেছেন, তিনি চিন্ময় জ্ঞানের আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে, ভগবানেরই মতো চিন্ময় স্বরূপে অধিষ্ঠিত হন। জীবের যদি কৃষ্ণে ভক্তি, জীবে দয়া এবং আত্ম-তত্ত্বজ্ঞান পূর্ণরূপে বিকশিত হয়, তা হলে তিনি তৎক্ষণাৎ সংসার বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করবেন। কালের অন্তর্গত অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতে যা কিছু হয় তা সবই স্বপ্নবৎ। এটিই হচ্ছে সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রের গূঢ় সিদ্ধান্ত।”

Leave a Reply

September 2025
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  

Blog Stats

  • 140,943 hits