দেবর্ষি নারদ বললেন- “হে মহারাজ প্রাচীনবর্হিষৎ! তারপর ভয় নামক যবনরাজ প্রজ্বার, কালকন্যা এবং তার সৈনিকগণ সহ সারা পৃথিবী বিচরণ করতে লাগলেন। এক সময় সেই ভয়ঙ্কর সৈনিকেরা প্রবলভাবে পুরঞ্জনের নগরী আক্রমণ করেছিল। যদিও সেই নগরীটি ইন্দ্রিয় সুখভোগের সামগ্রীতে পরিপূর্ণ ছিল, কিন্তু তা রক্ষিত হচ্ছিল একটি বৃদ্ধ সর্পের দ্বারা। ভয়ঙ্কর সৈনিকদের সহায়তায়, কালকন্যা ধীরে ধীরে পুরঞ্জনের নগরীর সমস্ত অধিবাসীদের আক্রমণ করেছিল এবং তাদের সর্বতোভাবে নিষ্ক্রিয় করেছিল। কালকন্যা যখন দেহ আক্রমণ করল, তখন যবনরাজের ভয়ঙ্কর সৈনিকেরা বিভিন্ন দ্বার দিয়ে সেই নগরীতে প্রবেশ করেছিল এবং তারা সমস্ত নাগরিকদের প্রবলভাবে পীড়ন করতে শুরু করেছিল। নগরীটি যখন এইভাবে কালকন্যা ও সৈনিকদের দ্বারা বিপদ্গ্রস্ত হয়েছিল, তখন রাজা পুরঞ্জন তার আত্মীয়-স্বজনদের মমতায় অত্যন্ত আকুল হয়ে, যবনরাজ ও কালকন্যার আক্রমণে বহু প্রকার ক্লেশ ভোগ করতে লাগলেন। কালকন্যার দ্বারা আলিঙ্গিত হওয়ার ফলে, রাজা পুরঞ্জন তাঁর সমস্ত সৌন্দর্য ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেন। রতিক্রিয়ায় অত্যন্ত আসক্ত হওয়ার ফলে, তাঁর বুদ্ধি ভ্রষ্ট হয়েছিল এবং সমস্ত ঐশ্বর্য বিনষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এইভাবে সবকিছু হারিয়ে, তিনি গন্ধর্ব ও যবনদের দ্বারা বলপূর্বক পরাভূত হয়েছিলেন। রাজা পুরঞ্জন তখন দেখলেন যে, তাঁর নগরীর সমৃদ্ধি নষ্ট হয়েছে এবং তাঁর পুত্র, পৌত্র, ভৃত ও অমাত্যেরা ধীরে ধীরে তাঁর বিরোধিতা করতে শুরু করেছে। তিনি এও দেখলেন যে, তাঁর পত্নী তাঁর প্রতি প্রীতিরহিত এবং উদাসীন হয়ে গেছে। রাজা পুরঞ্জন যখন দেখলেন যে, তাঁর আত্মীয়স্বজন, ভৃত্য, অমাত্য আদি সকলেই তাঁর বিরোধী হয়ে গেছে, তখন তিনি অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু তিনি সেই পরিস্থিতির সংশোধন করতে পারলেন না, কারণ তিনি কালকন্যার দ্বারা সম্পূর্ণভাবে অভিভূত হয়েছিলেন। কালকন্যার প্রভাবে ইন্দ্রিয়-সুখভোগের সমস্ত বিষয়গুলি বিস্বাদ হয়ে যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও হৃদয়ে কামবাসনা থাকার ফলে, রাজা পুরঞ্জন সর্বতোভাবে অত্যন্ত দরিদ্র হয়ে যান। জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য যে কি তা তিনি বুঝতে পারেননি। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর পত্নী ও পুত্রদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল হওয়ার ফলে, তাদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হন। গন্ধর্ব ও যবন সৈনিকদের দ্বারা পুরঞ্জনের নগরী বিধ্বস্ত হয়েছিল এবং সেই নগরী পরিত্যাগ করার বাসনা না থাকলেও, পরিস্থিতিবশত তাঁকে তা করতে হয়েছিল, কারণ তা কালকন্যার দ্বারা বিদ্বস্ত হয়েছিল। তখন ভয়ের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা প্রজ্বার তার ভ্রাতার প্রসন্নতা বিধানের জন্য সেই নগরীতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। সেই নগরী যখন দগ্ধ হচ্ছিল, তখন সমস্ত নাগরিকেরা, রাজার ভৃত্যরা, আত্মীয়-স্বজনেরা, পুত্র, পৌত্র, পত্নী এবং অন্যান্য কুটুম্বগণ সেই আগুনে দগ্ধ হতে লাগল। রাজা পুরঞ্জন তার ফলে অত্যন্ত দুঃখিত হয়েছিলেন। সেই নগরীর রক্ষক সর্পটি যখন দেখল যে, নাগরিকেরা কালকন্যার দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে এবং যবনেরা তার গৃহে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে, সে অত্যন্ত শোকে সে কাতর হয়ে পড়েছিল। বনে আগুন লাগলে বৃক্ষের কোটরস্থ সর্প যেমন সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছা করে, তেমনই নগরীর অধ্যক্ষ সর্পটিও অগ্নির প্রচণ্ড তাপের ফলে, সেই নগরী ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিল। যখন গন্ধর্ব ও যবন সৈনিকেরা তাঁর দেহের শক্তিকে সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত করে ফেলছিল, তখন সেই সর্পটির শরীর শিথিল হয়ে গিয়েছিল। সে যখন তার দেহটি ত্যাগ করার চেষ্টা করে, তখন তার শত্রুরা তাকে আটকে ফেলে। এইভাবে তার সমস্ত প্রচেষ্টা যখন ব্যর্থ হয়েছিল, তখন সে উচ্চস্বরে ক্রন্দন করতে শুরু করেছিল। রাজা পুরঞ্জন তখন তাঁর কন্যা, পুত্র, পৌত্র, পুত্রবধু, জামাতা, ভৃত্য, অন্যান্য পার্ষদ, গৃহ, গৃহের উপকরণ এবং যৎসামান্য সঞ্চিত ধন-সম্পদের কথা চিন্তা করতে শুরু করলেন। রাজা পুরঞ্জন তাঁর পরিবার এবং ‘আমি’ ও ‘আমার’ ধারণার প্রতি অত্যন্ত আসক্ত ছিলেন। যেহেতু তিনি তাঁর পত্নীর প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন, তাই তিনি ইতিপূর্বেই অত্যন্ত দারিদ্রগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। এখন তার সঙ্গে বিচ্ছেদের সময় উপস্থিত হওয়ায়, তিনি অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়লেন। রাজা পুরঞ্জন অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে ভাবতে লাগলেন, ‘হায়, আমার পত্নী এতগুলি সন্তানের ভারে ভারাক্রান্ত। আমি দেহত্যাগ করে অন্য লোকে চলে গেলে, সে কিভাবে পরিবারের এই সমস্ত আত্মীয়-স্বজনদের পালন করবে? হায়! পরিবার প্রতিপালনের দুশ্চিন্তায় সে না জানি কত কষ্ট পাবে।’ রাজা পুরঞ্জন তাঁর পত্নীর সঙ্গে তাঁর পূর্ব আচরণের কথা মনে করতে লাগলেন। রাজা ভাবতে লাগলেন- ‘আমি আহার না করা পর্যন্ত সে আহার করত না, আমি স্নান না করা পর্যন্ত সে স্নান করত না এবং সে আমার প্রতি এতই অনুরক্ত ছিল যে, কখনও কখনও আমি ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে ভর্ৎসনা করলে, সে নীরবে আমার সেই দুর্ব্যবহার সহ্য করত।’ ”
রাজা পুরঞ্জন ভাবতে লাগলেন- “আমি যখন মোহাচ্ছন্ন হতাম, তখন আমার পত্নী কিভাবে আমাকে সৎ পরামর্শ প্রদান করত এবং আমি গৃহ থেকে বাইরে চলে গেলে, সে অত্যন্ত শোকাচ্ছন্ন হত। যদিও সে বহু সন্তানের জননী, তবুও আমার আশঙ্কা এই যে, গৃহস্থালির দায়-দায়িত্বগুলি বহন করতে সে কি সক্ষম হবে? আমি পরলোকে গমন করলে, সম্পূর্ণরূপে আমার উপর নির্ভরশীল আমার পুত্র ও কন্যারা কিভাবে জীবন ধারণ করবে? মাঝসমুদ্রে নৌকা ভগ্ন হলে আরোহীদের যে অবস্থা হয়, তাদের অবস্থাও ঠিক সেই রকম হবে।” যদিও পত্নী এবং সন্তান-সন্ততিদের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে রাজা পুরঞ্জনের শোক করা উচিত ছিল না, তবুও তাঁর দীন বুদ্ধির ফলে তিনি তা করেছিলেন। সেই সময় ভয় নামক যবনরাজ তাঁকে বন্দি করার জন্য সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। যবনেরা যখন রাজা পুরঞ্জনকে একটি পশুর মতো বন্ধন করে তাঁকে তাদের স্থানে নিয়ে যেতে লাগল, তখন রাজার অনুচরেরা অত্যন্ত ব্যাকুল হয়েছিল। তারা যখন শোক করছিল, তখন তাদেরও তার সঙ্গে জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তখন সেই সর্পটিও, যাকে যবনরাজের সৈন্যরা বন্দি করে পূর্বেই নগরী থেকে বের করে নিয়ে গিয়েছিল, অন্যদের সঙ্গে সেও তার প্রভুকে অনুসরণ করতে লাগল। তারা যখন সেই নগরীটি ত্যাগ করল, তখনই তা বিশীর্ণ হয়ে পঞ্চভূতে বিলীন হল।’ অত্যন্ত বলবান যবনেরা যখন বলপূর্বক রাজা পুরঞ্জনকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন অজ্ঞানের অন্ধকারে আচ্ছন্ন থাকার ফলে, তিনি তাঁর সখা এবং নিত্য শুভাকাঙ্ক্ষী পরমাত্মাকে স্মরণ করতে পারেননি। সেই অত্যন্ত নির্দয় রাজা পুরঞ্জন বিভিন্ন যজ্ঞে বহু পশুহত্যা করেছিলেন। এখন সেই সমস্ত পশুরা সুযোগ পেয়ে তাদের শিং-এর দ্বারা তাঁকে বিদীর্ণ করতে লাগল। যেন তারা কুঠার দিয়ে তাঁকে খণ্ড-খণ্ড করে কাটতে লাগল। রমণীর দূষিত সঙ্গ প্রভাবে, রাজা পুরঞ্জনের মতো জীবেরা নিত্যকাল সংসারের কষ্টভোগ করে এবং বহু বহু বছর ধরে স্মৃতিরহিত হয়ে, তারা জড়-জাগতিক জীবনের অন্ধকার প্রদেশে অবস্থান করে।”
“রাজা পুরঞ্জন তাঁর পত্নীর কথা চিন্তা করতে করতে দেহত্যাগ করেছিলেন, তাই তাঁর পরবর্তী জীবনে তিনি এক অতি সুন্দরী এবং উত্তম ললনা হয়েছিলেন। রাজারই গৃহে তিনি পরজন্মে বিদর্ভরাজের কন্যা হন। বিদর্ভরাজের দুহিতা বৈদর্ভীর বিবাহ হয়েছিল পাণ্ডু দেশের মলয়ধ্বজ নামক এক অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যক্তির সঙ্গে। অন্যান্য রাজকুমারদের পরাজিত করে তিনি বিদর্ভ-রাজকন্যাকে বিবাহ করেছিলেন। রাজা মলয়ধ্বজের একটি কন্যা হয়েছিল, যার চক্ষু ছিল অতি কৃষ্ণবর্ণ। তাঁর সাতটি পুত্র-সন্তানও হয়েছিল, যারা পরবর্তী কালে দ্রাবিড়দেশের রাজা হয়েছিলেন। এইভাবে সেই ভূখণ্ডে সাতজন রাজা ছিলেন।”
“হে মহারাজ প্রাচীনবর্হিষৎ! মলয়ধ্বজের পুত্রেরা হাজার হাজার সন্তান উৎপাদন করেছিলেন এবং তাঁরা সকলে মন্বন্তর এবং তার পরেও সারা পৃথিবী পালন করেছিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পরম ভক্ত মলয়দ্বজের প্রথমা কন্যাকে অগস্ত্য মুনি বিবাহ করেছিলেন। তাঁর থেকে একটি পুত্র উৎপন্ন হয়েছিল, যার নাম ছিল দৃঢ়চ্যুত এবং তাঁর পুত্রের নাম ছিল ইধ্মবাহ। তার পর রাজর্ষি মলয়ধ্বজ তাঁর পুত্রদের মধ্যে তাঁর রাজ্য ভাগ করে দিয়ে, একাগ্রচিত্তে শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা করার উদ্দেশ্যে কুলাচল নামক নির্জন স্থানে গমন করেছিলেন। চন্দ্রিকা যেমন চন্দ্রের অনুগমন করে, তেমনই মদির-নয়না বিদর্ভনন্দিনীও গৃহসুখ, পুত্র এবং ভোগ্যসামগ্রী পরিত্যাগ করে, তাঁর পতির অনুগামিনী হয়ে কুলাচলে গিয়েছিলেন। কুলাচলে চন্দ্রবসা, তাম্রপর্ণী এবং বটোদকা নামক নদী প্রবাহিত ছিল। রাজা মলয়ধ্বজ নিয়মিতভাবে সেই পবিত্র নদীগুলিতে গিয়ে স্নান করতেন। তার ফলে তিনি অন্তরে ও বাইরে উভয়ত পবিত্র হয়েছিলেন। তিনি স্নান করে কন্দ, বজী, পাতা, ফুল, মূল, ফল ও ঘাস খেয়ে এবং জলপান করে জীবনধারণ করছিলেন। এইভাবে তিনি কঠোর তপস্যা করেছিলেন এবং তার ফলে তিনি অত্যন্ত কৃশ হয়ে গিয়েছিলেন। তপস্যার দ্বারা রাজা মলয়ধ্বজ তাঁর দেহে এবং মনে ধীরে ধীরে শীত ও উষ্ণ, সুখ ও দুঃখ, বায়ু ও বর্ষা. ক্ষুধা ও তৃষ্ণা, প্রিয় ও অপ্রিয় ইত্যাদি দ্বৈতভাবের প্রতি সমদর্শী হয়েছিলেন। এইভাবে তিনি সমস্ত দ্বন্দ্বভাব জয় করেছিলেন।”
“উপাসনা, তপস্যা, যম ও নিয়মাদির দ্বারা রাজা মলয়ধ্বজ তাঁর অন্তরের সমস্ত মল দগ্ধ করে, তাঁর ইন্দ্রিয়, প্রাণ ও চিত্তকে জয় করেছিলেন। এইভাবে তিনি তাঁর আত্মাকে পরমব্রহ্ম (কৃষ্ণ) রূপী কেন্দ্রবিন্দুতে স্থির করেছিলেন। এইভাবে তিনি এক শত দিব্য বৎসর এক স্থানে স্থাণুর মতো স্থির হয়েছিলেন। তারপর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি শুদ্ধ ভক্তিময়ী আসক্তি লাভ করেছিলেন এবং সেই অবস্থায় স্থির হয়েছিলেন। রাজা মলয়ধ্বজ আত্মা ও পরমাত্মার পার্থক্য হৃদয়ঙ্গম করে পূর্ণ জ্ঞান লাভ করেছিলেন। আত্মা একস্থানে অবস্থিত কিন্তু পরমাত্মা সর্বব্যাপ্ত। তিনি পূর্ণরূপে হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন যে, জড়-দেহ আত্মা নয়, কিন্তু আত্মা হচ্ছে জড় দেহের সাক্ষী। রাজা মলয়ধ্বজ পূর্ণজ্ঞান লাভ করেছিলেন কারণ তাঁর শুদ্ধ স্থিতিতে তিনি স্বয়ং ভগবানের কাছ থেকে উপদেশ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। এই প্রকার দিব্য জ্ঞানের আলোকে তিনি সর্বতোভাবে সব কিছু উপলব্ধি করেছিলেন। এইভাবে রাজা মলয়ধ্বজ দর্শন করেছিলেন যে, পরমাত্মা তাঁর পাশে বসে রয়েছেন এবং জীবাত্মা রূপে তিনিও পরমাত্মার পাশে বসে রয়েছেন। তাঁরা উভয়ে একত্রে থাকার ফলে, তাঁদের ভিন্ন স্বার্থ ছিল না; এইভাবে তিনি জড়-জাগতিক কার্যকলাপ থেকে সম্পূর্ণরূপে নিবৃত্ত হয়েছিলেন। বৈদর্ভী তাঁর পতিকে সর্বতোভাবে পরমেশ্বর ভগবান বলে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সমস্ত ইন্দ্রিয়সুখ ত্যাগ করে, সর্বতোভাবে বৈরাগ্য অবলম্বনপূর্বক তাঁর মহাভাগবত পতিকে অনুসরণ করেছিলেন। এইভাবে তিনি তাঁর সেবায় যুক্ত ছিলেন। ব্রত অনুষ্ঠানের ফলে বিদর্ভরাজের কন্যার শরীর ক্ষীণ হয়েছিল এবং তিনি জীর্ণ বসন পরিধান করেছিলেন। তাঁর কেশকলাপের যত্ন না নেওয়ার ফলে তা জটাবদ্ধ হয়েছিল। যদিও তিনি সর্বদা তাঁর পতির নিকটে থাকতেন, তবুও তিনি অবিচল দীপশিখার মতো মৌন এবং উজ্জ্বলরূপে অবস্থান করতেন। বিদর্ভনন্দিনী তাঁর পতি যে দেহত্যাগ করেছেন তা বুঝতে না পারা পর্যন্ত, স্থির আসনে উপবিষ্ট তাঁর পতির সেবা করে যেতে লাগলেন। তিনি যখন তাঁর পতির পদসেবা করছিলেন, তখন তিনি উষ্ণতা অনুভব না করার ফলে বুঝতে পেরেছিলেন যে, তিনি দেহত্যাগ করেছেন। তখন তিনি তাঁর পতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকিনী হওয়ার ফলে, যূথভ্রষ্টা হরিণীর মতো ব্যাকুল হয়েছিলেন। সেই বিদর্ভনন্দিনী অরণ্যে তাঁর বৈধব্য দশার নিমিত্ত শোক করতে করতে অবিরাম অশ্রুধারায় স্তনযুগল সিক্ত করে, উচ্চস্বরে রোদন করতে শুরু করলেন।”
“হে রাজর্ষে! উঠুন! উঠুন! দেখুন, জলধি বেষ্টিতা ধরিত্রী দস্যু এবং তথাকথিত রাজাতে ভরে গেছে। তাই ধরিত্রী অত্যন্ত ভীতা হয়েছেন এবং আপনার কর্তব্য হচ্ছে তাঁকে রক্ষা করা। পতির অনুগামিনী সেই পতিব্রতা স্ত্রী সেই নির্জন অরণ্যে তাঁর পতির পদযুগলে পতিতা হয়ে, করুণ স্বরে রোদন করতে লাগলেন। তখন তাঁর চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় অশ্রু ঝড়ে পরছিল। তারপর তিনি কাঠ দিয়ে চিতা রচনা করে তাতে তাঁর পতির কলেবর প্রদীপ্ত করে বিলাপ করতে করতে তাঁর পতির অনুসরণে সহমরণে কৃসংকল্প হয়েছিলেন।”
“হে রাজন্! তখন রাজা পুরঞ্জনের এক পূর্বতন সখা ব্রাহ্মণ সেখানে এসে, মধুর বাক্যের দ্বারা রাণীকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন।”
ব্রাহ্মণ জিজ্ঞাসা করলেন- “তুমি কে? তুমি কার পত্নী অথবা কন্যা? এই শায়িত পুরুষটি কে? মনে হচ্ছে যেন তুমি এই মৃত শরীরের জন্য শোক করছ। তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ না? আমি তোমার চিরকালের বন্ধু। তোমার স্মরণ হতে পারে যে, পূর্বে তুমি বহুবার আমার সঙ্গে পরামর্শ করেছিলে। হে বন্ধু! যদিও তুমি আমাকে এখনও চিনতে পারছ না, তোমার কি মনে পড়ে না যে, পূর্বে তোমার এক অতি অন্তরঙ্গ সখা ছিল? দুর্ভাগ্যবশত তুমি আমার সঙ্গ পরিত্যাগ করে, এই জগতের ভোক্তার পদ গ্রহণ করেছ। হে প্রিয় সখা! তুমি আর আমি ঠিক দুটি হংসের মতো। আমরা দুজনে একত্রে একই হৃদয়ে বাস করি, যা ঠিক মানস সরোবরের মতো যদিও আমরা বহু সহস্র বৎধর ধরে একসঙ্গে রয়েছি, তবুও আমরা আমাদের প্রকৃত আলয় থেকে বহু দূরে হে সখে! তুমি আমার সেই বন্ধু। যখন থেকে তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেছ, তখন থেকে তুমি ক্রমশ জড় বিষয়ের প্রতি আসক্ত হয়েছ এবং আমাকে বিস্মৃত হয়ে, কোন স্ত্রীর দ্বারা রচিত এই জড় জগতে বিভিন্ন দেহে তুমি ভ্রমণ করছ। সেই নগরীর (জড় শরীরের) পাঁচটি উদ্যান, নয়টি দ্বার, একজন রক্ষক, তিনটি কোষ্ঠ, ছয়টি পরিবার, পাঁচটি দোকান, পাঁচটি উপাদান এবং একজন স্ত্রী তার অধীশ্বরী।”
“হে সখে! পাঁচটি উদ্যান হচ্ছে ইন্দ্রিয় সুখভোগের পাঁচটি বিষয় এবং তাঁর রক্ষক হচ্ছে প্রাণবায়ু, যা নয়টি দ্বার দিয়ে প্রবাহিত হয়। তিনটি কোষ্ঠ হচ্ছে তিনটি প্রধান উপাদান- অগ্নি, জল ও মাটি। ছয়টি পরিবার হচ্ছে মন ও পঞ্চেন্দ্রিয়। পাঁচটি বিপণি হচ্ছে পাঁচটি কর্মেন্দ্রয়। সেগুলি পঞ্চ-মহাভূতের সংযুক্ত শক্তির দ্বারা তাদের ব্যবসা করে। সমস্ত কার্যকলাপের পিছনে রয়েছে আত্মা। আত্মা হচ্ছে ভোক্ত এবং সে হচ্ছে পুরুষ। কিন্তু শরীর-রূপী নগরীতে আচ্ছাদিত হওয়ার ফলে, সে তার স্বরূপ জানতে পারে না। হে সখে! তুমি যখন বিষয়-বুদ্ধিরূপা রমণীর সঙ্গে এই শরীর প্রবেশ করেছ, তখন থেকেই তুমি ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত হয়েছ। এই কারণে, তুমি তোমার চিন্ময় জীবনের কথা ভুলে গেছ। তার ফলে তুমি এই প্রকার পাপীয়সী দশা প্রাপ্ত হয়ে, নানা প্রকার দুঃখ-কষ্ট ভোগ করছ। প্রকৃতপক্ষে, তুমি বিদর্ভরাজের কন্যা নও, এই মলয়ধ্বজ তোমার হিতকারী পতি নয়। তুমি পুরঞ্জনীরও পতি নও। তুমি কেবল নবদ্বার সমন্বিত এই দেহে অবরুদ্ধ হয়েছ। কখনও তুমি নিজেকে একজন পুরুষ বলে মনে কর, কখনও বা একজন সতী স্ত্রী বলে মনে কর, আবার কখনও নপুংসক বলে মনে কর। তার কারণ হচ্ছে শরীর, যা মায়ার দ্বারা সৃষ্ট। এই মায়া আমারই শক্তি এবং প্রকৃতপক্ষে তুমি ও আমি, আমরা দুজনেই শুদ্ধ চিন্ময় আত্মা। আমি তোমাকে আমাদের বাস্তবিক স্থিতি সম্বন্ধে বোঝাতে চেষ্টা করছি, তা বুঝতে চেষ্টা কর। হে প্রিয় সখা! আমি এবং তুমি, পরমাত্মা এবং আত্মা গুণগতভাবে অভিন্ন, কারণ আমরা উভয়েই চিন্ময়। হে সখে! প্রকৃতপক্ষে তোমার প্রকৃত স্বরূপে তুমি গুণগতভাবে আমার থেকে ভিন্ন নও। সেই কথাটি বোঝার চেষ্টা কর। যারা প্রকৃতই বিদ্বান এবং জ্ঞানবান, তারা তোমার এবং আমার মধ্যে কোন গুণগত পার্থক্য দর্শন করে না। মানুষ যেমন দর্পণে তার নিজের প্রতিবিম্বকে তার থেকে অভিন্নরূপে দর্শন করে, কিন্তু অন্যেরা দুটি শরীর দর্শন করে, তেমনই জড়-জাগতিক পরিস্থিতিতে, যাতে জীব লিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও লিপ্ত নয়, ভগবান এবং জীবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এইভাবে উভয় হংসই হৃদয়ে বিরাজ করে। একটি হংস যখন অন্য হংসের দ্বারা উপদিষ্ট হয়, তখন সে তার স্বরূপে অবস্থিত হয়। অর্থাৎ সে তার কৃষ্ণচেতনা ফিরে পায়, যা সে জড় আসক্তির ফলে হারিয়েছিল। হে মহারাজ প্রাচীনবর্হি! সর্ব-কারণের পরম কারণ পরমেশ্বর ভগবান পরোক্ষরূপে উপলব্দ হন বলে বিখ্যাত। তাই আমি আপনার কাছে এই পুরঞ্জনের কাহিণী বর্ণনা করেছি। প্রকৃতপক্ষে এটি আত্ম-উপলব্ধির উপদেশ।”
অষ্টবিংশতি অধ্যায়- পরবর্তী জন্মে পুরঞ্জনের স্ত্রীত্ব প্রাপ্তি
07 Sep 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, চতুর্থ স্কন্ধ- ভগবদ্ভক্তদের প্রতি অনুগ্রহ