দেবর্ষি নারদ বললেন- “হে রাজন্! বিভিন্নভাবে তাঁর পতিকে মোহিত করে এবং তাঁকে বশীভূত করে, রাজা পুরঞ্জনের পত্নী সর্বপ্রকারে তাঁর সন্তোষবিধান করেছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে মৈথুনসুখ উপভোগ করেছিলেন। রাণী স্নান করে মঙ্গলময় বস্ত্র ও অলঙ্কারে সুসজ্জিতা হয়ে, পান-ভোজনাদির দ্বারা পূর্ণরূপে পরিতৃপ্ত হয়ে রাজার কাছে এসেছিলেন। রাজা তাঁর সুন্দরভাবে সজ্জিত আকর্ষণীয় মুখমণ্ডল দেখে, তাঁকে সাদরে স্বাগত জানিয়েছিলেন। রাণী পুরঞ্জনী যখন রাজাকে আলিঙ্গন করেছিলেন, তখন রাজাও তাঁর বাহুযুগলের দ্বারা তাঁর স্কন্ধদেশ বেষ্টন করেছিলেন। এইভাবে এক নির্জন স্থানে তাঁরা গুহ্য ভাষণ করতে লাগলেন। তখন রাজা পুরঞ্জন তাঁর সুন্দরী পত্নীর দ্বারা অত্যন্ত বিমোহিত হয়েছিলেন এবং তাঁর শুভ চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়েছিলেন। তিনি তখন ভুলে গিয়েছিলেন যে, দিন ও রাত্র অতিবাহিত হয়ে কেবল তাঁর অনর্থক আয়ু ক্ষয় হচ্ছে। এইভাবে অত্যন্ত মোহাচ্ছন্ন হয়ে, রাজা পুরঞ্জন উন্নত চেতনা সমন্বিত হওয়া সত্ত্বেও তার পত্নীর বাহুকে উপাধান করে মহামূল্য শয্যায় সর্বদা শয়ন করে রইলেন। এইভাবে তিনি সেই রমণীকে তাঁর জীবনের পরম লক্ষ্য বলে মনে করতে লাগলেন। অজ্ঞানের দ্বারা অভিভূত হওয়ার ফলে, তিনি আত্মোপলব্ধির তাৎপর্য এবং নিজেকে ও পরমেশ্বর ভগবানকে জানার মাহাত্ম্য উপলব্ধি করতে পারলেন না।”
“হে মহারাজ প্রাচীনবর্হিষৎ! এইভাবে রাজা পুরঞ্জন কাম ও পাপপূর্ণ হৃদয়ে তাঁর পত্নীর সঙ্গে রতিসুখ উপভোগ করতে লাগলেন এবং এইভাবে তাঁর নবযৌবন ক্ষণার্ধের মতো অতিক্রান্ত হয়ে গেল।”
দেবর্ষি নারদ তখন মহারাজ প্রাচীনবর্হিষৎকে বলেছিলেন- “হে বিরাট (দীর্ঘ আয়ুষ্মান)! এইভাবে রাজা পুরঞ্জন তাঁর পত্নী পুরঞ্জনীর গর্ভে এগারো শত পুত্র উৎপাদন করেছিলেন। কিন্তু, এই কার্যে তাঁর জীবনের অর্ধভাগ অতিবাহিত হয়েছিল। হে প্রজাপতি মহারাজ প্রাচীনবর্হিষৎ! এইভাবে পুরঞ্জনের একশ দশটি কন্যাও উৎপন্ন হয়েছিল। তাঁরা সকলেই ছিলেন তাঁদের পিতা ও মাতার মতো যশস্বী। তাঁরা সুশীলা, উদার ও অন্যান্য সদ্গুণাবলী সমন্বিতা ছিলেন। তারপর পঞ্চালপতি রাজা পুরঞ্জন তাঁর পিতৃবংশ বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে তাঁর পুত্রদের উপযুক্ত পত্নীর সঙ্গে বিবাহ দিয়েছিলেন এবং তাঁর কন্যাদেরও যোগ্য বরের সঙ্গে বিবাহ দিয়েছিলেন। পুরঞ্জনের এই সমস্ত পুত্রদের প্রত্যেকের শত-শত পুত্র হয়েছিল। এইভাবে রাজা পুরঞ্জনের পুত্র ও পৌত্রদের দ্বারা পঞ্চাল রাজ্য ভরে গিয়েছিল। রাজা পুরঞ্জনের এই সমস্ত পুত্র ও পৌত্রেরা প্রকৃতপক্ষে তাঁর গৃহ, কোষ, ভৃত্য, সহকারী আদি সমস্ত ধন-সম্পদের লুন্ঠনকারী ছিল। এই সমস্ত বিষয়ের প্রতি পুরঞ্জনের আসক্তি অত্যন্ত গভীর ছিল।”
দেবর্ষি নারদ বললেন- “হে মহারাজ প্রাচীনবর্হিষৎ! আপনার মতো রাজা পুরঞ্জনও বহু কামনাযুক্ত হয়ে বিভিন্ন যজ্ঞের দ্বারা দেবতা, পিতৃ ও ভূতপতিদের পূজা করেছিলেন। সেই সমস্ত যজ্ঞ ছিল অত্যন্ত বীভৎস, কারণ পশুহত্যা করার বাসনায় সেগুলি সম্পাদিত হয়েছিল। এইভাবে রাজা পুরঞ্জন সকাম কর্মের প্রতি ও তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত হয়ে এবং কলুষিত চেতনার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে জীবনের সেই অবস্থায় এসে উপনীত হলেন, যা কামিনীপ্রিয় ব্যক্তিদের কাছে অত্যন্ত অপ্রিয়।”
“হে রাজন্! গন্ধর্বলোকের অধিপতি হচ্ছেন চণ্ডবেগ নামক রাজা। তাঁর অধীনে তিনশ ষাটজন অত্যন্ত শক্তিশালী গন্ধর্ব সৈনিক রয়েছে। চণ্ডবেগের গন্ধর্ব-সৈনিকদের মতো সমসংখ্যক গন্ধর্বী ছিল এবং তারা বারবার ইন্দ্রিয় সুখভোগের সামগ্রীগুলি লুন্ঠন করেছিল। গন্ধর্বরাজ চণ্ডবেগ ও তাঁর অনুচরেরা যখন পুরঞ্জনের নগরী লুন্ঠন করতে শুরু করেছিল, তখন পঞ্চফনা বিশিষ্ট সর্পটি তাদের সেই আক্রমণ প্রতিহত করতে শুরু করেছিল। গন্ধর্বদের সংখ্যা সাতশ কুড়ি হলেও, রাজা পুরঞ্জনের নগরীর অধ্যক্ষ পঞ্চফনা-বিশিষ্ট সর্পটি একাকী তাদের সঙ্গে একশ বছর ধরে যুদ্ধ করেছিল। যেহেতুক তাকে বহু সৈন্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়েছিল এবং তারা সকলেই ছিল এক-একজন বড় যোদ্ধা, তাই পঞ্চফনা-বিশিষ্ট সর্পটি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তাঁর প্রিয়তম বন্ধুকে এইভাবে নিস্তেজ হয়ে পড়তে দেখে, রাজা পুরঞ্জন এবং সেই নগরবাসী তাঁর সমস্ত বন্ধুবান্ধবেরা অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। রাজা পুরঞ্জন পঞ্চাল নামক তাঁর রাজ্যে কর সংগ্রহ করে, নানা প্রকার মৈথুনসুখে মগ্ন থাকতেন। সম্পূর্ণরূপে স্ত্রীর বশীভূত হয়ে তিনি বুঝতে পারেননি যে, তাঁর জীবন অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে এবং তিনি মৃত্যুর সমীপবর্তী হচ্ছেন।”
“হে মহারাজ প্রাচীনবর্হিষৎ! ভয়ঙ্কর কালের কন্যা তখন পতির অন্বেষণে ত্রিলোক ভ্রমণ করছিল, কিন্তু কেউই তাকে গ্রহণ করতে সম্মত হয়নি। কালকন্যা (জরা) তার দুর্ভাগ্যবশত এই জগতে দুর্ভাগা নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। রাজর্ষি পুরু তাকে বরণ করেছিলেন বলে, তাঁর প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে কালকন্যা তাঁকে বর প্রদান করেছিল। আমি যখন সর্বোচ্চ লোক ব্রহ্মলোক থেকে এক সময় এই পৃথিবীতে এসেছিলাম, তখন কালকন্যা ব্রহ্মাণ্ড পর্যটন করছিল এবং আমার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। আমাকে একজন নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী জেনে, তাঁকে অঙ্গীকার করার জন্য সে কামাসক্ত হয়ে আমার কাছে প্রস্তাব করে।”
দেবর্ষি নারদ বলতে লাগলেন- “আমি তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিলাম বলে, সে আমার প্রতি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে এক দুঃসহ অভিশাপ প্রদান করেছিল। সে বলেছিল, ‘হে মুনে! যেহেতু আপনি আমার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলেন, সেই জন্য আপনি কখনও এক স্থানে স্থির হয়ে অবস্থান করতে পারবেন না।’ এইভাবে আমার দ্বারা নিারাশ হয়ে, আমার উপদেশক্রমে সে ভয় নামক যবন রাজার সমীপবর্তী হয়েছিলেন এবং তাঁকে তার পতিরূপে বরণ করেছিল। যবন রাজার কাছে গিয়ে কালকন্যা তাঁকে বলেছিল, “হে বীর! আপনি যবনদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। আমি আপনাকে ভালবাসি, তাই আমি আপনাকে আমার পতিরূপে বরণ করতে চাই। আমি জানি যে, আপনার সঙ্গে সখ্য স্থাপন করলে, কেউ নিরাশ হয় না। যে ব্যক্তি লৌকিক প্রথা বা শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে দান করে না এবং কেউ দান করতে ইচ্ছা করলে তা গ্রহণ করে না, তারা উভয়েই তমোগুণের দ্বারা আচ্ছন্ন। এই প্রকার ব্যক্তিরা অজ্ঞানের পথ অনুসরণ করছে। তাদের অবশ্যই পরিণামে শোক করতে হবে।”
কালকন্যা বলল- “হে ভদ্র! আমি আপনার সেবা করবার জন্য আপনার সম্মুখে উপস্থিত। দয়া করে আমাকে গ্রহণ করে, আমার প্রতি করুণা প্রদর্শন করুন। পুরুষের সর্বশ্রেষ্ঠ কর্তব্য হচ্ছে আর্তের প্রতি করুণা প্রকাশ করা। কালকন্যার কথা শুনে যবনরাজ ঈষৎ হেসে, দৈবের বিধান অনুসারে তাঁর গোপনীয় কর্তব্য সম্পাদন করার উদ্দেশ্যে এক উপায় উদ্ভাবন করেছিলেন। কালকন্যাকে সম্বোধন করে তিনি তখন বলেছিলেন- বহু বিবেচনা করে আমি জানতে পেরেছি কে তোমার পতি হবে। প্রকৃতপক্ষে সকলের কাছে তুমি অমঙ্গলরূপা এবং অপ্রিয়া। তাই যেহেতু কেউই তোমাকে চায় না, তা হলে কেই বা তোমাকে পত্নীরূপে গ্রহণ করবে? এই জগৎ সকাম কর্মের ফলস্বরূপ। তাই তুমি অলক্ষিতভাবে জীবদের আক্রমণ কর। আমার সৈনিকদের সহায়তায় তুমি নির্বিঘ্নে তাদের সংহার করতে পারবে। এই প্রজ্বার আমার ভ্রাতা। আমি এখন তোমাকে আমার ভগিনীরূপে গ্রহণ করছি। আমি তোমাদের দুজনকে এবং আমার ভয়ঙ্কর সৈনিকদের নিযুক্ত করব এই জগতে অলক্ষিতভাবে কার্য করার জন্য।”
সপ্তবিংশতি অধ্যায়- পুরঞ্জনের নগরীতে চণ্ডবেগের আক্রমণ এবং কালকন্যার উপাখ্যান
03 Sep 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, চতুর্থ স্কন্ধ- ভগবদ্ভক্তদের প্রতি অনুগ্রহ