দেবর্ষি নারদ বললেন- “হে রাজন্! এক সময় পুরঞ্জন তাঁর মহৎ ধনুক ও অক্ষয় তূণীর গ্রহণ করে এবং স্বর্ণনির্মিত বর্মে সজ্জিত হয়ে, একাদশ সেনাপতি সহ পাঁচটি দ্রুতগামী অশ্বচালিত রথে পঞ্চপ্রস্থ নামক বনে গমন করেছিলেন। সেই রথে তিনি দুটি বিস্ফোরক বাণ তাঁর সঙ্গে নিয়েছিলেন। সেই রথটির দুটি চক্র এবং একটি ঘূর্ণায়মান অক্ষ ছিল। সেই রথে তিনটি পতাকা, একটি রজ্জু, একজন সারথি, একটি উপবেশন স্থান, জোয়াল লাগানোর দুটি দণ্ড, পাঁচটি অস্ত্র এবং সাতটি আবরণ ছিল। সেই রথের গতি পঞ্চবিধ এবং তার সম্মুখে পাঁচটি বাধা ছিল। সেই রথের সমস্ত সাজসজ্জা ও অলঙ্করণ স্বর্ণনির্মিত ছিল। যদিও রাজা পুরঞ্জনের পক্ষে এক পলকের জন্যও তাঁর মহিষীর সঙ্গ ত্যাগ করা অসম্ভব ছিল, তবুও, মৃগয়া করার বাসনায় অত্যন্ত অনুপ্রাণিত হয়ে, তিনি মহাগর্বে তাঁর ধনুক ও বাণ গ্রহণ করে, তাঁর পত্নীর কথা চিন্তা না করে বনে গিয়েছিলেন। রাজা পুরঞ্জন তখন আসুরিক বৃত্তির দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং তার ফলে তাঁর হৃদয় অত্যন্ত কঠিন ও নির্দয় হয়ে উঠেছিল এবং তিনি তীক্ষ্ণ বাণের দ্বারা নির্বিচারে বনের বহু নিরীহ পশু বধ করেছিলেন। রাজা যদিও মাংস আহারের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত হন, তা হলে তিনি যজ্ঞ অনুষ্ঠানের শাস্ত্রীয় নির্দেশ অনুসারে বনে গিয়ে, কেবল বধ্য পশুদের হত্যা করতে পারেন। অনর্থক ও অবাধে পশুহত্যা কখনই অনুমোদিত হয়নি। রজ ও তমোগুণের দ্বারা প্রভাবিত মূর্খ মানুষেরা যাতে অসংযতভাবে অবাধে পশুহত্যা না করে, সেই জন্যই বেদে পশুবধের সুনিয়ন্ত্রিত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
নারদ মুনি মহারাজ প্রাচীনবর্হিষৎকে বলতে লাগলেন- “হে রাজন্! যে ব্যক্তি বৈদিক শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে কর্ম করেন, তিনি কখনও সকাম কর্মে লিপ্ত হন না। আর যে ব্যক্তি নিজের খেয়াল-খুশিমতো আচরণ করে, সে তার অহঙ্কারের প্রভাবে অধঃপতিত হয় এবং এইভাবে প্রকৃতির তিনটি গুণের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তার ফলে জীব তার প্রকৃত বুদ্ধি বর্জিত হয়ে জন্মমৃত্যুর চক্রে চিরকালের জন্য হারিয়ে যায়। এইভাবে যে মলের কীটাণু থেকে শুরু করে, ব্রহ্মলোকে অতি উন্নত পদ পর্যন্ত বিভিন্ন যোনিতে ভ্রমণ করে। রাজা পুরঞ্জন যখন এইভাবে শিকার করছিলেন, তখন তাঁর তীক্ষ্ণ বাণের দ্বারা বিদ্ধ হয়ে, সেই বনের বহু পশু অসহ্য বেদনায় তাদের প্রাণ ত্যাগ করেছিল। রাজার এই বীভৎস বিনাশকার্য দর্শন করে, দয়ালু ব্যক্তিরা অত্যন্ত অপ্রসন্ন হয়েছিলেন। তাঁরা এই প্রকার হত্যাকার্য দর্শন করে সহ্য করতে পারেননি। এইভাবে রাজা পুরঞ্জন বহু শশক, বরাহ, মহিষ, গবয়, কৃষ্ণসার মৃগ, শজারু এবং শিকার করার উপযুক্ত অন্যান্য পশু সংহার করে, শ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তার পর রাজা অত্যন্ত পরিশ্রান্ত হয়ে এবং ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কাতর হয়ে, তাঁর রাজপ্রাসাদে ফিরে এসেছিলেন। গৃহে ফিরে আসার পর, তিনি স্নান করেছিলেন এবং উপযুক্ত খাদ্য আহার করেছিলেন। তার পর তিনি বিশ্রাম করে তাঁর সমস্ত শ্রান্তি দূর করেছিলেন। তার পর রাজা পুরঞ্জন উপযুক্ত অলঙ্কারে তাঁর দেহকে সাজিয়েছিলেন। তিনি তাঁর দেহে চন্দনও লেপন করেছিলেন এবং গলায় ফুলমালা ধারণ করেছিলেন। এইভাবে তিনি সম্পূর্ণরূপে শ্রান্তিমুক্ত হয়েছিলেন। তার পর তিনি তাঁর পত্নীর অন্বেষণ করতে শুরু করেছিলেন। আহার করার পর তাঁর ক্ষুধা ও তৃষ্ণার নিবৃত্তি হওয়ার ফলে, রাজা পুরঞ্জন তাঁর হৃদয়ে হর্ষ অনুভব করেছিলেন। উচ্চতর চেতনায় উন্নীত হওয়ার পরিবর্তে, তিনি কামদেবের দ্বারা মোহিত হয়েছিলেন এবং তাঁর গৃহমেধী জীবনে যিনি তাঁকে সন্তুষ্ট রেখেছিলেন, তাঁর সেই পত্নীর অন্বেষণ করতে শুরু করেছিলেন। তখন রাজা পুরঞ্জন একটু উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন এবং তিনি অন্তঃপুরের রমণীদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘হে সুন্দরীগণ! তোমাদের অধীশ্বরীর সঙ্গে তোমরা পূর্বের মতো কুশলে আছ তো?’
রাজা পুরঞ্জন বললেন- “আমি বুঝতে পারছি না আমার গৃহের সমস্ত সাজ-সরঞ্জাম পূর্বের মতো আমাকে আর কেন আকর্ষণ করছে না। আমার মনে হয় যে, গৃহে যদি মাতা ও পতিপরায়ণা পত্নী না থাকে, তা হলে সেই গৃহ চক্রবিহীন রথের মতো। কোন্ মূর্খ সেই অচল রথে উপবেশন করবে? দয়া করে আমাকে বল, বিপদের সমুদ্রে নিমজ্জিত হলে, যে আমাকে সর্বদা উদ্ধার করে, সেই সুন্দরী ললনা কোথায় অবস্থান করছে? প্রতি পদে আমাকে সদ্বুদ্ধি প্রদান করে সে সর্বদা আমাকে রক্ষা করে।”
সেই রমণীরা তখন রাজাকে বললেন- “হে নরনাথ! আপনার স্ত্রী যে কেন এইভাবে অবস্থান করছেন, তা আমরা জানি না। হে শত্রুহন্! দয়া করে দেখুন! বিনা শয্যায় তিনি ভূমিতে শয়ন করে রয়েছেন। তিনি যে কেন এইভাবে আচরণ করছেন, তা আমরা বুঝতে পারছি না।”
দেবর্ষি নারদ বললেন- “হে মহারাজ প্রাচীনবর্হি! রাজা পুরঞ্জন তাঁর মহিষীকে অবধূতের মতো ভূতলে পতিতা দেখে তৎক্ষণাৎ অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে পড়লেন। দুঃখিত অন্তরে, রাজা তাঁর পত্নীকে মধুর বচনে সান্ত্বনা দিতে শুরু করেছিলেন। যদিও তাঁর অন্তর অনুশোচনায় পূর্ণ হয়েছিল এবং তিনি তাঁকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করেছিলেন, তবুও তাঁর প্রিয় পত্নীর প্রণয়জনিত কোপের উপশমের কোন লক্ষণ দেখা গেল না। অনুনয়-বিনয়ে অত্যন্ত নিপুণ রাজা ধীরে ধীরে তার মহিষীকে সান্ত্বনা দিতে শুরু করেছিলেন। প্রথমে তিনি তাঁর পদযুগল স্পর্শ করেছিলেন, তারপর তাঁকে তাঁর ক্রোড়ে স্থাপন করে, গভীর আবেগে আলিঙ্গন করেছিলেন এবং তাঁকে এইভাবে বলতে শুরু করেছিলেন।”
রাজা পুরঞ্জন বললেন- “হে কল্যাণী! প্রভু যখন তাঁর ভৃত্যকে নিজের লোক বলে মনে করেন, কিন্তু তার অপরাধের জন্য তাকে দণ্ড দেন না, তখন সেই ভৃত্য অবশ্যই মন্দভাগ্য। হে কৃশাঙ্গী! প্রভু যখন ভৃত্যকে দণ্ড দেন, তখন ভৃত্যের কর্তব্য হচ্ছে তা পরম অনুগ্রহ বলে মনে করা। যে ভৃত্য তাতে ক্রোধ করে, সে নিশ্চয়ই অজ্ঞ; কারণ সে জানে না যে, সেটিই হচ্ছে বন্ধুর কর্তব্য। হে প্রিয়ে, হে সুদর্শনে! তোমার আকর্ষণীয় কার্যকলাপের ফলে, তোমাকে অত্যন্ত চিন্তাশীল বলে মনে হচ্ছে। দয়া করে তোমার এই ক্রোধ পরিত্যাগ করে আমার প্রতি কৃপাপরবশ হও এবং অনুরাগ ভরে একটু হাস। তোমার সুন্দর মুখম-লে যখন আমি তোমার মধুর হাসি দর্শন করি এবং তোমার ঘন নীল সুন্দর কেশদাম ও তোমার উন্নত নাসিকা দর্শন করি এবং তোমার মধুর বাক্যালাপ শ্রবণ করি, তখন তুমি আমার কাছে আরও অধিক সুন্দর হয়ে ওঠ এবং তার ফলে তুমি আমাকে গভীরভাবে আকর্ষণ কর এবং কৃতার্থ কর। তুমি হচ্ছ আমার পরম আদরিণী প্রিয়তমা। হে বীরপত্নী! আমাকে তুমি বল কেউ কি তোমাকে অপমান করেছে? সেই ব্যক্তি যদি ব্রাহ্মণ কুলোদ্ভুত না হন, তা হলে আমি তাকে দণ্ড দিতে প্রস্তুত। মুররিপু শ্রীকৃষ্ণের সেবক ব্যতীত, এই ত্রিলোকে আমি অন্য আর কাউকে ক্ষমা করব না। তোমর চরণে অপরাধ করে কেউই স্বচ্ছন্দে বিচরণ করতে পারবে না, কারণ আমি তাকে প্রচণ্ড দণ্ডদান করব। প্রিয়ে! ইতিপূর্বে আমি তোমার মুখ কখনও তিলকবিহীন দেখিনি, এই রকম বিষণ্ন, অনুজ্জ্বল ও স্নেহশূন্য মুখ কখনও দর্শন করিনি। তোমার সুন্দর স্তনযুগল আমি কখনও অশ্রুসিক্ত দেখিনি এবং বিম্বফলের মতো রক্তিম তোমার অধর এইভাবে রক্তিম আভাশূণ্য হতে ইতিপূর্বে আমি কখনই দেখিনি। হে রাণী! আমার পাপপূর্ণ বাসনার ফলে, আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা না করে বনে শিকার করতে গিয়েছিলাম। তাই আমি তোমার কাছে অপরাধ করেছি। তবুও আমাকে তোমার সবচাইতে অন্তরঙ্গ ভৃত্য বলে মনে করে, আমার ত্রুটি মার্জন করে আমার প্রতি প্রসন্ন হও। বাস্তবিকপক্ষে আমি অত্যন্ত দুঃখী, কিন্তু কামদেবের বাণের আঘাতে আমি অত্যন্ত কামার্ত হয়েছি। কোন্ সুন্দরী রমণী তার কামুক পতিকে ত্যাগ করে তার সঙ্গে মিলিত হতে অস্বীকার করবে?”
ষড়বিংশতি অধ্যায়- পুরঞ্জনের মৃগয়ায় গমন এবং তাঁর মহিষীর ক্রোধ
02 Sep 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, চতুর্থ স্কন্ধ- ভগবদ্ভক্তদের প্রতি অনুগ্রহ