পঞ্চবিংশতি অধ্যায়- রাজা পুরঞ্জনের কাহিনী

মহর্ষি মৈত্রেয় বিদুরকে বললেন- “হে বিদুর! এইভাবে ভগবান শিব রাজা বর্হিষতের পুত্রদের উপদেশ দিয়েছিলেন। রাজপুত্রেরাও তখন গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তি সহকারে শিবের পূজা করেছিলেন। তার পর ভগবান শিব রাজপুত্রদের সমক্ষেই সেখান থেকে অন্তর্হিত হয়েছিলেন। সমস্ত প্রচেতারা দশ হাজার বছর জলের ভিতর দাঁড়িয়ে, সেই রুদ্রগীত জপ করেছিলেন। রাজপুত্রেরা যখন জলের ভিতর কঠোর তপস্যা করছিলেন, তখন তাঁদের পিতা বিভিন্ন প্রকার সকাম কর্ম অনুষ্ঠানে রত ছিলেন। তাই তখন আধ্যাত্মিক জ্ঞানের তত্ত্ববেত্তা দেবর্ষি নারদ রাজার প্রতি অত্যন্ত দয়াপরবশ হয়ে, তাঁকে পারমার্থিক জীবন সম্বন্ধে উপদেশ দিতে মনস্থ করেছিলেন।”
নারদ মুনি মহারাজ প্রাচীনবর্হিষৎকে জিজ্ঞাসা করলেন- “হে রাজন্! এই সমস্ত সকাম কর্মের অনুষ্ঠানের দ্বারা আপনি কি লাভ করতে চান? জীবনের চরম লক্ষ্য হচ্ছে সমস্ত দুঃখকষ্ট থেকে মুক্ত হওয়া এবং সুখভোগ করা, কিন্তু সকাম কর্মের দ্বারা তা তো লভ্য নয়।”
রাজা উত্তর দিলেন- “হে মহাত্মা নারদ! আমার বুদ্ধি সকাম কর্মে আবদ্ধ হয়ে রয়েছে, তাই আমি জীবনের চরম লক্ষ সম্বন্ধে অবগত নই। দয়া করে আপনি আমাকে শুদ্ধ জ্ঞান দান করুন। যার ফলে আমি সকাম কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারি। যারা কেবল তথাকথিত সুন্দর জীবনের প্রতি আগ্রহশীল- অর্থাৎ স্ত্রী-পুত্রাদির বন্ধনে গৃহস্থরূপে ধন-সম্পদের অন্বেষণ করাকে জীবনের চরম লক্ষ বলে মনে করে, তারা কেবল বিভিন্ন শরীরে সংসার-চক্রে আবর্তিত হয়। তারা কখনই জীবনের পরম লক্ষ্য খুঁজে পায় না।”
দেবর্ষি নারদ বললেন- “হে প্রজাপালক রাজন্! আপনি যজ্ঞস্থলে যে-সমস্ত পশুদের নির্দয়ভাবে বলি দিয়েছেন, গগনমার্গে সেই সমস্ত পশুদের দেখুন। আপনি যে তাদের পীড়ন করেছেন তা স্মরণ করে, এই সমস্ত পশুরা আপনার মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছে। আপনার মৃত্যুর পর তারা ক্রোধে উদ্দীপ্ত হয়ে, লৌহময় শৃঙ্গের দ্বারা আপনার দেহ ছিন্নবিচ্ছিন্ন করবে। এই সম্পর্কে আমি আপনাকে পুরঞ্জন নামক এক রাজার সম্বন্ধে এক প্রাচীন ইতিহাস শোনাব। আপনি দয়া করে সমাহিত চিত্তে তা শ্রবণ করার চেষ্টা করুন।”
হে রাজন্! পুরাকালে পুরঞ্জন নামক এক রাজা ছিলেন, যিনি তাঁর মহান কার্যকলাপের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর অবিজ্ঞাত (‘অজ্ঞাত’) নামক এক বন্ধু ছিল। তাঁর কার্যকলাপ কেউ বুঝতে পারত না। রাজা পুরঞ্জন তাঁর বসবাসের উপযুক্ত স্থান অন্বেষণ করতে করতে সারা পৃথিবী ভ্রমণ করেছিলেন। তবুও তিনি তাঁর ইচ্ছানুরূপ কোন স্থান খুঁজে পেলেন না। অবশেষে তিনি নিরাশ ও বিষণ্ন হয়েছিলেন। রাজা পুরঞ্জনের ইন্দ্রিয়-সুখভোগের অন্তহীন বাসনা ছিল; তার ফলে তিনি সারা পৃথিবী ভ্রমণ করে এমন একটি স্থানের অন্বেষণ করেছিলেন, যেখানে তাঁর সমস্ত বাসনা পূর্ণ হতে পারে। কিন্তু তিনি তেমন কোন স্থান খুঁজে পেলেন না। এইভাবে ভ্রমণ করতে করতে তিনি এক সময় হিমালয় পর্বতের দক্ষিণ ভাগে ভারতবর্ষ নামক স্থানে নয়টি দ্বার এবং সমস্ত সুলক্ষণযুক্ত একটি নগরী দেখতে পেলেন। সেই নগরীটি প্রাচীর, উপবন, অট্টালিকা, পরিখা, গবাক্ষ ও বহির্দ্বার দ্বারা সুশোভিত ছিল। সেখানকার গৃহসমূহ স্বর্ণ, রৌপ্য ও লৌহনির্মিত শিখরের দ্বারা অলঙ্কৃত ছিল। সেই নগরীর প্রাসাদের গৃহতল নীলা, স্ফটিক, হীরা, মুক্তা, পান্না ও প্রবালের দ্বারা নির্মিত ছিল। সেই নগরীর গৃহসমূহ এমনই দীপ্তিযুক্ত ছিল যে, তার সৌন্দর্যের তুলনা দিব্য নগরী ভোগবতীর সঙ্গে করা যেত। সেই নগরী বহু সভাগৃহ, চতুষ্পথ, রাজপথ, ভোজনালয়, দ্যূতক্রীড়ার স্থান, বাজার, বিশ্রামস্থান, ধ্বজ, পতাকা এবং সুন্দর উদ্যান-সমন্বিত ছিল। সেই নগরীর বাইরে এক সুন্দর সরোবরের চারপাশে বেষ্টন করে বহু সুন্দর বৃক্ষ ও লতা ছিল। সেই সরোবরের চারপাশে পক্ষীকুল মধুর স্বরে সর্বক্ষণ কূজন করত এবং ভ্রমরেরা গুঞ্জন করত। সরোবরের তটস্থিত বৃক্ষের শাখাগুলি বসন্ত বায়ুর দ্বারা বাহিত তুষারাচ্ছাদিত পর্বতের ঝর্নার জল প্রাপ্ত হচ্ছিল। এই প্রকার পরিবেশে বনের পশুরাও মুনিদের মতো হিংসা বিহীন এবং ঈর্ষাবিহীন হয়েছিল। তার ফলে পশুরা অন্য কাউকে আক্রমণ করত না। তদুপরি সমস্ত স্থান কোকিলের কুহুরবে মুখরিত ছিল। তার ফলে পথিকেরা মনে করতেন সেই পরিবেশে যেন তাঁদের নিমন্ত্রণ জানাচ্ছে এবং তাই তাঁরা এই সুন্দর উদ্যানে বিশ্রাম করতেন।”
“সেই অতি সুন্দর উদ্যানে বিচরণ করতে করতে রাজা পুরঞ্জন সহসা এক অত্যন্ত সুন্দরী রমণীকে দেখতে পেলেন, যিনি যদৃচ্ছাক্রমে ভ্রমণ করতে করতে সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে দশটি ভৃত্য ছিল এবং তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে শত-শত পত্নী ছিল। সেই রমণী পাঁচটি মস্তক বিশিষ্ট একটি সর্পের দ্বারা চারদিক থেকে সুরক্ষিত। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুন্দরী ও যুবতী এবং তাঁকে উপযুক্ত পতির অন্বেষণে অত্যন্ত উৎসুক বলে প্রতীত হচ্ছিল। সেই রমণীর নাক, দাঁত ও কপোল অত্যন্ত সুন্দর। তার কর্ণযুগল তেমনই সুন্দরভাবে বিন্যস্ত এবং উজ্জ্বল কুণ্ডলের দ্বারা বিভূষিত। সেই রমণীর কটি ও শ্রোণীদেশ অত্যন্ত সুন্দর। তাঁর পরনে পীতবর্ণ শাড়ি এবং তাঁর কটিদেশ স্বর্ণমেখলা বেষ্টিত ছিল। তিনি যখন ভ্রমণ করছিলেন, তখন তাঁর নূপুর থেকে কিঙ্কিণীধ্বনি উত্থিত হচ্ছিল। তাঁকে দেখে সাক্ষাৎ দেবাঙ্গনার মতো মনে হচ্ছিল। তিনি তার বস্ত্রাঞ্চলের দ্বারা তাঁর সমবর্তুল এবং ব্যবধান-রহিত স্তনযুগলকে আচ্ছাদন করার চেষ্টা করছিলেন। সেই গজগামিনী লজ্জাবশত বার বার তাঁর স্তনযুগলকে আচ্ছাদন করার চেষ্টা করছিলেন। বীর পুরঞ্জন সেই অত্যন্ত সুন্দর রমণীর ভ্রুযুগল ও হোস্যোজ্জ্বল মুখমণ্ডলের দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং তিনি তখনই তাঁর কাম-বাসনারূপী বাণের দ্বারা বিদ্ধ হয়েছিলেন। যখন সেই রমণী লজ্জাভরে হেসেছিলেন, তখন পুরঞ্জনের কাছে তাঁকে সুন্দর মনে হয়েছিল, যিনি বীর হওয়া সত্ত্বেও, তাঁকে সম্বোধন না করে পারলেন না। হে পদ্মপলাশ-লোচনে! তুমি কে, কার কন্যা এবং কোথা থেকে তুমি এখানে এসেছ, তা দয়া করে আমাকে বল। তোমাকে দেখে মনে হয় যে, তুমি অতি সাধ্বী। কি উদ্দেশ্যে তুমি এখানে এসেছ? তুমি এখানে কি করার চেষ্টা করছ? দয়া করে তুমি আমাকে তা বল। হে কমল-নয়না! তোমার সঙ্গে এই যে এগারজন শক্তিশালী দেহরক্ষী রয়েছে, এরা কে? আর ঐ দশজন বিশিষ্ট সেবকেরা কে? যে-সমস্ত রমণীরা সেই দশজন সেবকের অনুগমন করছে, তারা কে? আর তোমার সম্মুখে গমন করছে যে সাপটি, সেটিই বা কে? হে সুন্দরী! তুমি কি লক্ষ্মীদেবী, না শিবের পত্নী ভবানী, না ব্রহ্মার পত্নী সরস্বতী? যদিও তুমি অবশ্যই তাঁদের একজন, তবুও আমি দেখছি যে, তুমি এই নির্জন অরণ্যে বিচরণ করছ। মুনির মতো সংযত হয়ে, তুমি কি তোমার পতির অন্বেষণ করছ? তোমার পতি যেই হোন না কেন, তুমি যে তাঁর প্রতি এত অনুগত, তার ফলে তিনি সমস্ত ঐশ্বর্য প্রাপ্ত হবেন। আমি মনে করি যে, তুমি নিশ্চয়ই লক্ষ্মীদেবী, কিন্তু তোমার হাতে তো পদ্মফুল নেই। তাই আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করতে চাই, সেই পদ্মফুলটি কোথায় পড়ে গেল? হে পরম সৌভাগ্যবতী! আমার মনে হচ্ছে যে, যাদের কথা আমি উল্লেখ করলাম তুমি তাঁদের কেউ নও, কারণ আমি দেখছি যে, তোমার পদযুগল ভূমিস্পর্শ করছে। কিন্তু তুমি যদি এই গ্রহলোকের কোন সুন্দরী হও, তা হলে লক্ষ্মীদেবী যেমন বিষ্ণুর সঙ্গে বিরাজ করে বৈকুন্ঠলোকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, তেমন তুমিও আমার সঙ্গে এই নগরীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি কর। তুমি জেনে রাখ যে, আমি হচ্ছি একজন মহান বীর এবং এই পৃথিবীর একজন অত্যন্ত পরাক্রমশালী রাজা। তোমার অপাঙ্গদৃষ্টি আমার চিত্তকে অত্যন্ত বিচলিত করছে। তোমার হাসি লজ্জাযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও অত্যন্ত কামোদ্দীপক হওয়ার ফলে, আমার অন্তরে পরম শাক্তিশালী কামদেবকে জাগরিত করছে। তাই হে সুন্দরী! আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করি, আমার প্রতি সদয় হও। হে সুন্দরী! সুন্দর ভ্রু ও নয়ন-সমন্বিত তোমার মুখমণ্ডল অত্যন্ত সুন্দর এবং তাকে বেষ্টন করে রয়েছে তোমার শ্যামচিক্কণ কেশরাজি। তোমার মুখ থেকে অতি সুমধুর ধ্বনি নিঃসৃত হচ্ছে। তুমি লজ্জাবশত আমার দিকে তাকাতে পারছ না। তাই আমি তোমার কাছে অনুরোধ করছি, হে সুন্দরী! দয়া করে তুমি তোমার মস্তক উন্নত করে এবং মধুর হাস্য সহকারে আমার প্রতি দৃষ্টিপাত কর।”
নারদ মুনি বললেন- “হে রাজন্! পুরঞ্জন যখন সেই রমণীকে স্পর্শ করতে ও উপভোগ করতে অত্যন্ত অধীর হয়ে উঠেছিলেন, তখন সেই রমণীও তাঁর বাক্যের দ্বারা তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং মৃদু হেসে তাঁর সেই অনুরোধ স্বীকার করেছিলেন। ইতিমধ্যে তিনিও নিঃসন্দেহে রাজার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন।”
সেই রমণী বললেন- “হে পুরুষশ্রেষ্ঠ! কে যে আমাকে উৎপন্ন করেছে তা আমি জানি না। আমি তোমাকে তা যথাযথভাবে বলতে পারব না। আমাদের সঙ্গীদের নাম ও গোত্রও আমি জানি না। হে মহাবীর! আমরা কেবল এটুকুই জানি যে, এই স্থানে আমরা রয়েছি। কিন্তু তার অতীত কোন কিছুই আমরা জানি না। আমরা এতই মূর্খ যে, আমাদের বসবাসের জন্য এই সুন্দর স্থানটি যে কে সৃষ্টি করেছেন, তা আমরা জানতে চেষ্টা করি না। হে মহাশয়! এই সমস্ত পুরুষ ও স্ত্রী, যারা আমার সঙ্গে রয়েছে, তারা আমার সখা ও সখী এবং এই সর্পটি এই পুরীর রক্ষাকারী, এমন কি আমি নিদ্রিতা হলেও এই সর্পটি জাগরিত থাকে। আমি কেবল এটুকুই জানি। এর অধিক আর কিছুই আমি জানি না। হে শত্রু-সংহারক! তুমি যে এখানে এসেছ, তা অবশ্যই আমার পরম সৌভাগ্য। আমি সর্বতোভাবে তোমার কল্যাণ কামনা করি। তোমার ইন্দ্রিয়-সুখভোগের সমস্ত অভিলাষ আমি এবং আমার বন্ধুরা সর্বতোভাবে পূর্ণ করার চেষ্টা করব। হে প্রভু! তুমি যাতে সর্বতোভাবে ইন্দ্রিয় তৃপ্তিসাধন করতে পার, সেই জন্যই আমি নবদ্বার সমন্বিত এই নগরীর আয়োজন করেছি। এখানে তুমি একশ বছর বাস করতে পার এবং তোমার ইন্দ্রিয় তৃপ্তিসাধনের জন্য সব কিছু সরবরাহ করা হবে। তুমি ছাড়া আর অন্য কোন্ পুরুষের সঙ্গে আমি বিহার করতে পারি? কারণ তাদের তো রতিজ্ঞান নেই এবং তারা জীবিত অবস্থায় ও মৃত্যুর পর কিভাবে জীবন উপভোগ করতে হয় তা জানে না। এই প্রকার ব্যক্তিরা পশুতুল্য।”
“এই জগতে গৃহস্থ-জীবনেই ধর্ম, অর্থ, কাম এবং সন্তান-সন্ততি উৎপাদনের সর্বপ্রকার সুখভোগ করা যায়। তার পর মানুষ মুক্তি অথবা যশও প্রাপ্ত হতে পারেন। গৃহস্থরা যজ্ঞের ফলও ভোগ করতে পারেন, যার ফলে তাঁরা শ্রেষ্ঠ লোকে উন্নীত হতে পারেন। এই সমস্ত সুখভোগ পরমার্থবাদীদের কাছে প্রায় অজ্ঞাত। তাঁরা এই প্রকার সুখের কথা কল্পনাও করতে পারেন না। মহাজনদের বর্ণনা অনুসারে, গৃহস্থ-জীবন কেবল নিজের জন্য আনন্দদায়ক নয়, তা পিতৃগণ, দেবতাগণ, মহর্ষিগণ, মহাত্মাগণ এবং অন্য সকলের জন্য প্রেয়স্কর। এইভাবে গৃহস্থ-আশ্রম সকলের জন্যই লাভজনক। হে বীর! তুমি বিখ্যাত, উদার চিত্ত এবং অতি সুন্দর পুরুষ। অতএব তোমার মতো পতি স্বয়ং উপস্থিত থাকতে, আমার মতো কামিনী আর কাকেই বা পতিত্বে বরণ করবে? হে মহাবাহো! পৃথিবীতে এমন কোন্ রমণী আছ, যার মন তোমার সর্পদেহসদৃশ বাহুযুগলের আলিঙ্গনের প্রতি আকৃষ্ট হবে না? তুমি তোমার মধুরহাস্য ও উদ্ধত কৃপার দ্বারা আমার মতো অনাথা মহিলাদের সমস্ত সন্তাপ দূর কর। আমরা মনে করি যে, তুমি কেবল আমাদের উপকারের জন্য এই ভূপৃষ্ঠে বিচরণ করছ।”
দেবর্ষি নারদ বললেন- “হে রাজন্! সেই পুরুষ ও নারী পারস্পারিক সৌহার্দ্যরে দ্বারা পরস্পরকে অঙ্গীকার করে সেই নগরীতে প্রবেশ করেছিলেন এবং একশ বছর ধরে জীবন উপভোগ করেছিলেন। গায়কেরা মনোহর সঙ্গীতে মহারাজ পুরঞ্জনের মহিমান্বিত কার্যকলাপের যশোগান করত। গ্রীষ্মকালে যখন অত্যন্ত গরম পড়ত, তখন তিনি কামিনীকুল পরিবৃত হয়ে সরোবরে প্রবেশ করে তাদের সঙ্গ উপভোগ করতেন। সেই নগরীর নয়টি দ্বারের মধ্যে সাতটি দ্বার উপরিভাগে এবং দুটি দ্বার অধোভাগে রয়েছে। এই দ্বারগুলি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে যাওয়ার জন্য নির্মিত হয়েছে এবং সেই দ্বারগুলি ব্যবহার করেন সেই নগরীর অধীশ্বর। হে রাজন্! সেই নয়টি দ্বারের মধ্যে পাঁচটি দ্বার পূর্বমুখী, একটি উত্তরমুখী, একটি দক্ষিণমুখী এবং দুটি পশ্চিমমুখী। আমি সেই সমস্ত দ্বারগুলির নাম আপনার কাছে বর্ণনা করব। খদ্যোতা ও আবির্মুখী নামক দুটি দ্বার পূর্বদিকে স্থিত ছিল, কিন্তু তারা একস্থানেই নির্মিত ছিল। এই দুটি দ্বার দিয়ে রাজা তাঁর বন্ধু দ্যুমানের সঙ্গে বিভ্রাজিত নামক নগরীতে যেতেন। তেমনই পূর্বদিকে নলিনী ও নালিনী নামক আরও দুটি দ্বার রয়েছে এবং তারাও একস্থানে নির্মিত হয়েছে। এই দ্বার দুটি দিয়ে রাজা অবধূত নামক তাঁর বন্ধুর সঙ্গে সৌরভ নামক নগরীতে গমন করতেন। পূর্বদিকে অবস্থিত পঞ্চম দ্বারটির নাম মুখ্যা অর্থাৎ প্রধান। এই দ্বার দিয়ে তিনি রসজ্ঞ ও বিপণ নামক তাঁর দুই বন্ধুর সঙ্গে বহূদন ও আপণ নামক দুটি স্থানে গমন করতেন। সেই নগরীর দক্ষিণ দিকের দ্বারটির নাম পিতৃহূ এবং সেই দ্বার দিয়ে রাজা পুরঞ্জন তার বন্ধু শ্রুতধরের সঙ্গে দক্ষিণ-পঞ্চাল নাম নগরীতে গমন করতেন। উত্তর দিকে ছিল দেবহূ নামক দ্বার। সেই দ্বার দিয়ে রাজা পুরঞ্জন তাঁর সখা শ্রুতধরের সঙ্গে উত্তর-পঞ্চাল নামক স্থানে গমন করতেন। পশ্চিম দিকে ছিল আসুরী নামক দ্বার। সেই দ্বার দিয়ে রাজা পুরঞ্জন তাঁর সখা দুর্মদের সঙ্গে গ্রামক নামক নগরীতে যেতেন। পশ্চিম দিকস্থ আর একটি দ্বারের নাম নির্ঋতি। পুরঞ্জন সেই দ্বার দিয়ে তাঁর সখা লুব্ধকের সঙ্গে বৈশস নামক স্থানে গমন করতেন। সেই নগরীর বহু অধিবাসীদের মধ্যে নির্বাক্ ও পেশস্কৃৎ নামক দুই ব্যক্তি ছিলেন। যদিও রাজা পুনঞ্জন ছিলেন চক্ষুষ্মান নাগরিকদের শাসক, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি এই অন্ধদের সঙ্গ করতেন। তাদের সঙ্গে ইতস্তত বিচরণ করে তিনি নানা প্রকার কার্য করতেন। কখনও কখনও তিনি বিষূচীন (মন) নামক তাঁর প্রধান ভৃত্যের সাথে তাঁর গৃহের অন্তঃপুরে যেতেন। তখন তাঁর পত্নী ও পুত্রদের প্রভাবে মোহ, সন্তোষ ও হর্ষ উৎপন্ন হত। এইভাবে বিভিন্ন প্রকার মানসিক জল্পনা-কল্পনা এবং সকাম কর্মে আসক্ত হওয়ার ফলে, রাজা পুরঞ্জন সম্পূর্ণরূপে জড় বুদ্ধির নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে বঞ্চিত হয়েছিলেন। বাস্তবিকপক্ষে তিনি তাঁর মহিষীর সমস্ত বাসনা পূর্ণ করতেন।”
“রাণী যখন মদিরা পান করতেন, তখন রাজা পুরঞ্জনও তাঁর সঙ্গে মদিরা পান করতেন। রাণী যখন আহার করতেন, তখন তিনিও তাঁর সঙ্গ আহার করতেন এবং রাণী যখন চর্বণ করতেন, তখন রাজা পুরঞ্জনও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চর্বণ করতেন। রাণী যখন গান করতেন, তখন তিনিও গান করতেন। তেমনই, রানী যখন ক্রন্দন করতেন, তখন তিনিও তাঁর সঙ্গে কাঁদতেন এবং রাণী যখন হাসতেন, তখন তিনিও হাসতেন। রাণী যখন প্রজল্প করতেন, তখন তিনিও প্রজল্প করতেন এবং রাণী যখন গমন করতেন, তখন রাাজাও তাঁর পিছনে পিছনে গমন করতেন। রাণী যখন দাঁড়াতেন, তখন রাজাও দাঁড়াতেন এবং রাণী যখন শয্যায় শয়ন করতেন, তখন তিনিও তাঁকে অনুসরণ করে তাঁর সঙ্গে শয়ন করতেন। রাণী যখন বসতেন, তখন তিনিও বসতেন এবং রাণী যখন কোন কিছু শ্রবণ করতেন, তখন তিনিও তাঁকে অণুসরণ করে তা-ই শ্রবণ করতেন। রাণী যখন কোন কিছু দেখতেন, তখন রাজাও তা দেখতেন এবং রাণী কোন কিছুর ঘ্রাণ গ্রহণ করতেন, তখন রাজাও তাঁকে অনুসরণ করে সেই বস্তুর ঘ্রাণ গ্রহণ করতেন। রাণী যখন কোন কিছু স্পর্শ করতেন, তকন রাজাও তা স্পর্শ করতেন এবং প্রিয়তমা রানী যখন শোক করতেন, তখন বেচারি রাজাও তাঁকে অনুসরণ করে অনাথের মতো শোক করতেন। তেমনই রাণী যখন আনন্দিত হতেন, তখন তিনিও আনন্দিত হতেন এবং রাণী সন্তুষ্ট হলে, রাজাও সন্তোষ অনুভব করতেন। এইভাবে রাজা পুরঞ্জন তাঁর সুন্দরী পত্নীর দ্বারা বন্দি হয়ে প্রতারিত হয়েছিলেন। বাস্তবিকপক্ষে, এই জড় জগতে তিনি সর্বতোভাবে প্রতারিত হয়েছিলেন। সেই মূর্খ রাজা অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁর পত্নীর নিয়ন্ত্রণাধীনে ছিলেন, ঠিক যেভাবে একটি পোষা জন্তু তার প্রভুর ইচ্ছানুসারে নৃত্য করে।”

Leave a Reply

September 2025
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  

Blog Stats

  • 140,959 hits