মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “মহারাজ পৃথুর জ্যেষ্ঠ পুত্র বিজিতাশ্ব, যিনি তাঁর পিতারই মতো যশস্বী ছিলেন, তিনি রাজা হয়েছিলেন এবং তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতাদের তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দিক আধিপত্য করতে দিয়েছিলেন, কারন তিনি তাঁর ভাইদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন। মহারাজ বিজিতাশ্ব তাঁর ভ্রাতা হর্যক্ষকে পৃথিবীর পূর্ব দিক, ধূম্রকেশকে দক্ষিণ দিক, বৃককে পশ্চিম দিক এবং দ্রবিণকে উত্তর দিক প্রদান করেছিলেন। পূর্বে, মহারাজ বিজিতাশ্ব দেবরাজ ইন্দ্রের প্রসন্নতা বিধানের ফলে, তাঁর কাছ থেকে অন্তর্ধান বিদ্যা প্রাপ্ত হয়ে অন্তর্ধান উপাধি লাভ করেন। শিখণ্ডিণী নামক পত্নীর গর্ভে তিনি তিনটি অতি উত্তম পুত্র উৎপাদন করেন। মহারাজ অন্তর্ধানের তিনটি পুত্রের নাম ছিল- পাবক, পাবমান ও শুচি। পূর্বে এই তিনজন ছিলেন অগ্নির দেবতা, কিন্তু মহর্ষি বসিষ্ঠের অভিশাপের ফলে তাঁরা মহারাজ অন্তর্ধানের পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার ফলে তাঁরা ছিলেন অগ্নিদেবের মতো শক্তিমান এবং তাঁরা যোগবলে পুনরায় অগ্নিত্ব প্রাপ্ত হয়েছিলেন। মহারাজ অন্তর্ধানের নভস্বতী নামক আর এক পত্নী ছিলেন এবং তাঁর গর্ভে তিনি হবির্ধান নামক আর একটি পুত্র প্রাপ্ত হয়েছিলেন। মহারাজ অন্তর্ধান যেহেতু ছিলেন অত্যন্ত উদার, তাই ইন্দ্র তার পিতার যজ্ঞের অশ্ব অপহরণ করছেন জেনেও তিনি তাঁকে হত্যা করেননি। রাজার বৃত্তি অনুসারে, অন্তর্ধানকে যখন প্রজাদের কাছ থেকে কর আদায় করতে হত, দণ্ডদান করতে হত অথবা শুল্ক গ্রহণ করতে হত, তা অত্যন্ত পীড়াদায়ক বলে তিনি তা করতে চাইতেন না। তার ফলে এই প্রকার কর্তব্য কর্ম থেকে অবসর গ্রহণ করে তিনি বিভিন্ন প্রকার যজ্ঞ অনুষ্ঠানে রত হয়েছিলেন। মহারাজ অন্তর্ধান যজ্ঞ অনুষ্ঠান করলেও, আত্ম-তত্ত্ববেত্তা হওয়ার ফলে তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা সহকারে ভক্তবৎসল ভগবানের প্রেমময়ী সেবা সম্পাদন করেছিলেন। এইভাবে পরমেশ্বর ভগবানের আরাধনা করে মহারাজ অন্তর্ধান সমাধিমগ্ন হয়ে অনায়াসে ভগবদ্ধাম প্রাপ্ত হয়েছিলেন। মহারাজ অন্তর্ধানের পুত্র হবির্ধানের পত্নীর নাম ছিল হবির্ধানী, যিনি বর্হিষৎ, গয়, শুক্ল, কৃষ্ণ, সত্য ও জিতব্রত নামক ছয়টি পুত্রের জন্মদান করেছিলেন।”
“হে বিদুর! হবির্ধানের অত্যন্ত শক্তিমান পুত্র বর্হিষৎ বিভিন্ন প্রকার কর্মকাণ্ডীয় যজ্ঞ অনুষ্ঠানে অত্যন্ত সুদক্ষ ছিলেন এবং তিনি হঠযোগের অভ্যাসেও পারদর্শী ছিলেন। তাঁর মহৎ গুণাবলীর প্রভাবে, তিনি প্রজাপতিরূপেও পরিচিত হয়েছিলেন। মহারাজ বর্হিষৎ পৃথিবীর সর্বত্র বহু যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেছিলেন। তার প্রভাবে পূর্বাগ্রকুশ দ্বারা ধরণীতল আচ্ছাদিত হয়েছিল। মহারাজ বর্হিষৎ, যিনি প্রাচীনবর্হি নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন, তিনি দেবদেব ব্রহ্মার আদেশে সমুদ্রকন্যা শতদ্রুতিকে বিবাহ করেন। তাঁর দেহের প্রতিটি অঙ্গ অত্যন্ত সুন্দর ছিল এবং তিনি ছিলেন নবযৌবন-সম্পন্না। সুন্দর অলঙ্কারে ভূষিতা হয়ে, বিবাহের সময় তিনি যখন অগ্নিকে প্রদক্ষিণ করেছিলেন, তখন অগ্নিদেব তাঁর প্রতি অত্যন্ত আকৃষ্ট হয়ে তাঁকে কামনা করেছিলেন, ঠিক যেমন তিনি পূর্বে শুকীকে অভিলাষ করেছিলেন। শতদ্রুতির বিবাহের সময় অসুর, গন্ধর্ব, মুনি, সিদ্ধ, নর ও নাগেরা অত্যন্ত মহান হলেও, সকলেই তাঁর নূপুরের কিঙ্কিণী ধ্বনির দ্বারা মোহিত হয়েছিলেন। মহারাজ প্রাচীনবর্হি শতদ্রুতির গর্ভে দশটি পুত্রসন্তান লাভ করেছিলেন। তাঁরা সকলেই সমানভাবে ধর্মপরায়ণ ছিলেন এবং তাঁদের সকলেরই নাম ছিল প্রচেতা। বিবাহ করে সন্তান উৎপাদনের জন্য পিতা কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে, প্রচেতারা সমুদ্রে প্রবেশ করে দশ হাজার বছর ধরে তপস্যা করেছিলেন। এইভাবে তাঁরা সমস্ত তপস্যার পতি পরমেশ্বর ভগবানের আরাধনা করেছিলেন। যখন প্রাচীনবর্হির সমস্ত পুত্র তপস্যা করার জন্য গৃহত্যাগ করেছিলেন, তখন তাঁদের সঙ্গে মহাদেবের সাক্ষাৎ হয়েছিল, যিনি অত্যন্ত কৃপাপূর্বক তাঁদের পরম তত্ত্বজ্ঞান প্রদান করেছিলেন। প্রাচীনবর্হির পুত্ররা অত্যন্ত সাবধানতা ও মনোযোগ সহকারে তা কীর্তন ও উপাসনা করে সেই উপদেশের ধ্যান করেছিলেন।”
বিদুর মৈত্রেয়কে জিজ্ঞাসা করলেন- “হে ব্রাহ্মণ! প্রচেতাদের সঙ্গে শিবের সাক্ষাৎ হয়েছিল কেন? দয়া করে বলুন কিভাবে সেই সাক্ষাৎ হয়েছিল, কিভাবে শিব তাঁদের প্রতি প্রসন্ন হয়েছিলেন এবং কিভাবে তিনি তাঁদের উপদেশ দিয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে এই আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দয়া করে আমার প্রতি কৃপাপরায়ণ হয়ে, সেই কথা আমাকে বলুন।”
“হে ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ! জড় দেহের বন্ধনে আবদ্ধ জীবদের পক্ষে শিবের সাক্ষাৎ লাভ করা অত্যন্ত দুর্লভ। এমন কি সমস্ত জড় আসক্তি থেকে মুক্ত এবং শিবের সঙ্গলাভের জন্য সর্বদা তাঁর ধ্যানে মগ্ন মহান ঋষিরাও তাঁর সঙ্গলাভ করতে পারেন না। ভগবান শিব হচ্ছেন সব চাইতে শক্তিশালী দেবতা, যাঁর স্থান ভগবান শ্রীবিষ্ণুর পরেই। তিনি আত্মারাম। যদিও এই জড় জগতে কোন বস্তুর প্রতি তাঁর আকাক্সক্ষা নেই, তবুও বদ্ধ জীবদের কল্যাণের জন্য, তিনি সর্বদা কালী ও দুর্গা আদি ভয়ঙ্কর শক্তিসহ সর্বত্র বিচরণ করেন।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “হে বিদুর! সাধু চরিত্র প্রচেতারা তাঁদের পিতা প্রাচীনবর্হির বাক্য শিরোধার্য করে পিতার আদেশ পালন করার জন্য পশ্চিম দিকে গমন করেছিলেন। এইভাবে ভ্রমণ করার সময়, প্রচেতারা এক বিশাল সরোবর দর্শন করলেন, যা প্রায় সমুদ্রের মতো বিস্তৃত ছিল। এই সরোবরের জল ছিল মহাত্মাদের নির্মল অন্তঃকরনের মতো স্বচ্ছ এবং জলচরেরা এত বড় জলাশয়ের শরণ গ্রহণ করার ফলে, তাদের অত্যন্ত শান্ত ও প্রসন্ন বলে প্রতীত হয়েছিল। সেই বিশাল সরোবর নানা প্রকার পদ্মফুল প্রস্ফুটিত হয়েছিল। তাদের কোনটির রঙ নীল, কোনটির রঙ লাল, কোনটি রাত্রে প্রস্ফুটিত হয়, কোনটি দিনের বেলা প্রস্ফুটিত হয়, আবার কোনটি সন্ধ্যাবেলা প্রস্ফুটিত হয়। সেই সমস্ত ইন্দীবর, কহ্লার আদি পদ্মফুলে সেই সরোবরটি এমনভাবে পূর্ণ ছিল যে, তা দেখে মনে হচ্ছিল যেন সেটি একটি ফুলের আকর। আর সেই সরোবরের তীর হংস, সারস, চক্রবাক ও অন্যান্য পাখির কূজনে মুখরিত ছিল। সেই সরোবরের চতুর্দিকে বিভিন্ন প্রকার বৃক্ষ ও লতা ছিল, এবং তাদের চারপাশে মত্ত ভ্রমরেরা গুঞ্জন করছিল। ভ্রমরদের সেই মধুর গুঞ্জন শ্রবণ করে, সেখানকার গাছপালাগুলি যেন অত্যন্ত পুলকিত হয়ে উঠেছিল এবং তখন পদ্মফুলের পরাগ চতুর্দিকে বায়ুর দ্বারা বিক্ষিপ্ত হচ্ছিল। তার ফলে সেখানে এক আনন্দময় মহোৎসবের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। রাজপুত্রেরা যখন মৃদঙ্গ ও পণবসহ অত্যন্ত সুমধুর রাগরাগিনীর ধ্বনি শুনতে পেলেন, তখন তাঁরা অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছিলেন। প্রচেতারা তাঁদের সৌভাগ্যক্রমে দেবশ্রেষ্ঠ শিবকে তাঁর পার্ষদগণ-সহ জল থেকে উত্থিত হতে দেখলেন। তাঁর অঙ্গকান্তি ছিল ঠিক তপ্ত-কাঞ্চনের মতো, তাঁর কন্ঠ ছিল নীলাভ এবং তাঁর তিনটি চক্ষু ছিল এবং তিনি অত্যন্ত কৃপাপূর্ণ নয়নে তাঁর ভক্তদের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছিলেন। তাঁর অনুগামী গন্ধর্বাদি সংগীতজ্ঞেরা তাঁর মহিমা কীর্তন করছিলেন। শিবকে দর্শন করে প্রচেতারা অত্যন্ত কৌতূহল-বিশিষ্ট হয়েছিলেন এবং তাঁকে তৎক্ষণাৎ প্রণতি নিবেদন করেছিলেন। ভগবান শিব প্রচেতাদের প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিলেন, কারণ তিনি সাধারণত পুণ্যবান ও সদাচারী ব্যক্তিদের রক্ষক।”
রাজকুমারদের প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে তিনি বলেছিলেন- “হে মহারাজ প্রাচীনবর্হির পুত্রগণ! তোমাদের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল হোক। আমি জানি তোমরা কি করতে চাও এবং তাই তোমাদের প্রতি কৃপা প্রদর্শন করার জন্য আমি তোমাদের গোচরীভূত হয়েছি। যে ব্যক্তি জড়া প্রকৃতি ও জীব আদি সব কিছুর নিয়ন্তা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত, তিনি আমার অত্যন্ত প্রিয়। মানুষ শত জন্ম ধরে যথাযথভাবে স্বধর্ম আচরণ করার ফলে, ব্রহ্মপদ প্রাপ্ত হওয়ার যোগ্য হন এবং তিনি যদি তার থেকেও অধিক যোগ্যতা অর্জন করেন, তা হলে তিনি আমাকে লাভ করতে পারেন। কিন্তু যেই ব্যক্তি অনন্য ভক্তি সহকারে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বা শ্রীবিষ্ণুর শরণাগত হন, তিনি অচিরেই চিৎ-জগতে উন্নতি হন। আমি ও অন্যান্য দেবতারা এই জড় জগতের বিনাশের পর সেই লোক প্রাপ্ত হই। তোমরা সকলেই ভগবানের ভক্ত এবং তাই আমার কাছে তোমরা স্বয়ং ভগবানের মতো শ্রদ্ধেয়। সেই সূত্রে আমি জানি যে, ভক্তরাও আমাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করেন এবং আমি তাঁদের অত্যন্ত প্রিয়। তাই ভক্তদের কাছে আমার মতো প্রিয় আর কেউ নয়। এখন আমি একটি মন্ত্র উচ্চারণ করব, যা কেবল দিব্য, পবিত্র ও মঙ্গলময়ই নয়, অধিকন্তু জীবনের চরম লক্ষ্যলাভের অভিলাষী ব্যক্তির পক্ষে শ্রেষ্ঠ প্রার্থনা। আমি যখন এই মন্ত্র উচ্চারণ করব, তখন তা অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে এবং মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “ভগবানের পরম ভক্ত, মহাপুরুষ শিব দয়াপরবশ হয়ে রাজপুত্রদের উপদেশ দিতে লাগলেন এবং তাঁরাও কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁর সেই উপদেশ শ্রবণ করতে লাগলেন।”
ভগবানের প্রার্থনা করে শিব বললেন- “হে পরমেশ্বর ভগবান! আপনার মহিমা সর্বতোভাবে জয়যুক্ত হোক! সমস্ত আত্মবিৎ পুরুষদের মধ্যে আপনি সর্বশ্রেষ্ঠ এবং আপনি সর্বদা তাঁদের কল্যাণসাধন করেন, তাই আপনি আমারও কল্যাণসাধন করুন। আপনার উপদেশ সর্বতোভাবে পূর্ণ, তাই আপনি আরাধ্য। আপনি হচ্ছেন পরমাত্মা, তাই আমি পুরুষোত্তমরূপে আপনাকে আমার প্রণতি নিবেদন করি। হে প্রভু! আপনার নাভিদেশ থেকে সর্বলোকাত্মক পদ্ম উত্থিত হয়েছে, তাই আপনি সমস্ত সৃষ্টির উৎস। আপনি সমস্ত ইন্দ্রিয় ও তন্মাত্রের পরম নিয়ন্তা এবং আপনি হচ্ছেন সর্বব্যাপ্ত বাসুদেব। আপনি পরম শান্ত এবং আপনার স্বপ্রকাশের ফলে, আপনি ছয় প্রকার বিকারের দ্বারা কখনও বিচলিত হন না। হে ভগবান! আপনি সূক্ষ্ম তত্ত্বের উৎস, সমস্ত জড় উপাদানের অধিষ্ঠাতা এবং সংহারকর্তা। আপনি অহঙ্কারের অধিষ্ঠাতা সঙ্কর্ষণ এবং বুদ্ধির অধিষ্ঠাতা প্রদ্যুম্ন। তাই আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। হে ভগবান! আপনি ইন্দ্রিয় ও মনের অধীশ্বর অনিরুদ্ধ। আপনি সূর্যরূপে তেজের দ্বারা বিশ্ব পরিব্যাপ্ত করছেন, আপনার ক্ষয় বা বৃদ্ধি নেই। তাই আমি বার বার আপনাকে আমার প্রণতি নিবেদন করি। হে ভগবান অনিরুদ্ধ! আপনার অধ্যক্ষতায় স্বর্গ ও মোক্ষের দ্বার উন্মুক্ত হয়। আপনি সর্বদা জীবের শুদ্ধ হৃদয়ে বিরাজ করেন। তাই আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। আপনি স্বর্ণসদৃশ বীর্যসমন্বিত এবং তার ফলে অগ্নিরূপে আপনি চাতুর্হোত্র আদি বৈদিক যজ্ঞের সহায়তা করেন। তাই আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। হে ভগবান! আপনি পিতৃলোক ও দেবতাদেরও পোষক। আপনি চন্দ্রলোকের অধিষ্ঠাতৃ দেবতা এবং তিন বেদের প্রভু। আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি, কারণ আপনি সমস্ত জীবের তৃপ্তির আদি উৎস। হে ভগবান! আপনি বিরাট স্বরূপ, যাতে সমস্ত জীবদের শরীর নিহিত রয়েছে। আপনি ত্রিলোকের পালক এবং তার ফলে আপনি সেগুলির মধ্যে মন, ইন্দ্রিয়, দেহ ও প্রাণবায়ূ পালন করেন। আমি তাই আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। হে ভগবান! আপনি দিব্য বাণীর প্রসারের দ্বারা সব কিছুর প্রকৃত অর্থ প্রকাশ করেন। আপনি অন্তর ও বাইরের সর্বব্যাপ্ত আকাশ এবং আপনি জড়-জাগতিক ও জড়াতীত সমস্ত পুণ্যকর্মের চরম লক্ষ্য। আমি তাই বারবার আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। হে ভগবান্! আপনি পুন্যকর্মের ফল দর্শনকারী। আপনি প্রবৃত্তি, নিবৃত্তি ও তাদের পরিণাম। আপনি অধর্মজনিত জীবনের দুঃখ-দুর্দশার কারণ, অতএব আপনি মৃত্যু। আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। হে ভগবান! আপনি সমস্ত আশীর্বাদ প্রদানকারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, প্রবীণতম এবং সমস্ত ভোক্তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ভোক্তা। আপনি সমগ্র জগতের সাংখ্যযোগ-দর্শনের ঈশ্বর, কারণ আপনি সর্ব-কারণের পরম কারণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। আপনি সমস্ত ধর্মতত্ত্বের পরম ঈশ্বর, পরম মন এবং আপনার মেধা কখনও কোন পরিস্থিতিতে প্রতিহত হয় না। তাই বার বার আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।”
“হে ভগবান! আপনি কর্তা, করণ ও কর্মের পরম নিয়ন্তা। তাই আপনি দেহ, মন ও ইন্দ্রিয়ের নিয়ন্তা। আপনি অহঙ্কারের পরম নিয়ন্তা রুদ্র। আপনিই হচ্ছেন জ্ঞান ও বৈদিক নির্দেশ অনুসারে কর্মের উৎস। হে ভগবান! আমি আপনার সেই রূপ দর্শন করতে চাই যা আপনার অত্যন্ত প্রিয় ভক্তরা আরাধনা করেন। আপনার অন্য বহু রূপ রয়েছে, কিন্তু আমি বিশেষভাবে সেই রূপ দর্শন করতে চাই, যা ভক্তদের অত্যন্ত প্রিয়। দয়া করে আপনি আমার প্রতি প্রসন্ন হয়ে, সেই রূপ প্রদর্শন করুন, কারণ ভক্তদের আরাধ্য সেই রূপই কেবল ইন্দ্রিয়ের সমস্ত আবেদনগুলি পূর্ণরূপে তৃপ্ত করতে পারে। ভগবানের রূপ বর্ষার সুস্নিগ্ধ মেঘের মতো শ্যামবর্ণ। বর্ষার ধারা যেমন স্নিগ্ধ, তাঁর দেহের সৌন্দর্যও তেমন স্নিগ্ধ। নিঃসন্দেহে তিনি হচ্ছেন সমস্ত সৌন্দর্যের সমষ্টি। ভগবানের চতুর্ভজ ও পদ্ম-পলাশের মতো নেত্রসমন্বিত তাঁর মুখমণ্ডল অপূর্ব সুন্দর। তাঁর নাসিকা উন্নত, তাঁর হাসি অত্যন্ত মনোহর, তাঁর কপোল অত্যন্ত সুন্দর এবং সম্পূর্ণরূপে বিভূষিত তাঁর কর্ণযুগল সমানভাবে সুন্দর। তাঁর উদার ও প্রীতিপূর্ণ হাস্য এবং তাঁর ভক্তদের প্রতি নেত্রান্ত থেকে তির্যকভাবে দৃষ্টিপাতের ফলে, ভগবান অপূর্ব সুন্দর। তাঁর কৃষ্ণ কেশদাম কুঞ্চিত এবং পদ্মফুলের কেশরের মতো তাঁর পীতবর্ণ বসন বায়ুর মধ্যে উড়ছে। তাঁর উজ্জ্বল কর্ণকুণ্ডল, মুকুট, বলয়, হার, নূপুর, মেখলা এবং শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম সহ অন্যান্য অলংকার-সমূহ তাঁর বক্ষের কৌস্তুভ-মণির স্বাভাবিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করছে। ভগবানের স্কন্দদেশ ঠিক সিংহের মতো। সেই স্কন্ধদেশ ফুলের মালা, কন্ঠহার ও মণিমালা সর্বদা উজ্জ্বলভাবে শোভা পাচ্ছে। এগুলি ছাড়াও রয়েছে কৌস্তুভ-মণির সৌন্দর্য আর ভগবানের শ্যাম বক্ষস্থলে শ্রীবৎস-চিহ্ন, যা হচ্ছে লক্ষ্মীদেবীর প্রতীক। এই উজ্জ্বল শ্রীবৎস-চিহ্ন স্বর্ণ-রেখাঙ্কিত কষ্টিপাথরের সৌন্দর্যকেও তিরস্কার করছে। ভগবানের উদর ত্রিবলী-রেখায় শোভিত। তা অশ্বত্থ পত্রের মতো গোল এবং তার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের ফলে, সেই উদর অত্যন্ত সুন্দরভাবে কম্পিত হয়। ভগবানের নাভিদেশ এত গভীর যে, মনে হয় যেন সেখান থেকে সমগ্র বিশ্ব প্রকাশ হয়ে পুনরায় সেখানেই প্রবেশ করতে চায়। ভগবানের কোমরের নিম্নভাগ শ্যামবর্ণ এবং তা পীতবর্ণ বস্ত্র ও স্বর্ণনির্মিত মেখলার দ্বারা সুশোভিত। তাঁর পাদপদ্ম, জঙ্ঘা, ঊরুদ্বয় ও জানুযুগল পরস্পর সমান এবং অপূর্ব সুন্দর। তাঁর সমগ্র শরীর অত্যন্ত সুন্দরভাবে গঠিত। হে ভগবান! আপনার শ্রীপাদপদ্ম-যুগল শরৎকালের প্রস্ফুটিত পদ্মদলের মতো এবং আপনার সেই পাদপদ্মের নখরাজির দীপ্তি বদ্ধ জীবদের হৃদয়ের অজ্ঞান অন্ধকার দূর করে। হে ভগবান! আপনি আমাকে কৃপাপূর্বক আপনার সেই রূপ প্রদর্শন করুন, যা ভক্তদের হৃদয়ের সমস্ত অন্ধকার দূর করে। হে ভগবান! আপনি সকলের পরম গুরু; অতএব অজ্ঞানের অন্ধকারে আচ্ছন্ন সমস্ত বদ্ধ জীব আপনার কাছ থেকে জ্ঞানের আলোক প্রাপ্ত হতে পারে।”
“হে ভগবান! যাঁরা তাদের জীবন পবিত্র করতে চান, তাঁদের অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে, পূর্বোক্ত বর্ণনা অনুসারে আপনার শ্রীপাদপদ্মের ধ্যান করা। যাঁরা তাঁদের স্বধর্ম অনুষ্ঠানে ঐকান্তিকভাবে আগ্রহী এবং যাঁরা ভয় থেকে মুক্ত হতে চান, তাঁদের এই ভক্তিযোগের পন্থা অবলম্বন করা অবশ্য কর্তব্য। হে ভগবান! স্বর্গের দেবরাজ ইন্দ্রও জীবনের চরম লক্ষ্য ভগবদ্ভক্তি লাভে অভিলাষী! তেমনই, আপনি ব্রহ্মবাদীদেরও চরম লক্ষ্য। কিন্তু, তাদের পক্ষে আপনাকে লাভ করা অত্যন্ত কঠিন, অথচ যাঁরা আপনার ভক্ত, তাঁরা আপনাকে অনায়াসে প্রাপ্ত হতে পারেন। হে ভগবান! ভগবদ্ভক্তি মুক্ত পুরুষদের পক্ষেও দুর্লভ, কিন্তু এই ভক্তির দ্বারা কেবল আপনার প্রসন্নতা-বিধান করা যায়। কেউ যদি জীবনের সিদ্ধিলাভের বিষয়ে প্রকৃতই নিষ্ঠাপরায়ণ হন, তা হলে আত্ম-উপলব্ধির অন্য পন্থা তিনি কেন গ্রহণ করবেন? অজেয় কাল কেবলমাত্র তাঁর ভ্রূকুটি বিলাসের দ্বারা সমগ্র বিশ্ব ধ্বংস করে। কিন্তু যাঁরা সম্পূর্ণরূপে আপনার শ্রীপাদপদ্মের শরণাগত ভক্ত, তাঁদের কাছে ভয়ঙ্কর কাল আসতে পারে না। কেউ যদি সৌভাগ্যক্রমে ক্ষণার্ধের জন্য ভগবদ্ভক্তের সঙ্গলাভের সুযোগ পান, তা হলে আর তাঁর কর্ম ও জ্ঞানের ফলের প্রতি কোন আকর্ষণ থাকে না। তা হলে যে সমস্ত দেবতারা জন্ম ও মৃত্যুর নিয়ন্ত্রণাধীন, তাঁদের কাছ থেকে বর লাভ করার প্রতি তাঁর কি আর আকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে? হে ভগবান! আপনার শ্রীপাদপদ্ম সমস্ত মঙ্গলের উৎস এবং সমস্ত পাপের কলুষ বিনাশকারী। আমি তাই আপনার কাছে প্রার্থনা করি, আপনি যেন আমাকে আপনার ভক্তদের সঙ্গলাভের আশীর্বাদ করেন, যাঁরা আপনার শ্রীপাদপদ্মের আরাধনা করার ফলে, সম্পূর্ণরূপে পবিত্র হয়েছেন এবং যাঁরা বদ্ধ জীবদের প্রতি অত্যন্ত কৃপাময়। আমি মনে করি যে, আপনার এই প্রকার ভক্তদের সঙ্গ করার সৌভাগ্যই হবে আমার প্রতি আপনার প্রকৃত আশীর্বাদ।”
“যে ভক্তের হৃদয় ভগবদ্ভক্তির প্রভাবে পূর্ণরূপে পবিত্র হয়েছে এবং যিনি ভক্তিদেবীর কৃপা লাভ করেছেন, তিনি কখনও অন্ধকূপ-সদৃশ বহিরঙ্গা মায়াশক্তির দ্বারা মোহিত হন না। এইভাবে সমস্ত জড় কলুষ থেকে পবিত্র হয়ে, ভগবদ্ভক্ত অত্যন্ত আনন্দ সহকারে আপনার নাম, যশ, রূপ কার্যকলাপ ইত্যাদি হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন। হে ভগবান! নির্বিশেষ ব্রহ্ম সূর্য কিরণের মতো অথবা আকাশের মতো সর্বব্যাপ্ত। সেই নির্বিশেষ ব্রহ্ম, যা সমগ্র ব্রহ্মা- জুড়ে ব্যাপ্ত এবং যাতে সমগ্র ব্রহ্মা- অবস্থিত, তা আপনিই। হে ভগবান! আপনার বহু প্রকার শক্তি রয়েছে এবং সেই সমস্ত শক্তিগুলি নানারূপে প্রকাশিত। সেই শক্তির দ্বারা আপনি এই জড় জগৎ সৃষ্টি করেছেন এবং এমনভাবে তা আপনি পালন করছেন যে, মনে হয় তা যেন চিরস্থায়ী, কিন্তু তবুও চরমে আপনি তা ধ্বংস করেন। যদিও আপনি এই প্রকার পরিবর্তনের দ্বারা কখনও একটুও বিচলিত হন না, তবুও জীবেরা তার ফলে বিচলিত হয় এবং তাই তারা মনে করে যে, এই জড় জগৎ আপনার থেকে ভিন্ন। হে ভগবান! আপনি সর্বদা স্বতন্ত্র এবং তা আমি স্পষ্টভাবে দর্শন করতে পারি। হে ভগবান! আপনার বিশ্বরূপ পঞ্চ তত্ত্ব, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার এবং আপনার অংশ সর্বান্তর্যামী পরমাত্মার দ্বারা রচিত। ভক্ত ব্যতীত অন্য যোগীরা যথা কর্মযোগী ও জ্ঞানযোদীরা তাদের স্বীয় স্থিতিতে অবস্থিত থেকে, তাদের কার্যকলাপের দ্বারা আপনার আরাধনা করে। বেদে, তন্ত্রে ও অন্যান্য সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রে সর্বত্র উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেবল আপনিই আরাধ্য। সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রে এটিই হচ্ছে পরম সিদ্ধান্ত।”
“হে ভগবান! আপনি সর্ব-কারণের পরম কারণ একমাত্র পরম পুরুষ। এই জড় জগৎ সৃষ্টির পূর্বে, আপনার মায়াশক্তি সুপ্ত অবস্থায় থাকে। যখন আপনার মায়াশক্তি ক্ষোভিত হয়, তখন সত্ত্ব, রজ ও তম, এই তিনটি গুণ সক্রিয় হয় এবং তার ফলে মহত্তত্ত্ব, অহঙ্কার, আকাশ, বায়ু, আগুন, জল, মাটি, বিভিন্ন দেবতা ও ঋষিগণ প্রকট হন। এইভাবে জড় জগতের সৃষ্টি হয়। হে ভগবান! আপনার স্বীয় শক্তির দ্বারা সৃষ্টি করার পর, আপনি চারটি রূপে এই সৃষ্টিতে প্রবেশ করেন। সমস্ত জীবের অন্তঃকরণে অবস্থিত হয়ে আপনি তাদের জানেন এবং কিভাবে তারা তাদের ইন্দ্রিয় উপভোগ করছে তাও জানেন। এই জড় জগতে তথাকথিত সুখভোগ ঠিক মৌমাছির মৌচাকে সঞ্চিত মধু আস্বাদন করার মতো। হে ভগবান! আপনার পরম ঈশ্বরত্ব প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করা যায় না, কিন্তু এই জগতে যে সবকিছু কালের প্রভাবে ধ্বংস হয়ে যায়, তা দেখে তা অনুমান করা যায়। কালের বেগ অত্যন্ত প্রচণ্ড এবং সবকিছুই অন্য কিছুর দ্বারা ধ্বংস প্রাপ্ত হয়- ঠিক যেমন একটি পশু আর একটি পশুকে আহার করে। বায়ু যেমন আকাশের মেঘকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে, ঠিক সেইভাবে কাল সবকিছু ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দেয়। হে ভগবান! এই জড় জগতে সমস্ত জীবই বিভিন্ন বিষয়ে পরিকল্পনার ব্যাপারে প্রমত্ত এবং তারা সর্বদাই কিছু না কিছু করার বাসনায় ব্যস্ত তার কারণ হচ্ছে দুর্দমনীয় লোভ। জড়-জাগতিক সুখভোগের জন্য এই লোভ জীবের মধ্যে সর্বদাই রয়েছে, কিন্তু পরমেশ্বর ভগবান আপনি কালরূপে তাদের আক্রমণ করেন, ঠিকযেভাবে একটি সর্প অনায়াসে একটি মূষিককে গ্রাস করে।”
“হে ভগবান! যে-কোন পণ্ডিত ব্যক্তিই জানেন যে, আপনার আরাধনা না করলে সমগ্র জীবন ব্যর্থ হয়। সেই কথা জানা সত্ত্বেও, কিভাবে তিনি আপনার শ্রীপাদপদ্মের আরাধনা ত্যাগ করতে পারেন? এমন কি আমাদের পিতা এবং গুরুদেব ব্রহ্মাও নির্দ্বিধায় আপনার আরাধনা করেছেন এবং চতুর্দশ মনুগণও তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। হে ভগবান! যে-সমস্ত মানুষ প্রকৃতপক্ষে জ্ঞানবান, তাঁরা আপনাকে পরম ব্রহ্ম ও পরমাত্মারূপে জানেন। যদিও সমগ্র ব্রহ্মা- চরমে সব কিছুর সংহারকারী রুদ্রের ভয়ে ভীত, কিন্তু আপনার জ্ঞানবান ভক্তের কাছে আপনিই হচ্ছেন নির্ভয় আশ্রয়। হে রাজপুত্রগণ! তোমরা সকলে বিশুদ্ধ হৃদয়ে তোমাদের রাজোচিত কর্তব্য সম্পাদন কর। ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে মন স্থির করে তোমরা এই মন্ত্র জপ কর। তার ফলে ভগবান তোমাদের প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হবেন এবং তাতে তোমাদের সর্বতোভাবে মঙ্গল হবে। অতএব, হে রাজকুমারগণ! পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরি সকলেরই হৃদয়ে অবস্থিত। তিনি তোমাদের হৃদয়েও অবস্থিত। অতএব সর্বক্ষণ তাঁর মহিমা কীর্তন কর এবং নিরন্তর তাঁর ধ্যান কর।”
“হে রাজপুত্রগণ! আমি তোমাদের কাছে প্রার্থনা রূপে ভগবানের দিব্য নাম কীর্তন করার যোগপদ্ধতি বর্ণনা করেছি। তোমরা সকলে এই মহত্ত্বপূর্ণ স্তোত্র মনে ধারণ করে তাতে সমাহিত থাকার ব্রত গ্রহণ করার মাধ্যমে মহান ঋষি হও। মুনিদের মতো মৌনব্রত অবলম্বন করে, তোমরা গভীর মনোযোগ ও শ্রদ্ধা সহকারে এই পন্থা অনুশীলন কর। সমস্ত প্রজাপতিদের প্রভু ব্রহ্মা প্রথমে আমাদের এই স্তোত্রটি বলেছিলেন। সৃষ্টিকার্যে ইচ্ছুক ভৃগু আদি প্রজাপতিদেরও এই স্তোত্র শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল। ব্রহ্মা যখন সমস্ত প্রজাপতিদের প্রজার সৃষ্টি করার আদেশ দিয়েছিলেন, তখন আমরা ভগবানের মহিমা কীর্তন করে এই স্তোত্র গেয়েছিলাম এবং সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞান থেকে মুক্ত হয়েছিলাম। এইভাবে আমরা বিবিধ প্রকার জীব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলাম। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত, যাঁর মন সর্বদা তাঁর ধ্যানে মগ্ন থাকে, যিনি একাগ্রচিত্তে শ্রদ্ধা সহকারে এই স্তোত্র জপ করেন, তিনি অচিরেই জীবনের পরম সিদ্ধি লাভ করবেন। এই জড় জগতে যত প্রকার কল্যাণ রয়েছে, তার মধ্যে জ্ঞানকেই সর্বশ্রেষ্ঠ বলে বিবেচনা করা হয়, কারণ জ্ঞানরূপ নৌকায় আরোহণ করে, দুর্লঙ্ঘ্য সংসার-সমুদ্র উত্তীর্ণ হওয়া যায়। তা ছাড়া এই সমদ্র উত্তীর্ণ হওয়ার আর কোন উপায় নেই। যদিও পরমেশ্বর ভগবানকে ভক্তি করা এবং তার আরাধনা করা অত্যন্ত কঠিন, তবুও কেউ যদি আমার দ্বারা রচিত ও গীত এই স্তোত্র কেবল পাঠ করেন, তা হলে তিনি অনায়াসে পরমেশ্বর ভগবানের কৃপা লাভ করতে পারেন। পরমেশ্বর ভগবান সমস্ত মঙ্গলময় আশীর্বাদের মধ্যে প্রিয়তম বস্তু। যে ব্যক্তি আমার দ্বারা গীত এই সঙ্গীত গান করেন, তিনি ভগবানকে প্রসন্ন করতে পারেন। এই প্রকার ভক্ত ভগবদ্ভক্তিতে স্থির হয়ে ভগবানের কাছে যা প্রার্থনা করেন, তাই প্রাপ্ত হন। যে ভক্ত খুব সকালে উঠে বদ্ধাঞ্জলি হয়ে এই রুদ্রগীত গান করেন এবং অন্যদের তা শোনান, তিনি নিশ্চিতভাবে সকাম কর্মের সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্ত হবেন। হে রাজপুত্রগণ! আমি যে স্তোত্রটি গাইলাম, তার উদ্দেশ্য হচ্ছে পরমাত্মা পরমেশ্বর ভগবানের প্রসন্নতা বিধান করা। আমি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি এই স্তোত্র তোমরা জপ কর, কারণ তা মহান তপস্যারই মতো কার্যকরী। এইভাবে যখন তোমরা পূর্ণতা প্রাপ্ত হবে, তখন তোমাদের জীবন সার্থক হবে এবং তোমাদের সমস্ত অভীষ্ট প্রাপ্ত হবে।”
চতুর্বিংশতি অধ্যায়- রুদ্রগীত কীর্তন
31 Aug 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, চতুর্থ স্কন্ধ- ভগবদ্ভক্তদের প্রতি অনুগ্রহ