ষষ্ঠ অধ্যায়- ভগবান ঋষভদেবের কার্যকলাপ

মহারাজ পরীক্ষিত শ্রীল শুকদেব গোস্বামীকে জিজ্ঞাসা করলেন- “হে ভগবন্, যাঁদের হৃদয় সম্পূর্ণরূপে নির্মল, ভক্তিযোগ অনুশীলনের প্রভাবে তাঁরা জ্ঞান লাভ করেন এবং সকাম কর্মের প্রতি তাঁদের সমস্ত আসক্তি সম্পূর্ণরূপে দগ্ধ হয়ে ভষ্মীভূত হয়। তখন তাঁদের কাছে সমস্ত যোগ ঐশ্বর্য আপনা থেকেই উপস্থিত হলেও তা তাঁদের কাছে ক্লেশদায়ক হয় না। তাহলে ঋষভদেব কেন সেগুলি অঙ্গীকার করলেন না?”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী উত্তর দিলেন- “হে রাজন্, আপনি যা বলেছেন তা সত্য। কিন্তু, ধূর্ত ব্যাধ যেমন পশুদের ধরার পরও তাঁদের প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে না, কারণ তারা পালিয়ে যেতে পারে, তেমনই মহাত্মগণও চঞ্চল মনের প্রতি আস্থা স্থাপন করেন না। তাই তাঁরা সর্বদা অত্যন্ত সতকর্তার সঙ্গে মনকে পর্যবেক্ষণ করেন।”
পণ্ডিতেরা বলেছেন- “মন স্বভাবতই অত্যন্ত চঞ্চল, তাই তার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করা উচিত নয়। মনের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করলে, যে কোন মুহূর্তে তা আমাদের প্রতারণা করতে পারে। দেবাদিদেব মহাদেও ভগবানের মোহিনী মূর্তি দেখে বিচলিত হয়েছিলেন এবং সৌভরি মুনি যোগসিদ্ধির অতি উন্নত অবস্থা থেকে অধঃপতিত হয়েছিলেন। অসতী স্ত্রী যেমন সহজেই উপপতির সঙ্গ লাভের জন্য নিজের স্বামীর প্রাণ বিনাশ করায়, তেমনই যোগী যদি তাঁর মনকে সংযত না রাখেন, তাহলে তাঁর মন কাম, ক্রোধ, লোভ ইত্যাদি শত্রুদের প্রশ্রয় দিয়ে নিশ্চিতভাবেই সেই যোগীকে হত্যা করবে। মন হচ্ছে, কাম, ক্রোধ, মদ, লোভ, শোক, মোহ এবং ভয়ের মূল কারণ। এই সব একত্রে কর্মবন্ধনের সৃষ্টি করে। অতএব কোন্ বুদ্ধিমান ব্যক্তি এই মনকে বিশ্বাস করবেন?”
“ভগবান ঋষভদেব এই ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত রাজা এবং সম্রাটদের শিরোভূষণ ছিলেন, কিন্তু তিনি অবধূতের বেশ, ভাষা ও চরিত্র অবলম্বন করে জড়বৎ অবস্থান করছিলেন বলে, তখন কেউই তাঁর দিব্য ঐশ্বর্য দর্শন করতে পারেনি। তিনি যোগীদের দেহত্যাগ করার প্রক্রিয়া শিক্ষা দেওয়ার জন্য এইভাবে আচরণ করছিলেন। কিন্ত তা সত্ত্বেও, বাসুদেব কৃষ্ণের অংশ-অবতাররূপে তাঁর মূলস্থিতি তিনি সর্বদাই বজায় রেখেছিলেন। সেই অবস্থায় নিরন্তর অবস্থান করে তিনি ঋষভদেব রূপে এই জড় জগতে তাঁর লীলা সংবরণ করেছিলেন। ভগবান ঋষভদেবের পদাঙ্ক অনুসরণ করে কেউ যদি তাঁর সূক্ষ্ম দেহ ত্যাগ করতে পারেন, তাহলে আর তাঁর জড় দেহ ধারণ করার কোন সম্ভাবনা থাকে না। প্রকৃতপক্ষে ঋষভদেবের কোন জড় শরীর ছিল না, কিন্তু যোগমায়ার প্রভাবে তিনি তাঁর দেহকে জড় বলে মনে করেছিলেন এবং যেহেতু তিনি একজন সাধারণ মানুষের মতো লীলাবিলাস করছিলেন, তাই তিনি তাঁর দেহাত্মবুদ্ধি পরিত্যাগ করেছিলেন। এইভাবে স্থূল এবং সূক্ষ্ম দেহ অভিমান পরিত্যাগ করে ভ্রমণ করতে করতে তিনি দক্ষিণ ভারতের কর্ণটক প্রদেশের কোঙ্ক, বেঙ্ক ও কুটক প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করে, তাঁর ইচ্ছা অনুসারে কুটকাচল পর্বতের সমীপবর্তী উপবনে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেখানে তিনি তাঁর মুখের মধ্যে কতকগুলি পাথরে টুকরো নিক্ষেপ করে, উন্মাদের মতো মুক্তকেশে দিগম্বর বেশে ভ্রমণ করতে লাগলেন। তিনি যখন এইভাবে ভ্রমণ করছিলেন, তখন বায়ুবেগে সেই বনের বাঁশের মধ্যে সংঘর্ষনের ফলে প্রচণ্ড দাবানল প্রজ্বলিত হয়েছিল। সেই দাবানল ভগবান ঋষভদেবের দেহসহ কুটকাচলের সমীপবর্তী সেই বনটিকে ভস্মীভূত করেছিল।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী মহারাজ পরীক্ষিৎকে বললেন- “হে রাজন্, ঋষভদেবের কার্যকলাপের কথা শ্রবণ করে এবং তাঁর অনুকরণে কোঙ্ক, বেঙ্ক এবং কুটকের রাজা অর্হৎ এক নতুন ধর্মমত প্রবর্তন করেছিলেন। পাপময় কলিযুগের সুযোগ গ্রহণ করে, রাজা অর্হৎ বিমূঢ় হয়ে এবং সমস্ত ভয় অপনোদনকারী বৈদিক ধর্মপথ পরিত্যাগ করে, নিজের মনগড়া এক বেদবিরুদ্ধ ধর্মমত প্রবর্তন করেছিলেন। এইভাবে জৈনধর্মের সূচনা হয়। অন্য অনেক তথাকথিত ধর্মও এই নাস্তিক্য মত অনুসরণ করেছিল। তার ফলে নরাধমেরা দৈবী মায়ায় বিমোহিত হয়ে, বর্ণাশ্রম ধর্মের বিধিনিষেধ পরিত্যাগ করবে। তারা দিনে তিনবার স্নান এবং ভগবানে আরাধনা পরিত্যাগ করবে। শৌচাচার পরিত্যাগ করে এবং পরমেশ্বর ভগবান অবজ্ঞা করে তারা কুসিদ্ধান্তসমূহ স্বীকার করবে। নিয়মিতভাবে স্নান না করে এবং আচমন না করে তারা সর্বদা অশৌচ থাকবে এবং তারা তাদের কেশ উৎপাটন করবে। মনগড়া ধর্ম অনুষ্ঠান করে, তারা তাদের প্রভাব বিস্তার করবে। এই কলিযুগে, মানুষেরা অধর্মের প্রতি অধিক অনুরক্ত। তার ফলে সেই সমস্ত মানুষেরা স্বাভাবিকভাবেই বেদ, বেদানুগ ব্রাহ্মণ, ভগবান এবং ভক্তদের উপহাস করবে। এই সমস্ত নরাধমেরা বেদবিরোধী ধর্মমত প্রবর্তন করে। তাদের মনগড়া মতবাদের অনুসরণ করে তারা আপনা থেকেই ঘোর তমিস্রে প্রবিষ্ট হয়। এই কলিযুগে মানুষেরা রজ এবং তমোগুণের দ্বারা আচ্ছন্ন। ভগবান ঋষভদেব তাদের মায়ার বন্ধন থেকে উদ্ধার করার জন্য অবতরণ করেছিলেন।”
“পণ্ডিতেরা ঋষভদেবের দিব্য গুণাবলী বর্ণনা করে এই প্রকার শ্লোকসমূহ কীর্তন করেন- “আহা, সপ্ত-সাগর এবং সপ্ত-দ্বীপ সমন্বিতা পৃথিবীর মধ্যে এই ভারতবর্ষই সব চাইতে পবিত্র স্থান, কারণ এখানে সকলেই ঋষভদেব আদি ভগবানের অবতারদের মহিমা কীর্তন করেন। মানব সমাজের কল্যাণ সাধনের জন্য এই সমস্ত কার্যকলাপ অত্যন্ত পবিত্র। আহা, প্রিয়ব্রতের বংশ সম্বন্ধে আমি কি বলব, যা অত্যন্ত নির্মল এবং বিখ্যাত। এই বংশে পুরাণ পুরুষ আদি দেব ভগবান অবতীর্ণ হয়ে সকাম কর্মের নিবৃত্তিসাধক ধর্মের আচরণ করেছিলেন। এমন কোন যোগী কি আছেন যিনি মনের দ্বারাও ঋষভদেবের আদর্শ অনুসরণ করতে পারেন? যোগীরা যে সমস্ত সিদ্ধি লাভের জন্য লালায়িত, ভগবান ঋষভদেব সেগুরি ‘অসৎ’ বলে পরিত্যাগ করেছিলেন। এমন কোন্ যোগী আছেন ঋষভদেবের সঙ্গে যাঁর তুলনা করা যায়?’
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “ভগবান ঋষভদেব সমস্ত বৈদিক জ্ঞান, মানুষ, দেবতা, গাভী এবং ব্রাহ্মণদের গুরু। আমি পূর্বেই তাঁর বিশুদ্ধ, দিব্য কার্যকলাপের বিস্তারিত বর্ণনা করেছি, যা সমস্ত জীবের যাবতীয় পাপকর্ম বিনাশ করে। ভগবান ঋষভদেবের লীলার এই বর্ণনা সমস্ত মঙ্গলের উৎস। যিনি আচার্যদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে মনোযোগ সহকারে তা শ্রবণ করেন অথবা কীর্তন করেন, তিনি নিঃসন্দেহে ভগবান বাসুদেবের শ্রীপাদপদ্মে অনন্য ভক্তি লাভ করবেন। ভগবদ্ভক্তেরা জড় জগতের বিভিন্ন দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্ত হওয়ার ফলে, নিরন্তর ভগবদ্ভক্তির অমৃতে অবগাহন করেন। তার ফলে ভগবদ্ভক্ত পরম আনন্দ উপভোগ করেন এবং মুক্তি স্বয়ং তাঁর সেবা করতে আসেন। কিন্তু তাঁরা তাঁর সেবা গ্রহণ করেন না। এমনকি ভগবান স্বয়ং তাঁদের মুক্তি দিতে চাইলেও তাঁরা তা গ্রহণ করতে চান না। ভক্তের কাছে মুক্তি নিতান্তই নগণ্য, কারণ ভগবানের দিব্য প্রেমময়ী সেবা লাভ করার ফলে, তাঁদের সমস্ত আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়ে যায় এবং তাঁদের আর কোন জড়-জাগতিক বাসনা থাকে না।”
“হে রাজন্, পরমেশ্বর ভগবান মুকুন্দ পাণ্ডব ও যদুদের পালক। তিনি আপনাদের গুরু, ইষ্টদেব, সখা এবং কার্যকলাপের পরিচালক। অধিক কি, তিনি কোন কোন সময় আপনাদের বার্তাবহ দূত অথবা কিঙ্করের কার্যও করেছিলেন। অর্থাৎ তিনি একজন সাধারণ ভৃত্যের মতো আচরণ করেছিলেন। যাঁরা ভগবানের কৃপা লাভের জন্য তাঁর সেবায় যুক্ত, তাঁরা অনায়াসে মুক্তি লাভ করতে পারেন। কিন্তু তিনি সচরাচর কাউকে ভক্তিযোগ প্রদান করেন না। ভগবান ঋষভদেব তাঁর স্বরূপ সম্বন্ধে অবগত ছিলেন; তাই তিনি ছিলেন আত্মতৃপ্ত এবং তাঁর বাহ্য ইন্দ্রিয় সুখভোগের কোন বাসনা ছিল না। যেহেতু তিনি ছিলেন স্বয়ংসম্পূর্ণ, তাই তাঁর কোন প্রকার সাফল্য লাভের কোন বাসনা ছিল না। যাাঁরা দেহাত্মবুদ্ধি-যুক্ত হয়ে জড় পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য বৃথা পরিশ্রম করে, তারা অবশ্যই তাদের প্রকৃত স্বার্থ সম্বন্ধে অবগত নয়। ভগবান ঋষভদেব তাঁর অহৈতুকী কৃপাবশত, আত্মার স্বরূপ এবং জীবনের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে শিক্ষা দান করেছিলেন। তাই আমরা ভগবান ঋষভদেবকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।”

Leave a Reply

September 2025
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  

Blog Stats

  • 140,943 hits