মহর্ষি মৈত্রেয় বিদুরকে বললেন- “হে বিদুর! পৃথিবী এইভাবে স্তব করা সত্ত্বেও পৃথু মহারাজের ক্রোধ উপশম হল না এবং অত্যন্ত ক্রোধের বশে তাঁর অধর তখন কম্পিত হচ্ছিল। পৃথিবী অত্যন্ত ভীতা হওয়া সত্ত্বেও, রাজাকে আশ্বস্ত করার জন্য এইভাবে বলতে শুরু করেছিলেন। হে ভগবান! দয়া করে আপনি ক্রোধ সংবরণ করুন এবং আমি আপনাকে যা নিবেদন করছি, তা ধৈর্য সহকারে শ্রবণ করুন। দয়া করে এই বিষয়ে আপনি একটু বিবেচনা করুন। আমি অত্যন্ত দীন হতে পারি, কিন্তু মধুকর যেমন প্রতিটি ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে, ঠিক তেমনিই পণ্ডিত ব্যক্তি সমস্ত বিষয় থেকেই তার সারভাগ গ্রহণ করেন। সমগ্র মানব-সমাজের মঙ্গলের জন্য, কেবল ইহলোকেই নয়, পরলোকেও মানুষের উন্নতি সাধনের তত্ত্বদর্শী মুনিঋষিরা বিবিধ উপায় নির্ণয় করে গেছেন। যিনি পূর্বতন মহর্ষিদের প্রদর্শিত উপায় ব্যবহারিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যথাযথভাবে অনুসরণ করেন, তিনি অনায়াসে তার জীবনের উদ্দেশ্য সাধন করতে পারেন। যে সমস্ত মূর্খ মানুষ নির্ভুল নির্দেশ প্রদানকারী মহর্ষিদের প্রমাণিকতা অস্বীকার করে, তাদের স্বতন্ত্র ইচ্ছা অনুসারে কল্পিত উপায়সমুহ উদ্ভাবন করে তাদের সেই সমস্ত প্রচেষ্টা কেবলই বার বার নিষ্ফল হয়।”
“হে রাজন্! পুরাকালে ব্রহ্মা যে-সমস্ত বীজ, মূল, ওষধি এবং শস্য সৃষ্টি করেছিলেন, তা এখন সমস্ত অভক্তরা ভোগ করছে, যারা সব রকম আধ্যাত্মিক জ্ঞানরহিত। হে রাজন্! কেবল শস্য ও ওষধিই অভক্তদের দ্বারা অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে, তাই নয়, যথাযথভাবে আমার পালনও হচ্ছে না। ইন্দ্রিয়তৃপ্তি সাধনের উদ্দেশ্যে খাদ্যশস্য ব্যবহার করে যারা চোরে পরিণত হয়েছে, সেই সমস্ত দুর্বৃত্তদের দণ্ডদানে অক্ষম রাজাদের দ্বারাও আমি অনাদৃতা। তাই আমি সমস্ত বীজ লুকিয়ে রেখেছি, কারণ সেগুলি প্রকৃতপক্ষে যজ্ঞ অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহার করার কথা। দীর্ঘকাল আমার ভিতর সঞ্চিত থাকার ফলে, এই সমস্ত শস্যবীজ নিশ্চয়ই জীর্ণ হয়েছে। তাই আচর্য বা শাস্ত্র নির্দেশিত উপযুক্ত উপায়ে, সেই সমস্ত বীজগুলি এখনই উদ্ধার করা আপনার কর্তব্য। হে মহাবীর! হে ভূতভাবন! আপনি যদি প্রচুর খাদ্যশস্য প্রদান করে জীবদের কষ্ট নিবারণ করতে চান, আপনি যদি আমাকে দোহন করে তাদের পোষণ করতে চান, তা হলে আপনি উপযুক্ত বৎস, দোহনপাত্র ও দোগ্ধা নিরূপণ করুন, যাতে আমি আমার বৎসের প্রতি অত্যন্ত বৎসলা হয়ে আপনার বাসনা অনুসারে দুগ্ধ প্রদান করতে পারি। হে রাজন্! আপনি আমাকে এমনভাবে সমতল করুন, যেন বর্ষা ঋতু শেষ হয়ে গেলেও, ইন্দ্রদেব-বর্ষিত জল আমার উপরিভাগে সর্বত্রই সমভাবে থাকতে পারে এবং পৃথিবীকে আর্দ্র রাখতে পারে। তার ফলে সর্বপ্রকার উৎপাদনের জন্য তা অত্যন্ত শুভ হবে।”
“পৃথিবীর এই প্রিয় ও হিতকর বাক্য শ্রবণ করে পৃথু মহারাজ প্রসন্ন হয়েছিলেন। তার পর তিনি স্বায়ম্ভুব মনুকে বৎস রূপে গ্রহণ করে, তার নিজের হাতকে দোহন পাত্ররূপে পরিণত করে, পৃথিবীরূপ গাভী থেকে সমস্ত ওষধি ও শস্য দোহন করেছিলেন। অন্যেরা, যাঁরা পৃথু মহারাজের মতো বুদ্ধিমান ছিলেন, তাঁরাও পৃথিবী থেকে সার গ্রহণ করেছিলেন। বাস্তবিকপক্ষে সকলেই সেই সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন এবং পৃথু মহারাজের পদাঙ্ক অনুসরণ করে, তাঁদের বাসনা অনুসারে তাঁরা পৃথিবীর কাছ থেকে সমস্ত বস্তু প্রাপ্ত হয়েছিলেন। মহর্ষিগণ বৃহস্পতিকে বৎসে পরিণত করে এবং তাঁদের ইন্দ্রিয়সমূহকে দোহনপাত্রে পরিণত করে, তাঁদের বাণী, মন ও শ্রবণ পবিত্র করার জন্য সর্বপ্রকার বৈদিক জ্ঞান দোহন করেছিলেন। সমস্ত দেবতারা দেবরাজ ইন্দ্রকে বৎসে পরিণত করে, পৃথিবী থেকে সোমরসরূপ অমৃত দোহন করেছিলেন। তার ফলে তাঁদের মানসিক ক্ষমতা, দেহের ক্ষমতা এবং ইন্দ্রিয়ের ক্ষমতা অত্যন্ত প্রবল হয়েছিল। দৈত্য-দানবেরা অসুরকুলশ্রেষ্ঠ প্রহ্লাদ মাহরাজকে বৎস বানিয়ে, বিভিন্ন প্রকার সুরা এবং আসব দোহন করেছিল, যা তারা লৌহপাত্রে রেখেছিল। গন্ধর্ব ও অপ্সরারা বিশ্বাবসুকে বৎস বানিয়ে, পদ্মফুলের পাত্রে দুগ্ধ দোহন করেছিলেন। সেই দুদ্ধ মধুর সঙ্গীতকলা ও সৌন্দর্যের রূপ ধারণ করেছিল। শ্রাদ্ধকর্মের মূখ্য দেবতা সৌভাগ্যবান পিতৃগণ অর্যমাকে বৎস বানিয়ে অত্যন্ত শ্রদ্ধাসহকারে অপক্ক মৃন্ময় পাত্রে কব্য দোহন করেছিলেন, যা হচ্ছে পিতৃদের উদ্দেশ্যে নিবেদিন অন্ন। তার পর সিদ্ধলোক-বাসীরা এবং বিদ্যাধরলোক-বাসীরা কপিল মুনিকে বৎসরূপে পরিণত করে এবং আকাশকে পাত্র করে, অণিমা আদি যোগসিদ্ধি দোহন করেছিলেন। বস্তুত বিদ্যাধরেরা আকাশে উড়ার বিদ্যা লাভ করেছিলেন। কিম্পুরুষের লোকবাসীরা ময়দানবকে বৎস বানিয়ে সংকল্পমাত্র অদৃশ্য হওয়ার এবং অন্যরূপে আবির্ভূত হওয়ার বিদ্যা দোহন করেছিলেন। তার পর যক্ষ, রাক্ষস, ভূত এবং পিশাচেরা, যারা মাংস আহারে অভ্যস্ত, তারা শিবের অবতার রুদ্রকে বৎসে পরিণত করে, নর-কপালরূপ পাত্রে রক্ত থেকে প্রস্তুত মদ্য দোহন করেছিল। তার পর ফণাহীন সর্প, ফনাযুক্ত সর্প, বিশাল নাগ, বৃশ্চিক এবং অন্যান্য সমস্ত বিষধর প্রাণীরা তক্ষককে বৎস বানিয়ে, সাপের গর্তরূপ পাত্রে পৃথিবী থেকে বিষ দোহন করেছিল। গবাদি চতুষ্পদ প্রাণীরা শিবের বাহন বৃষকে বৎস করে এবং অরণ্যকে পাত্র করে তাদের আহারের জন্য তাজা সবুজ ঘাস দোহন করেছিল। ব্যাঘ্র আদি হিংস্র পশুরা সিংহকে বৎস বানিয়ে তাদের আহার্যরূপে মাংস দোহন করেছিল। পক্ষীরা গরুড়কে বৎস বানিয়ে, পৃথিবী থেকে তাদের আহার্যরূপে জঙ্গম কীটপতঙ্গ এবং স্থাবর তৃণগুল্ম দোহন করেছিল। বৃক্ষরা বটবৃক্ষকে বৎস বানিয়ে বিভিন্ন প্রকার সুস্বাদু রস দোহন করেছিল। পর্বতেরা হিমালয়কে বৎস বানিয়ে, শৃঙ্গরূপে পাত্রে বিভিন্ন প্রকার ধাতু দোহন করেছিল। পৃথিবী সকলকে তাদের উপযুক্ত আহার প্রদান করেছিলেন। পৃথু মহারাজের রাজাত্বকালে পৃথিবী সম্পূর্ণরূপে তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীনে ছিলেন। তার ফলে পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীরা তাদের স্ব স্ব জাতির প্রধানি ব্যক্তিকে বৎসে পরিণত করে, বিভিন্ন প্রকার পাত্রে তাদের খাদ্যরূপ পৃথক পৃথক বস্তু লাভ করেছিলেন।”
“হে কুরুশ্রেষ্ঠ বিদুর! এইভাবে পৃথু প্রমুখ অন্নভোজী জীবেরা ভিন্ন ভিন্ন বৎস সৃষ্টি করে ভিন্ন ভিন্ন দোহনপাত্রে তাদের অভীষ্ট খাদ্যরূপ দুদ্ধ দোহন করেছিলেন। তার পর, পৃথিবী সমস্ত জীবদের বিভিন্ন প্রকার আহার্য প্রদান করেছিলেন বলে, পৃথু মহারাজ তাঁর প্রতি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছিলেন এবং তিনি অত্যন্ত স্নেহপরায়ণ হয়ে পৃথিবীকে দুহিতৃত্বে বরণ করেছিলেন। তার পর, রাজাধিরাজ মহারাজ পৃথু তাঁর ধনুকের শক্তির দ্বারা গিরিপর্বত চূর্ণবিচূর্ণ করে, পৃথিবীপৃষ্ট সমতল করেছিলেন। তাঁরই কৃপায় পৃথিবী প্রায় সমতল হয়েছে। রাজ্যের সমস্ত প্রজাদের কাছে পৃথু মহারাজ ছিলেন ঠিক পিতার মতো। তাই তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য উপযুক্ত বৃত্তি প্রদানে তিনি ব্যস্ত ছিলেন। পৃথিবীপৃষ্ঠ সমতল করার পর, সকলের বৃত্তি এবং বাসনা অনুসারে, তিনি তাদের বাসস্থানের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। এইভাবে পৃথু মহারাজ বহু গ্রাম, নগর, পত্তন, দুর্গ, ঘোষপল্লী, গোশালা, সেনানিবাস, খনি, কৃষকদের গ্রাম এবং পাহাড়ী গ্রাম প্রভৃতি বাসস্থান নির্মান করে দিয়েছিলেন। পৃথু মহারাজের রাজত্বকালের পূর্বে এই ভূমণ্ডলে নগর, গ্রাম, গোচারণভূমি ইত্যাদির পরিকল্পিত ব্যবস্থা ছিল না। সকলেই তাদের নিজেদের খেয়াল-খুশিমতো এবং সুবিধামতো তাদের বাসস্থান তৈরী করত এবং তার ফলে সব কিছুই অবিন্যস্ত ছিল। কিন্তু পৃথু মহারাজের সময় থেকে পরিকল্পনা অনুসারে, নগর ও গ্রাম পত্তনের ব্যবস্থা শুরু হয়।
অষ্টাদশ অধ্যায়- পৃথু মহারাজ কর্তৃক পৃথিবী দোহন
18 Aug 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, চতুর্থ স্কন্ধ- ভগবদ্ভক্তদের প্রতি অনুগ্রহ