মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “এইভাবে বন্দীরা পৃথু মহারাজের গুণাবলী এবং বীরত্বপূর্ণ কার্যকলাপের বর্ণনা করেছিলেন। তার পর পৃথু মহারাজ প্রশংসা বাক্যের দ্বারা তাঁদের অভিনন্দন এবং ইপ্সিত বস্তু প্রদান করে তাঁদের সন্তোষ-বিধান করেছিলেন। এইভাবে সন্তুষ্ট হয়ে পৃথু মহারাজ ব্রাহ্মণ এবং অন্যান্য বর্ণের নেতাদের, তাঁর সেবকদের, তাঁর মন্ত্রীদের, পুরোহিতদের, নাগরিকদের, সাধারণ দেশবাসীদের, অন্যান্য জাতির মানুষদের, প্রশংসকদের এবং অন্যন্য সকলকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন এবং তার ফলে তাঁরা সকলে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। ”
বিদুর মহর্ষি মৈত্রেয়কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- “হে ব্রাহ্মণ! বহুরূপ ধারণে সমর্থা পৃথিবী কেন গাভীরূপ ধারণ করেছিলেন? এবং পৃথু মহারাজ যখন তাঁকে দোহন করেছিলেন, তখন বৎস কে হয়েছিল এবং দোহনপাত্র কি হয়েছিল? পৃথিবী স্বভাবতই অসমতল, কিন্তু পৃথু মহারাজ কিভাবে তাকে সমতল করেছিলেন? আর দেবরাজ ইন্দ্রই বা কেন তাঁর যজ্ঞাশ্ব অপহরণ করেছিলেন? রাজর্ষি পৃথু বেদবিদদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সনৎকুমারের কাছ থেকে তত্ত্বজ্ঞান লাভ করেছিলেন। সেই জ্ঞান প্রাপ্ত হওয়ার পর, তিনি কিভাবে তাঁর জীবনে ব্যবহারিকভাবে তা প্রয়োগ করেছিলেন এবং তিনি কি প্রকার গতি প্রাপ্ত হয়েছিলেন? পৃথু মহারাজ ছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শক্ত্যাবেশ অবতার; তাই তার কার্যকলাপের যে-কোন বর্ণনা অবশ্যই অত্যন্ত শ্রুতিমধুর এবং তা সর্ব সৌভাগ্যপ্রদ। আমি সর্বদা আপনর এবং অধোক্ষজ ভগবানের ভক্ত। তাই দয়া করে পৃথু মহারাজের কাহিনী বর্ণনা করুন, যিনি রাজা বেণের পুত্ররূপে গাভীরূপে পৃথিবীকে দোহন করেছিলেন।”
শ্রীসূত গোস্বামী বললেন- “বিদুর যখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিবিধ অবতারের কার্যকলাপ শুনতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, তখন মৈত্রেয়ও অনুপ্রাণিত হয়ে এবং বিদুরের প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে, তাঁর প্রশংসা করেছিলেন। তার পর মৈত্রেয় বলেছিলেন- হে বিদুর! যখন ব্রাহ্মণ ও ঋষিরা পৃথু মহারাজকে রাজসিংহাসনে অভিষিক্ত করেছিলেন এবং তাকে প্রজাদের রক্ষক বলে ঘোষণা করেছিলেন, তখন অন্নাভাব হয়েছিল। অনাহারে প্রজাদের দেহ বাস্তবিকই ক্ষীণ হয়েছিল। তাই তারা রাজার কাছে এসে তাদের প্রকৃত অবস্থার কথা জনিয়েছিল। হে রাজন্! বৃক্ষের কোটরস্থ অগ্নি যেমন ধীরে ধীরে বৃক্ষটিকে শুকিয়ে ফেলে, তেমনই আমরা আমাদের জঠরাগ্নির প্রভাবে শুকিয়ে যাচ্ছি। আপনি শরণাগতদের রক্ষক এবং আমাদের জীবিকা প্রদানের জন্য আপনি নিযুক্ত হয়েছেন। তাই আমরা সকলে আপনার কাছে এসেছি, যাতে আপনি আমাদের রক্ষা করুন। আপনি কেবল একজন রাজাই নন, আপনি ভগবানের অবতারও। বাস্তবিকপক্ষে আপনি সমস্ত রাজাদের রাজা। আপনি আমাদের সর্বপ্রকার জীবিকা প্রদান করতে পারেন, কারণ আপনি আমাদের জীবিকাপতি। তাই, হে রাজাধিরাজ! দয়া করে অন্ন বিতরণ করে আপনি আমাদের ক্ষুধার নিবৃত্তি-সাধন করুন। দয়া করে আপনি আমাদের রক্ষা করুন, অন্যথায় আনাহারে আমাদের মৃত্যু হবে।”
“হে বিদুর! পৃথু মহারাজ প্রজাদের এই প্রকার বিলাপ শ্রবণ করলেন এবং তাদের করুণ অবস্থা দর্শন করে, তার অন্তর্নিহিত কারণ জানবার জন্য বহুক্ষণ ধরে চিন্তা করেছিলেন। সেই বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজা ক্রোধে সমগ্র জগৎ সংহারকারী ত্রিপুরারির মতো শরাসন গ্রহণ করলেন এবং পৃথিবীকে লক্ষ করে তাতে শর যোজন করলেন। পৃথিবী যখন দেখলেন যে, মহারাজ পৃথু তাঁকে সংহার করার জন্য তাঁর ধনুক এবং বাণ গ্রহণ করেছেন, তখন তিনি অত্যন্ত ভয়ভীত হয়ে কাঁপতে শুরু করেছিলেন। তিনি তখন পৃথু মহারাজের ভয়ে একটি গাভীর রূপ ধারণ করে, ব্যাধ তাড়িত হরিণীর মতো দ্রুতবেগে পলায়ন করতে শুরু করেছিলেন। তা দেখে মহারাজ পৃথু অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন এবং তাঁর চক্ষু উদীয়মান সূর্যের মতো আরক্তিম হয়েছিল। তাঁর-ধনুকে বাণ যোজন করে, তিনি সেই গাভীরূপী পৃথিবী যেখানেই পলায়ন করেছিলেন, তাঁর পশ্চাদ্ধাবন করছিলেন। গোরূপী পৃথিবী দ্যুলোক ও ভূলোকের মধ্যে ইতস্তত পলায়ন করছিলেন এবং যেখানেই তিনি যাচ্ছিলেন, মহারাজ পৃথু ধনুর্বান নিয়ে সেখানেই তাঁর পশ্চাদ্ধাবন করছিলেন। মানুষ যেমন নিষ্ঠুর মৃত্যুর হাত থেকে নিস্তার পায় না, তেমনই গোরূপী পৃথিবী বেণপুত্র পৃথু মহারাজের হাত থেকে নিস্তারের কোন উপায় নেই দেখে, অবশেষে ভীত ও দুঃখিত চিত্তে তিনি পলায়ন-কার্য থেকে নিবৃত্ত হলেন। মহা ঐশ্বর্যশালী পৃথু মহাাজকে ধর্ম-তত্ত্ববেত্তা এবং শরণাগত-বৎসল বলে সম্বোধন করে পৃথিবী বললেন- “আপনি সমস্ত জীবের রক্ষক। এখন আপনি এই লোকের রাজারূপে অবস্থিত হয়েছেন, সুতরাং দয়া করে আপনি আমাকেও রক্ষা করুন।”
গাভীরূপী পৃথিবী রাজার কাছে আবেদন করতে লাগলেন- “আমি অত্যন্ত দীন এবং আমি কোন পাপকর্ম করিনি। তা হলে কেন আপনি আমাকে হত্যা করতে চান? ধর্মজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও কেন আপনি আমার প্রতি বিদ্বেষ-পরায়ণ হয়েছেন এবং কেন আপনি একজন অবলা রমণীকে এইভাবে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছেন? হে রাজন্! কোন স্ত্রীলোক যদি অপরাধ করে, তা হলেও মানুষ তাকে প্রহার করে না, অতএব আপনার মতো দয়ালু, প্রজারক্ষক ও দীনবৎসল রাজার আর কি কথা। হে রাজন্! আমি একটি সুদৃঢ় তরণীর মতো এবং সমগ্র বিশ্ব আমাতেই প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। আপনি যদি আমাকে বিদীর্ণ করেন, তা হলে আপনি কিভাবে নিজেকে এবং আপনার প্রজাদের নিমজ্জিত হওয়া থেকে রক্ষা করবেন?”
পৃথু মহারাজ ধরিত্রীকে বললেন- “হে বসুন্ধরে! তুমি আমার আদেশ ও শাসন অবজ্ঞা করেছ। দেবতারূপে তুমি আমাদের যজ্ঞভাগ গ্রহণ করেছ, কিন্তু তার বিনিময়ে তুমি যথেষ্ট খাদ্যশস্য উৎপাদন করনি। সেই কারণে আমি তোমাকে অবশ্যই বধ করব। যদিও তুমি প্রতিদিন তৃণ ভক্ষণ কর, তবুও তুমি আমাদের উপযোগের জন্য তোমার দুধের থলি পূর্ণ করছ না। যেহেতু তুমি জেনে-শুনে এই অপরাধ করছ, তাই তুমি বলতে পার না যে, গাভীরূপ ধারণ করেছ বলে, তোমাকে দণ্ডদান করা উচিত নয়। তুমি এতই মন্দবুদ্ধি যে, পুরাকালে ব্রহ্মা যে-সমস্ত ওষধি ও শস্যের বীজ সৃষ্টি করেছিলেন, সেগুলি তুমি নিজের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছ এবং আমার আদেশ সত্ত্বেও তুমি সেগুলি প্রদান করছ না। আমার বাণের দ্বারা তোমাকে খণ্ড খণ্ড করে কেটে, তোমার মাংসের দ্বারা আমি আমার রাজ্যের এই সমস্ত ক্ষুধাতুর প্রজাদের আর্তনাদ শান্ত করব। যে নিষ্ঠুর ব্যক্তি- তা সে পুরুষ হোক, স্ত্রী হোক অথবা ক্লীব হোক- সে যদি কেবল নিজের ভরণ-পোষণের ব্যাপারেই আগ্রহী হয় এবং অন্য জীবেদের প্রতি দয়া প্রদর্শনা না করে, তা হলে রাজা তাকে বধ করতে পারে। এই প্রকার বধ প্রকৃত বধ বলে মনে করা হয় না। তুমি অত্যন্ত গর্বোদ্ধত ও উন্মত্ত হয়েছ। এখম তুমি তোমার যোগশক্তির প্রভাবে গাভীরূপ ধারণ করেছ, কিন্তু তা হলেও আমি আমার বাণের দ্বারা তোমাকে তিল তিল করে খণ্ডবিখণ্ড করব এবং তার পর আমার যোগশক্তির প্রভাবে আমি নিজেই এই সমস্ত প্রজাদের ধারণ করব। তখন সাক্ষাৎ যমরাজ-সদৃশ পৃথু মহারাজ ক্রোধময়ী মূর্তি ধারণ করেছিলেন। অর্থাৎ তিনি যেন তখন মূর্তিমান ক্রোধরূপে প্রতিভাত হয়েছিলেন। তাঁর বাক্য শ্রবণ করে পৃথিবী ভয়ে কম্পমানা হয়েছিলেন। বদ্ধাঞ্জলি সহকারে পৃথু মহারাজকে প্রণতি নিবেদন করে, ধরিত্রী বলতে লাগলেন- হে পরমেশ্বর ভগবান! হে প্রভু! আপনার স্থিতি দিব্য এবং আপনি আপনার মায়ার দ্বারা প্রকৃতির তিন গুণের মিথষ্ক্রিয়ার মাধ্যমে বহুরূপে এবং বহু যোনিতে বিস্তার করেছেন। আপনি সর্বদা দিব্য স্থিতিতে অবস্থিত এবং বিবিধ জড়-জাগতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার অধীন জড় সৃষ্টির দ্বারা আপনি প্রভাবিত হন না। তার ফলে আপনি জড় জাগতিক কার্যকলাপে মোহগ্রস্থ হন না। হে ভগবান! আপনি জড় সৃষ্টির পূর্ণ পরিচালক। আপনি এই জড় জগৎ ও প্রকৃতির তিনটি গুণ উৎপন্ন করেছেন এবং তাই আপনি সমস্ত জীবের আশ্রয়স্থল-স্বরূপ পৃথিবীরূপে আমাকেও সৃষ্টি করেছেন। তবুও হে প্রভু, আপনি সর্বদাই সম্পূর্ণরূপে স্বতন্ত্র। এখন আপনি আমার সম্মুখে উপস্থিত হয়ে, আপনার অস্ত্র উদ্যত করে আমাকে হত্যা করতে প্রস্তুত হয়েছেন, তখন আমি আর কার শরণ গ্রহণ করব। সৃষ্টির প্রারম্ভে আপনি আপনার অচিন্ত্য শক্তির দ্বারা সমস্ত স্থাবর ও জঙ্গম প্রাণীদের সৃষ্টি করেছিলেন। সেই শক্তির দ্বারা এখন আপনি জীবদের রক্ষা করতে প্রস্তুত। আপনিই ধর্মের পরম রক্ষক। তা হলে কেন আমি গাভীরূপ ধারণ করা সত্ত্বেও আমাকে সংহার করতে আপনি ইচ্ছা করছেন?”
“হে ভগবান! যদিও আপনি এক, তবুও আপনার অচিন্ত্য শক্তির দ্বারা আপনি নিজেকে বহুরূপে বিস্তার করেছেন। ব্রহ্মার মাধ্যমে আপনি এই ব্রহ্মা- সৃষ্টি করেছেন। তাই আপনি হচ্ছেন স্বয়ং ভগবান। যারা যথেষ্ট অভিজ্ঞতা-সম্পন্ন নয়, তারা আপনার চিন্ময় কার্যকলাপ বুঝতে পারে না, কারণ তারা আপনার মায়ার দ্বারা আচ্ছন্ন। হে ভগবান! আপনার স্বীয় শক্তির দ্বারা আপনি সমস্ত জড় উপাদানের, ইন্দ্রিয়সমূহের, নিয়ন্ত্রণকারী দেবতাদের, বুদ্ধির, অহঙ্কারের এবং অন্য সব কিছুর আদি কারণ। আপনার শক্তির দ্বারা আপনি এই জড় জগৎ সৃষ্টি, পালন ও সংহার করেন। আপনার শক্তির প্রভাবেই কেবল সব কিছু কখনও প্রকাশিত হয় এবং কখনও অপ্রকাশিত হয়। তাই আপনিই হচ্ছেন সর্ব কারণের পরম কারণ পরমেশ্বর ভগবান। আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। হে ভগবান! আপনি অজ। এক সময় আপনি বরাহরূপে ব্রহ্মাণ্ডের নিম্নভাগে রসাতল থেকে আমাকে উদ্ধার করেছিলেন। আপনার স্বীয় শক্তির প্রভাবে এই জগৎকে পালন করার জন্য, আপনি সমস্ত ভৌতিক উপাদান, ইন্দ্রিয়সমূহ এবং হৃদয় সৃষ্টি করেছেন। হে ভগবান! এইভাবে এক সময় আপনি জল থেকে আমাকে উদ্ধার করেছিলেন এবং তাই আপনি ধরাধর নামে প্রসিদ্ধ হয়েছেন। কিন্তু এখন একজন মহাবীররূপে আপনার তীক্ষ্ণ বাণের দ্বারা আপনি আমাকে সংহার করতে উদ্যত হয়েছেন। কিন্তু আমি তা কেবল জলের উপর একটি নৌকার মতো সব কিছু ভাসিয়ে রেখেছি। হে ভগবান! আমিও আপনার জড়া প্রকৃতির তিন গুণ থেকে উৎপন্ন হয়েছি। তার ফলে আমি আপনার কার্যকলাপের দ্বারা মোহাচ্ছন্ন হয়েছি। আপনার ভক্তদের কার্যকলাপও হৃদয়ঙ্গম করা যায় না, অতএব আপনার লীলা সম্বন্ধে কি আর বলার আছে। এইভাবে সব কিছুই পরস্পর-বিরোধী এবং আশ্চর্যজনক বলে মনে হয়।”
সপ্তদশ অধ্যায়- পৃথিবীর প্রতি পৃথু মহারাজের ক্রোধ
14 Aug 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, চতুর্থ স্কন্ধ- ভগবদ্ভক্তদের প্রতি অনুগ্রহ