মহর্ষি মৈত্রেয় বলতে লাগলেন- “পৃথু মহারাজ যখন এইভাবে বললেন, তখন তাঁর বিনয়পূর্ণ অমৃতময় বাণী গায়কদের অত্যন্ত প্রসন্নতা বিধান করেছিল। তখন তাঁরা মুনিদের প্রেরণনাক্রমে পুনরায় ভুরি ভুরি প্রশংসার দ্বারা রাজার বন্দনা করতে লাগলেন।”
গায়কেরা বললেন- “হে রাজন্! আপনি সাক্ষাৎ ভগবান বিষ্ণুর অবতার এবং তাঁরই অহৈতুকী কৃপায় আপনি এই পৃথিবীতে অবতরণ করেছেন। অতএব, আপনার মহিমান্বিত কার্যকলাপের যথাযথভাবে গুণগান করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। যদিও আপনি রাজা বেণের শরীর থেকে আবির্ভূত হয়েছেন, তবুও ব্রহ্মা আদি দেবতাদের মতো মহান বক্তাদের পক্ষেও আপনার মহিমান্বিত কার্যকলাপের সঠিক বর্ণনা করা সম্ভব নয়। যদিও যথাযথভাবে আপনার মহিমা কীর্তন করার ক্ষমতা আমাদের নেই, তবুও আপনার মহিমা কীর্তন করার দিব্য স্বাদ আমরা পেয়েছি। মুনিঋষি মহাজনদের কাছ থেকে যে-উপদেশ আমরা প্রাপ্ত হয়েছি, সেই অনুসারে আমরা আপনার মহিমা কীর্তন করার চেষ্টা করব। কিন্তু যে বর্ণনাই আমরা করি, তা সর্বদা নিতান্ত অপর্যাপ্ত এবং নগণ্য। হে রাজা! যেহেতু আপনি ভগবানের সাক্ষাৎ অবতার, তাই আপনার সমস্ত কার্যকলাপ অত্যন্ত উদার এবং প্রশংসনীয়। এই পৃথু মহারাজ ধর্ম পালনকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তিনি সকলকে ধর্মে প্রবৃত্ত করবেন এবং ধর্মকে রক্ষা করবেন। ধর্ম-বিরোধীদের এবং নাস্তিকদের কাছে তিনি হবেন মহান দণ্ডদাতা। এই রাজা, যথাসময়ে, সমস্ত জীবদের পালন করার জন্য এবং সুন্দর অবস্থায় রাখার জন্য বিভিন্ন প্রকার বিভাগীয় কার্য সম্পাদন করতে নিজেকে বিভিন্ন দেবতারূপে প্রকাশ করবেন। এইভাবে তিনি প্রজাদের বৈদিক যজ্ঞ অনুষ্ঠান করতে অনুপ্রাণিত করে স্বর্গলোক পালন করবেন। যথাসময়ে তিনি উপযুক্ত বারি বর্ষনের দ্বারা এই ভূর্লোক পালন করবেন। এই পৃথু মহারাজ সূর্যের মতো শক্তিশালী হবেন এবং সূর্যদেব যখন সকলকে সমানভাবে তাঁর কিরণ বিতরণ করেন, মহারাজ পৃথুও সমানভাবে সকলের প্রতি তাঁর করুণা বিতরণ করবেন। সূর্য যেমন বছরের মধ্যে আট মাস ধরে জল বাষ্পে পরিণত করে, বর্ষাকালে প্রচুরভাবে তা ফিরিয়ে দেয়, ঠিক তেমনই মহারাজ পৃথুও নাগরিকদের কাছ থেকে কর আদায় করে, প্রয়োজনের সময় তাদের তা ফিরিয়ে দেবেন। এই পৃথু মহারাজ সমস্ত নাগরিকদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু হবেন। কোন আর্ত ব্যক্তি যদি বিধি-বিধান অবহেলা করে রাজার মস্তকে পদার্পণও করে, তা হলেও তিনি তাঁর অহৈতুকী কৃপার বশে, কিছু মনে না করে তাকে ক্ষমা করবেন। পৃথিবীর পালকরূপে তিনি পৃথিবীরই মতো সহনশীল হবেন। যখন বৃষ্টি হবে না এবং জলের অভাবে প্রজাদের ভীষণ কষ্ট হবে, তখন ভগবানের অংশসম্ভুত এই রাজা নিজেই ইন্দ্রের মতো বারি বর্ষণ করবেন। এইভাবে তিনি অনায়াসে অনাবৃষ্টি থেকে প্রজাদের রক্ষা করবেন। এই পৃথু মহাাজ তাঁর স্নেহসিক্ত দৃষ্টিপাতের দ্বারা এবং হাস্যোৎফুল্ল সুন্দর মুখচন্দ্রিমার দ্বারা সকলের আনন্দ বর্ধন করবেন। পৃথু মহারাজের অনুসৃত মার্গ কেউ বুঝতে পারবে না। তাঁর কার্যকলাপও অত্যন্ত গোপন থাকবে এবং তিনি যে কিভাবে তাঁর সমস্ত কার্যকলাপ সাফল্যমণ্ডিত করবেন, তাও কারও পক্ষে বোঝা সম্ভব হবে না। তাঁর রাজকোষ সকলের অজ্ঞাত থাকবে। তিনি অন্তহীন মাহাত্ম্যসম্পন্ন হবেন এবং সমস্ত গুণের অধার হবেন। তাঁর পদ স্থায়ী এবং প্রচ্ছন্ন থাকবে, ঠিক যেমন সমুদ্রের দেবতা বরুণ সর্বদা জলের দ্বারা আচ্ছাদিত থাকেন। অরণি কাষ্ঠ থেকে যেমন অগ্নি উৎপন্ন হয়, ঠিক তেমনই বেণ রাজার মৃত শরীর থেকে পৃথু মহারাজের জন্ম হয়েছিল। তাই পৃথু মহারাজ সর্বদাই অগ্নির মতো অবস্থান কবেন এবং তাঁর শত্রুরা তাঁর সমীপবর্তী হতে সক্ষম হবে না। তাঁর শত্রুদের কাছে তিনি দুঃসহ হবেন, কারণ তাঁর অতি নিকটে থাকলেও তারা তাঁর কাছে আসতে পারবে না। কেউই পৃথু মহারাজের শক্তিকে পরাভূত করতে পারবে না। পৃথু মহারাজ তাঁর সমস্ত প্রজাদের আভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক সমস্ত কার্যকলাপ দেখতে সমর্থ হবেন। তবুও তাঁর গুপ্তচর ব্যবস্থা কেউই জানতে পারবে না। দেহাভ্যন্তরস্থ প্রাণবায়ু যেমন বাহ্যিক এবং আভ্যন্তরীণভাবে কার্যকলাপ করা সত্ত্বেও সর্ব বিষয়ে সর্বদা নিরপেক্ষ থাকে, পৃথু মহারাজও তেমন প্রশংসা এবং নিন্দায় উদাসীন থাকবেন। যেহেতু রাজা সর্বদা ধর্মপথে থাকবেন, তাই তিনি তাঁর নিজের পুত্র এবং তাঁর শত্রুর পুত্র, উভয়ের প্রতি নিরপেক্ষ থাকবেন। শত্রুর পুত্র যদি অদণ্ডনীয় হয়, তা হলে তিনি তাকে দণ্ডদান করবেন না, কিন্তু তাঁর নিজের পুত্র যদি দণ্ডনীয় হয়, তা হলে তিনি তৎক্ষণাৎ তাকে দণ্ড দেবেন। সূর্যদেব যেমন অপ্রতিহতভাবে তার উজ্জ্বল কিরণ মানসাচল পর্যন্ত বিস্তার করে, মহারাজ পৃথুর প্রভাবও তেমন যতদিন পর্যন্ত তিনি জীবিত থাকবেন, ততদিন পর্যন্ত মানসাচল পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে। এই রাজা তাঁর ব্যবহারিক কার্যকলাপের দ্বারা সকলের মনোরঞ্জন করবেন এবং তাঁর সমস্ত প্রজারা তাঁর প্রতি অত্যন্ত সন্তুষ্ট থাকবে। সেই কারণে নাগরিকেরা পরম প্রসন্নতা সহকারে তাঁকে তাদের শানসকারী রাজারূপে বরণ করেছিল। এই রাজা দৃঢ়ব্রত এবং সর্বদা সত্যপ্রতিজ্ঞ হবেন। তিনি ব্রহ্মণ্য সংস্কৃতির অনুরাগী হবেন, বৃদ্ধদের সেবা করবেন এবং শরণাগতদের আশ্রয়দান করবেন। তিনি সকলকে সম্মান প্রদান করবেন এবং দীন ও অসহায় ব্যক্তিদের সর্বদা কৃপা প্রদর্শন করবেন। রাজা অন্য রমণীদের মাতৃবৎ শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন এবং তাঁর নিজের স্ত্রীকে তাঁর দেহের অর্ধ অঙ্গসদৃশ মনে করবেন। তিনি তাঁর প্রজাদের পুত্রবৎ স্নেহে পালন করবেন এবং তিনি নিজেকে সর্বদা ভগবানের মহিমা প্রচারকারী ভক্তদের পরম আজ্ঞাকারী দাস বলে মনে করবেন। রাজা সমস্ত দেহধারী জীবদের আত্মতুল্য প্রিয় বলে মনে করবেন এবং তিনি সর্বদা সুহৃৎদের আনন্দ বর্ধন করবেন। তিনি মুক্ত পুরুষদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সঙ্গ করবেন এবং অসাধু ব্যক্তিদের তিনি কঠোরভাবে দণ্ডদান করবেন। এই রাজা ত্রিভুবনের অধীশ্বর এবং তিনি সাক্ষাৎ ভগবানের শক্তিতে আবিষ্ট। তিনি নির্বকার এবং ভগবানের শক্ত্যাবেশ অবতার। মুক্ত ও পূর্ণপ্রজ্ঞ হওয়ার ফলে, তিনি সমস্ত জড় বৈচিত্র্যকে অর্থহীন বলে মনে করেন, কারণ সেগুলি মূলত অবিদ্যার দ্বারা রচিত। অদ্বিতীয় পরাক্রমশালী এই বীর রাজার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না। তিনি তাঁর হাতে ধনুক ধারণ করে, তাঁর বিজয় রথে চড়ে সূর্যের মতো ভূমণ্ডল প্রদক্ষিণ করবেন এবং তিনি উদয়াচল পর্যন্ত সমগ্র ভূখণ্ড শাসন করবেন। যখন এই রাজা সারা পৃথিবী ভ্রমণ করবেন, তখন অন্য সমস্ত রাজারা এবং দেবতারা তাঁকে নানা প্রকার উপহার প্রদান করবেন। তাঁদের মহিষীরাও তাঁকে হস্তে চক্র এবং গদাচিহ্নধারী আদি রাজা বলে বিচেনা করে তাঁর যশ গান করবেন, কারণ তিনি পরমেশ্বর ভগবানের মতো যশস্বী হবেন।”
“প্রজাবৎসল এই অসাধারণ রাজা প্রজাপতিদের মতো প্রজা পালন করবেন। প্রজাদের জীবিকা সম্পাদনের জন্য তিনি গোস্বরূপা এই পৃথিবীকে দোহন করবেন। কেবল তাই নয়, দেবরাজ ইন্দ্র যেমন তাঁর শক্তিশালী বজ্রের দ্বারা পর্বত বিদীর্ণ করেন, তেমনই তিনি তাঁর ধনুকের তীক্ষ্ণ অগ্রভাগের দ্বারা গিরিপর্বত চূর্ণ করে পৃথিবীর পৃষ্ঠ সমতল করবেন। সিংহ যখন তার পুচ্ছ উন্নত করে বনে বিচরণ করে, তখন অন্য সমস্ত অধম পশুরা লুকিয়ে পড়ে। তেমনই, পৃথু মহারাজ যখন তাঁর মেষ ও বৃষের শৃঙ্গনির্মিত এবং যুদ্ধে অপ্রতিহত ধনুকে টঙ্কার দিয়ে তাঁর রাজ্যে বিচরণ করবেন, তখন সমস্ত আসুরিক-ভাবাপন্ন দুর্বৃত্ত ও দস্যুরা চতুর্দিকে পলায়ন করে লুক্কায়িত হবে।”
“সরস্বতী নদীর উৎসস্থলে এই রাজা একশত অশ্বমেধ যজ্ঞ অনুষ্ঠান করবেন। শেষ যজ্ঞটি অনুষ্ঠানের সময় দেবরাজ ইন্দ্র যজ্ঞের অশ্ব অপহরণ করবেন। পৃথু মহারাজ তাঁর প্রাসাদ সংলগ্ন উপবনে চতুঃসনদের অন্যতম সনৎকুমারের সঙ্গ লাভ করবেন। রাজা ভক্তিসহকারে তাঁর আরাধনা করবেন এবং যে জ্ঞানের দ্বারা পরম আনন্দ লাভ করা যায়, সেই দিব্য জ্ঞান প্রাপ্ত হবেন। এইভাবে যখন মহারাজ পৃথুর বীরত্বপূর্ণ কার্যকলাপ জনসাধারণে বিদিত হবে, তখন পৃথু মহারাজ তাঁর অদ্বিতীয় পরাক্রমশালী কার্যকলাপের বর্ণনা নিজেও সর্বদা শুনতে পাবেন। কেউই পৃথু মহারাজের আদেশ অমান্য করতে পারবে না। সারা পৃথিবী জয় করে তিনি প্রজাদের ত্রিতাপ দুঃখ সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট করবেন। তখন তাঁর খ্যাতি সারা পৃথিবী জুড়ে বিস্তৃত হবে এবং সুর ও অসুরেরা সকলেই তাঁর উদার কার্যকলাপের মহিমা কীর্তন করবে।”
ষোড়শ অধ্যায়- বন্দীদের দ্বারা পৃথু মহারাজের স্তুতি
13 Aug 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, চতুর্থ স্কন্ধ- ভগবদ্ভক্তদের প্রতি অনুগ্রহ