মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “হে বিদুর! তার পর ব্রাহ্মণ ও ঋষিরা পুনরায় রাজা বেণের মৃত শরীরের বাহুদ্বয় মন্থন করেছিলেন এবং তার ফলে তার বাহু থেকে একজন পুরুষ এবং একজন স্ত্রী উৎপন্ন হয়েছিল। সেই ঋষিগণ বৈদিক জ্ঞানে পারঙ্গত ছিলেন। তাঁরা যখন বেণের বাহু থেকে একজন পুরুষ এবং একজন স্ত্রীকে উৎপন্ন হতে দেখলেন, তখন তাঁরা অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিলেন, কারণ তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, সেই মিথুন ভগবান শ্রীবিষ্ণুর অংশসম্ভূত।”
মহান ঋষিগণ বললেন- “এই পুরুষ ভগবান বিষ্ণুর ভুবন-পালন অংশ এবং এই স্ত্রীটিও ভগবানের সনাতনী লক্ষ্মীর অংশসম্ভূতা। এই দুজনের মধ্যে যিনি-পুরুষ, তিনি সারা পৃথিবী জুড়ে তাঁর যশ বিস্তার করবেন। তাঁর নাম হবে পৃথু। প্রকৃতপক্ষে তিনি হবেন সমগ্র রাজাদের মধ্যে অগ্রণী। অত্যন্ত সুন্দরী এবং সমস্ত সদ্গুণে বিভূষিতা এই রমণীটি ভূষণেরও ভূষণ-স্বরূপা হবেন। তাঁর নাম হবে অর্চি। ভবিষ্যতে তিনি পৃথু মহারাজকে তাঁর পতিরূপে বরণ করবেন। পৃথু মহারাজরূপে পরমেশ্বর ভগবান তাঁর শক্তির এক অংশের দ্বারা বিশ্বের সমস্ত মনুষদের রক্ষা করার জন্য আবির্ভূত হয়েছেন। ভগবানের নিত্যসঙ্গিনী হচ্ছেন লক্ষ্মীদেবী এবং তাঁরই অংশে অর্চিরূপে পৃথু মহারাজের রানী হওয়ার জন্য অবতীর্ণ হয়েছেন।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “হে বিদুর! তখন সমস্ত ব্রাহ্মণেরা পৃথু মহারাজের মহিমা কীর্তন করেছিলেন, শ্রেষ্ঠ গন্ধর্বেরা তাঁর যশোগান করেছিলেন, সিদ্ধরা পুষ্পবৃষ্টি করেছিলেন এবং স্বর্গের অপ্সরারা মহা আনন্দে নৃত্য করেছিলেন। অন্তরীক্ষে শঙ্খ, তূর্য, মৃদঙ্গ এবং দুন্দুভি বাজতে লাগল। বিভিন্ন লোক থেকে দেবতা, মহর্ষি এবং পিতৃগণ তখন এই পৃথিবীতে এসেছিলেন। দেবতা ও দেবশ্রেষ্ঠগণ সহ সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের প্রভু ব্রহ্মা সেখানে এসেছিলেন। মহাাজ পৃথুর দক্ষিণ করতলে বিষ্ণুর হাতের রেখা এবং দুই পদতলে পদ্মচিহ্ন দর্শন করে ব্রহ্মা বুঝতে পেরেছিলেন যে, মহারাজ পৃথু হচ্ছেন ভগবানের অংশ। কারণ যাঁর করতলে চক্ররেখা অন্য রেখার দ্বারা প্রতিহত হয় না বা বিলুপ্ত হয় না, তাঁকে পরমেশ্বর ভগবানে অংশ-অবতার বলে বুঝতে হবে। তখন ব্রহ্মবাদী ব্রাহ্মণেরা রাজার অভিষেকের আয়োজন করেছিলেন। লোকেরা তখন চতুর্দিক থেকে সেই অনুষ্ঠানের জন্য বিবিধ দ্রব্যসম্ভার সংগ্রহ করেছিলেন। এইভাবে সেই অনুষ্ঠান সার্থক হয়েছিল। সমস্ত নদী, সমুদ্র, গিরি, পর্বত, নাগ, গাভী, পক্ষী, পশু, স্বর্গলোক এবং পৃথিবীর সমস্ত জীবেরা তাদের ক্ষমতা অনুসারে রাজাকে দেওয়ার জন্য বিবিধ প্রকার উপহার সংগ্রহ করেছিল। এইভাবে মহারাজ পৃথু অত্যন্ত সুন্দর বস্ত্র ও অলঙ্কারে সজ্জিত হয়ে, রাজসিংহাসনে অভিষিক্ত হয়েছিলেন; এবং অত্যন্ত সুন্দর অলঙ্কারে বিভূষিতা পত্নী অর্চি সহ রাজা অগ্নির মতো বিরাজ করছিলেন।”
“হে বিদুর! মহারাজ পৃথুকে কুবের এক স্বর্ণনির্মিত সিংহাসন উপহার দিয়েছিলেন। বরুণদেব তাঁকে একটি ছত্র উপহার দিয়েছিলেন, যা চন্দ্রের মতো উজ্জ্বল এবং যা থেকে নিরন্তর সূক্ষ্ম বারিবিন্দু বর্ষিত হয়। মহারাজ পৃথুকে বায়ু দুটি চামর প্রদান করেছিলেন; ধর্মরাজ তাঁকে যশ-বর্ধনকারী এক পুষ্পমাল্য প্রদান করেছিলেন; দেবরাজ ইন্দ্র তাঁকে এক মহামূল্যবান মুকুট প্রদান করেছিলেন; এবং যমরাজ তাঁকে সারা পৃথিবী শাসন করার জন্য একটি রাজদ- প্রদান করেছিলেন। ব্রহ্মা পৃথু মহারাজকে চিন্ময় জ্ঞাননির্মিত একটি বর্ম প্রদান করেছিলেন ব্রহ্মার পত্নী ভারতী (সরস্বতী) তাঁকে এক দিব্য হার প্রদান করেছিলেন। ভগবান বিষ্ণু তাঁকে সুদর্শন চক্র দান করেছিলেন এবং বিষ্ণুর পত্নী লক্ষ্মীদেবী তাঁকে অক্ষয় সম্পদ প্রদান করেছিলেন। শিব তাঁকে দশ চন্দ্র অঙ্কিত একটি তরবারি প্রদান করেছিলেন এবং তাঁর পত্নী দুর্গাদেবী তাঁকে শত চন্দ্র অঙ্কিত একটি ঢাল প্রদান করেছিলেন। চন্দ্রদেব তাঁকে অমৃতময় কতকগুলি অশ্ব প্রদান করেছিলেন এবং বিশ্বকর্মা তাঁকে একটি অত্যন্ত সুন্দর রথ প্রদান করেছিলেন। অগ্নিদেব তাঁকে ছাগ ও গোশৃঙ্গ-নির্মিত একটি ধনুক প্রদান করেছিলেন। সূর্যদেব তাঁকে সূর্যরশ্মির মতো উজ্জ্বল বাণ প্রদান করেছিলেন। ভূর্লোকের অধিষ্ঠাত্রী ভূমিদেবী তাঁকে যোগশক্তি-সমন্বিত দুটি পাদুকা প্রদান করেছিলেন এবং আকাশের দেবতারা পুনঃ পুনঃ পুষ্পবৃষ্টি করেছিলেন। আকাশমার্গে বিচরণকারী গন্ধর্ব, বিদ্যাধর আদি দেবতারা পৃথু মহারাজকে নাট্য, গীত, বাদ্য এবং নিজের ইচ্ছা অনুসারে অন্তর্হিত হয়ে যাওয়ার কৌশল প্রদান করেছিলেন। মহর্ষিরা তাঁকে তাঁদের অমোঘ আশীর্বাদ প্রদান করেছিলেন। সমুদ্র তাঁকে সলিলসম্ভূত শঙ্খ উপহার দিয়েছিলেন। সমুদ্র, পর্বত, নদী তাঁকে বিনা বাঁধায় তাঁর রথ চালাবার জন্য পথ প্রদান করেছিল। তার পর সূত, মাগধ এবং বন্দীরা তাদের নিজ নিজ বৃত্তি অনুসারে তার স্তব করার জন্য সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। বেণের পুত্র পরম শক্তিশালী মহারাজ পৃথু যখন তাঁর সম্মুখে সেই সমস্ত ব্যক্তিদের দেখলেন, তখন তিনি তাদের অভিনন্দন জানিয়ে, মৃদু হেসে জলদ-গম্ভীরস্বরে বলতে লাগলেন, ‘হে সৌম্য সূত, মাগধ এবং বন্দিগণ, তোমরা আমার যে সমস্ত গুণাবলীর কথা বর্ণনা করেছ তা এখনও অপ্রকাশিত। সুতরাং যে-সমস্ত গুণে আমি গুণান্বিত নই, সেই সমস্ত গুণের প্রশংসা কেন করছ? আমি চাই না যে, তোমাদের এই বাক্যাবলী আমাতে প্রযুক্ত হয়ে মিথ্যারূপে প্রতিপন্ন হোক, তাই তোমাদের এই স্তব অন্য কোন যোগ্য ব্যক্তির উদ্দেশ্যে প্রয়োগ কর। হে মধুরভাষী স্তাবকগণ! তোমরা যে-সমস্ত গুণের কথা বর্ণনা করেছ; সেগুলি যখন প্রকৃতপক্ষে আমার মধ্যে প্রকাশিত হবে, তখন তোমরা এইভাবে আমার প্রশংসা করো। সভ্য ব্যক্তিরা ভগবানের উদ্দেশ্যে যে-স্তবস্তুতি করে, সেই সমস্ত গুণাবলী কখনও মানুষের উদ্দেশ্যে নিবেদন করো না, যাদের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে সেই গুণগুলি নেই। এই সমস্ত মহান গুণাবলী ধারণে সক্ষম কোন্ বুদ্ধিমান ব্যক্তি আছে যে, বাস্তবিকপক্ষে সেই গুণগুলির অধিকারি না হয়ে, কিভাবে তার অনুগামীদের তার প্রশংসা করতে দিতে পারে? কোন মানুষকে যদি এই বলে প্রশংসা করা হয় যে, যদি সে শিক্ষিত হত, তা হলে সে একজন মহা পণ্ডিত হত অথবা একজন মহাপুরুষ হত, তা হলে সেটি প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। যে মূর্খ ব্যক্তি এই প্রকার প্রশংসা গ্রহণে সম্মত হয়, সে জানে না যে, এই প্রকার প্রশংসাবাক্য প্রকৃতপক্ষে তার প্রতি অপমান-সূচক। সম্মানিত এবং উদার-হৃদয় ব্যক্তি যেমন তাঁর নিন্দনীয় কার্যকলাপের কথা শুনতে চান না, তেমনই অত্যন্ত বিখ্যাত এবং পরাক্রমশালী ব্যক্তি নিজের প্রশংসা শুনতে চান না।’ ”
মহারাজ পৃথু বললেন- “হে সূত আদি ভক্তগণ। আমার কার্যকলাপের দ্বারা এখনও আমি প্রসিদ্ধ হইনি, কারণ তোমাদের বন্দনীয় কোন কার্য এখনও পর্যন্ত আমি করিনি। অতএব একটি শিশুর মতো আমি কিভাবে তোমাদের আমার গুণগান কার্যে নিযুক্ত করতে পারি?”
পঞ্চদশ অধ্যায়- পৃথু মহারাজের আবির্ভাব ও অভিষেক
12 Aug 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, চতুর্থ স্কন্ধ- ভগবদ্ভক্তদের প্রতি অনুগ্রহ