মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “হে বিদুর! ধ্রুব মহারাজের ক্রোধ প্রশমিত হল এবং তিনি সম্পূর্ণরূপে যক্ষদের হত্যা করা থেকে নিবৃত্ত হলেন। ধনপতি কুবের যখন সেই সংবাদ পেলেন, তখন তিনি যক্ষ, কিন্নর এবং চারণদের দ্বারা পূজিত হয়ে ধ্রুব মহারাজের সম্মুখে উপস্থিত হলেন এবং অঞ্জলিবদ্ধ হয়ে দণ্ডায়মান ধ্রুব মহারাজকে তখন তিনি বলতে লাগলেন।”
ধনপতি কুবের বললেন- “হে নিষ্পাপ ক্ষত্রিয়পুত্র! তোমার পিতামহের উপদেশে তুমি যে দুস্ত্যজ বৈরীভাব ত্যাগ করেছ, সেই জন্য আমি তোমার প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছি। প্রকৃতপক্ষে, তুমি যক্ষদের হত্যা করনি এবং তারাও তোমার ভাইকে হত্যা করেনি, কারণ সৃষ্টি এবং সংসারের পরম কারণ হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের কালরূপী প্রকাশ। দেহাত্মবুদ্ধির ফলে, নিজের এবং অপরের প্রতি ‘আমি’ এবং ‘তুমি’ এইরূপ ভ্রান্ত ধারণার কারণ হচ্ছে অবিদ্যা। এই দেহাত্মবুদ্ধিই হচ্ছে পুনঃ পুনঃ জন্ম-মৃত্যুর কারণ এবং তা আমাদের সংসারচক্রে নিরন্তর আবর্তিত করে। হে ধ্রুব! আমার কাছে এসো। ভগবান সর্বদা তোমার মঙ্গল করুন। অধোক্ষজ ভগবান সমস্ত জীবের পরমাত্মা এবং এইভাবে বৈষম্য-রহিত হয়ে সমস্ত জীবই এক। তাই, সমস্ত জীবের পরম আশ্রয় পরমেশ্বর ভগবানের সেই চিন্ময় রূপের সেবা করতে শুরু কর। তাই, সম্পূর্ণরূপে ভগবানের প্রেমময়ী সেবায় নিজেকে যুক্ত কর, কারণ তিনিই কেবল আমাদের এই জড়-জাগতিক বন্ধন থেকে উদ্ধার করতে পারেন। ভগবান যদিও জড়া প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত, তবুও তিনি এই জড়া প্রকৃতির কার্যকলাপ থেকে আলাদা থাকেন। এই জড় জগতের সব কিছুই সংঘটিত হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের অচিন্ত্য শক্তির প্রভাবে। হে মহারাজ উত্তানপাদের পুত্র ধ্রুব মহারাজ! আমরা শুনেছি যে, তুমি নিরন্তর পদ্মনাভ পরমেশ্বর ভগবানের দিব্য প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত। তাই তুমি আমাদের কাছ থেকে সব রকম বর গ্রহণের যোগ্য। অতএব নির্দ্বিধায় তুমি আমার কাছ থেকে বর প্রার্থনা করতে পার।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “হে বিদুর! যক্ষরাজ কুবের যখন ধ্রুব মহারাজকে বর প্রার্থনা করার জন্য বললেন, তখন মহাভাগবত মহামতি ধ্রুব মহারাজ প্রার্থনা করেছিলেন- তিনি যেন পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি অবিচলিত স্মৃতি লাভ করে দুস্তর অজ্ঞান-সমুদ্র পার হতে পারেন। ইড়বিড়ার পুত্র কুবের ধ্রুবের প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিলেন এবং আনন্দিত চিত্তে তাঁর বাঞ্ছিত বর প্রদান করেছিলেন। তার পর তিনি ধ্রুবের সম্মুখে অন্তর্হিত হলেন। ধ্রুব মহারাজও তখন তাঁর রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করলেন। ধ্রুব মহারাজ যত দিন গৃহে ছিলেন, তত দিন তিনি সমস্ত যজ্ঞের ভোক্তা পরমেশ্বর ভগবানের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য বহু মহান যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেছিলেন। শাস্ত্রবিহিত যজ্ঞ অনুষ্ঠানের বিশেষ উদ্দেশ্য হচ্ছে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর প্রসন্নতা বিধান করা, যিনি সমস্ত যজ্ঞের উদ্দেশ্য এবং যিনি যজ্ঞের ফল প্রদান করেন। ধ্রুব মহারাজ ঐকান্তিক ভক্তি সহকারে সব কিছুর উৎস পরমেশ্বর ভগবানের সেবা করেছিলেন। ভগবদ্ভক্তি সম্পাদন করার সময় তিনি দেখেছিলেন যে, সব কিছু কেবল তাঁর মধ্যে অবস্থিত এবং তিনি সমস্ত জীবের অন্তরে বিরাজমান। ভগবানকে বলা হয় অচ্যুত, কারণ তিনি কখনও তাঁর ভক্তকে রক্ষা করার পরম কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হন না। ধ্রুব মহারাজ সমস্ত দিব্য গুণসম্পন্ন ছিলেন। তিনি ভগবদ্ভক্তদের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধালু, দরিদ্র ও নিরীহ ব্যক্তিদের প্রতি দয়ালু এবং ধর্মের রক্ষক ছিলেন। তাঁর এই সমস্ত গুণের জন্য তাঁর প্রজারা তাঁকে তাঁদের পিতা বলে মনে করতেন। ধ্রুব মহারাজ ভোগের দ্বারা পুণ্য ক্ষয় এবং তপস্যার দ্বারা অশুভ কর্মের ফল ক্ষয় করে, ছত্রিশ হাজার বছর ধরে এই পৃথিবী শাসন করেছিলেন। সংযত-ইন্দ্রিয় মহাত্মা ধ্রুব মহারাজ এইভাবে ধর্ম, অর্থ এবং কামরূপ ত্রিবর্গ অনুকূলভাবে অনুষ্ঠানের দ্বারা বহুকাল অতিবাহিত করে, অবশেষে তাঁর রাজসিংহাসনের ভার তঁর পুত্রকে দিয়েছিলেন। ধ্রুব মহারাজ উপলব্ধি করেছিলেন যে, এই জগৎ স্বপ্ন বা মায়াজালের মতো জীবেদের মোহগ্রস্ত করে, কারণ তা পরমেশ্বর ভগবানের বহিরঙ্গা মায়াশক্তির দ্বারা রচিত। এইভাবে ধ্রুব মহারাজ অবশেষে সমগ্র পৃথিবী জুড়ে ব্যাপ্ত এবং মহাসাগর পরিবৃত ভূমণ্ডল জুড়ে বিস্তৃত তাঁর রাজ্য ত্যাগ করেছিলেন। তিনি তাঁর দেহ, পত্নী, সন্তান, বন্ধু-বান্ধব, সৈন্যসামন্ত, সমৃদ্ধ রাজকোষ, তাঁর অত্যন্ত আরামপ্রদ প্রাসাদ এবং রমণীয় বিহারস্থল মায়া রচিত বিবেচনা করে, বানপ্রস্থ অবলম্বন করে হিমালয়ের বদরিকাশ্রমে গিয়েছিলেন। স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ পবিত্র জলে নিয়মিতভাবে স্নান করার ফলে, ধ্রুব মহারাজের ইন্দ্রিয়গুলি সম্পূর্ণরূপে পবিত্র হয়েছিল। তিনি যোগাসনে উপবিষ্ট হয়ে প্রাণায়ামের দ্বারা তাঁর শ্বাসক্রিয়া এবং প্রাণবায়ু সংযত করেছিলেন। এইভাবে তিনি তাঁর ইন্দ্রিয়গুলিকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করেছিলেন। তার পর তিনি তাঁর মনকে ভগবানের প্রতিরূপ অর্চা বিগ্রহে ধ্যানস্থ করেছিলেন, এইভাবে ভগবানের ধ্যান করতে তিনি পূর্ণ সমাধিতে প্রবেশ করেছিলেন। চিন্ময় আনন্দে অভিভূত হওয়ার ফলে, তাঁর নয়ন-যুগল থেকে অবিরল ধারায় অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগল এবং অঙ্গ পুলকে ব্যাপ্ত হয়ে উঠল। এইভাবে ভগবদ্ভক্তিতে সমাধিস্থ হওয়ার ফলে, ধ্রুব মহারাজ তাঁর জড় দেহের অস্তিত্ব বিস্মৃত হলেন এবং তার ফলে তৎক্ষণাৎ জড় দেহের বন্ধন থেকে তিনি মুক্ত হলেন। মুক্তির সেই লক্ষণগুলি প্রকট হওয়া মাত্র, তিনি দেখতে পেলেন যে, একটি সুন্দর বিমান দশদিক আলোকিত করে আকাশ থেকে অবতরণ করছে, যেন পূর্ণচন্দ্র আকাশ থেকে নীচে নেমে আসছে। ধ্রুব মহারাজ সেই বিমানে দুইজন অতি সুন্দর বিষ্ণুপার্ষদদের দেখতে পেলেন। তাঁরা চতুর্ভুজ এবং তাঁদের অঙ্গকান্তি শ্যামবর্ণ, তারা কিশোর বয়স্ক এবং তাঁদের নয়ন কমলের মতো অরুণবর্ণ। তাঁদের হাতে গদা ছিল এবং তাঁদের পরিধানে ছিল অত্যন্ত সুন্দর বসন এবং মাথায় ছিল মুকুট, আর তাঁরা হার, অঙ্গদ, কুন্ডল ইত্যাদি অলঙ্কারের দ্বারা ভূষিত ছিলেন। সেই অসাধারণ ব্যক্তিদের ভগবানের পার্ষদ বলে চিনতে পেরে, ধ্রুব মহারাজ তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু, কিংকর্তব্য-বিমূঢ় হয়ে পড়ার ফলে, তিনি যে কিভাবে তাঁদের স্বাগত জানাবেন তা ভুলে গিয়েছিলেন। তাই তিনি কেবল করজোড়ে তাদের প্রণতি নিবেদন করে, ভগবানের পবিত্র নামের মহিমা উচ্চারণ করেছিলেন।”
“ধ্রুব মহারাজ সর্বদাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মের চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। তাঁর হৃদয় সম্পূর্ণরূপে কৃষ্ণময় ছিল। যখন নন্দ এবং সুনন্দ নামক ভগবানের দুই অন্তরঙ্গ পার্ষদ সহাস্য বদনে তাঁর কাছে এসেছিলেন, তখন ধ্রুব মহারাজ হাতজোড় করে উঠে দাঁড়িয়ে, বিনীতভাবে তাঁর মস্তক অবনত করেছিলেন। তাঁরা তখন তাঁকে সম্বোধন করে বলেছিলেন- হে রাজন! আপনার কল্যাণ হোক। আমরা যা বলব তা মনোযোগ সহকারে শ্রবন করুন। আপনি যখন মাত্র পাঁচ বছর বয়সের ছিলেন, তখন আপনি কঠোর তপস্যা করেছিলেন এবং তার ফলে ভগবানকে অত্যন্ত প্রসন্ন করেছিলেন। আমরা সমগ্র জগতের স্রষ্টা শার্ঙ্গ নামক ধনুক ধারণকারী ভগবানের প্রতিনিধি। আপনাকে বৈকুন্ঠলোকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিশেষভাবে নিযুক্ত হয়ে, আমরা এখানে এসেছি। এই বিষ্ণুলোক প্রাপ্ত হওয়া অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু আপনার তপস্যার দ্বারা আপনি তা জয় করেছেন। মহান ঋষিগণ এবং দেবতাগণও সেই পদ প্রাপ্ত হন না। সেই পরম ধাম (বিষ্ণুলোক) কেবল দর্শন করার জন্য সূর্য, চন্দ্র এবং অন্যান্য সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্র ঐ স্থানকে নিরন্তর প্রদক্ষিণ করে। আপনি আসুন, সেখানে যাওয়ার জন্য আমরা আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি।”
“হে মহারাজ ধ্রুব! আপনার পূর্বপুরুষেরা অথবা অন্য কেউ সেই চিন্ময় লোক কখনও প্রাপ্ত হননি। সেই স্থান বিষ্ণুলোক নামে পরিচিত সর্বোচ্চ পদ, যেখানে শ্রীবিষ্ণু স্বয়ং বাস করেন। এই ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত গ্রহলোকের অধিবাসীদের দ্বারা তা পূজিত হয়। দয়া করে আপনি আমাদের সঙ্গে আসুন এবং সেখানে নিত্যকাল বাস করুন। হে অমর! এই অদ্বিতীয় বিমানটি ভগবান পাঠিয়েছেন, যাঁর স্তুতি উত্তমশ্লোকের দ্বারা করা হয় এবং যিনি সমস্ত জীবাত্মাদের শিরোমণি। আপনি এই বিমানে আরোহণের সম্পূর্ণ যোগ্য।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “ধ্রুব মহারাজ ভগবানের অত্যন্ত প্রিয় পাত্র ছিলেন। বৈকুন্ঠলোকের মুখ্য ভগবৎ পার্ষদদের সুমধুর বাণী শ্রবণ করে তিনি পুণ্য স্নান সমাপন করলেন এবং উপযুক্ত আভরণে ভূষিত হয়ে, তাঁর নিত্য মাঙ্গলিক কৃত্য সম্পন্ন করেছিলেন। তার পর সেখানে উপস্থিত সমস্ত মহর্ষিদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করে তাঁদের আশীর্বাদ গ্রহণ করেছিলেন। বিমানে আরোহন করবার পূর্বে, ধ্রুব মহারাজ সেই বিমানটিকে প্রদক্ষিণ করেছিলেন এবং বিষ্ণু পার্ষদদের প্রণতি নিবেদন করেছিলেন। তখন তাঁর রূপ তপ্ত-কাঞ্চনের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। এইভাবে তিনি সেই দিব্য বিমানে আরোহন করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন। ধ্রুব মহারাজ যখন সেই চিন্ময় বিমানটিতে আরোহণ করতে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি দেখলেন যে, মূর্তিমান মৃত্যু তাঁর কাছে এসেছে। কিন্তু তাকে একেবারে গ্রাহ্য না করে, তিনি তার মস্তকে পা রেখে, সেই বিমানটিতে আরোহণ করেছিলেন, যা ছিল একটি বিশাল গৃহের মতো। তখন আকাশে দুন্দুভি, মৃদঙ্গ ও পণব বাজতে শুরু করেছিল, মুখ্য গন্ধর্বেরা গান গাইতে শুরু করেছিলেন এবং অন্যান্য দেবতারা ধ্রুব মহারাজের উপর পুষ্পবৃষ্টি করেছিলেন। ধ্রুব মহারাজ বিমানে আরোহন করার পর, বিমান যখন ছাড়তে যাচ্ছিল তখন তিনি তাঁর দুঃখিতা মাতা সুনীতির কথা স্মরণ করলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন, “আমার দুঃখিনী জননীকে ফেলে রেখে, আমি কি করে বৈকুন্ঠলোকে যাব?”
“বৈকুন্ঠলোকের দুই মহান ভগবৎ পার্ষদ নন্দ ও সুনন্দ ধ্রুব মহারাজের মনের কথা জানতে পেরে, তাঁকে দেখিয়েছিলেন যে, তাঁর মাতা সুনীতি অন্য আর একটি বিমানে তাঁর পুরোভাগে যাচ্ছেন। অন্তরীক্ষ দিয়ে যাওয়ার সময়, ধ্রুব মহারাজ ক্রমশ সৌরমণ্ডলের সমস্ত গ্রহগুলি দেখতে পেলেন এবং পথে তাঁর উপর পুষ্প-বর্ষণকারী ও বিভিন্ন বিমানে বিচরণকারী সমস্ত দেবতাদের দেখতে পেলেন। এইভাবে ধ্রুব মহারাজ সপ্তর্ষিমণ্ডল অতিক্রম করেছিলেন। সেই স্থানের ঊর্ধ্ব লোকে তিনি শাশ্বত চিন্ময় পদ প্রাপ্ত হয়েছিলেন, যেখানে শ্রীবিষ্ণু বাস করে। বৈকুন্ঠলোক স্বীয় জ্যোতির দ্বারা উদ্ভাসিত। এই জড় জগতের উজ্জ্বল লোকসমূহ সেই জ্যোতির প্রতিফলনের ফলেই উজ্জ্বল হয়। যারা অন্যান্য জীবের প্রতি কৃপাপরবশ নয়, তারা কখনও সেই লোকে যেতে পারে না। যাঁরা নিরন্তর জীবের কল্যাণজনক কার্যকলাপে যুক্ত, তাঁরাই সেই বৈকুন্ঠলোকে প্রবেশ করতে পারেন। যাঁরা শান্ত, সমদর্শী, নির্মল ও পবিত্র এবং যাঁরা অন্য সমস্ত জীবেদের কিভাবে প্রসন্নতা বিধান করতে হয় তা জানেন, তাঁরা ভগবদ্ভক্তদের বন্ধু; তাঁরাই কেবল অনায়াসে ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধি লাভ করতে পারেন। এইভাবে মহারাজ উত্তানপাদের অত্যন্ত মহিমান্বিত পুত্র, ধ্রুব মহারাজ পূর্ণরূপে কৃষ্ণভাবনাময় হয়ে ত্রিলোকের সর্বোচ্চ পদ প্রাপ্ত হয়েছিলেন।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “হে কুরুনন্দন বিদুর! বলীবর্দ যেমন মেঢদণ্ডের চারপাশে পরিভ্রমণ করে, ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত জ্যোতিষ্ক ঠিক সেইভাবে প্রবলবেগে ধ্রুব মহারাজের ধামকে প্রদক্ষিণ করছে। ধ্রুব মহারাজের মহিমা দর্শন করে, নারদ মুনি তাঁর বীণা বাজিয়ে প্রচেতাদের যজ্ঞে মহা আনন্দে পরবর্তী তিনটি শ্লোক গেয়েছিলেন।”
দেবির্ষ নারদ বললেন- “পতিব্রতা সুনীতির পুত্র ধ্রুব মহারাজ তাঁর আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রভাবে এবং অত্যন্ত শক্তিশালী তপস্যার প্রভাবে, এমন এক উচ্চপদ প্রাপ্ত হয়েছিলেন, যা বেদান্তবিদ ব্রহ্মবাদীরাও লাভ করতে পারেন না। সুতরাং সাধারণ মানুষের আর কি কথা। দেখ, কিভাবে ধ্রুব মহারাজ তার বিমাতার বাক্যবাণে মর্মাহত হয়ে, কেবল পাঁচ বছর বয়সে বনে গিয়েছিল এবং আমার নির্দেশে তপস্যা করেছিল। ভগবান যদিও অজেয়, তবুও ধ্রুব মহারাজ ভক্তোচিত বিশেষ গুণাবলীর দ্বারা তাঁকে পরাস্ত করেছিল। ছয় মাস ধরে কঠোর তপস্যা করার পর, ধ্রুব মহারাজ পাঁচ অথবা ছয় বছর বয়সে অতি উচ্চ পদ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। আহা! কোন মহান ক্ষত্রিয় বহু বহু বছর ধরে তপস্যা করার পরেও এই পদ লাভ করতে পারে না।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “হে বিদুর! ধ্রুব মহারাজের মহান যশ এবং চরিত্র সম্বন্ধে তুমি যা কিছু প্রশ্ন আমাকে করেছিলে, আমি সবিস্তারে তা বর্ণনা করেছি। মহাত্মা এবং ভগবদ্ভক্তরা ধ্রুব মহারাজের বিষয়ে শ্রবণ করতে অত্যন্ত আগ্রহবোধ করেন। ধ্রুব মহারাজের আখ্যান শ্রবণকারীর ধন, যশ এবং আয়ু বৃদ্ধি পায়। তা এতই পবিত্র যে, কেবলমাত্র তা শ্রবণ করার ফলেই স্বর্গলোক বা ধ্রুবলোক প্রাপ্ত হওয়া যায়। এই আখ্যান এতই মহিমান্বিত যে, তা শ্রবণের ফলে দেবতারা পর্যন্ত প্রসন্ন হন এবং তা এতই শক্তিশালী যে, তার ফলে সমস্ত পাপ বিনষ্ট হয়। যিনি ধ্রুব মহারাজের এই আখ্যান শ্রবণ করেন এবং শ্রদ্ধা ও ভক্তি সহকারে তাঁর শুদ্ধ চরিত্র হৃদয়ঙ্গম করার জন্য বার বার প্রয়াস করেন, তিনিও শুদ্ধ ভক্তির স্তর প্রাপ্ত হয়ে শুদ্ধ ভক্তি সম্পাদন করেন। এই প্রকার কার্যকলাপের দ্বারা জড়-জাগতিক জীবনের ত্রিতাপ-দুঃখের নিবৃত্তি হয়। যিনি ধ্রুব মহারাজের এই আখ্যান শ্রবণ করেন, তিনি তাঁরই মতো উত্তম গুণাবলী অর্জন করেন। যাঁরা মহিমা, শক্তি অথবা প্রভাব লাভ করতে চান, এই পন্থার দ্বারা তাঁরা তা লাভ করতে পারেন, আর যাঁরা চিন্তাশীল এবং সম্মানের আকাঙ্ক্ষী তাঁদের বাঞ্ছা-পূরণেরও এটি হচ্ছে উপযুক্ত উপায়।”
মহর্ষি মৈত্রেয় নির্দেশ দিয়েছিলেন- “ধ্রুব মহারাজের মহৎ চরিত্র ও কার্যকলাপ ব্রাহ্মণ বা দ্বিজদের সঙ্গে প্রাতঃকালে এবং সন্ধ্যায় একাগ্রচিত্তে কীর্তন করা উচিত। যাঁরা সম্পূর্ণরূপে ভগবানের চরণ-কমলের শরণ গ্রহণ করেছেন, তাঁদের কোন রকম পারিশ্রমিক না নিয়ে, ধ্রুব মহারাজের এই আখ্যান কীর্তন করা উচিত। বিশেষ করে পূর্ণিমা, অমাবস্যা, দ্বাদশী, শ্রবণ নক্ষত্রের উদয়ে, বিশেষ তিথির সমাপ্তিতে, ব্যতীপাতে, সংক্রান্তিতে অথবা রবিবাসরে এই আখ্যান কীর্তন করা উচিত। এইভাবে, কোন রকম ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য বিনা, এই আখ্যান কীর্তন করা হলে, বক্তা এবং শ্রোতা উভয়েই সিদ্ধিলাভ করেন। ধ্রুব মহারাজের আখ্যান অমৃতত্ত্ব লাভের পরম মহিমান্বিত জ্ঞান। যারা পরম সত্য সম্বন্ধে অবগত নয়, এই জ্ঞানের দ্বারা তাদের সত্যের পথে পরিচালিত করা যায়। যাঁরা দিব্য সহানুভূতির ফলে, দীনজনদের রক্ষা করার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যাঁরা আপনা থেকেই দেবতাদের কৃপা এবং আশীর্বাদ লাভ করেন। ধ্রুব মহারাজের দিব্য কার্যকলাপ সারা জগতে প্রসিদ্ধ এবং তা অত্যন্ত বিশুদ্ধ। ধ্রুব মহারাজ শৈশবেই সমস্ত খেলার সামগ্রী পরিত্যাগ করে তাঁর মায়ের আশ্রয় ত্যাগ করে, ঐকান্তিক নিষ্ঠাসহকারে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর শরণ গ্রহণ করেছিলেন। হে বিদুর! আমি এই আখ্যান এখন সমাপ্ত করেছি, কারণ তোমার কাছে আমি তা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি।”
দ্বাদশ অধ্যায়- ধ্রুব মহারাজের ভগবদ্ধামে গমন
07 Aug 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, চতুর্থ স্কন্ধ- ভগবদ্ভক্তদের প্রতি অনুগ্রহ