শ্রীমৈত্রেয় বললেন- “হে বিদুর! ধ্রুব মহারাজ মহর্ষিদের অনুপ্রেরণাদায়ক বাণী শ্রবণ করে, জল স্পর্শ করে আচমন করলেন এবং তার পর ভগবান নারায়নের নির্মিত বাণ তাঁর ধনুকে যুক্ত করলেন। ধ্রুব মহারাজ ধনুকে নারায়ণাস্ত্র যোজন করা মাত্রই যক্ষনির্মিত মায়া দূর হয়ে গেল, ঠিক যেমন পূর্ণরূপে আত্ম-তত্ত্বজ্ঞান লাভের ফলে, সমস্ত জড়-জাগতিক দুঃখ এবং সুখ দূর হয়ে যায়। ধ্রুব মহারাজ যখন নারায়ণ ঋষি নির্মিত সেই অস্ত্রটি তাঁর ধনুকে যোজন করলেন, তখন তা থেকে সুবর্ণময় দণ্ডযুক্ত এবং কলহংসের পক্ষের মতো পালক-সমন্বিত শরসমূহ নিঃসৃত হল। ময়ূরেরা যেমন ভীষণ শব্দ করতে করতে বনের মধ্যে প্রবেশ করে, সেই শরসমূহ তেমনই শত্রুসেনার মধ্যে প্রবিষ্ট হল। সেই সমস্ত তীক্ষ্ণধার বাণ শত্রু-সৈন্যদের বিচলিত করেছিল, যারা প্রায় মূর্ছিত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে অন্য অনেক যক্ষ তাদের অস্ত্রশস্ত্র উত্তোলন করে, মহা ক্রোধে ধ্রুব মহারাজকে আক্রমণ করার জন্য তাঁর প্রতি ধাবিত হল। সর্প যেমন ফণা উন্নত করে গরুড়ের দিকে ধাবিত হয়, সমস্ত যক্ষ সৈনিকেরাও সেইভাবে তাদের অস্ত্র উত্তোলন করে ধ্রুব মহারাজকে পরাস্ত করার জন্য তাঁর প্রতি ধাবিত হয়েছিল। ধ্রুব মহারাজ যখন দেখলেন যে, যক্ষরা তাঁর প্রতি এগিয়ে আসছে, তৎক্ষণাৎ তিনি তাঁর বাণের দ্বারা তাদের খণ্ড খণ্ড করেছিলেন। তাদের শরীর থেকে বাহু, পা, মাথা, পেট আলাদা করে, তিনি যক্ষদের সূর্যমণ্ডলের উপরিস্তিত লোক প্রদান করেছিলেন, যা কেবল সর্বোত্তম ঊর্ধ্বরেতা ব্রহ্মাচারীরই প্রাপ্ত হয়। যখন স্বায়ম্ভুব মনু দেখলেন যে, তাঁর পৌত্র ধ্রুব এমন অনেক যক্ষদের বধ করছেন, যারা প্রকৃতপক্ষে অপরাধী নয়, তখন তিনি অত্যন্ত কৃপাপরবশ হয়ে, মহর্ষিগণ সহ ধ্রুব মহারাজের কাছে এসে তাঁকে সৎ উপদেশ দিয়েছিলেন।”
শ্রীমনু বললেন- “হে বৎস! এই যুদ্ধ বন্ধ কর। অনর্থক ক্রুদ্ধ হওয়া সমীচীন নয়, তা হচ্ছে নারকীয় জীবনের পথ। প্রকৃতপক্ষে যারা অপরাধী নয়, সেই সমস্ত যক্ষদের হত্যা করে এখন তুমি তোমার সীমা অতিক্রম করছ। হে পুত্র! তুমি যে নির্দোষ যক্ষদের বধন করছ তা মহাজনদের দ্বারা স্বীকৃত হয়নি এবং তা আমাদের পরিবারের উপযুক্তও নয়, কারণ ধর্ম এবং অধর্মের নিয়ম সম্বন্ধে তাদের অবগত থাকার কথা । হে বৎস! তুমি যে তোমার ভ্রাতার প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল এবং যক্ষের হাতে তার মৃত্যুতে তুমি যে অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছ তা বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু বিবেচনা করে দেখ, একজন মাত্র যক্ষের অপরাধে, তুমি অন্য কতজন নির্দোষ যক্ষকে বধ করেছ। দেহকে কখনও আত্মা বলে মনে করা উচিত নয় এবং তার ফলে অন্যে দেহকে পশুর মতো হত্যা করা উচত নয়। ভগবদ্ভক্তির পথ অনুসরণ করেন যে সমস্ত সাধু, তাঁদের পক্ষে এই ধরনের আচরণ বিশেষভাবে বর্জনীয়। ভগবান শ্রীহরির ধাম বৈকুন্ঠলোক প্রাপ্ত হওয়া অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু তুমি এতই ভাগ্যবান যে, সমস্ত জীবের পরম ধাম শ্রীভগবানের আরাধনা করার ফলে, তুমি ইতিমধ্যেই সেই ধাম প্রাপ্ত হয়েছ। যেহেতু তুমি ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত, তাই ভগবান সর্বদাই তোমার কথা চিন্তা করেন এবং তুমি তাঁর অন্তরঙ্গ ভক্তদেরও মান্য। তোমার জীবন হচ্ছে আদর্শ আচরণের নিমিত্ত। তাই তোমাকে এই প্রকার নিন্দনীয় কার্যে লিপ্ত হতে দেখে আমি অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছি। ভক্ত যখন অন্যদের প্রতি তিতিক্ষা, দয়া, মৈত্রী এবং সমতা প্রদর্শন করেন, তখন ভগবান সেই ভক্তের প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হন। কেউ যখন প্রকৃতপক্ষে পরমেশ্বর ভগবানকে প্রসন্ন করেন, তিনি তাঁর জীবদ্দশাতেই স্থূল এবং সূক্ষ্ম জড় অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে যান। এইভাবে জড়া প্রকৃতির সমস্ত গুণ থেকে মুক্ত হয়ে, তিনি অন্তহীন চিন্ময় আনন্দ প্রাপ্ত হন। পঞ্চ মহাভূত থেকে জড় জগতের সৃষ্টি শুরু হয়। সেই পঞ্চভূত স্ত্রীদেহ এবং পুরুষদেহে পরিণত হয়। স্ত্রী এবং পুরুষের মিলনে এই সংসারে অন্যান্য স্ত্রী এবং পুরুষের সৃষ্টি হয়।”
“হে ধ্রুব মহারাজ! পরমেশ্বর ভগবানের মায়িক জড় শক্তির দ্বারা জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণের মিথষ্ক্রিয়ার দ্বারা সৃষ্টি, স্থিতি এবং প্রলয় সংঘটিত হয়। হে ধ্রুব! পরমেশ্বর ভগবান জড়া প্রকৃতির গুণের দ্বারা কলুষিত হন না। তিনি হচ্ছেন এই জড় জগতের সৃষ্টির নিমিত্ত কারণ। তিনি যখন প্রেরণা দেন, তখন অন্য অনেক কারণ এবং কার্য উৎপন্ন হয় এবং তার ফলে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড পরিচালিত হয়, ঠিক যেমন চুম্বকের আকর্ষণে লৌহ চালিত হয়। পরমেশ্বর ভগবান তাঁর অচিন্তনীয় কালরূপ পরম শক্তির দ্বারা প্রকৃতির তিন গুণের মিথষ্ক্রিয়ার কারণ হন এবং তার ফলে বিভিন্ন প্রকার শক্তি প্রকট হয়। মনে হয় যেন তিনি কার্য করছেন, কিন্তু তিনি কর্তা নন। তিনি হত্যা করছেন, কিন্তু তিনি হন্তা নন। এইভাবে বোঝা যায় যে, তাঁর অচিন্ত্য শক্তির দ্বারাই কেবল সব কিছু ঘটছে। হে ধ্রুব! পরমেশ্বর ভগবান নিত্য, কিন্তু কালরূপে তিনি সব কিছুর সংহারকর্তা। তাঁর আদি নেই, যদিও তিনি সব কিছুর আদি; তিনি অব্যয় যদিও কালক্রমে সব কিছু শেষ হয়ে যায়। পিতার মাধ্যমে জীবের সৃষ্টি হয় এবং মৃত্যুর দ্বারা তার বিনাশ হয়, কিন্তু তিনি সর্বদাই জন্ম-মৃত্যুর থেকে মুক্ত। কালরূপে পরমেশ্বর ভগবান জড় জগতের সর্বত্র বিদ্যমান এবং সকলেরই প্রতি সমভাবাপন্ন। তাঁর কাছে কেউই তাঁর মিত্র নয় অথবা শত্রু নয়। কালের অধীনে সকলেই তাদের কর্মফল অনুসারে সুখ অথবা দুঃখ ভোগ করছে। যেমন, বায়ুর প্রবাহের ফলে ধুলিকণা ওড়ে, তেমনই জীব তার বিশেষ কর্ম অনুসারে, জড়-জাগতিক জীবনে সুখ এবং দুঃখ ভোগ করে। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণু সর্বশক্তিমান এবং তিনি জীবকে তার কর্মফল প্রদান করেন। এইভাবে যদিও কোন জীবের আয়ু অত্যন্ত অল্প এবং অন্য কোন জীবের আয়ু অত্যন্ত দীর্ঘ, তবুও তিনি সর্বদাই চিন্ময় স্থিতিতে অবস্থিত এবং তাঁর নিজের আয়ুর হ্রাস অথবা বৃদ্ধির কোন প্রশ্নই ওঠে না। কেউ কেউ বিভিন্ন প্রকার জীবনের মধ্যে পার্থক্য এবং তাদের সুখ-দুঃখকে কর্মের ফল বলে। অন্য কেউ বলে যে, তার কারণ হচ্ছে স্বভাব, আবার অনেকে বলে কাল, কেউ কেউ বলে ভাগ্য এবং আবার কেউ বলে যে, তার কারণ হচ্ছে কাম। পরম সত্য বা চিন্ময় তত্ত্ব কখনই অপূর্ণ ইন্দ্রিয়ানুভূতির বোধগম্য নয়, অথবা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিষয় নয়। তিনি জড়া প্রকৃতি আদি বিভিন্ন শক্তির ঈশ্বর এবং তঁর পরিকল্পনা অথবা কার্যকলাপ কেউই হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না; তাই বুঝতে হবে যে, যদিও তিনি হচ্ছেন সর্ব কারণের পরম কারণ, কিন্তু মনোধর্মপ্রসূত জল্পনা-কল্পনার দ্বারা কেউ তাঁকে জানতে পারে না।”
“হে বৎস! কুবেরের অনুচর এই সমস্ত যক্ষরা তোমার ভ্রাতা উত্তমের বধকর্তা নয়। জীবের জন্ম এবং মৃত্যু সর্ব কারণের পরম কারণ ভগবানের দ্বারাই হয়। পরমেশ্বর ভগবান এই জড় জগৎ সৃষ্টি করেন, পালন করেন অথবা যথা সময়ে ধ্বংস করেন, কিন্তু যেহেতু তিনি এই সমস্ত কার্যকলাপের অতীত, তাই তিনি কখনও এই সমস্ত কার্যজনিত অহঙ্কারের দ্বারা অথবা জড়া প্রকৃতির গুণের দ্বারা প্রভাবিত হন না। পরমেশ্বর ভগবান সমস্ত জীবের পরমাত্মা। তিনি সকলের নিয়ন্তা এবং পালনকর্তা; তাঁর বহিরঙ্গা শক্তির মাধ্যমে তিনি সকলের সৃষ্টি করেন, পালন করেন এবং সংহার করেন। হে ধ্রুব! তুমি পরমেশ্বর ভগবানের শরণাগত হও, যিনি জগতের উন্নতির পরম লক্ষ্য। ব্রহ্মা আদি দেবতাগণ পর্যন্ত সকলেই তাঁর নিয়ন্ত্রণে কার্য করছেন, ঠিক যেমন নাসাবদ্ধ বলীবর্দ তার প্রভুর কার্য করতে বাধ্য হয়। হে ধ্রুব! মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তোমার মাতার সতীনের বাণীতে অত্যন্ত মর্মামত হয়ে, তোমার মায়ের আশ্রয় ত্যাগ করে ভগবানকে পাওয়ার উদ্দেশ্যে তুমি যোগপদ্ধতি অনুশীলন করার জন্য বনে গিয়েছিলে। তার ফলে তুমি ইতিমধ্যেই ত্রিভুবনের সর্বোচ্চ পদ প্রাপ্ত হয়েছ। হে ধ্রুব! তাই তুমি অক্ষর ব্রহ্ম পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি তোমার চেতনা নিবদ্ধ কর। তোমার স্বরূপে অধিষ্ঠিত হয়ে তুমি পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি উন্মুখ হও এবং তার ফলে, আত্ম-উপলব্ধির দ্বারা তুমি দেখবে যে, জড়-জাগতিক সমস্ত ভেদগুলি নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী। এইভাবে তোমার স্বাভাবিক স্থিতি প্রাপ্ত হয়ে এবং সমস্ত আনন্দের উৎস ও পরমাত্মারূপে সমস্ত জীবের হৃদয়ে বিরাজমান পরমেশ্বর ভগবানের সেবা করার দ্বারা তুমি অচিরেই ‘আমি’ ও ‘আমার’ এই মোহ থেকে মুক্ত হবে।”
“হে রাজন! আমি তোমাকে যা বলেছি, সেই সম্বন্ধে একটু বিচার কর। তা রোগের ঔষদের মতো কাজ করবে। তোমার ক্রোধ সংবরণ কর, কারণ পারমার্থিক উপলব্ধির পথে ক্রোধ হচ্ছে সব চাইতে বড় শত্রু। আমি তোমার সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করি। তুমি আমার উপদেশ পালন কর। যে ব্যক্তি এই জড় জগৎ থেকে মুক্তি লাভের আকাঙ্ক্ষী, তার কখনই ক্রোধের বশীভূত হওয়া উচিত নয়, কারণ ক্রোধাভিভূত ব্যক্তি অন্য সকলের উদ্বেগের কারণ হয়। হে ধ্রুব! তুমি মনে করছ যে, যক্ষরা তোমরা ভ্রাতাকে হত্যা করেছে এবং তাই তুমি বহুসংখ্যক যক্ষকে হত্যা করেছ। কিন্তু তোমার এই আচরণের দ্বারা তুমি শিবের ভ্রাতা, যিনি দেবতাদের কোষাধ্যক্ষ সেই কুবেরকে ক্ষুব্ধ করেছ। তুমি ভেব দেখ যে, তোমার আচরণ কুবের এবং শিবের প্রতি অত্যন্ত অসম্মানজনক হয়েছে। হে বৎস! সেই কারণে, কুবেরের ক্রোধে আমাদের বংশ অভিভূত হওয়ার পূর্বেই বিনম্র বচন, প্রণতি এবং স্তুতির দ্বারা তাঁকে প্রসন্ন কর। স্বায়ম্ভুব মনু তাঁর পৌত্র ধ্রুব মহারাজকে এইভাবে শিক্ষা প্রদান করে তাঁর দ্বারা সংস্তুত হয়ে, মহর্ষিগণ সহ তাঁর আলয়ে গমন করেছিলেন।”
একাদশ অধ্যায়- ধ্রুব মহারাজকে যুদ্ধ বন্ধ করতে স্বায়ম্ভুব মনুর উপদেশ
06 Aug 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, চতুর্থ স্কন্ধ- ভগবদ্ভক্তদের প্রতি অনুগ্রহ