মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “হে বিদুর! তার পর ধ্রুব মহারাজ প্রজাপতি শিশুমারের কন্যা ভ্রমিকে বিবাহ করেছিলেন। তাঁর কল্প এবং বৎসর নামক দুই পুত্র হয়েছিল। অত্যন্ত শক্তিশালী ধ্রুব মহারাজের ইলা নামক অন্য আর একজন পত্নী ছিল, যিনি ছিলেন বায়ুদেবতার কন্যা। তাঁর গর্ভে তিনি উৎকল নামক একটি পুত্র এবং এক অতি সুন্দরী কন্যারত্ন উৎপাদন করেছিলেন। ধ্রুব মহারাজের কনিষ্ঠ ভ্রাতা উত্তম, যিনি তখনও অবিবাহিত ছিলেন, এক সময় মৃগয়ায় গিয়ে, হিমালয় পর্বতে এক অতি বলবান যক্ষের দ্বারা নিহত হন। তাঁর মাতা সুরুচিও তাঁর পুত্রের পথ অনুসরণ করেছিলেন (মৃত্যুবরণ করেছিলেন)। হিমালয় পর্বতে যক্ষের হাতে তাঁর ভ্রাতা উত্তমের মৃত্যু হয়েছে, সেই সংবাদ পেয়ে ধ্রুব মহারাজ শোক এবং ক্রোধে অভিভূত হয়ে, তাঁর রথে চড়ে যক্ষপুরী বা অলকাপুরী বিজয় করতে বহির্গত হয়েছিলেন। ধ্রুব মহারাজ উত্তরাভিমুখে হিমালয় পর্বতে গমন করেছিলেন। সেখানে একটি উপত্যকায় রুদ্রের অনুচরগণ অধ্যুষিত একটি নগরী তিনি দর্শন করলেন।”
“হে বিদুর! অলকাপুরীতে পৌছানো মাত্রই, ধ্রুব মহারাজ তাঁর শঙ্খে ফুৎকার দিয়েছিলেন এবং সেই শঙ্খধ্বনি সমগ্র আকাশ জুড়ে এবং সমস্ত দিকে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। তা শুনে যক্ষ-রমণীগণ অত্যন্ত ভয়ভীত হয়েছিল। তাদের চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে, তাদের হৃদয় উৎকন্ঠায় পূর্ণ হয়ে উঠেছে। হে মহাবীর বিদুর! ধ্রুব মহারাজের শঙ্খধ্বনি সহ্য করতে না পেরে, মহাবলী যক্ষবীরেরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে, ধ্রুব মহারাজকে আক্রমণ করার জন্য নগরী থেকে বেরিয়ে এল। মহা ধনুর্ধারী ও মহারথী ধ্রুব মহারাজ সেই যক্ষ-সৈন্যদের অগ্রসর হতে দেখে, একসঙ্গে তিন-তিনিটি করে বাণ নিক্ষেপ করে তাদের হত্যা করতে লাগলেন। যক্ষবীরেরা যখন দেখল যে, ধ্রুব মহারাজের দ্বারা তাদের মস্তক ছিন্ন হতে চলেছে, তখন তারা সহজেই তাদের সঙ্কটজনক পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে পেরেছিল এবং তারা বুঝতে পেরেছিল যে, তাদের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু বীর হিসাবে, তারা ধ্রুব মহারাজের কার্যের প্রশংসা করেছিল। সর্প যেমন পদস্পর্শ সহনে অসমর্থ, সেই যক্ষরাও তেমন ধ্রুব মহারাজের আশ্চর্যজনক বীরত্ব সহ্য করতে না পেরে, তাদের ধনুক থেকে একসঙ্গে ছয়টি করে বাণ তাঁর প্রতি নিক্ষেপ করতে লাগল এবং এইভাবে তারা তাদের বীরত্ব প্রদর্শন করছিল। যক্ষ সৈন্যের সংখ্যা ছিল এক লক্ষ ত্রিশ হাজার এবং তারা সকলেই অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে অদ্ভুতকর্মা ধ্রুব মহারাজকে পরাস্ত করতে ইচ্ছা করেছিল। তাদের সমস্ত শক্তি সহকারে তারা রথ এবং সারথি সহ ধ্রুব মহারাজের উপর পরিঘ, নিস্ত্রিংশ, প্রাশশূল, পরশ্বধ, শক্তি, ঋষ্টি, ভুশুণ্ডী- এবং বিচিত্র পক্ষবিশিষ্ট বাণ নিক্ষেপ করতে লাগল। নিরন্তর অস্ত্র বর্ষণের ফলে ধ্রুব মহারাজ সম্পূর্ণভাবে আচ্ছাদিত হয়ে গিয়েছিল, ঠিক যেমন নিরন্তর বর্ষণের ফলে পর্বত সমাচ্ছন্ন হয়ে দৃষ্টির অগোচর হয়। উচ্চতর লোকের সমস্ত সিদ্ধরা আকাশ থেকে সেই যুদ্ধ দেখছিলেন এবং যখন তাঁরা দেখলেন যে, ধ্রুব মহারাজ শত্রুপক্ষের বাণ-বর্ষণে আচ্ছাদিত হয়ে গেছেন, তখন তাঁরা হাহাকার করে উঠেছিলেন, ‘হায়! মনুর পৌত্র ধ্রুব সূর্যবৎ এখন যক্ষদের সমুদ্রে অস্তমিত হল।’ যক্ষেরা সাময়িকভাবে জয় লাভ করে উল্লসিত হয়ে চিৎকার করছিল যে, তারা ধ্রুব মহারাজকে পরাস্ত করেছে। কিন্তু তখন হঠাৎ ধ্রুব মহারাজের রথ আবির্ভূত হল, ঠিক যেমন কুজ্ঝটিকা ভেদ করে সহসা সূর্যের প্রকাশ হয়। ধ্রুব মহারাজের ধনুকের টঙ্কার এবং বাণের ফুৎকার শত্রুদের হৃদয়ে বিষাদ উৎপন্ন করেছিল। তিনি নিরন্তর বাণ নিক্ষেপ করতে লাগলেন এবং তার ফলে শত্রুদের অস্ত্রশস্ত্র চূর্ণবিচূর্ণ হল, ঠিক যেমন প্রবল বায়ু আকাশের মেঘরাশি ছিন্নভিন্ন করে। ধ্রুব মহারাজের ধনুক থেকে বিনির্মুক্ত সেই সুতীক্ষ্ণ বাণগুলি শত্রুদের বর্ম ভেদ করে তাদের শরীরে প্রবেশ করেছিল, ঠিক যেমন দেবরাজ ইন্দ্রের বজ্র পর্বতগাত্র বিদারণ করে।”
“হে বিদুর! ধ্রুব মহারাজের বাণের দ্বারা যাদের মস্তক ছিন্ন হয়েছিল, সেইগুলি কর্ণকুণ্ডল এবং উষ্ণীষের দ্বারা অতি সুন্দরভাবে অলঙ্কৃত ছিল। সেই শরীরের জঙ্ঘাগুলি ছিল সুবর্ণ বর্ণ তালগাছের মতো সুন্দর, তাদের বাহুগুলি সোনার কঙ্কন এবং কেয়ূরের দ্বারা সুসজ্জিত ছিল এবং তাদের মস্তকে মহা মূল্যবান স্বর্ণমুকুট শোভা পচ্ছিল। সেই রণভূমিতে এই সমস্ত অলঙ্কার বিক্ষিপ্ত থাকার ফলে, তা অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়েছিল এবং তা একজন বীরের পক্ষেও মনোহর হয়েছিল। অন্য যে সমস্ত যক্ষরা, যারা নিহত হয়নি, তাদের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মহান যোদ্ধা ধ্রুব মহারাজের বাণের দ্বারা খণ্ড খণ্ড হয়েছিল। তাই তারা তখন পালিয়ে যেতে লাগল, ঠিক যেমন সিংহের দ্বারা পরাস্ত হয়ে হস্তী পলায়ন করে। নরশ্রেষ্ঠ ধ্রুব মহারাজ তখন দেখলেন যে, সেই বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রে একটিও সশস্ত্র শত্রুসৈন্য দণ্ডায়মান নেই। তখন তিনি অলকাপুরী দর্শন করার ইচ্ছা করেছিলেন, কিন্তু তিনি মনে মনে চিন্তা করেছিলেন, ‘মায়াবী যক্ষদের পরিকল্পনা কেউই জানে না।’ ইতিমধ্যে ধ্রুব মহারাজ যখন মাযাবী শত্রুদের পুনঃ আক্রমণের আশঙ্কা করে তাঁর সারথির সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন তারা এক প্রচন্ড শব্দ শুনতে পেলেন, যেন সমগ্র সমুদ্র সেখানে এসে পড়েছে এবং তাঁরা দেখলেন যে, প্রচণ্ড বায়ুবেগে চতুর্দিকে ধুলিরাশি সমুত্থিত হচ্ছে। ক্ষণিকের মধ্যে আকাশ ঘন মেঘম-লের দ্বারা আচ্ছন্ন হল, প্রচ- শব্দে বজ্রপাত হতে লাগল, বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল এবং সেই সঙ্গে প্রবলভাবে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। হে নিষ্পাপ বিদুর! তখন রক্ত, শ্লেষ্মা, পূঁজ, বিষ্ঠা, মূত্র এবং মেদ বর্ষণ হতে লাগল এবং গগনমণ্ডল থেকে ধ্রুবের সম্মুখে বহু বহু শিররহিত দেহ পতিত হতে লাগল। তার পর, আকাশে একটি বিশাল পর্বত দৃষ্ট হল এবং তা থেকে চতুর্দিকে প্রস্তর বৃষ্টি এবং সেই সঙ্গে গদা, পরিঘ, নিস্ত্রিংশ ও মুষল ইত্যাদি পতিত হতে লাগল। ধ্রুব মহারাজ দেখলেন যে, ক্রোধপূর্ণ চক্ষুসমন্বিত বিশালাকার সর্পেরা তাদের মুখ থেকে অগ্নি উদ্গিরণ করতে করতে তাঁকে গ্রাস করার জন্য এগিয়ে আসছে এবং সেই সঙ্গে উন্মত্ত হস্তী, সিংহ এবং ব্যাঘ্র দলে দলে তাঁর দিকে ছুটে আসছে। তার পর ভীষণমূর্তি সমুদ্র যেন প্রলয়কালীন ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে, প্রবল তরঙ্গ সহযোগে সারা বিশ্ব প্লাবিত করতে করতে ভীষণ গর্জন করতে লাগল। আসুরিক যক্ষেরা স্বভাবতই অত্যন্ত ক্রুর এবং তাদের আসুরিক মায়ার দ্বারা তারা অনেক আশ্চর্যজনক ব্যাপার সৃষ্টি করে অল্পজ্ঞ ব্যক্তিদের ভয় দেখাতে পারে। মহর্ষিগণ যখন শুনলেন যে, অসুরেরা ধ্রুবের প্রতি মায়াবী শক্তি প্রয়োগ করেছে, তখন তাঁরা তৎক্ষণাৎ সেখানে উপস্থিত হয়ে, তাঁকে কল্যাণকর অনুপ্রেরণা দিতে শুরু করলেন।”
সমস্ত মুনিরা বললেন- “হে উত্তানপাদের পুত্র ধ্রুব! শার্ঙ্গধন্বা পরমেশ্বর ভগবান, যিনি তাঁর ভক্তদের সমস্ত দুঃখ থেকে উদ্ধার করেন, তিনি তোমার শত্রুদের সংহার করুন। ভগবানের পবিত্র নাম ভগবানেরই মতো শক্তিসম্পন্ন, তাই ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তনে এবং শ্রবণের দ্বারাই কেবল ভয়ঙ্কর মৃত্যু থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এইভাবে ভগবদ্ভক্ত পরিত্রাণ পায়।”
দশম অধ্যায়- যক্ষদের সঙ্গে ধ্রুব মহারাজের যুদ্ধ
04 Aug 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, চতুর্থ স্কন্ধ- ভগবদ্ভক্তদের প্রতি অনুগ্রহ