মৈত্রেয় বললেন- “শিব যখন নারদের কাছ থেকে শুনলেন যে, তাঁর পত্নী সতী প্রজাপতি দক্ষের দ্বারা অপমানিত হওয়ার ফলে দেহত্যাগ করেছেন এবং তাঁর সৈন্যরা ঋভু দেবতাদের দ্বারা বিতাড়িত হয়েছে, তখন তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। শিব তখন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে অধর দংশন করেছিলেন এবং তড়িৎ ও বহ্নিশিখার মতো দীপ্তিশালী এক গুচ্ছ চুল তাঁর মস্তক থেকে উৎপাটন করলেন এবং তৎক্ষণাৎ গাত্রোত্থান করে গম্ভীর শব্দে অট্টহাস্য করতে করতে সেই জটাকে ভূমিতে নিক্ষেপ করলেন। তখন আকাশের মতো উঁচু এবং তিনটি সূর্যের মতো উজ্জ্বল এক ভয়ঙ্কর শ্যামবর্ণ অসুরের সৃষ্টি হয়েছিল, তাঁর দাঁতগুলি ছিল অত্যন্ত ভয়ঙ্কর এবং তাঁর মাথার কেশরাশি ছিল জ্বলন্ত অগ্নির মতো। বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্রধারী সহস্র বাহু-সমন্বিত তাঁর গলায় ছিল মনমুণ্ডের মালা। সেই মহাকায় অসুর যখন কৃতাঞ্জলিপুটে শিবকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ হে প্রভু, এখন আমি কি করব?’ তখনই ভূতনাথ শিব তাঁকে আদেশ দিয়েছিলেন, ‘যেহেতু তুমি আমার দেহ থেকে উৎপন্ন হয়েছে, তাই তুমি হচ্ছ আমার সমস্ত পার্ষদের অধিনায়ক। অতএব, যজ্ঞস্থলে গিয়ে তুমি দক্ষ এবং তার সৈনিকদের সংহার কর। হে বিদুর! সেই কৃষ্ণবর্ণ ব্যক্তিটি ছিলেন পরমেশ্বর ভগবানের ক্রোধের মূর্তিমান প্রকাশ এবং তিনি শিবের আদেশ পালন করতে প্রস্তুত ছিলেন। এইভাবে, তিনি যে-কোন বিরোধী শক্তির সঙ্গে বোঝাপড়া করতে নিজেকে সমর্থ বলে মনে করে শিবকে প্রদক্ষিণ করেছিলেন। প্রচন্ডভাবে গর্জন করতে করতে শিবের অন্য বহু সৈনিকেরা সেই ভয়ঙ্কর ব্যক্তিকে অনুসরণ করতে লাগল। তাঁর হাতে ছিল এক বিশাল ত্রিশুল, যা মৃত্যুকে পর্যন্ত বধ করতে সমর্থ ছিল এবং তাঁর পদক্ষেপের ফলে তাঁর পায়ের নূপুরগুলিও যেন গর্জন করছিল। তখন, সেই যজ্ঞে উপস্থিত পুরোহিত, যজমান, ব্রাহ্মণ এবং তাঁদের পত্নীরা সকলে আশ্চর্য হয়ে ভাবতে লাগলেন, এই অন্ধকার এল কোথা থেকে। তার পর তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, সেটি ছিল একটি ধুলির ঝড় এবং তাঁরা সকলে অত্যন্ত উৎকন্ঠিত হয়েছিলেন। সেই ঝড়ের কারণ সম্বন্ধে অনুমান করে তাঁরা বলেছিলেন- বায়ু প্রবাহিত হচ্ছে না, কেউ গাভীর পাল তাড়না করেও নিয়ে যাচ্ছে না, দস্যুদের দৌরাত্মের ফলেও এই ঝড় সম্ভব নয়, কারণ এখনও প্রবল পরাক্রমশালী রাজা বর্হি তাদের দণ্ড দেওয়ার জন্য জীবিত রয়েছেন। তা হলে এই ধুলির ঝড় সমুত্থিত হচ্ছে কোথা থেকে? তা হলে কি এই গ্রহের প্রলয়ের সময় উপস্থিত হয়েছে?”
“দক্ষের পত্নী প্রসূতি এবং সেখানে সমবেত অন্য সমস্ত স্ত্রীলোকেরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে বলতে লাগলেন- প্রজাপতি দক্ষ নিরপরাধ সতীকে অবজ্ঞা করার ফলে, সতী যে তাঁর ভগিনীদের সমক্ষে দেহত্যাগ করেছেন, সেই পাপেরই ফলে এই সঙ্কট উপস্থিত হয়েছে। প্রলয়ের সময়, শিবের জটাকলাপ বিক্ষিপ্ত হয় এবং তিনি তাঁর ত্রিশূলের দ্বারা দিক্-গজেন্দ্রদের বিদ্ধ করেন। বজ্র যেমন মেঘসমূহকে সর্বত্র বিক্ষিপ্ত করে, তেমনভাবেই তাঁর বাহরূপ ধ্বজাসমূহ বিস্তার করে তিনি অট্টহাস্য করতে করতে নৃত্য করেন। সেই বিশাল কৃষ্ণকায় ব্যক্তিটি তাঁর ভয়ঙ্কর দন্তরাজি প্রদর্শন করেছিলেন। তাঁর ভ্রূকুটির প্রভাবে নক্ষত্রসমূহ কক্ষচ্যুত হয়েছিল এবং তিনি তাঁর প্রচন্ড তেজের দ্বারা তাদের আচ্ছাদিত করেছিলেন। দক্ষের অসৎ আচরণের ফলে, তাঁর পিতা ব্রহ্মা পর্যন্ত সেই প্রচন্ড ক্রোধ প্রদর্শন থেকে নিস্তার লাভ করতে পারতেন না। এইভাবে যখন সকলে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলেন, তখন দক্ষ পৃথিবীতে এবং আকাশে ভয়ঙ্কর সমস্ত অশুভ ইঙ্গিত দেখতে লাগলেন।”
“হে বিদুর! শিবের সমস্ত অনুচরেরা সেই যজ্ঞভূমি বেষ্টন করেছিল। তারা ছিল খর্বাকৃতি এবং বিভিন্ন প্রকার অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত; তাদের উদর এবং মুখ মকরের মতো কৃষ্ণ এবং পীত বর্ণাভ ছিল। তারা যজ্ঞভূমির সর্বত্র ছুটাছুটি করে মহা উৎপাত সৃষ্টি করেছিল। কিছু সৈন্য যজ্ঞ-মন্ডপের স্তম্ভ ভেঙে ফেলেছিল, কেউ কেউ পত্নীশালায় ঢুকে পড়েছিল, কেউ যজ্ঞস্থল বিনষ্ট করতে শুরু করেছিল এবং কেউ আবাসস্থল ও পাকশালায় প্রবেশ করেছিল। তারা যজ্ঞপাত্র ভেঙে ফেলেছিল, কেউ কেউ যজ্ঞাগ্নি নিভিয়ে দিয়েছিল, কেউ যজ্ঞস্থলের সীমাসূত্র ছিঁড়ে ফেলেছিল এবং কেউ কেউ যজ্ঞকুন্ডে মূত্রত্যাগ করেছিল। কেউ কেউ পলায়নকারী মুনিদের পথ রোধ করেছিল, কেউ কেউ সেখানে সমবেত স্ত্রীদের তিরস্কার করেছিল এবং কেউ কেউ মণ্ডপ থেকে পলায়নকারী দেবতাদের বন্দি করেছিল। শিবের এক অনুচর মণিমান ভৃগু মুনিকে বন্দি করেছিলেন এবং কৃষ্ণকায় অসুর বীরভদ্র প্রজাপতি দক্ষকে বন্দি করেছিলেন। চণ্ডেশ নামক শিবের আর একজন অনুচর পূষাকে বন্দি করেছিলেন এবং নন্দীশ্বর ভগ দেবতাকে বন্দি করেছিলেন। নিরন্তর প্রস্তর বর্ষিত হচ্ছিল এবং সমস্ত পুরোহিত ও যজ্ঞস্থলে সমবেত সমস্ত সদস্যরা তার ফলে এক মহা সঙ্কটে পতিত হয়েছিলেন। তাঁরা তাঁদের জীবনের ভয়ে বিভিন্ন দিকে পলায়ন করত শুরু করেছিলেন। যিনি স্রুব হস্তে যজ্ঞাগ্নিতে আহুতি নিবেদন করছিলেন, বীরভদ্র সেই ভৃগু মুনির শ্মশ্রুরাজি উৎপাটন করেছিলেন। দক্ষ যখন শিবের নিন্দা করছিলেন, তখন ভগ দক্ষকে উৎসাহিত করেছিলেন, সেই কারণে বীরভদ্র ক্রোধভরে তাঁকে ভূমিতে নিক্ষেপ করে তাঁর চক্ষুদ্বয় উৎপাটন করেছিলেন। অনিরুদ্ধের বিবাহের সময় দ্যূতক্রীড়াকালে বলদেব যেভাবে কলিঙ্গরাজ দন্তবক্রের দন্তরাজি উৎপাটন করেছিলেন, সেইভাবে যে দক্ষ শিবের নিন্দার সময়ে দন্ত প্রকাশ করেছিলেন এবং তখন সেই নিন্দার সমর্থন করে পূষাও তাঁর দন্তরাজি প্রদর্শন করে হেসেছিলেন, বীরভদ্র তাঁদের উভয়েরই দন্তরাজি উৎপাটন করেছিলেন। তখন সেই বিশালকায় বীরভদ্র দক্ষের বুকের উপর বসে তীক্ষ্ণধার খড়ে্গর দ্বারা তার মস্তক ছেদন করতে প্রবৃত্ত হলেন, কিন্তু দক্ষের শরীর থেকে তাঁর মস্তক বিচ্ছিন্ন করতে পারলেন না। তিনি অস্ত্র এবং মন্ত্রের দ্বারাও দক্ষের মস্তক ছেদন করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাঁর চর্ম মাত্রও ছেদন করতে পারলেন না। তার ফলে বীরভদ্র অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত হয়েছিলেন। তখন বীরভদ্র যজ্ঞস্থলে পশুবলি দেওয়ার যূপকাষ্ঠ দর্শন করে তার দ্বারা দক্ষের মস্তক ছেদন করেছিলেন। বীরভদ্রের সেই কার্য দর্শন করে, শিবপক্ষীয় ভূত, প্রেত এবং পিশাচেরা সাধু সাধু বলে কোলাহল করে উঠল; কিন্তু যজ্ঞ অনুষ্ঠানকারী ব্রাহ্মণেরা দক্ষের মৃত্যুতে হাহাকার করে উঠল। বীরভদ্র তখন মহা ক্রোধে দক্ষের মস্তকটি নিয়ে দক্ষিণ দিকস্থ যজ্ঞাগ্নিতে তা আহুতির মতো নিক্ষেপ করেছিলেন। এইভাবে শিবের অনুচরেরা যজ্ঞের সমস্ত আয়োজন তচনছ করে এবং সমস্ত যজ্ঞস্থলে আগুন জ্বালিয়ে তাঁদের প্রভুর ধাম কৈলাসের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করেছিলেন।”
পঞ্চম অধ্যায়- দক্ষযজ্ঞ নাশ
22 Jul 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, চতুর্থ স্কন্ধ- ভগবদ্ভক্তদের প্রতি অনুগ্রহ