শ্রীমৈত্রেয় বললেন- “এইভাবে ভগবান কপিলদেবের মাতা এবং কর্দম মুনির পত্নী দেবহূতি ভগবদ্ভক্তি এবং দিব্য জ্ঞান সম্পর্কিত সমস্ত অবিদ্যা থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। মুক্তির পটভূমি-স্বরূপ সাংখ্য দর্শনের প্রবর্তক ভগবান কপিলদেবকে তিনি নিম্ন লিখিত স্তুতির দ্বারা প্রসন্ন করেছিলেন।”
দেবহূতি বললেন- “ব্রহ্মান্ডের তলদেশে সমুদ্রে শায়িত আপনার নাভিকমল থেকে উদ্ভুত হয়েছেন বলে, ব্রহ্মাকে অজ বলা হয়। আপনার শরীর অনন্ত ব্রহ্মান্ডের উৎস, কিন্তু ব্রহ্মাও কেবল আপনারই ধ্যান করেছিলেন। হে ভগবান! যদিও আপনার করণীয় কিছু নেই, তবুও আপনি আপনার শক্তিকে জড়া প্রকৃতির গুণে পারস্পারিক ক্রিয়ায় বিভক্ত করেছেন, যার ফলে জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় সম্পাদিত হয়। হে ভগবান! আপনি সত্য-সঙ্কল্প এবং সমস্ত জীবের পরমেশ্বর। তাদের জন্য আপনি এই জড় জগৎ সৃষ্টি করেছেন এবং যদিও আপনি এক, আপনার বিবিধ শক্তি নানাভাবে কার্য করতে পারে। সেইটি আমাদের কাছে অচিন্ত্য। পরমেশ্বর ভগবানরূপে আপনি আমার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছেন। হে প্রভু! যাঁর উদরে সমগ্র বিশ্ব অবস্থান করে, সেই পরমেশ্বরের পক্ষে কিভাবে তা সম্ভব? তার উত্তর হচ্ছে এই যে, তা সম্ভব কারণ কল্পান্তে আপনি একটি শিশুরূপ ধারণ করে আপনার পায়ের অঙ্গুলি চুষতে চুষতে একলা একটি বটপাতায় শয়ন করেন। হে ভগবান! পতিতদের পাপকর্মের প্রশমনের জন্য এবং তাদের ভক্তি ও মুক্তির জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য, আপনি এই শরীর ধারণ করেছেন। যেহেতু এই সমস্ত পাপাত্মারা আপনার নির্দেশের উপর নির্ভরশীল, তাই আপনি স্বেচ্ছায় বরাহ আদি রূপ নিয়ে অবতরণ করেন। তেমনই, আপনার আশ্রিতদের দিব্য জ্ঞান বিতরণ করার জন্য আপনি প্রকট হয়েছেন। কুকুরভোজী পরিবারে যার জন্ম হয়েছে, সেও যদি একবার পরমেশ্বর ভগবানের দিব্য নাম উচ্চারণ করে, তাঁর লীলা শ্রবণ করে, তাঁকে প্রণতি নিবেদন করে অথবা তাঁকে স্মরণ করে, তা হলে সে তৎক্ষণাৎ বৈদিক যজ্ঞ অনুষ্ঠানের যোগ্য হয়, অতএব, যাঁরা প্রত্যক্ষভাবে পরমেশ্বর ভগবানকে দর্শন করেন, তাঁদের আধ্যাত্মিক উন্নতি সম্বন্ধে কি আর বলা আছে। আহা! যাঁরা আপনার পবিত্র নাম কীর্তন করেন, তাঁরা কত ধন্য! কুকুরভোজী পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও এই প্রকার ব্যক্তিরা পূজ্য। যাঁরা আপনার পবিত্র নাম কীর্তন করেন, তাঁরা সর্ব প্রকার তপস্যা এবং অগ্নিহোত্র যজ্ঞ সম্পাদন করেছেন এবং তাঁরা আর্যদের সমস্ত সদাচার অর্জন করেছেন। আপনার পবিত্র নামগ্রহণ করার জন্য তাঁরা নিশ্চয়ই সমস্ত পবিত্র তীর্থে স্নান করেছেন, বেদ অধ্যয়ন করেছেন এবং সমস্ত আবশ্যকতা পূর্ণ করেছেন। হে ভগবান! আমি বিশ্বাস করি যে, আপনি হচ্ছেন কপিল নামক ভগবান শ্রীবিষ্ণু এবং আপনি হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান পরমব্রহ্ম! ইন্দ্রিয় এবং মনের বিক্ষোভ থেকে মুক্ত হয়ে, মহাত্মা এবং ঋষিরা আপনার ধ্যান করেন, কারণ আপনার কৃপার প্রভাবেই কেবল মানুষ জড়া প্রকৃতির তিন গুণের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারে। প্রলয়ের সময়, সমস্ত বেদ আপনিই রক্ষা করেছিলেন। এইভাবে তাঁর মায়ের বাক্যে প্রসন্ন হয়ে, মাতৃবৎসল ভগবান কপিল গম্ভীরতাপূর্বক উত্তর দিয়েছিলেন।”
পরমেশ্বর ভগবান বললেন- “হে মাতঃ! আমি আপনাকে আত্ম-উপলব্ধির যে পন্থা সম্বন্ধে উপদেশ দিয়েছি তা অত্যন্ত সহজ। আপনি অনায়াসে তা অনুষ্ঠান করতে পারবেন এবং তা অনুশীলন করার ফলে, আপনি আপনার বর্তমান শরীরেই, অতি শ্রীঘ্র মুক্তি লাভ করতে পারবেন। হে মাতঃ! যাঁরা প্রকৃতই অধ্যাত্মবাদী, তাঁরা আপনাকে প্রদত্ত আমার এই উপদেশ অনুসরণ করেন। আপনি নিশ্চিতভাবে জেনে রাখতে পারেন যে, আত্ম-উপলব্ধির এই পন্থা আপনি যদি সম্যকভাবে অনুসরণ করেন, তা হলে আপনি নিশ্চিতভাবে ভয়ঙ্কর জড়-জাগতিক কলুষ থেকে মুক্ত হয়ে, আমাকে প্রাপ্ত হবেন। মাতঃ! যারা এই ভগবদ্ভক্তি সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ, তারা কখনই জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে উদ্ধার লাভ করতে পারে না।”
শ্রীমৈত্রেয় বললেন- “পরমেশ্বর ভগবান কপিলদেব তাঁর প্রিয় মাতাকে উপদেশ দিয়ে, তাঁর উদ্দেশ্য সাধন হওয়ার ফলে, তাঁর মায়ের অনুমতি নিয়ে গৃহ ত্যাগ করেছিলেন। দেবহূতিও তাঁর পুত্রের দ্বারা উপদিষ্ট হয়ে, সেই আশ্রমে ভক্তিযোগ অনুশীলন করতে শুরু করলেন। তিনি কর্দম মুনির গৃহে সমাধি-যোগ অভ্যাস করেছিলেন এবং সেই গৃহটি ফুলের দ্বারা এত সুন্দরভাবে অলঙ্কৃত ছিল যে, সেইটিকে সরস্বতী নদীর পুষ্প-মুকুট বলে মনে করা হত। তিনি দিনে তিনবার স্নান করতেন এবং তার ফলে তার কুঞ্চিত কৃষ্ণ কেশদাম জটাযুক্ত এবং পিঙ্গল বর্ণ হয়েছিল। তাঁর কঠোর তপস্যার ফলে, তাঁর দেহ ধীরে ধীরে শীর্ণ হয়েছিল এবং তাঁর বসন জীর্ণ হয়েছিল। প্রজাপতি কর্দমের ঘর এবং গৃহস্থালি তাঁর তপস্যা এবং যোগের বলে এতই সমৃদ্ধ ছিল যে, যাঁরা অন্তরীক্ষে বিমানে বিচরণ করেন, তাঁরাও তাঁর ঐশ্বর্যের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হতেন। এখানে কর্দম মুনির গৃহের ঐশ্বর্য বর্ণনা করা হয়েছে। সেই গৃহের শয্যা ছিল দুগ্ধ-ফেননিভ, আসনসমূহ হস্তীদন্ত-নির্মিত এবং সেইগুলি সোনার জরিযুক্ত বস্ত্রের দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল এবং পালঙ্কগুলি ছিল সোনার তৈরী এবং বালিশগুলি অত্যন্ত কোমল ছিল। সেই গৃহের স্বচ্ছ স্ফটিক-নির্মিত দেওয়ালগুলি মহা মূল্যবান মনিরত্নের দ্বারা অলঙ্কৃত ছিল। সেখানে আলোকের কোন প্রয়োজন ছিল না, কারণ সেই গৃহ সেই সমস্ত মণির কিরণে আলোকিত ছিল। সেই গৃহের রমনীরা সকলেই সুন্দর অলঙ্কারে বিভূষিতা ছিলেন। সেই গৃহের অঙ্গন সুন্দর বাগানের দ্বারা বেষ্টিত ছিল, যেখানে অত্যন্ত মধুর সৌরভযুক্ত ফুল ছিল এবং অনেক বৃক্ষ ছিল, যেগুলিতে তাজা ফল উৎপন্ন হত এবং সেইগুলি উচ্চ ও সুন্দর ছিল। সেই বাগানের আকর্ষণ ছিল বৃক্ষের উপর কূজনরত পক্ষীকুল এবং গুঞ্জনরত মধুকর। তারা সেই পরিবেশকে অত্যন্ত মনোরম করে তুলেছিল। দেবহূতি যখন সেই মনোরম উদ্যানের পদ্মপূর্ণ সরোবরে স্নান করবার জন্য প্রবেশ করতেন, তখন স্বর্গের দেবতাদের অনুচর গন্ধর্বেরা কর্দম মুনির গার্হস্থ্য জীবনের মহিমা গান করতেন। তাঁর মহান পতি কর্দম তাঁকে সর্বদা সব রকম সুরক্ষা প্রদান করেছিলেন। যদিও তাঁর স্থিতি সর্বতোভাবে অতুলনীয় ছিল, তবুও স্বর্গললনাদেরও বাঞ্ছিত তাঁর সমস্ত ঐশ্বর্য থাকা সত্ত্বেও, সাধ্বী দেবহূতি তাঁর পুত্রের বিচ্ছেদ-জনিত বিরহে কাতর হয়ে, সেই সমস্ত সুখ ত্যাগ করেছিলেন। দেবহূতির পতি ইতিমধ্যেই গৃহত্যাগ করে সন্ন্যাস আশ্রম অবলম্বন করেছিলেন এবং তার পর তাঁর একমাত্র পুত্র কপিলদেব গৃহ ত্যাগ করেছিলেন। যদিও তিনি জীবন এবং মৃত্যুর সমস্ত তত্ত্ব অবগত ছিলেন এবং যদিও তাঁর হৃদয় সমস্ত কলুষ থেকে মুক্ত ছিল, তবুও তাঁর পুত্রের বিরহে তিনি বৎসহারা গাভীর মতো কাতর হয়েছিলেন।”
“হে বিদুর, এইভাবে সর্বদা তাঁর পুত্র পরমেশ্বর ভগবান কপিলদেবের ধ্যান করে অতি সুন্দরভাবে সজ্জিত তাঁর গৃহের প্রতি তিনি অনাসক্ত হয়েছিলেন। তার পর তাঁর পুত্র প্রসন্ন বদন ভগবান কপিলদেবের কাছ থেকে সমস্ত বৃত্তান্ত গভীর আগ্রহ সহকারে শ্রবণ করে, দেবহূতি নিরন্তর পরমেশ্বর ভগবানের বিষ্ণুরূপের ধ্যান করতে শুরু করেছিলেন। তিনি ঐকান্তিকভাবে ভক্তিযুক্ত হয়ে তা করেছিলেন। যেহেতু তাঁর বৈরাগ্য প্রবল ছিল, তাই তিনি তাঁর দেহের প্রয়োজনের জন্য ঠিক যতটুকুই আবশ্যক, ততটুকুই কেবল গ্রহণ করেছিলেন। পরমতত্ত্বকে উপলব্ধি করার ফলে তিনি জ্ঞানে স্থিত হয়েছিলেন, তাঁর হৃদয় শুদ্ধ হয়েছিল, তিনি পরমেশ্বর ভগবানের ধ্যানে সম্পূর্ণরূপে মগ্ন হয়েছিলেন এবং জড়া প্রকৃতির প্রভাবজাত সমস্ত দুর্ভাবনা দূর হয়েছিল। তাঁর মন সম্পূর্ণরূপে ভগবানে মগ্ন হয়েছিল এবং তিনি আপনা থেকেই নির্বিশেষ ব্রহ্মাজ্ঞান উপলব্ধি করেছিলেন। ব্রহ্ম-উপলব্ধ আত্মারূপে তিনি জড়-জাগতিক জীবনের ধারণা-প্রসূত সমস্ত উপাধি থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। এইভাবে তাঁর সমস্ত ভৌতিক ক্লেশের নিবৃত্তি হয়েছিল এবং তিনি চিন্ময় আনন্দ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। জড়া প্রকৃতির গুণ থেকে উৎপন্ন ভ্রম থেকে মুক্ত হয়ে এবং নিত্য সমাধিতে অবস্থিত হয়ে, তিনি তাঁর জড় দেহের কথা ভুলে গিয়েছিলেন, ঠিক যেমন মানুষ জেগে ওঠার পর, তার স্বপ্ন-দৃষ্ট শরীরের কথা ভুলে যায়। তাঁর পতি কর্দম সৃষ্ট দেবাঙ্গনারা তাঁর দেহের পালন-পোষণ করায় এবং তাঁর কোন রকম মানসিক উৎকন্ঠা না থাকায়, তাঁর দেহ কৃশ হয়নি। তাঁকে তখন ঠিক ধূমাচ্ছন্ন বহ্নির মতো প্রতীত হয়েছিল। যেহেতু তিনি সর্বদা পরমেশ্বর ভগবানের চিন্তায় মগ্ন ছিলেন, তাই কখন যে তাঁর চুল আলুলায়িত হয়েছিল এবং কখন যে তাঁর বসন অবিন্যস্ত হয়েছিল, সেই সম্বন্ধে তাঁর কোন চেতনাই ছিল না।”
“হে বিদুর! কপিলদেব কর্তৃক উপদিষ্ট মার্গ অনুসরণ করে দেবহূতি অচিরেই জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়েছিলেন এবং অনায়াসে পরমেশ্বর ভগবানকে পরমাত্মারূপে প্রাপ্ত হয়েছিলেন। হে প্রিয় বিদুর! যেই স্থানে দেবহূতি সিদ্ধি লাভ করেছিলেন, সেই স্থানটিকে পবিত্রতম বলে মনে করা হয়। তা তিন লোকে সিদ্ধপদ নামে বিখ্যাত। প্রিয় বিদুর! তাঁর দেহের ভৌতিক উপাদাগুলি দ্রবীভূত হয়ে, তা এখন একটি নদীরূপে প্রবাহিত হচ্ছে, যা সমস্ত নদীর মধ্যে পূণ্যতমা। সেই নদীতে যিনি স্নান করেন, তিনি সিদ্ধি প্রাপ্ত হন এবং তাই যাঁরা সিদ্ধি লাভের অভিলাষী, তাঁরা তাতে অবগাহন করেন।”
“হে বিদুর! ভগবান মহির্ষ কপিল তাঁর মায়ের অনুমতি নিয়ে, তাঁর পিতার আশ্রম ত্যাগ করে উত্তর-পূর্বদিকে গমন করেছিলেন। তিনি যখন উত্তর-পূর্বদিকে গমন করছিলেন, তখন চারণ, গন্ধর্ব, মুনি, অপ্সরা আদি স্বর্গলোকের অধিবাসীরা তাঁর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন এবং তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন। সমুদ্র তাঁকে অর্ঘ্য নিবেদন করেছিলেন এবং বসবাসের স্থান প্রদান করেছিলেন। ত্রিলোকের বদ্ধ জীবেদের উদ্ধারের জন্য কপিল মুনি এখনও সেখানে সমাধিস্থ রয়েছেন এবং সমস্ত সাংখ্যাচার্যরা তাঁর পূজা করেন। হে পুত্র! তুমি যেহেতু আমাকে জিজ্ঞাসা করেছ, তাই আমি উত্তর দিয়েছি। হে নিষ্পাপ! কপিলদেব এবং তাঁর মাতার বৃত্তান্ত এবং তাঁদের কার্যকলাপ সমস্ত আলোচনার মধ্যে পরম পবিত্র। কপিলদেব এবং তাঁর মাতার আচরণের বর্ণনা অত্যন্ত গোপনীয়। সেই বৃত্তান্ত যিনি শ্রবণ করেন অথবা পাঠ করেন, তিনি গরুড়-ধ্বজ পরমেশ্বর ভগবানের ভক্ত হয়ে যান, এবং তার পর পরমেশ্বর ভগবানের অপ্রাকৃত প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত হওয়ার জন্য ভগবদ্ধামে প্রবেশ করেন।”
ত্রয়োত্রিংশতি অধ্যায়- কপিলদেবের কার্যকলাপ
14 Jul 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, তৃতীয় স্কন্ধ- সৃষ্টির স্থিতি