শ্রীমৈত্রেয় বললেন- “স্বায়ম্ভুব মনু তাঁর পত্নী শতরূপা থেকে তিনটি কন্যা লাভ করেছিলেন এবং তাঁদের নাম হচ্ছে- আকূতি, দেবহূতি এবং প্রসূতি। আকূতির দুজন ভাই ছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও স্বায়ম্ভুব মনু এই শর্তে তাঁকে প্রজাপতি রুচির হস্তে সম্প্রদান করেছিলেন যে, তাঁর থেকে যে পুত্রের জন্ম হবে, তাকে মনুর কাছে তাঁর পুত্ররূপে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তাঁর পত্নী শতরূপা এই শর্তটিকে অনুমোদন করেছিলেন। ব্রাহ্মণোচিত গুণাবলীতে অত্যন্ত শক্তিসম্পন্ন রুচি প্রজাপতির পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং তাঁর পত্নী আকূতির গর্ভে তিনি একটি পুত্র ও একটি কন্যা লাভ করেছিলেন। আকূতির দুটি সন্তানের মধ্যে, পুত্রসন্তানটি ছিলেন স্বয়ং ভগবানের অবতার এবং তাঁর নাম ছিল যজ্ঞ, যা হচ্ছে ভগবান বিষ্ণুর আর একটি নাম। আর কন্যাসন্তানটি ছিলেন ভগবান শ্রীবিষ্ণুর নিত্য সহচরী লক্ষ্মীদেবীর অংশাবতার। স্বায়ম্ভুব মনু অত্যন্ত প্রসন্নতাপূর্বক যজ্ঞ নামক অপূর্ব সুন্দর বালকটিকে গৃহে নিয়ে এসেছিলেন এবং তাঁর জামাতা রুচি তাঁর কন্যা দক্ষিণাকে তাঁর কাছে রেখেছিলেন। যজ্ঞের ঈশ্বর ভগবান পরবর্তী কালে দক্ষিণাকে বিবাহ করেছিলেন, যিনি পরমেশ্বর ভগবানকে তার পতিরূপে লাভ করার কামনা করেছিলেন। ভগবান তাঁর সেই পত্নীর প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে, বারটি পুত্র লাভ করেছিলেন। যজ্ঞ এবং দক্ষিণার বারটি পুত্রের নাম ছিল- তোষ, প্রতোষ, সন্তোষ, ভদ্র, শান্তি, ইড়স্পতি, ইধ, কবি, বিভু, স্বহ্ন, সুদেব এবং রোচন। স্বায়ম্ভুব মন্বন্তরে এই পুত্রেরা দেবতা হয়েছিলেন, যাঁদের যৌথভাবে তুষিত বলা হয়। মরীচি সপ্তর্ষিদের প্রধান হয়েছিলেন এবং যজ্ঞ দেবতাদের রাজা ইন্দ্র হয়েছিলেন। স্বায়ম্ভুব মনুর দুই পুত্র প্রিয়ব্রত এবং উত্তানপাদ অত্যন্ত শক্তিশালী রাজা হয়েছিলেন এবং তাঁদের পুত্র ও পৌত্রেরা সমগ্র ত্রিভুবন জুড়ে বিস্তার লাভ করেছিল।”
“হে বৎস! স্বায়ম্ভুব মনু তাঁর অত্যন্ত প্রিয় কন্যা দেবহূতিকে কর্দম মুনির কাছে সম্প্রদান করেছিলেন। সেই কথা আমি পূর্বেই আপনাকে বলেছি এবং আপনিও তা প্রায় সম্পূর্ণ শ্রবণ করেছেন। স্বায়ম্ভুব মনু তাঁর কন্যা প্রসূতিকে ব্রহ্মার পুত্র এবং প্রজাপতিদের অন্যতম দক্ষের হস্তে দান করেছিলেন। দক্ষের বংশধরেরা ত্রিলোক জুড়ে বিস্তার লাভ করেছে। আমি আপনাকে কর্দম মুনির নয়টি কন্যার বিষয়ে পূর্বেই বলেছি, যাঁদের নয়জন ব্রহ্মর্ষিকে দান করা হয়েছিল। এখন আমি সেই নয়জন কন্যার বংশধরদের কথা বর্ণনা করব। দয়া করে আপনি তা আমার কাছে শ্রবণ করুন। কর্দম মুনির কন্যা কলা, মরীচির সঙ্গে যাঁর বিবাহ হয়েছিল, তিনি কশ্যপ এবং পূর্নিমা নামক দুটি সন্তান প্রসব করেছিলেন। তাঁদের বংশধরো সারা বিশ্ব জুড়ে বিস্তৃত হয়েছে। হে বিদুর! কশ্যপ এবং পূণিমা নামক দুই সন্তানের মধ্যে পূর্ণিমার বিরজ, বিশ্বগ এবং দেবকুল্যা নামক তিনটি সন্তান উৎপন্ন হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে দেবকুল্যা ছিল পরমেশ্বর ভগবানের শ্রীপাদপদ্ম-ধৌত জল, যা পরবর্তী কালে স্বর্গলোকে গঙ্গায় রূপান্তরিত হয়েছিল। অত্রি মুনির পত্নী অনসূয়া তিনজন অতি প্রসিদ্ধ পুত্রের জন্ম দিয়েছিলেন, যথা- সোম, দত্তাত্রেয় এবং দুর্বাসা, যাঁরা ছিলেন, ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং শিবের অংশাবতার। সোম ব্রহ্মার, দত্তাত্রেয় বিষ্ণুর এবং দুর্বাসা শিবের অংশাবতার ছিলেন।”
তা শোনার পর, বিদুর মৈত্রেয়কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- “হে গুরুদেব! ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং শিব, যাঁরা সমগ্র সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা এবং সংহারকর্তা, তাঁরা অত্রি মুনির পত্নীর সন্তান কিভাবে হয়েছিলেন?”
মৈত্রেয় বললেন- “অত্রি মুনি যখন অনসূয়াকে বিবাহ করেন, তখন ব্রহ্মা তাঁকে প্রজা সৃষ্টি করার আদেশ দেন। তখন অত্রি মুনি তাঁর পত্নী সহ কঠোর তপস্যা করার জন্য ঋক্ষ নামক পর্বতের উপত্যকায় গিয়েছিলেন। সেই পর্বতের উপত্যকায় নির্বিন্ধ্যা নামক নদী প্রবাহিত হচ্ছে। সেই নদীর তটে অশোক, পশাশ আদি পুষ্পবৃক্ষ পুষ্পগুচ্ছে সুশোভিত ছিল এবং সেখানে ঝরনার জন্য সর্বদা মধুর ধ্বনি উৎপন্ন করে প্রবাহিত হচ্ছিল। পতি এবং পত্নী সেই অতি সুন্দর স্থানে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেই মহর্ষি সেখানে প্রাণায়াম অভ্যাসের দ্বারা তাঁর মনকে একাগ্র করেছিলেন এবং এইভাবে তাঁর সমস্ত আসক্তি সংযত করে, এক পায়ের উপর দন্ডায়মান হয়ে, কেবল বায়ু আহার করে এক শত বছর তপস্যা করেছিলেন। তিনি কামনা করেছিলেন- আমি যাঁর শরণ করেছি, সেই জগদীশ্বর কৃপাপূর্বক আমাকে ঠিক তাঁরই মতো একটি পুত্র প্রদান করুন। অত্রি মুনি যখন এইভাবে কঠোর তপস্যায় যুক্ত ছিলেন, তখন প্রাণায়ামের প্রভাবে তাঁর মস্তক থেকে একটি প্রজ্বলিত অগ্নি নির্গত হয়েছিল এবং ত্রিভুবনের তিনজন মুখ্য দেবতা সেই অগ্নি দর্শন করেছিলেন, সেই সময়ে, অপ্সরা, গন্ধর্ব, সিদ্ধ, বিদ্যাধর, নাগ প্রভৃতি স্বর্গবাসীগণ সহ তিন দেবতা অত্রি মুনির আশ্রমে এসেছিলেন। তপস্যার প্রভাবে বিখ্যাত সেই মহর্ষির আশ্রমে তাঁরা এইভাবে প্রবেশ করেছিলেন। ঋষি এক পায়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, কিন্তু সেই তিনজন দেবতাদের একত্রে তাঁর কাছে আসতে দেখে, তিনি এত প্রসন্ন হয়েছিলেন যে, অত্যন্ত কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তিনি এক পায়ে তাঁদের কাছে গিয়েছিলেন। তার পর তিনি সেই তিনজন দেবতাদের বন্দনা করতে শুরু করেছিলেন, যাঁরা তাদের বাহন- বৃষ, হংস ও গরুড়ে উপবিষ্ট ছিলেন এবং তাঁদের হাতে ডমরু, কুশ ঘাস ও চক্র ছিল। মুনি ভূমিতে পতিত হয়ে, তাঁদের দন্ডবৎ প্রণতি নিবেদন করেছিলেন। সেই তিনজন দেবতাকে তাঁর প্রতি প্রসন্ন দেখে অত্রি মুনি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। তাঁদের দেহনির্গত রশ্মিচ্ছটায় তাঁর চোখ ঝলসে গিয়েছিল এবং তাই তিনি সেই সময় তাঁর নেত্র নিমীলিত করেছিলেন। কিন্তু যেহেতু তাঁর হৃদয় পূর্বেই সেই দেবতাদের প্রতি আকৃষ্ট ছিল, তাই তিনি কোনক্রমে সচেতন হয়ে, কৃতাঞ্জলিপুটে মধুর শব্দের দ্বারা ব্রহ্মান্ডের প্রধান দেবতাদের বন্দনা করতে লাগলেন।”
মহর্ষি অত্রি বললেন- “হে ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং শিব, আপনারা প্রকৃতির তিন গুণ স্বীকার করে তিন ভাগে আপনাদেরকে বিভক্ত করেছেন, যেভাবে আপনারা প্রতি কল্পে জগতের সৃষ্টি, স্থিতি এবং প্রলয়ের জন্য করে থাকেন। আমি আপনাদের সকলকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি এবং আমি আপনাদের কাছে জানতে চাই, আমার প্রার্থনার দ্বারা আপনাদের তিনজনের মধ্যে কাকে আমি আহ্বান করেছি। আমি পরমেশ্বর ভগবানের মতো পুত্র লাভের বাসনা করে তাঁকে আহ্বান করেছি এবং আমি কেবল তাঁরই কথা চিন্তা করেছি। কিন্তু যদিও তিনি মানুষের মনের কল্পনার অতীত, তবুও আপনারা তিনজন এখানে এসেছে। দয়া করে আমাকে বলুন কিভাবে আপনারা এসেছেন, কারণ সেই বিষয়ে আমি অত্যন্ত সংশয়াচ্ছন্ন হয়েছি।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “অত্রি মুনির সেই কথা শুনে, তিনজন মহান দেবতা মৃদু হেসেছিলেন এবং তাঁরা মধুর স্বরে উত্তর দিয়েছিলেন।”
তিনজন দেবতা অত্রি মুনিকে বললেন- “হে ব্রাহ্মণ! তুমি সত্যসঙ্কল্প এবং তাই তুমি যা চেয়েছ, তা হবে; তার কোন অন্যথা হবে না। আমরা সকলেই সেই পুরুষ যাঁর ধ্যান তুমি করেছ এবং তাই আমরা সকলে তোমার কাছে এসেছি। আমাদের শক্তির অংশ-স্বরূপ পুত্র তুমি লাভ করবে এবং যেহেতু আমরা তোমার সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করি, তাই তোমার সেই পুত্রেরা সমগ্র জগৎ জুড়ে তোমার যশ বিস্তার করবে। এইভাবে, অত্রি মুনিকে তাঁর অভিলষিত বর প্রদান করে, সেই তিনজন সুরেশ্বর ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বর সেই দম্পতির দৃষ্টিপথ থেকে অন্তর্হিত হয়ে গেলেন। তার পর ব্রহ্মার অংশ থেকে সোমের জন্ম হয়েছিল; বিষ্ণুর অংশ থেকে মহাযোগী দত্তাত্রেয়র জন্ম হয়েছিল এবং শঙ্করের অংশ থেকে দুর্বাসার জন্ম হয়েছিল। এখন আপনি আমার কাছ থেকে অঙ্গিরার অনেক পুত্র সম্বন্ধে শ্রবণ করুন।”
“অঙ্গিরার পত্নী শ্রদ্ধা চারটি কন্যার জন্ম দিয়েছিলেন, যাঁদের নাম ছিল- সিনীবালী, কুহূ, রাকা এবং অনুমতি। এই চারটি কন্যা ব্যতীত তাঁর আরও দুটি পুত্র হয়েছিল। তাঁদের একজনের নাম উতথ্য এবং অন্যজন হচ্ছেন পরম বিদ্বান বৃহস্পতি। পুলস্ত্য তাঁর পত্নী হবির্ভূর মাধ্যমে অগস্ত্য নামক এক পুত্র লাভ করেছিলেন, যিনি পরবর্তী জন্মে দহ্রাগ্নি হয়েছিলেন। তা ছাড়া পুলস্ত্যের আর একটি মহান সাধু প্রকৃতির পুত্র হয়েছিল, যার নাম ছিল বিশ্রবা। বিশ্রবার দুই পত্নী ছিলেন। প্রথম পত্নী ইড়বিড়া থেকে যক্ষপতি কুবেরের জন্ম হয়েছিল এবং অন্য পত্নী কেশিনী থেকে রাবণ, কুম্ভকর্ণ ও বিভীষণ, এই তিন পুত্রের জন্ম হয়েছিল। পুলহ ঋষির পত্নী গতি তিনটি পুত্রের জন্ম দিয়েছিলেন, যাঁদের নাম ছিল- কর্মশ্রেষ্ঠ, বরীয়ান ও সহিষ্ণু এবং তাঁরা সকলেই ছিলেন মহান ঋষি। ক্রতুর পত্নী ক্রিয়া বালখিল্য নামক ষাট হাজার মহর্ষির জন্ম দিয়েছিলেন। এই সমস্ত ঋষিরা আধ্যাত্মিক জ্ঞানে অত্যন্ত উন্নত ছিলেন এবং তাঁদের জ্ঞানের প্রভাবে তাঁদের শরীর জ্যোতির্ময় ছিল। মহর্ষি বশিষ্ঠ তাঁর পত্নী ঊর্জা, যাঁর আর এক নাম অরুন্ধতী, তাঁর থেকে চিত্রকেতু আদি সাতটি নির্মল মহর্ষির জন্ম দান করেছিলেন। সেই সাতজন মহর্ষির নাম- চিত্রকেতু, সুরোচি, বিরজা, মিত্র, উল্বণ, বসুভৃদ্যান এবং দ্যুমান। বশিষ্ঠের অন্য পত্নী থেকে আরও কয়েকজন অত্যন্ত যোগ্য পুত্র হয়েছিল। অথর্বার পত্নী চিত্তি দধ্যঞ্চ নামক ব্রত ধারণ করে অশ্বশিরা নামক পুত্রের জন্ম দিয়েছিলেন। এখন আপনি আমার কাছে ভৃগুর বংশধরদের সম্বন্ধে শ্রবণ করুন। ভৃগু মুনি ছিলেন অত্যন্ত ভাগ্যবান। তিনি তাঁর পত্নী খ্যাতি থেকে ধাতা এবং বিধাতা নামক দুই পুত্র এবং শ্রী নাম্নী এক কন্যা প্রাপ্ত হয়েছিলেন। এই কন্যাটি পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি অত্যন্ত ভক্তিমতী ছিলেন। মহর্ষি মেরু তাঁর দুই কন্যা আয়তি এবং নিয়তিকে ধাতা এবং বিধাতার হস্তের সম্প্রদান করেন। আয়তি এবং নিয়তি থেকে মৃকণ্ড এবং প্রাণ নামক দুটি পুত্রের জন্ম হয়। মৃকণ্ড থেকে মার্কণ্ডেয় ঋষির জন্ম হয় এবং প্রাণ থেকে বেদশিরা ঋষির জন্ম হয়, যাঁর পুত্র ছিলেন উশনা (শুক্রাচার্য), যিনি কবি নামেও পরিচিত। এইভাবে কবিও ভৃগু-বংশীয়।”
“হে বিদুর! এইভাবে মহান ঋষিদের এবং কর্দম মুনির কন্যাদের সন্তানদের দ্বারা এই ব্রহ্মান্ডের প্রজা বৃদ্ধি হয়েছিল। যে-ব্যক্তি শ্রদ্ধা সহকরে এই বংশের আখ্যান শ্রবণ করেন, তিনি সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হবেন। প্রসূতি নামক মনুর অপর কন্যার বিবাহ হয়েছিল ব্রহ্মার পুত্র দক্ষের সঙ্গে। তাঁর পত্নী প্রসূতি থেকে দক্ষের অত্যন্ত সুন্দর কমল-নয়না ষোলটি কন্যার জন্ম হয়েছিল। ষোলটি কন্যার তেরটিকে তিনি ধর্মকে এবং একটি কন্যা অগ্নিকে সম্প্রদান করেন। অবশিষ্ট দুই কন্যার একটিকে তিনি পিতৃলোককে দান করেছিলেন, যেখানে তিনি অত্যন্ত প্রীতিপূর্বক বাস করছেন এবং অপর কন্যাটিকে তিনি শিবের হস্তে সম্প্রদান করেন, যিনি পাপী ব্যক্তিদের ভববন্ধন থেকে উদ্ধার করেন। দক্ষ যে তেরটি কন্যা ধর্মকে দান করেছিলেন, তাঁদের নাম হচ্ছে- শ্রদ্ধা, মৈত্রী, দয়া, শান্তি, তুষ্টি, পুষ্টি, ক্রিয়া, উন্নতি, বুদ্ধি, মেধা, তিতিক্ষা, হ্রী এবং মূর্তি। এই তেরটি কন্যা যে-সমস্ত সন্তানদের জন্ম দিয়েছিলেন তাঁরা হচ্ছেন- শ্রদ্ধা থেকে শুভ, মৈত্রী থেকে প্রসাদ, দয়া থেকে অভয়, শান্তি থেকে সুখ, তুষ্টি থেকে মুদ, পুষ্টি থেকে স্ময়, ক্রিয়া থেকে যোগ, উন্নতি থেকে দর্প, বুদ্ধি থেকে অর্থ, মেধা তেকে স্মৃতি, তিতিক্ষা থেকে ক্ষেম এবং হ্রী থেকে প্রশ্রয়। সমস্ত সদ্গুণের আধার মূর্তি, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীনর-নারায়ণের জন্ম দিয়েছিলেন। নর-নারায়ণের আবির্ভাবের ফলে, সমগ্র জগৎ আনন্দে পূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সকলের মন প্রশান্ত হয়েছিল এবং এইভাবে সর্বত্র বায়ু, নদীসমূহ, পর্বতসমূহ অত্যন্ত মনোহর হয়েছিল। স্বর্গলোকে বাজনা বাজতে শুরু করেছিল এবং আকাশ থেকে পুষ্প-বৃষ্টি হয়েছিল। ঋষিরা প্রসন্ন হয়ে বৈদিক স্তব উচ্চারণ করেছিলেন, গন্ধর্ব এবং কিন্নরেরা গান গাইতে শুরু করেছিলেন এবং স্বর্গের অপ্সরারা নাচতে শুরু করেছিলেন। এইভাবে নর-নারায়ণের আবির্ভাবের সময় সমস্ত মঙ্গলসূচক লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। সেই সময় ব্রহ্মা আদি মহান দেবতারাও শ্রদ্ধা সহকারে তাঁদের প্রার্থনা নিবেদন করেছিলেন।”
“দেবতারা বললেন- “ আমরা পরমেশ্বর ভগবানকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি, যিনি তাঁর বহিরঙ্গা শক্তিরূপে এই জগৎ সৃষ্টি করেছেন। বায়ু এবং মেঘ যেমন অন্তরীক্ষে অবস্থিত, এই সৃষ্টিও তেমন তাঁর মধ্যে অবস্থিত। এখন তিনি নর-নারায়ণ ঋষিরূপে ধর্মের গৃহে আবির্ভূত হয়েছেন। বিশুদ্ধ প্রামাণিক শাস্ত্র বেদের দ্বারা যাঁকে জানা যায় এবং যিনি জড় জগতের দুঃখ-দুর্দশার নিবৃত্তির জন্য শান্তি এবং সমৃদ্ধি সৃষ্টি করেছেন, সেই পরমেশ্বর ভগবান দেবতাদের উপর তার কৃপাপূর্ণ দৃষ্টিপাত করুন। তাঁর কৃপাপূর্ণ দৃষ্টিপাত লক্ষ্মীদেবীর আলয় নির্মল পদ্মের সৌন্দর্যকেও অতিক্রম করে।”
“হে বিদুর! নর-নারায়ণ ঋষিরূপে আবির্ভূত পরমেশ্বর ভগবান এইভাবে দেবতাদের বন্দনার দ্বারা পূজিত হয়েছিলেন। ভগবান তখন তাঁদের উপর তাঁর কৃপাপূর্ণ দৃষ্টিপাত করেছিলেন এবং তার পর গন্ধমাদন পর্বতে চলে গিয়েছিলেন। সেই নর-নারায়ণ ঋষি, যাঁরা হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণের অংশ-প্রকাশ, সম্প্রতি তাঁরা ভূভার হরণের জন্য যদু ও কুরুবংশে কৃষ্ণ ও অর্জুনরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। অগ্নিদেব তাঁর পত্নী স্বাহাতে পাবক, পবমান এবং শুচি নামক তিনটি সন্তান উৎপাদন করেছিলেন, যাঁরা যজ্ঞাগ্নিতে নিবেদিত আহুতি ভোজন করেন। এই তিন পুত্র থেকে পঁয়তাল্লিশ বংশধরের জন্ম হয়েছে এবং তাঁরাও হচ্ছেন অগ্নিদেব। পিতা এবং পিতামত সহ অগ্নিদেবের সংখ্যা মোট ঊনপঞ্চাশ। নির্বিশেষবাদী ব্রাহ্মণদের যজ্ঞাগ্নিতে অর্পিত আহুতির ভোক্তা এই ঊনপঞ্চাশজন অগ্নিদেবতা। অগ্নিষ্বাত্ত, বর্হিষদ, সৌম্য এবং আজ্যপগণ হচ্ছেন পিতা। তাঁরা সাগ্নিক অথবা নিরগ্নিক। এই সমস্ত পিতৃদের পত্নী হচ্ছেন রাজা দক্ষের কন্যা স্বধা। স্বধা, যাঁকে পিতৃদেব সম্প্রদান করা হয়েছিল, তাঁর বয়ুনা এবং ধারিণী নামক দুটি কন্যা হয়। তাঁরা উভয়েই ছিলেন নির্বিশেষবাদী এবং দিব্য ও বৈদিক জ্ঞানে পারদর্শী। সতী নামক ষোড়শতম কন্যাটি ছিলেন শিবের পত্নী। তিনি যদিও সর্বদা শ্রদ্ধা সহকারে তাঁর পতির সেবায় যুক্ত ছিলেন, তবুও তাঁর কোন পুত্র হয়নি। শিব নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও সতীর পিতা দক্ষ তাঁর নিন্দা করতেন। তাই, প্রৌঢ়ত্ব প্রাপ্তির পূর্বেই, সতী যোগ প্রভাবে তাঁর দেহত্যাগ করেছিলেন।”
প্রথম অধ্যায়- মনুকন্যাদের বংশাবলী
16 Jul 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, চতুর্থ স্কন্ধ- ভগবদ্ভক্তদের প্রতি অনুগ্রহ