দ্বাত্রিংশতি অধ্যায়- সকাম কর্মের বন্ধন

ভগবান বললেন- “যে ব্যক্তি গৃহব্রতীর জীবন অবলম্বন করে জড়-জাগতিক উন্নতি সাধনের জন্য ধর্ম অনুষ্ঠান করে এবং তার ফলে সে অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন এবং ইন্দ্রিয়-তৃপ্তি সাধনের বাসনা চরিতার্থ করে। সে বার বার একইভাবে আচরণ করে। ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির প্রতি অত্যন্ত আসক্ত হওয়ার ফলে, এই প্রকার ব্যক্তিরা সর্বদাই ভক্তিবিহীন এবং তাই, যদিও তারা নানা প্রকার যজ্ঞ অনুষ্ঠান করে এবং দেবতা ও পিতৃপুরুষদের প্রসন্ন করার জন্য বড় বড় ব্রত পালন করে, তবুও তারা কৃষ্ণভক্তিতে আগ্রহী নয়। এই প্রকার বিষয়াসক্ত ব্যক্তিরা ইন্দ্রিয় সুখভোগের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এবং পিতৃ ও দেবতাদের প্রতি শ্রদ্ধাযুক্ত হয়ে, চন্দ্রলোকে উন্নীত হতে পারে, যেখানে তারা সোমরস পান করতে পারে। তার পর তারা পুনরায় এই লোকে ফিরে আসে। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরি যখন অনন্তশেষ নামক সর্পশয্যায় শায়িত হন, তখন চন্দ্রলোক আদি স্বর্গলোক সহ বিষয়াসক্ত ব্যক্তিদের সমস্ত লোক ধ্বংস হয়ে যায়। যাঁরা বুদ্ধিমান এবং যাঁদের চেতনা শুদ্ধ, তাঁরা কৃষ্ণভাবনায় সম্পূর্ণরূপে তৃপ্ত থাকেন। জড়া প্রকৃতির গুণ থেকে মুক্ত হয়ে তাঁরা ইন্দ্রিয় সুখভোগের জন্য কোন কর্ম করেন না; পক্ষান্তরে যেহেতু তাঁরা স্বধর্মে-নিরত, তাই তাঁরা বিধান অনুসারে কার্য করেন। আসক্তি-রহিত হয়ে এবং প্রভুত্ব করার বাসনা-রহিত হয়ে অথবা অহঙ্কারশূণ্য হয়ে, নিজের বৃত্তি অনুসারে কর্তব্য-কর্ম সম্পাদনের দ্বারা, জীব শুদ্ধ চেতনা প্রাপ্ত হয় এবং তখন সে তার স্বরূপে অধিষ্ঠিত হয়। এইভাবে তথাকথিত জড়-জাগতিক কর্তব্য সম্পাদনের দ্বারা, মানুষ অনায়াসে ভগবদ্ধামে প্রবেশ করতে পারে। এই প্রকার মুক্ত পুরুষ জ্যোতির্ময় পথের মাধ্যমে, পূর্ণ পরমেশ্বর ভগবানকে প্রাপ্ত হন, যিনি জড় জগৎ ও চিৎ-জগতের অধীশ্বর এবং সৃষ্টি ও বিনাশের পরম কারণ। পরমেশ্বর ভগবানের হিরণ্যগর্ভ প্রকাশের উপসকেরা এই জগতে দুই পরার্ধের শেষ পর্যন্ত থাকেন, যখন ব্রহ্মারও মৃত্যু হয়। ত্রিগুণাত্মিক জড়া প্রকৃতির দুই পরার্ধ নামক বসবাসযোগ্য কালের অভিজ্ঞতার পর ব্রহ্মা পৃথিবী, জল, বায়ু, অগ্নি, আকাশ, মন, অহঙ্কার ইত্যাদির দ্বারা আচ্ছাদিত জড় ব্রহ্মান্ডের অবসান সাধন করে ভগবানের কাছে ফিরে যান। যে যোগী প্রাণায়ামে এবং মনোনিগ্রহের দ্বারা জড় জগতের প্রতি বিরক্ত হয়ে, বহু দূরে ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হন, দেহত্যাগের পর তাঁরা ব্রহ্মার শরীরে প্রবিষ্ট হন এবং তাই ব্রহ্মা যখন মুক্তি লাভ করে পরমব্রহ্ম পরমেশ্বর ভগবানের কাছে যান, তখন এই যোগীরাও ভগবদ্ধামে প্রবেশ করেন।”
“অতএব, হে মাতঃ! যিনি সকলের হৃদয়ে বিরাজমান, ভগবদ্ভক্তির মাধ্যমে সরাসরিভাবে, সেই পরমেশ্বর ভগবানের শরণ গ্রহণ করুন। হে মাতঃ! কেউ বিশেষ স্বার্থে পরমেশ্বর ভগবানের পূজা করতে পারে, কিন্তু ব্রহ্মার মতো দেবতা, সনৎ-কুমারের মতো ঋষি এবং মরীচির মতো মুনিদেরও সৃষ্টির সময় এই জগতে পুনরায় ফিরে আসতে হয়। প্রকৃতির তিন গুণের পারস্পারিক ক্রিয়া যখন শুরু হয়, তখন দৃশ্য জগতের স্রষ্টা বেদগর্ভ ব্রহ্মাকে এবং আধ্যাত্মিক মার্গ ও যোগ-পদ্ধতির প্রবর্তক মহান ঋষিদেরও কালের প্রভাবে ফিরে আসতে হয়। তাঁরা তাঁদের নিষ্কাম কর্মের প্রভাবে মুক্ত এবং তাঁরা প্রথম পুরুষ অবতারকে প্রাপ্ত হন, কিন্তু সৃষ্টির সময় তাঁদের পূর্বের মতো রূপ এবং পদে তাঁরা ফিরে আসেন। যারা এই জড় জগতের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত, তারা খুব সুন্দরভাবে এবং গভীর শ্রদ্ধা সহকারে তাদের কর্তব্য কর্ম সম্পাদন করে। তারা প্রতিদিন এই সমস্ত বৈধ কর্তব্য কর্ম সম্পাদন করে, কিন্তু কর্মফলের প্রতি আসক্তিযুক্ত হয়ে, তারা তা করে। রজোগুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, এই প্রকার ব্যক্তিরা সর্বদাই উৎকন্ঠায় পূর্ণ থাকে এবং অসংযত ইন্দ্রিয়ের প্রভাবে সর্বদাই ইন্দ্রিয়-তৃপ্তি সাধনের অভিলাষী হয়। তারা পিতৃদের পূজা করে এবং তাদের পরিবারের বা সমাজের অথবা রাষ্ট্রীয় জীবনের অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনের জন্য দিবা-রাত্র ব্যস্ত থাকে। এই প্রকার ব্যক্তিদের বলা হয় ত্রৈবর্গিক, কারণ তারা ত্রিবর্গ সাধনে উৎসাহী। বদ্ধ জীবেদের ত্রাণকর্তা পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি তারা বিমুখ। তারা পরমেশ্বর ভগবানের লীলা শ্রবণে আগ্রহী নয়, যা তাঁর অপ্রাকৃত বিক্রমের জন্য শ্রবণীয়। এই প্রকার ব্যক্তিরা ভগবানের পরম আদেশ অনুসারে দন্ডিত হয়। যেহেতু তারা ভগবানের লীলারূপ অমৃতের প্রতি বিমুখ, তাই তাদের বিষ্ঠাভোজী শূকরের সঙ্গে তুলনা করা হয়। তারা ভগবানের চিন্ময় লীলা-বিলাসের কথা না শুনে, বিষয়াসক্ত মানুষদের কুৎসিৎ কার্যকলাপের কথা শ্রবণ করে। এই প্রকার বিষয়াসক্ত ব্যক্তিরা সুর্যের দক্ষিণ অয়ন পথে পিতৃলোকে গমন করে, তার পর সেখান থেকে ভ্রষ্ট হয়ে, পুনরায় এই লোকে তাদের নিজেদের পরিবারে জন্মগ্রহণ করে জীবনের অন্ত পর্যন্ত পুনরায় সেই সকাম কর্মই করতে থাকে। তাদের পূর্ণ কর্মের ফল নিঃশেষ হয়ে গেলে, তারা দৈববশে পুনরায় অধঃপতিত হয়ে এই লোকে ফিরে আসে, ঠিক যেমন উচ্চপদে উন্নীত কোন ব্যক্তিকে কখনও কখনও সহসা পদচ্যুত করা হয়।”
“হে মাতঃ! আমি তাই আপনাকে উপদেশ দিচ্ছি যে, আপনি পরমেশ্বর ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় গ্রহণ করুন, কারণ তাঁর শ্রীপাদপদ্ম আরাধ্য। পূর্ণ ভক্তি এবং প্রেম সহকারে তার গ্রহণ করুন, কারণ তার ফলে আপনি দিব্য ভগবদ্ভক্তিতে অধিষ্ঠিত হতে পারবেন। কৃষ্ণভাবনায় যুক্ত হলে এবং শ্রীকৃষ্ণকে ভক্তি করলে, শ্রীঘ্রই জ্ঞান ও বৈরাগ্য এবং আত্ম-উপলব্ধি লাভ হয়। ইন্দ্রিয়ের কার্যকলাপের মাধ্যমে, উন্নীত ভক্তের মন সমদর্শী হয় এবং কোন্ বস্তুটি প্রিয় এবং কোন্ বস্তুটি অপ্রিয়, তিনি এই ধারণার অতীত হন। শুদ্ধ ভক্ত তাঁর অপ্রাকৃত বুদ্ধির প্রভাবে সমদর্শী হন এবং নিজেকে জড়ের কলুষিত প্রভাব থেকে মুক্তরূপে দর্শন করেন। তিনি কোন বস্তুকেই উত্তম বা অধমরূপে দর্শন করেন না এবং তিনি গুণগতভাবে ভগবানের সমান হওয়ার ফলে, নিজেকে চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত বলে অনুভব করেন।”
“পরমেশ্বর ভগবানই হচ্ছেন পূর্ণ চিন্ময় অদ্বয়জ্ঞান, কিন্তু উপলব্ধির বিবিধ পন্থা অনুসারে তিনি ব্রহ্ম, পরমাত্মা, পরমেশ্বর ভগবান অথবা পুরুষাবতাররূপে প্রতীত হন। সমস্ত যোগীদের জন্য সর্ব শ্রেষ্ঠ উপলব্ধি হচ্ছে বিষয়ের প্রতি পূর্ণ বিরক্তি। বিভিন্ন প্রকার যোগ-পদ্ধতির দ্বারা কেবল সেইটুকুই লাভ হয়। যারা চিন্ময় তত্ত্বের প্রতি পরাঙ্মুখ, তারা তাদের কল্পনামূলক ইন্দ্রিয় অনুভূতির দ্বারা পরমতত্ত্বকে ভিন্ন ভিন্নরূপে দর্শন করে এবং তাই তাদের সেই ভ্রান্ত কল্পনার ফলে, সব কিছুই তাদের কাছে আপেক্ষিক বলে মনে হয়। মহত্তত্ত্ব বা সমগ্র শক্তি থেকে, অহঙ্কার, তিন গুণ, পঞ্চ মহাভূত ব্যষ্টি চেতনা, একাদশ ইন্দ্রিয় এবং জড় দেহ আমি উৎপন্ন করেছি। তেমনই, আমার থেকে (পরমেশ্বর ভগবান থেকে) সমগ্র ব্রহ্মান্ড প্রকাশিত হয়েছে। এই পূর্ণ জ্ঞান তিনিই লাভ করতে পারেন, যিনি শ্রদ্ধা, স্থিরতা এবং পূর্ণ বৈরাগ্য সহকারে ভগবদ্ভক্তিতে যুক্ত হয়েছেন এবং যিনি সর্বদাই পরমেশ্বর ভগবানের চিন্তায় নিমগ্ন। তিনি জড় সঙ্গ থেকে দূরে থাকেন।”
“হে শ্রদ্ধেয় মাত! আমি ইতিপূর্বে পরমতত্ত্বকে জানার পন্থা আপনার কাছে বর্ণনা করেছি, যার দ্বারা জড় এবং চেতনের প্রকৃত তত্ত্ব এবং তাদের সম্পর্ক হৃদয়ঙ্গম করা যায়। দার্শনিক গবেষণার চরম পরিণতি হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানকে হৃদয়ঙ্গম করা। এই জ্ঞান লাভ করে যখন প্রকৃতির গুণ থেকে মুক্ত হওয়া যায়, তখন ভগবদ্ভক্তির স্তর প্রাপ্ত হওয়া যায়। প্রত্যক্ষভাবে ভগবদ্ভক্তির দ্বারা অথবা দার্শনিক গবেষণার দ্বারা, একই লক্ষ বস্তু প্রাপ্ত হতে হয়, এবং তা হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবান। একই বস্তু যেমন তার বিভিন্ন গুণের ফলে, ভিন্ন ভিন্ন ইন্দ্রিয়ের দ্বারা ভিন্ন প্রকারে প্রকাশিত হয়, তেমনই ভগবান এক, কিন্তু বিভিন্ন শাস্ত্রীয় নির্দেশ অনুসারে, তিনি ভিন্ন বলে প্রতীত হন। সকাম কর্ম এবং যজ্ঞ অনুষ্ঠানের দ্বারা, দানের দ্বারা, তপশ্চর্যা অনুষ্ঠানের দ্বারা, বিবিধ শাস্ত্র অধ্যয়নের দ্বারা, দার্শনিক গবেষণার দ্বারা, মন নিগ্রহের দ্বারা, ইন্দ্রিয় সংযমের দ্বারা, সন্ন্যাস গ্রহণের দ্বারা এবং বর্ণাশ্রম ধর্ম অনুষ্ঠানের দ্বারা, যোগের বিভিন্ন অঙ্গের অনুশীলনের দ্বারা, ভগবদ্ভক্তির দ্বারা এবং প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তি লক্ষণযুক্ত ভক্তিযোগ প্রদর্শনের দ্বারা, আত্মতত্ত্ব উপলব্ধির দ্বারা এবং তীব্র বৈরাগ্য জাগ্রত করার দ্বারা আত্ম-উপলব্ধির বিভিন্ন পন্থা হৃদয়ঙ্গম করতে যিনি দক্ষ, তিনি পরমেশ্বর ভগবানকে, জড় জগতে এবং চিৎ-জগতে যেভাবে তাঁর স্বরূপে তিনি প্রকাশিত, সেইভাবে উপলব্ধি করেন।”
হে মাতঃ! আমি আপনাকে ভক্তিযোগের পন্থা এবং চারটি আশ্রমে এর স্বরূপ বর্ণনা করেছি। শাশ্বত কাল যে কিভাবে সকলের কাছে অদৃশ্য থেকে, সমস্ত জীবেদের পশ্চাদ্ধাবন করে, তাও আমি আপনার কাছে বর্ণনা করেছি। অজ্ঞান-জনিত বা আত্ম-বিস্মৃত হয়ে কর্ম করার ফলে, সেই কর্ম অনুসারে জীবের নানা প্রকার জড়-জাগতিক স্থিতি লাভ হয়। হে মাতঃ! কেউ যখন সেই বিস্মৃতিতে প্রবেশ করে, তখন সে বুঝতে পারে না, তার গতি কোথায় শেষ হবে। এই উপদেশ কখনও ঈর্ষালু, অবিনীত অথবা দুরাচারীদের দেওয়া উচিত নয়। এই উপদেশ দাম্ভিক এবং ধর্মধ্বজীদের জন্য নয়। যারা অত্যন্ত লোভী, পারিবারিক জীবনের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত, অভক্ত এবং ভগবান ও ভগবানের ভক্তদের প্রতি বিদ্বেষ-ভাবাপন্ন, তাদের কখনও এই উপদেশ দেওয়া উচিত নয়। যে শ্রদ্ধাপরায়ণ ভক্ত গুরুদেবের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, নির্মৎসর, সমস্ত জীবের প্রতি মৈত্রীভাব সমন্বিত এবং বিশ্বাস ও নিষ্ঠা সহকারে সেবা করতে উৎসুক, তাঁকেই কেবল উপদেশ দেওয়া উচিত। যাঁরা কারও প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ নন, যাঁরা সম্পূর্ণরূপে শুদ্ধ, যাঁরা কৃষ্ণেতর বিষয়ে বিরক্ত এবং যাঁরা পরমেশ্বর ভগবানকে সব চাইতে প্রিয় বলে গ্রহণ করেছেন, গুরুদেব তাঁদেরই এই জ্ঞান দান করবেন। শ্রদ্ধা ও প্রীতি সহকারে যিনি একবার আমার ধ্যান করেন এবং আমার বিষয়ে শ্রবণ ও কীর্তন করেন, নিঃসন্দেহে তিনি তাঁর প্রকৃত আলয় ভগবদ্ধামে ফিরে যাবেন।”

Leave a Reply

July 2025
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  

Blog Stats

  • 140,959 hits