দেবহূতি বললেন- “হে প্রভো! আপনি পূর্বে সাংখ্য দর্শন অনুসারে সম্পূর্ণ প্রকৃতি এবং আত্মার লক্ষণ অত্যন্ত বিজ্ঞান-সম্মতভাবে বর্ণনা করেছেন। এখন আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি যে, আপনি ভক্তির মার্গ আমার কাছে সবিস্তারে বর্ণনা করুন, যা সমস্ত দর্শনের চরম পরিণতি। হে প্রভু! কৃপা করে আমর জন্য এবং জনসাধারণের জন্য, জন্ম-মৃত্যুর নিরন্তর প্রক্রিয়ারও বর্ণনা করুন, কারণ সেই সমস্ত বিপদের কথা শ্রবণ করে, আমরা জড়-জাগতিক কার্য থেকে বিরক্ত হতে পারি। কৃপা করে আপনি শাশ্বত কালেরও বর্ণনা করুন, যা আপনারই স্বরূপের প্রতিনিধিত্ব করে এবং যার প্রভাবে জনসাধরণ পুণ্য কর্মে প্রবৃত্ত হয়। হে ভগবন্! আপনি সূর্যের মতো, কারণ আপনি জীবের অন্ধকারাচ্ছন্ন বদ্ধ জীবনকে আলোকিত করেন। যেহেতু তাদের জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হয়নি, তাই আপনার আশ্রয় ব্যতীত তারা সেই অন্ধকারে তারা চিরনিদ্রিত এবং তাই তারা জড়-জাগতিক কর্মে অনর্থক ব্যস্ত থাকে এবং তাদের অত্যন্ত পরিশ্রান্ত বলে মনে হয়।”
শ্রীমৈত্রেয় বললেন- “হে কুরুশ্রেষ্ঠ! মহামুনি কপিলদেব তাঁর যশস্বী মাতার এই সুন্দর বাক্য শ্রবণ করে অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে, করুণা বিগলিত চিত্তে সেই বাক্যের অভিনন্দন করে তাঁর মাতাকে বলতে লাগলেন, হে মহদাশয়া! অনুষ্ঠানকারীর বিভিন্ন গুণ অনুসারে ভগবদ্ভক্তির অনেক পন্থা রয়েছে। ক্রোধী, ভেদদর্শী, হিংসা, দম্ভ ও মাৎসর্য-পরায়ণ ব্যক্তি আমার প্রতি যে ভক্তি করে, তা তামসিক। যে ব্যক্তি বিষয়, যশ এবং ঐশ্বর্যের উদ্দেশ্যে ভেদদর্শী হয়ে আমার পূজা করে, তার সেই ভক্তি রাজসিক। ভক্ত যখন সকাম কর্মের ফল থেকে মুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে পরমেশ্বর ভগবানের পূজা করে এবং তাঁর কর্মের ফল ভগবানকে নিবেদন করেন, তখন তাঁর ভক্তি সাত্ত্বিক। পরমেশ্বর ভগবানের দিব্য নাম এবং গুণাবলী শ্রবণ করা মাত্রই, সকলের হৃদয়ে নিবাসকারী ভগবানের প্রতি আত্মার যে অহৈতুকী এবং অবিচ্ছিন্ন আকর্ষণের উদয় হয়, তাই হচ্ছে নির্গুণ ভক্তির লক্ষণ। গঙ্গার জল যেমন স্বাভাবিকভাবে সমুদ্রের প্রতি প্রবাহিত হয়, এই প্রকার ভগবদ্ভক্তের স্বাভাবিক ভক্তিও ঠিক তেমনভাবে ভগবানের প্রতি প্রবাহিত হয়। শুদ্ধ ভক্ত সালোক্য, সার্ষ্টি, সামীপ্য, সারূপ্য অথবা একত্ব- এই সমস্ত মুক্তির কোনটি গ্রহণ করেন না, এমন কি ভগবান সেইগুলি তাঁদের দান করলেও তাঁরা তা গ্রহণ করেন না। যা আমি পূর্বে বর্ণনা করেছি, সেই ভগবদ্ভক্তির সর্বোচ্চ স্তর লাভ করে, ভক্ত প্রকৃতির তিন গুণের প্রভাব অতিক্রম করতে পারেন এবং ভগবানের চিন্ময় ভাব প্রাপ্ত হতে পারেন।”
“ভক্তের কর্তব্য কোন রকম জড়-জাগতিক লাভের প্রত্যাশা বিনা, স্বধর্ম আচরণ করা, যা অত্যন্ত মহিমামন্ডিত। অত্যধিক হিংসা না করে, নিয়মিতভাবে ভক্তির কার্য সম্পাদন করা উচিত। ভক্তের নিয়মিতভাবে মন্দিরে আমার শ্রীবিগ্রহ দর্শন করা, আমার শ্রীপাদপদ্ম স্পর্শ করা এবং আমার উদ্দেশ্যে পূজার উপচার এবং প্রার্থনা নিবেদন করা উচিত। তাঁর উচিত সত্ত্বগুণে নিষ্কাম চিত্তে, প্রতিটি জীবকে চিন্ময় ভাব-সমন্বিত বলে দর্শন করা। শুদ্ধ ভক্তের উচিত গুরুদেব এবং আচার্যদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদান করে ভগবদ্ভক্তি সম্পাদন করা। দীনজনদের প্রতি তাঁর কৃপা প্রদর্শন করা উচিত এবং সমতুল্য ব্যক্তিদের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করা উচিত, কিন্তু তাঁর সমস্ত কার্যকলাপ ইন্দ্রিয় সংযম এবং বিধি- নিষেধ অনুসরণ করার দ্বারা সম্পাদন করা উচিত। ভক্তের কর্তব্য হচ্ছে সর্বদাই আধ্যাত্মিক বিষয় শ্রবণ করা এবং সর্বদাই ভগবানের দিব্য নাম সংকীর্তন করে তাঁর সময়ের সদ্ব্যবহার করা। তাঁর আচরণ সর্বদাই সরল হওয়া উচিত এবং যদিও তিনি কারও প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ নন এবং সকলের প্রতিই বন্ধুভাবাপন্ন, তবুও যারা আধ্যাত্মিক বিচারে উন্নত নয়, তাদের সঙ্গ তাঁর বর্জন করা উচিত। কেউ যখন এই সমস্ত দিব্য গুণাবলীর দ্বারা সম্পূর্ণরূপে গুণান্বিত হন এবং তার ফলে তাঁর চেতনা পূর্ণরূপে শুদ্ধ হয়, তিনি তৎক্ষণাৎ আমার নাম এবং আমার দিব্য গুণাবলী শ্রবণ করা মাত্রই, আমার প্রতি আকৃষ্ট হন। বায়ুরূপ রথ যেমন গন্ধকে তার উৎপত্তি স্থান থেকে বহন করে ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে পৌছে দেয়, তেমনই যিনি নিরন্তর কৃষ্ণভাবনায় ভাবিত হয়ে ভক্তিযোগে যুক্ত, তিনি সর্ব ব্যাপ্ত পরমাত্মাকে প্রাপ্ত হন।”
“পরমাত্মারূপে আমি প্রতিটি জীবে বিরাজমান। কেউ যদি সর্বত্র বিরাজমান সেই পরমাত্মাকে অবমাননা করে মন্দিরে শ্রীবিগ্রহের সেবায় যুক্ত হয়, তা হলে তা কেবল বিড়ম্বনা মাত্র। যে ব্যক্তি মন্দিরে ভগবানের বিগ্রহের পূজা করে, কিন্তু জানে না যে, পরমেশ্বর ভগবান পরমাত্মারূপে সমস্ত জীবের হৃদয়ে বিরাজমান, সে অবশ্যই অজ্ঞানাচ্ছন্ন এবং তার সেই পূজা ভস্মে ঘি ঢালার মতোই অর্থহীন। যে ব্যক্তি আমাকে শ্রব্ধা নিবেদন করে কিন্তু অন্য জীবেদের প্রতি হিংসাপরায়ণ, সেই ভেদদর্শী ব্যক্তি অন্য জীবেদের প্রতি শত্রুতামূলক আচরণ করার ফলে, কখনও মনে শান্তি লাভ করতে পারে না।”
“হে মাতঃ! যারা সমস্ত জীবের অন্তরে আমার উপস্থিতি সম্বন্ধে অজ্ঞ, তারা যদি যথাযথভাবে অনুষ্ঠানের দ্বারা মন্দিরে আমার বিগ্রহের পূজাও করে, সেই পূজায় আমি প্রসন্ন হই না। যতক্ষণ পর্যন্ত না নিজের হৃদয়ে এবং অন্য সমস্ত জীবের হৃদয়ে আমার উপস্থিতি উপলব্দ হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত কর্তব্য কর্ম সম্পাদন করে, অর্চা-বিগ্রহের পূজা করে যাওয়া উচিত। যে ব্যক্তি নিজের ও অন্যের মধ্যে অণুমাত্রও ভিন্ন দর্শন করে, মৃত্যুর প্রজ্বলিত অগ্নিরূপে আমি তার মহা ভয় উৎপন্ন করি। অতএব, দান, সম্মান, এবং মৈত্রীপূর্ণ আচরণের দ্বারা সমস্ত জীবকে সম দৃষ্টিতে দর্শন করে, সমস্ত জীবের আত্মার স্বরূপে বিরাজমান আমার পূজা করা উচিত।”
“হে কল্যাণী মাতা! অচেতন পদার্থ থেকে জীব শ্রেষ্ঠ এবং তাদের মধ্যে যারা জীবনের লক্ষণ প্রকাশ করে তারা শ্রেষ্ঠ। তাদের থেকে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে যাদের চেতনা বিকশিত হয়েছে এবং তাদের থেকেও শ্রেষ্ঠ হচ্ছে যাদের ইন্দ্রিয়ানুভূতি বিকশিত হয়েছে। যে সমস্ত জীবের ইন্দ্রিয়ানুভূতি বিকশিত হয়েছে, তাদের মধ্যে যারা রস আস্বাদন করতে পারে, তারা স্পর্শানুভূতি বিকশিত হয়েছে যে-সমস্ত জীব তাদের থেকে শ্রেষ্ঠ। রস আস্বাদন করতে পারে যে-সমস্ত জীব, তাদের থেকে ঘ্রাণ গ্রহণ করতে পারে যে-সমস্ত জীব তারা শ্রেষ্ঠ এবং তাদের থেকেও শ্রেষ্ঠ হচ্ছে যাদের শ্রবণেন্দ্রিয় বিকশিত হয়েছে। শ্রবণক্ষম প্রাণীদের থেকে রূপের পার্থক্য নিরূপণ করতে সক্ষম জীবেরা শ্রেষ্ঠ। তাদের থেকে দুই পঙ্ক্তি দন্ত-বিশিষ্ট প্রাণীরা শ্রেষ্ঠ এবং তাদের থেকেও শ্রেষ্ঠ হচ্ছে বহু পদ-বিশিষ্ট প্রাণী। তাদের থেকে শ্রেষ্ঠ চতুষ্পদ এবং তাদের থেকেও শ্রেষ্ঠ হচ্ছে দ্বিপদ-বিশিষ্ট মানুষ। মানুষদের মধ্যে যে-সমাজ গুণ এবং কর্ম অনুসারে চতুর্বণে বিভক্ত হয়েছে তা শ্রেষ্ঠ, চতুর্বর্ণের মধ্যে ব্রাহ্মাণ নামক বুদ্ধিমান মানুষেরা সর্বোত্তম। ব্রাহ্মণদের মধ্যে যাঁরা বেদ অধ্যয়ন করেছেন তাঁরা শ্রেষ্ঠ এবং বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণদের মধ্যে যাঁরা বেদের তাৎপর্য সম্বন্ধে অবগত তাঁরা সর্বোত্তম। বেদ তাৎপর্যবিৎ ব্রাহ্মণ থেকে মীমাংসক ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ এবং তাঁর থেকেও শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন স্বধর্মরত ব্রাহ্মণ। স্বধর্মরত ব্রাহ্মণ থেকে মুক্তসঙ্গ ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ এবং তাঁর থেকেও শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন শুদ্ধ ভক্ত, যিনি কোন ফলের প্রত্যাশা না করে ভগবদ্ভক্তি সম্পাদন করেন। অতএব আমাকে ছাড়া অন্য আর কোন কিছুতে যে-ব্যক্তির আকর্ষণ নেই এবং তাই যিনি তাঁর সমস্ত কর্ম, তাঁর জীবন- তাঁর সবকিছু- আমাকে নিবেদন করে, অব্যবহিতভাবে আমার শরণাগত হয়েছেন, সেই প্রকার কর্তৃত্বাভিমানশূণ্য, সমদর্শী পুরুষ থেকে কোন জীবকেই আমি শ্রেষ্ঠ দেখতে পাই না। এই প্রকার আদর্শ ভক্ত সমস্ত জীবেদের শ্রদ্ধা নিবেদন করেন, কারণ তিনি দৃঢ় বিশ্বাস সহকারে জানেন যে, পরমেশ্বর ভগবান পরমাত্মা বা নিয়ন্তারূপে প্রতিটি জীবের শরীরে প্রবেশ করেছেন।”
“হে মাতঃ! হে মনুকন্যা! যে ভক্ত এইভাবে ভগবদ্ভক্তি এবং অষ্টাঙ্গ যোগের সাধন করেন, তিনি কেবল ভক্তির দ্বারাই পরমেশ্বর ভগবানের পরম ধাম প্রাপ্ত হতে পারেন। এই পুরুষ, যাঁকে প্রাপ্ত হওয়া জীবের অবশ্য কর্তব্য, তিনি হচ্ছেন ব্রহ্ম এবং পরমাত্মারূপে পরিচিত পরমেশ্বর ভগবানের রূপ। তিনি প্রধান দিব্য পুরুষ এবং তাঁর সমস্ত কার্যকলাপ সর্বোতোভাবে চিন্ময়। বিভিন্ন জড় প্রকাশের রূপান্তর সাধনকারী কাল হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের আর একটি রূপ। যারা জানে না যে, কাল হচ্ছে সেই একই ভগবান, তারা কালের ভয়ে ভীত হয়। সমস্ত যজ্ঞের ভোক্তা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণু হচ্ছেন কাল এবং সমস্তু প্রভুর প্রভু। তিনি সকলের হৃদয়ে প্রবেশ করেন, তিনি সকলের আশ্রয় এবং জীবেদের দ্বারা অন্য সমস্ত জীবেদের সংহার করেন। কেউই পরমেশ্বর ভগবানের প্রিয় নয় অথবা অপ্রিয় নয়। কেউই তাঁর বন্ধু নয় অথবা শত্রু নয়। কিন্তু যাঁরা তাঁকে ভুলে যাননি, তিনি তাঁদের অনুপ্রেরণা প্রদান করেন এবং যারা তাঁকে ভুলে গেছে, তিনি তাদের সংহার করেন। পরমেশ্বর ভগবানের ভয়ে বায়ু প্রবাহিত হয়, সূর্য কিরণ বিতরণ করে, ইন্দ্র বাড়ি বর্ষণ করে এবং নক্ষত্রসমূহ দীপ্তি প্রকাশ করে। পরমেশ্বর ভগবানের ভয়ে বৃক্ষ, লতা, ওষধি এবং মরসুমি গাছেরা আপন আপন সময়ে ফুল এবং ফল ধারণ করে। পরমেশ্বর ভগবানের ভয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হয় এবং সমুদ্র বেলা-ভূমি অতিক্রম করে প্লাবিত হয় না। তাঁরই ভয়ে অগ্নি প্রজ্বলিত হয় এবং পর্বত সহ পৃথিবী ব্রহ্মান্ডের জলে নিমজ্জিত হয় না। পরমেশ্বর ভগবানের নিয়ন্ত্রণে আকাশ অন্তরীক্ষে বিভিন্ন গ্রহদের স্থান প্রদান করে, যেখানে অসংখ্য প্রাণী বাস করে। তাঁর পরম নিয়ন্ত্রণে সমগ্র ব্রহ্মান্ডের বিরাট শরীর সপ্ত আবরণ সহ বিস্তৃত হয়। পরমেশ্বর ভগবানের ভয়ে জড়া প্রকৃতির গুণের নিয়ন্তা দেবতাগণ সৃষ্টি, পালন এবং সংহার কার্য সম্পাদন করেন। এই জড় জগতের স্থাবর এবং জঙ্গম সব কিছুই তাঁদের নিয়ন্ত্রণাধীন। কাল অনাদি এবং অনন্ত। তা কারাগার-সদৃশ এই জড় জগতের স্রষ্টা পরমেশ্বর ভগবানের প্রতিনিধি। কাল এই জগতের অন্তক। তা এক ব্যক্তির দ্বারা অন্য ব্যক্তির জন্ম দেওয়ার মাধ্যমে যেমন সৃষ্টিকার্য সম্পাদন করে, আবার তেমনই মৃত্যুর দেবতা যমরাজেরও বিনাশ সাধন করে ব্রহ্মান্ডের প্রলয় সম্পাদন করে।”
ঊনত্রিংশতি অধ্যায়- ভগবান কপিলদেব কর্তৃক ভগবদ্ভক্তির ব্যাখ্যা
08 Jul 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, তৃতীয় স্কন্ধ- সৃষ্টির স্থিতি