পরমেশ্বর ভগবান বললেন- “হে মাতঃ! হে রাজপুত্রী! এখন আমি আপনার কাছে যোগের লক্ষণ বর্ণনা করব, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে মনকে একাগ্র করা। এই পন্থা অনুশীলনের ফলে, মানুষ প্রসন্ন হতে পারে এবং পরম সত্যের পথে অগ্রসর হতে পারে। মানুষের যথাসাধ্য স্বধর্ম আচরণ করা উচিত এবং বিধর্ম আচরণ পরিত্যাগ করা উচিত। ভগবানের কৃপায় তিনি যা প্রাপ্ত হন, তা নিয়ে তার সন্তুষ্ট থাকা উচিত এবং শ্রীগুরুবেদের শ্রীপাদপদ্মের আরাধনা করা উচিত। মানুষের কর্তব্য হচ্ছে প্রচলিত প্রথা অনুসারে তথাকথিত যে-ধর্ম আচরণ হয়, সেই সমস্ত গ্রাম্য ধর্ম পরিত্যাগ করে, মুক্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যায় যে-মোক্ষ ধর্ম, তার প্রতি আকৃষ্ট হওয়া। মিতাহারী হয়ে সর্বদা নির্জন স্থানে বাস করা উচিত, যাতে জীবনে চরম সিদ্ধি লাভ করা যায়। মানুষের উচিত অহিংসা এবং সততা অনুশীলন করা, চৌর্যবৃত্তি থেকে বিরত থাকা এবং জীবন ধারণের জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই সংগ্রহ করা। তাঁর উচিত ব্রহ্মচর্য পালন করা, তপস্যা অনুষ্ঠান করা, পরিষ্কার থাকা, বেদ-অধ্যয়ন করা এবং পরমেশ্বর ভগবানের আরাধনা করা। মৌন অবলম্বন করা, বিভিন্ন প্রকার যোগ আসন অভ্যাসের দ্বারা স্থৈর্য লাভ করা, প্রাণবায়ু নিয়ন্ত্রণ করা, ইন্দ্রিয়গুলিকে বিষয় থেকে প্রত্যাহার করা এবং এইভবাবে মনকে হৃদয়ে একাগ্র করা যোগীর পক্ষে অবশ্য কর্তব্য। প্রাণবায়ু এবং মনকে দেহাভ্যন্তরে প্রাণের ছয়টি চক্রের কোন একটিতে ধারণ করে, মনকে পরমেশ্বর ভগবানের অপ্রাকৃত লীলায় ধ্যানস্থ করার নামই হচ্ছে সমাধি বা মনের সমাধান। এই পন্থার দ্বারা অথবা অন্য কোন সঠিক পন্থার দ্বারা কলুষিত এবং জড় সুখভোগের প্রতি সর্বদাই আকৃষ্ট অসংযত মনকে নিয়ন্ত্রিত করা অবশ্য কর্তব্য। এইভাবে নিজেকে পরমেশ্বর ভগবানের চিন্তায় স্থির করতে হয়। মন সংযত করে জিতাসন হয়ে, নির্জন এবং পবিত্র স্থানে আসন বিছিয়ে সহজ মুদ্রায় উপবিষ্ট হয়ে, দেহ ঋজু রেখে প্রাণায়াম অভ্যাস করতে হয়। যোগীর কর্তব্য অত্যন্ত গভীরভাবে শ্বাস গ্রহণ করা, তার পর সেই ম্বাস ধারণ করা এবং অবশেষে শ্বাস ত্যাগ করা। অথবা, বিপরীতক্রমে, প্রথমে শ্বাস ত্যাগ করা, তার পর শ্বাস বাইরে ধারণ করা এবং অবশেষে শ্বাস গ্রহণ করা। এইভাবে প্রাণবায়ুর পথ শোধন করতে হয়। তা করা হয় যাতে মন অচঞ্চল হয়ে স্থির হতে পারে। অগ্নি এবং বায়ুর দ্বারা সন্তপ্ত হলে, স্বর্ণ যেমন সমস্ত মল থেকে মুক্ত হয়, যোগীও তেমন প্রাণায়াম অভ্যাস করার ফলে অচিরেই সমস্ত মানসিক উপদ্রব থেকে মুক্ত হন। প্রাণায়ামের দ্বারা সমস্ত শারীরিক দোষ সম্পূর্ণরূপে দূর হয় এবং ধারণার দ্বারা সমস্ত পাপকর্ম থেকে মুক্ত হওয়া যায়। প্রত্যাহারের দ্বারা বিষয় সংসর্গজনিত দোষ থেকে মুক্ত হওয়া যায় এবং পরমেশ্বর ভগবানের ধ্যানের দ্বারা জড় জগতের আসক্তিজনিত তিন গুণের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া যায়। যোগ অভ্যাসের দ্বারা মন যখন সম্পূর্ণরূপে শুদ্ধ হয়, তখন অর্ধ নিমীলিত নেত্রে স্বীয় নাসিকার অগ্রভাগে দৃষ্টিপাত করে, পরমেশ্বর ভগবানের রূপের ধ্যান করতে হয়।”
“পরমেশ্বর ভগবানের মুখপদ্ম সুপ্রসন্ন, নয়ন পদ্মগর্ভের মতো অরুণ বর্ণ, অঙ্গ নীল উৎপল দলের মতো শ্যাম বর্ণ। তার তিন হাতে তিনি শঙ্খ, চক্র, এবং গদা ধারণ করে রয়েছেন। তাঁর কটিদেশ পদ্ম-কেশরের মতো পীত উজ্জ্বল পট্টবস্ত্রে আচ্ছাদিত। তাঁর বক্ষস্থলে শ্রীবৎস চিহ্ন। তাঁর কন্ঠে দীপ্তিশালী কৌস্তভ মণি বিরাজিত। তাঁর গলদেশে বনমালা বিলম্বিত রয়েছে এবং মধুর গন্ধে মত্ত ভ্রমরেরা মালার চারিপাশে গুঞ্জন করছে। তিনি বহু মূল্য মুক্তাহার, কিরীট, অঙ্গদ এবং নূপুরের দ্বারা অত্যন্ত সুন্দরভাবে সজ্জিত। তাঁর কটিদেশে কাঞ্চিদাম, তিনি তাঁর ভক্তের হৃদয়-কমলে দন্ডায়মান। তাঁর মতো সুন্দর দর্শনীয় বস্তু আর কিছু নেই এবং তাঁর প্রশান্ত বিগ্রহ তাঁর ভক্ত-দর্শকের মন এবং নয়নের আনন্দ বর্ধন করে। ভগবান অত্যন্ত সুন্দর-দর্শন এবং তিনি সর্বলোকের আরাধ্য। তিনি নিত্য নবকিশোর এবং সর্বদাই তাঁর ভক্তদের প্রতি কৃপা বিতরণে উৎসুক। ভগবানের মহিমা সর্বদাই কীর্তন করার যোগ্য, কারণ তাঁর মহিমা তাঁর ভক্তদের মহিমা বর্ধন করে। তাই ভগবান এবং তাঁর ভক্তের ধ্যান করা উচিত। মন যতক্ষণ না স্থির হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত ভগবানের শাশ^ত রূপের ধ্যান করা উচিত। এইভাবে ভগবদ্ভক্তিতে নিরন্তর মগ্ন হয়ে, যোগী তাঁর হৃদয়ে ভগবানকে দন্ডায়মান, গমনশীল, উপবিষ্ট অথবা শায়িত অবস্থায় দর্শন করেন, কারণ পরমেশ্বর ভগবানের লীলাসমূহ সর্বদাই অত্যন্ত সুন্দর এবং আকর্ষণীয়। তাঁর মনকে ভগবানের শাশ্বত রূপে নিবদ্ধ করে, যোগী ভগবানের পূর্ণ অবয়বের সম্যক্ দর্শন না করে, এক-একটি অঙ্গে মনকে স্থির করবেন। ভক্তের কর্তব্য হচ্ছে প্রথমে ধ্বজ, বজ্র, অঙ্কুশ এবং পদ্ম চিহ্নিত ভগবানের চরণ-কমলের ধ্যান করা। সেই চরণ-কমলের অত্যন্ত সুন্দর রক্তবর্ণে শোভমান নখরূপ চন্দ্রমন্ডলের কিরণচ্ছটায় হৃদয়ের ঘন অন্ধকার দূরীভূত হয়। ভগবানের চরণ-কমল প্রক্ষালিত জল থেকে উৎপন্ন গঙ্গার পবিত্র জল মস্তকে ধারণ করে, শিবও মঙ্গলময় হয়েছেন। ভগবানের শ্রীপাদপদ্ম প্রক্ষিপ্ত বজ্রের মতো, যা ধ্যানকারীর মনে সঞ্চিত পর্বত-সদৃশ পাপসমূহ ধ্বংস করে, অতএব দীর্ঘ কাল যাবৎ ভগবানের চরণারবিন্দের ধ্যান করা উচিত।”
“যোগীদের কর্তব্য সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী লক্ষ্মীদেবীর কার্যকলাপ হৃদয়ে ধ্যান করা, যিনি সমস্ত দেবতাদের দ্বারা পূজিতা এবং সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার জননী। তিনি সর্বদা সচ্চিদানন্দঘন ভগবানের পা এবং জঙঘা তাঁর করপল্লবের দ্বারা অত্যন্ত যত্ন সহকারে সেবা করে থাকেন। তার পর যোগী পরমেশ্বর ভগবানের ঊরুদ্বয়ের ধ্যান করবেন, যা সমস্ত শক্তির আধার। তাঁর ঊরুদ্বয় অতসী পুষ্পের মতো শুভ্র-শ্যামল এবং ভগবান যখন গরুড়ের স্কন্ধে বাহিত হন, তখন তা সব চাইতে সুন্দর বলে প্রতিভাত হয়। তার পর যোগী গুল্ফদেশ পর্যন্ত লম্বিত পীত বসনোপরি কাঞ্চিদাম-বেষ্টিত ভগবানের সুডোল নিতম্বদেশের ধ্যান করবেন। তারপর যোগী ভগবানের উদরের মধ্যভাগে নাভি-সরোবরের ধ্যান করবেন। সেই নাভি থেকে ভূবনসমূহের অধিষ্ঠান-স্বরূপ একটি পদ্ম প্রাদর্ভূত হয়েছিল। সেই পদ্ম হচ্ছে প্রথম সৃষ্ট জীব ব্রহ্মার আবাসস্থল। তার পর যোগী ভগবানের স্তনদ্বয়ের ধ্যান করবেন, যা উৎকৃষ্ট মরকত মণির দ্বারা অলঙ্কৃত এবং যা তাঁর বক্ষের দুগ্ধধবল মুক্তামালার কিরণের প্রভাবে শ্বেতাভ বলে প্রতীত হয়। তার পর যোগীর কর্তব্য মহালক্ষ্মীর আবাসস্থল পরমেশ্বর ভগবানের বক্ষের ধ্যান করা। ভগবানের বক্ষ মনের সমস্ত দিব্য আনন্দের উৎস এবং নয়নের পূর্ণ সন্তোষ প্রদানকারী। তার পর যোগী সমগ্র বিশ্বের দ্বারা পূজিত ভগবানের কন্ঠদেশ হৃদয়ে ধ্যান করবেন। ভগবানের কন্ঠ তাঁর বক্ষঃস্থলে দোদুল্যমান কৌস্তুভ মণির সৌন্দর্য বর্ধন করে। তার পর যোগীর ভগবানের চারটি বাহুর ধ্যান করা উচিত, যা জড়া প্রকৃতির বিভিন্ন কার্যের নিয়ন্ত্রণকারী দেবতাদের সমস্ত শক্তির উৎস। তার পর মন্দার পর্বতের ঘূর্ণনের ফলে উজ্জ্বল তাঁর হাতের অলঙ্কারগুলির ধ্যান করা উচিত। তাঁর হস্তধৃত সহস্র অর সমন্বিত এবং দুঃসহ তেজসম্পন্ন সুদর্শন চক্রের ধ্যান করা উচিত এবং তাঁর কমল-সদৃশ হস্তে রাজহংসের মতো প্রতীয়মান শঙ্খেরও ধ্যান করা উচিত। ভগবানের অতি প্রিয় কৌমোদকী গদার ধ্যান করা উচিত। এই গদা বৈরী-ভাবাপন্ন অসুরদের সংহার করার ফলে, তাদের শোণিতপঙ্কে সিক্ত। গুঞ্জনরত মধুকরকুলের দ্বারা সর্বদা পরিবেষ্টিত তাঁর অতি সুন্দর বনমালার এবং সর্বদা ভগবানের সেবায় যুক্ত বিশুদ্ধ জীবতত্ত্ব-স্বরূপ তাঁর গলার মুক্তাহারেরও ধ্যান করা উচিত। তার পর যোগী ভগবানের কমল-সদৃশ মুখমন্ডলের ধ্যান করবেন, যিনি তাঁর উৎসুক ভক্তদের অনুকম্পা করার জন্য তাঁর বিভিন্ন রূপ এই জগতে প্রকট করেন। তাঁর সুকোমল গন্ডস্থল দীপ্তিমান মকর কুন্ডলের সঞ্চালনে উজ্জ্বল এবং তাঁর উন্নত নাসিকা তাঁর মুখ-কমলকে এক অপূর্ব শোভায় উদ্ভাসিত করেছে। যোগী তার পর ভগবানের সুন্দর মুখমন্ডলের ধ্যান করবেন, যা কুঞ্চিত কেশদাম, পদ্ম-সদৃশ নয়ন এবং নৃত্যপর ভ্রূযুগলের দ্বারা শোভিত। তাঁর মুখকমল মধুকর পরিবেষ্টিত পদ্মফুলকে লজ্জা দেয় এবং তাঁর নেত্রদ্বয় তাদের শোভার দ্বারা সন্তরণশীল মীনযুগলকে লজ্জা দেয়। যোগীর কর্তব্য পূর্ণ ভক্তি সহকারে ভগবানের অনুকম্পাপূর্ণ চক্ষুর অবলোকন একাগ্রচিত্তে ধ্যান করা, কারণ তা তাঁর ভক্তদের ভয়ঙ্কর ত্রিতাপ দুঃখ থেকে মুক্ত করে। তাঁর সুস্নিগ্ধ হাস্যযুক্ত দৃষ্টিপাত তাঁর অন্তহীন কৃপায় পূর্ণ। যোগীর এইভাবে ভগবান শ্রীহরির অত্যন্ত মনোরম হাস্যের ধ্যান করা উচিত, যা তাঁর শরণাগতের গভীর শোক থেকে উৎপন্ন অশ্রুর সমুদ্র শোষণ করে। যোগীর ভগবানের বঙ্কিম ভ্রূযুগলেরও ধ্যন করা উচিত, যা সাধুদের উপকারার্থে কামদেবকে মোহিত করার জন্য তিনি তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তি থেকে প্রকট করেছেন। যোগীর কর্তব্য প্রেমাপ্লুত ভক্তি সহকারে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর মধুর হাস্য তাঁর হৃদয়ের অন্তঃস্থলে ধ্যান করা। বিষ্ণুর এই হাস্য এতই মনোরম যে, তা অনায়াসে ধ্যান করা যায়। পরমেশ্বর ভগবান যখন হাসেন, তখন কুন্দকলির পঙ্ক্তির মতো তাঁর ক্ষুদ্র দন্তরাজি তাঁর অধরৌষ্ঠের কান্তিরে অরুণাভ হয়ে ওঠে। যোগী যখন একবার তাঁর মনকে ভগবানের একই মধুর হাস্যে স্থির করেন, তখন আর তাঁর অন্য কিছু দর্শন করার বাসনা থাকে না। এই পন্থা অনুসরণের দ্বারা যোগীর চিত্তে ভগবান শ্রীহরির প্রতি ধীরে ধীরে ভাবের উদয় হয়। তখন আনন্দের আতিশয্যে তাঁর দেহে রোমাঞ্চ হয় এবং তাঁর চিত্ত ভক্তিরসে দ্রবীভূত হয়, তিনি তখন গভীর প্রেমে নিরন্তর আনন্দ অশ্রুতে অবগাহন করেন। বড়শির দ্বারা মাছকে আকর্ষণ করার মতো তাঁর চিত্ত, যা ভগবানকে আকর্ষণ করার জন্য ব্যবহৃত হয়, তা ধীরে ধীরে জড়-জাগতিক কার্যকলাপ থেকে মুক্ত হয়ে যায়।”
“মন যখন এইভাবে সমস্ত জড় কলুষ থেকে মুক্ত হয় এবং জড় বিষয় থেকে বিরুক্ত হয়, তখন দীপশিখা যেমন তৈলের অভাবে নির্বাপিত হয়ে যায়, তেমনই মনও ইন্দ্রিয়সমূহের বিষয় গ্রহণের প্রবাহ থেকে প্রতিনিবৃত্ত হয় এবং ব্যবধান-রহিত হয়ে পরমেশ্বর ভগবানকে প্রত্যক্ষ করে। এইভাবে সর্বোচ্চ চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত হওয়ার ফলে, মন সমস্ত কর্মফল থেকে নিবৃত্ত হয়ে, সমস্ত জড় সুখ এবং দুঃখের ধারণার অতীত স্বীয় মহিমায় অবস্থিত হয়। যোগী তখন পরমেশ্বর ভগবানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক উপলব্ধি করেন। তিনি তখন বুঝতে পারেন যে, সুখ-দুঃখ এবং তাদের প্রতিক্রিয়া, যেগুলির কারণ তিনি স্বয়ং বলে মনে করেছিলেন, প্রকৃতপক্ষে তা অবিদ্যাজনিত অহঙ্কারের ফল। যেহেতু তিনি তাঁর স্বরূপ উপলব্ধি করেছেন, পূর্ণরূপে সিদ্ধ জীবের তাই আর তখন বোধ থাকে না, তাঁর জড় দেহটি কিভাবে চলাফেরা করছে এবং কার্য করছে, ঠিক যেমন মদ্য পানে উন্মত্ত ব্যক্তি বুঝতে পারে না, তার শরীরে বসন আছে কি নেই। এই প্রকার মুক্ত যোগীর ইন্দ্রিয় সহ শরীরের দায়িত্ব পরমেশ্বর ভগবান স্বয়ং গ্রহণ করেন এবং সেই দেহ আরব্ধ কর্মের সমাপ্তি পর্যন্ত কার্য করে। স্বরূপে জাগ্রত মুক্ত ভক্ত এইভাবে যোগের চরম সিদ্ধ অবস্থা সমাধিতে অবস্থিত হয়ে, সেই দেহকে এবং দেহ সম্পর্কিত পুত্র-কলত্রাদিকে আর ভজনা করেন না। এইভাবে তিনি তাঁর দেহের কার্যকলাপকে স্বপ্নদৃষ্ট কার্যকলাপ বলে মনে করেন। পরিবার এবং সম্পত্তির প্রতি অত্যধিক স্নেহের ফলে, মানুষ যেমন তার পুত্র এবং তার বিত্তকে নিজের বলে মনে করে, এবং তার জড় শরীরের প্রতি আসক্তির ফলে, তার এই প্রকার মমত্ব বোধ হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মানুষ বুঝতে পারে যে, তার পরিবার এবং তার বিত্ত তার থেকে ভিন্ন, তেমনই মুক্ত জীব বুঝতে পারে যে, তার দেহ তার থেকে ভিন্ন। জ্বলন্ত অগ্নি যেমন অগ্নিশিখা থেকে, স্ফুলিঙ্গ থেকে এবং ধূম থেকে ভিন্ন, যদিও তারা সকলেই জ্বলন্ত কাষ্ঠ থেকে উদ্ভূত হওয়ার ফলে, পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। পরমেশ্বর ভগবান, যিনি পরমব্রহ্ম নামে পরিচিত, তিনি হচ্ছেন দ্রষ্টা। তিনি পঞ্চ মহাভূত ইন্দ্রিয় এবং চেতনা সংযুক্ত জীবাত্মা বা ব্যষ্টি জীব থেকে ভিন্ন। যোগীর কর্তব্য সমস্ত প্রকাশে সেই একই আত্মাকে দর্শন করা, কারণ যা কিছু বিদ্যমান তা সবই পরমেশ্বর ভগবানের বিভিন্ন শক্তির প্রকাশ। এইভাবে ভক্তের কর্তব্য ভেদভাব-রহিত হয়ে সমস্ত জীবেদের দর্শন করা। সেইটি হচ্ছে পরমাত্মা উপলব্ধি। অগ্নি যেমন বিভিন্ন প্রকার কাষ্ঠে বিভিন্ন রূপে প্রতিভাত হয়, তেমনই জড়া প্রকৃতির গুণের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে শুদ্ধ জীবাত্মা বিভিন্ন দেহে প্রকট হয়। এইভাবে মায়ার দুরত্যয়া মোহময়ী প্রভাব জয় করে, যোগী তাঁর স্বরূপে স্থিত হতে পারেন। এই মায়া জড় সৃষ্টির কার্য এবং কারণরূপে উপস্থিত, তাই তাকে জানা অত্যন্ত কঠিন।”
অষ্টবিংশতি অধ্যায়- ভগবদ্ভক্তি সম্পাদন সম্বন্ধে কপিলদেবের উপদেশ
07 Jul 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, তৃতীয় স্কন্ধ- সৃষ্টির স্থিতি