ভগবান কপিলদেব বলতে লাগলেন- “বিকার-রহিত এবং কর্তৃত্বাভিমানশূন্য হওয়ার ফলে, জীব যখন এইভাবে জড়া প্রকৃতির গুণের দ্বারা অপ্রভাবিত থাকে, তখন জড় দেহে অবস্থান করলেও সে গুণের প্রতিক্রিয়া থেকে মুক্ত থাকে, ঠিক যেমন সূর্য তার জলের প্রতিবিম্ব থেকে স্বতন্ত্রভাবে অবস্থান করে। আত্মা যখন জড়া প্রকৃতির মোহ এবং অহঙ্কারের দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে, তার দেহকে তার স্বরূপ বলে মনে করে, তখন সে জড়-জাগতিক কার্যকলাপে মগ্ন হয় এবং অহঙ্কারের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, সে নিজেকে সব কিছুরই কর্তা বলে মনে করে। এইভাবে বদ্ধ জীব প্রকৃতির গুণের সঙ্গ প্রভাবে, উচ্চ এবং নীচ বিভিন্ন যোনিতে দেহান্তরিত হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত না সে জড়-জাগতিক কার্যকলাপ থেকে মুক্ত হয়, ততক্ষণ তাকে তার কর্মদোষে এই অবস্থা স্বীকার করতে হয়। প্রকৃতপক্ষে জীব জড়া অস্তিত্বের অতীত, কিন্তু জড়া প্রকৃতির উপর আধিপত্য করার মনোভাবের ফলে, তাঁর ভববন্ধনের নিবৃত্তি হয় না এবং সে স্বপ্নবৎ নানা রকম অনর্থের দ্বারা প্রভাবিত হয়। প্রতিটি বদ্ধ জীবের কর্তব্য হচ্ছে জড় সুখভোগের প্রতি আসক্ত তার কলুষিত চেতনাকে বৈরাগ্য সহকারে অত্যন্ত একান্তিকভাবে ভগবানের সেবায় যুক্ত করা। তার ফলে তার মন এবং চেতনা পূর্ণরূপে বশীভূত হবে। যম আদি যোগের বিভিন্ন পন্থার অনুশীলনের দ্বারা শ্রদ্ধাবান হওয়া এবং আমার কথা শ্রবণ এবং কীর্তনের দ্বারা শ্রদ্ধ ভক্তির স্তরে উন্নীত হওয়া অবশ্য কর্তব্য।”
“ভগবদ্ভক্তি সম্পাদন করতে হলে, সমস্ত জীবের প্রতি সমভাবাপন্ন হতে হয়, কারও প্রতি বৈরীভাব পোষ করতে নেই, কারও সঙ্গে আবার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও রাখতে নেই। ব্রহ্মচর্য পালন করতে হয়, মৌনব্রত অবলম্বন করতে হয় এবং পরমেশ্বর ভগবানকে সমস্ত কর্মের ফল নিবেদন করে স্বধর্ম অনুষ্ঠান করতে হয়। ভক্তের উচিত অনায়াসে যা উপার্জন করা যায় তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা। তাঁর প্রয়োজনের অতিরিক্ত আহার করা উচিত নয়। তাঁর নির্জন স্থানে বাস করা উচিত এবং সর্বদাই চিন্তাশীল, শান্ত, মৈত্রীপূর্ণ, দয়ালু এবং আত্ম-তত্ত¡জ্ঞ হওয়া উচিত। মানুষের কর্তব্য হচ্ছে চেতন এবং জড়ের জ্ঞানের দ্বারা দর্শন-শক্তি বৃদ্ধি করা। অনর্থক জড় দেহটিকে স্বরূপ বলে মনে করা উচিত নয় এবং তার ফলে দেহের সম্পর্কের প্রতি অনুরক্ত হওয়া উচিত নয়। জড় চেতনার ঊর্ধ্বে চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত হওয়া উচিত এবং জীবনের অন্য সমস্ত ধারণা থেকে মুক্ত থাকা উচিত। এইভাবে অহঙ্কার থেকে মুক্ত হয়ে, আকাশে যেমন সূর্যকে দর্শন করা যায়, ঠিক সেইভাবে আত্মাকে দর্শন করা উচিত। অধোক্ষজ এবং অহঙ্কারের প্রতিবিম্বস্বরূপে প্রকাশিত পরমেশ্বর ভগবানকে মুক্ত জীব উপলব্ধি করতে পারেন। তিনি জড় কারণের আশ্রয় এবং তিনি সব কিছুতে প্রবিষ্ট হয়েছেন। তিনি এক এবং অদ্বিতীয় পরমতত্ত্ব এবং তিনি মায়ার চক্ষু। সূর্য আকাশে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও যেমন প্রথমে জলে প্রতিবিম্বরূপে এবং ঘরের দেওয়ালে দ্বিতীয় প্রতিবিম্বরূপে সূর্যকে উপলব্ধি করা যায়, ঠিক সেইভাবেই পরমেশ্বর ভগবানের উপস্থিতি উপলব্ধি করা যায়। তত্ত্বদ্রষ্টা আত্মা এইভাবে প্রথমে ত্রিবিধ অহঙ্কারে এবং তার পর দেহ, ইন্দ্রিয় এবং মনে প্রতিবিম্বিত হয়। যদিও মনে হয় যে ভক্ত পঞ্চভূতে, ভোগের বিষয়ে, জড় ইন্দ্রিয়ে এবং মন ও বুদ্ধিতে লীন হয়ে রয়েছেন, তবুও বুঝতে হবে যে, তিনি জাগ্রত এবং অহঙ্কার থেকে মুক্ত। জীব দ্রষ্টারূপে স্পষ্টভাবে তার অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে পারে, কিন্তু গভীর নিদ্রার সময় তার অহঙ্কার দূর হয়ো যাওয়ার ফলে, সে ভ্রান্তভাবে মনে করে যে, সে নষ্ট হয়ে গেছে, ঠিক যেমন ধন-সম্পদ হারাবার ফলে মানুষ গভীর দুঃখে অভিভূত হয় এবং মনে করে যে, সে নিজেও নষ্ট হয়ে গেছে। কোন ব্যক্তি যখন তাঁর পরিপক্ক জ্ঞানের দ্বারা তাঁর ব্যক্তিসত্তাকে উপলব্ধি করতে পারেন, তখন অহঙ্কারের প্রভাবে তিনি যে অবস্থা স্বীকার করেছেন তা তাঁর কাছে প্রকাশিত হয়।”
দেবহূতি জিজ্ঞাসা করলেন- “হে ব্রাহ্মণ! জড়া প্রকৃতি কি কখনও জীবাত্মাকে মুক্তি দেয়? যেহেতু তাদের পরস্পরের আকর্ষণ নিত্য, তাই তাদের বিচ্ছেদ কিভাবে সম্ভব? পৃথিবী এবং গন্ধের অথবা জল এবং রসের যেমন পরস্পর থেকে পৃথক কোন অস্তিত্ব নেই, তেমনই বুদ্ধি এবং চেতনার পরস্পর থেকে পৃথক কোন অস্তিত্ব থাকতে পারে না। অতএব, সমস্ত কর্মের নিষ্ক্রিয় অনুষ্ঠাতা হলেও, যতক্ষণ পর্যন্ত জড়া প্রকৃতি তার উপর তার প্রভাব বিস্তার করে এবং তাকে বেঁধে রাখে, ততক্ষণ তার পক্ষে মুক্ত হওয়া কিভাবে সম্ভব? যদিও মনোধর্মপ্রসূত জ্ঞান এবং তত্ত্ব বিচারের দ্বারা ভব-বন্ধনের মহাভয় বিদূরিত হয়েও থাকে, কিন্তু তার কারণ নষ্ট না হওয়ায়, পুনরায় সেই ভয় আবির্ভূত হতে পারে।”
পরমেশ্বর ভগবান বললেন- “যদি কেউ ঐকান্তিকভাবে আমার সেবা করেন এবং তার ফলে দীর্ঘ কাল ধরে আমার সম্বন্ধে অথবা আমার কাছ থেকে শ্রবণ করেন, তা হলে তিনি মুক্তি লাভ করতে পারেন। এইভাবে স্বধর্ম আচরণ করার ফলে, কোন প্রকার কর্মফলের উদ্ভব হবে না এবং তিনি জড় জগতের কলুষ থেকে মুক্ত হয়ে যাবেন। পূর্ণ জ্ঞান এবং চিন্ময় তত্ত্ব-দর্শন সহকারে দৃঢ়তাপূর্বক এই ভক্তি অনুষ্ঠান করা কর্তব্য। দৃঢ়তাপূর্বক আত্ম-সমাধিতে মগ্ন হওয়ার জন্য কঠোর বৈরাগ্যযুক্ত হওয়া উচিত এবং তপশ্চর্যা ও অষ্টাঙ্গ যোগ অনুষ্ঠান করা উচিত। জড়া প্রকৃতির প্রভাব জীবকে আবৃত করে রেখেছে এবং তার ফলে মনে হয় যেন জীব নিরন্তর জ্বলন্ত অগ্নিতে দগ্ধ হচ্ছে। কিন্তু ঐকান্তিকভাবে ভগবদ্ভক্তি অনুষ্ঠান করা ফলে, এই প্রভাব দূর করা সম্ভব, ঠিক যেমন কাষ্ঠ থেকে উৎপন্ন আগুনে সেই কাষ্ঠই ভষ্ম হয়ে যায়। জড়া প্রকৃতির উপর আধিপত্য করার বাসনার দোষ দর্শন করে এবং তাই তা পরিত্যাগ করে, জীব তখন স্বতন্ত্র হয় এবং স্বীয় মহিমায় স্থিত হয়। স্বপ্নাবস্থায় মানুষের চেতনা প্রায় আচ্ছাদিত থাকে এবং তখন নানা প্রকার অশুভ বস্তু দর্শন হয়, কিন্তু যখন সে জেগে উঠে পূর্ণ চেতনায় অধিষ্ঠিত হয়, তখন আর এই সমস্ত অশুভ বস্তু তাকে মোহাচ্ছন্ন করতে পারে না। আত্মারাম ব্যক্তি জড়-জাগতিক কার্যকলাপে যুক্ত হলেও, জড়া প্রকৃতির প্রভাব কখনও তাঁর অপকার করতে পারে না, কেননা তিনি পরমতত্ত্ব সম্বন্ধে অবগত এবং তাঁর মন পরমেশ্বর ভগবানের স্থির হয়েছে। কেউ যখন বহু বর্ষব্যাপী এবং বহু জন্ম-জন্মান্তর ধরে ভগবৎ-সেবা এবং আত্ম উপলব্ধিতে এইভাবে যুক্ত হন, তিনি ব্রহ্মলোক পর্যন্ত এই জড় জগতের যে কোন লোকের সুখ উপভোগের প্রতি সম্পূর্ণরূপে বিরক্ত হন; তাঁর চেতনা সম্পূর্ণরূপে বিকশিত হয়। আমার ভক্ত প্রকৃতপক্ষে আমার অন্তহীন অহৈতুকী কৃপার দ্বারা আত্ম উপলব্ধি লাভ করেন এবং তার ফলে, সমস্ত সংশয় থেকে মুক্ত হয়ে, তিনি তাঁর গন্তব্য ধামের প্রতি অবিচলিতভাবে অগ্রসর হন, যা আমার অনাবিল আনন্দময় পরা শক্তির আশ্রয়াধীন। সেটিই হচ্ছে জীবের চরম সিদ্ধির পরম লক্ষ। তাঁর জড় দেহ ত্যাগ করার পর, যোগীভক্ত সেই দিব্য ধামে গমন করেন এবং সেখান থেকে তিনি আর কখনও ফিরে আসেন না। সিদ্ধ যোগীর চিত্ত যখন বহিরঙ্গা শক্তির দ্বারা প্রকাশিত যোগ-সিদ্ধির প্রতি আর আকৃষ্ট হয় না, তখন তিনি আমার প্রতি আত্যন্তিক গতি প্রাপ্ত হন এবং তখন মৃত্যু আর তাঁকে পরাভূত করতে পারে না।”
সপ্তবিংশতি অধ্যায়- জড়া প্রকৃতির উপলব্ধি
03 Jul 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, তৃতীয় স্কন্ধ- সৃষ্টির স্থিতি