ষড়বিংশতি অধ্যায়- জড়া প্রকৃতির মৌলিক তত্ত্ব

ভগবান কপিলদেব বললেন- “হে মাতঃ! এখন আমি পরমতত্ত্বের বিভিন্ন বিভাগ সম্বন্ধে আপনার কাছে বর্ণনা করব, যা জানার ফলে যে কোন ব্যক্তি জড়া প্রকৃতির গুণের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেন। আত্ম উপলব্ধির চরম পূর্ণতা হচ্ছে জ্ঞান। আমি সেই জ্ঞান আপনার কাছে বিশ্লেষণ করব, যার দ্বারা জড় জগতের প্রতি আসক্তিরূপ হৃদয়গ্রন্থি ছেদন করা যায়। পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন পরমাত্মা এবং তাঁর আদি নেই। তিনি জড়া প্রকৃতির গুণের অতীত এবং জড়-জাগতিক অস্তিত্বের অতীত। তিনি সর্বত্রই উপলব্দ হন কেননা তিনি স্বয়ং প্রকাশ এবং তাঁর অঙ্গের জ্যোতির দ্বারা সমগ্র সৃষ্টির পালন হয়। পরমেশ্বর ভগবান, যিনি মহতের থেকেও মহীয়ান, তাঁর লীলারূপে সূক্ষ্ম জড়া প্রকৃতিকে গ্রহণ করেছেন, যা ত্রিগুনাত্মিকা এবং শ্রীবিষ্ণুর সঙ্গে সম্পর্কিত। জড়া প্রকৃতি তাঁর ত্রিগুণের দ্বারা বিচিত্ররূপে বিভক্ত হয়ে, জীবের রূপ সৃষ্টি করে এবং জীব তা দর্শন করে মায়ার জ্ঞান আবরণকারী রূপের দ্বারা মোহিত হয়। চিন্ময় জীব তার বিস্মরণের ফলে, জড়া প্রকৃতির প্রবাবকে তার কর্মক্ষেত্র বলে মনে করে এবং এইভাবে প্রভাবিত হয়ে, সে ভ্রান্তিবশত নিজেকে তার কর্মের কর্তা বলে মনে করে। জড় চেতনাই বদ্ধ জীবনের কারণ, যে পরিস্থিতিতে জড়া প্রকৃতি জীবের উপর বিভিন্ন অবস্থা বলপূর্বক প্রয়োগ করে। জীবাত্মা যদিও কিছুই করে না এবং সে এই প্রকার কার্যকলাপের অতীত, তবুও সে বদ্ধ জীবনের দ্বারা এইভাবে প্রভাবিত হয়। বদ্ধ জীবের জড় শরীর, ইন্দ্রিয় ও ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাতা দেবতাদের কারণ হচ্ছে জড়া প্রকৃতি। বিজ্ঞ ব্যক্তিরা তা জানেন। জড়া প্রকৃতির অতীত যে জীব, তার সুখ এবং দুঃখের অনুভূতি স্বয়ং আত্মার দ্বারাই উৎপন্ন হয়।”
দেবহূতি বললেন- “হে পরমেশ্বর ভগবান! দয়া করে আপনি আমার কাছে পুরুষ এবং তাঁর শক্তিসমূহের লক্ষণ বর্ণণা করুন, কেননা তা উভয়েই এই প্রকট এবং অপ্রকট সৃষ্টির কারণ।”
পরমেশ্বর ভগবান বললেন- “তিন গুণের শাশ্বত অব্যক্ত সমন্বয় ব্যক্ত অবস্থার কারণ এবং তাকে বলা হয় প্রধান। তার ব্যক্ত অবস্থাকে বলা হয় প্রকৃতি। পাঁচটি স্থূল তত্ত্ব, পাঁচটি সূক্ষ্ম তত্ত্ব, চারটি অন্তরেন্দ্রিয়, পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয়ের সমষ্টিকে বলা হয় প্রধান। পাঁচটি স্থূল উপাদান হচ্ছে ভূমি, জল, আগুন, বায়ু এবং আকাশ। পাঁচটি সূক্ষ্ম উপাদান হচ্ছে গন্ধ, রস, রূপ, স্পর্শ এবং শব্দ। জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং কর্মেন্দ্রিয়ের সংখ্যা দশ, যথা- শ্রবণেন্দ্রিয়, স্বাদেন্দ্রিয়, স্পর্শেন্দ্রিয়, দর্শনেন্দ্রিয়, ঘ্রাণেন্দ্রিয়, বাগেন্দ্রিয়, হস্তদ্বয়, পদদ্বয়, জননেন্দ্রিয় এবং পায়ু। সূক্ষ্ম অন্তরেন্দ্রিয় চার প্রকার, যথা- মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার এবং কলুষিত চেতনা। তাদের বৃত্তি এবং লক্ষণ অনুসারেই কেবল তাদের পার্থক্য নিরূপণ করা যায়। এই সকলকে বলা হয় সগুণ ব্রহ্ম। এদের সমন্বয় সাধন করে যে কাল, তাকে পঞ্চবিংশতি তত্ত্ব বলে বিবেচনা করা হয়। ভগবানের প্রভাব কারে অনুভব করা যায়, যার ফলে জড়া প্রকৃতির সংস্পর্শে আসার ফলে অহঙ্কারের দ্বারা বিশেষভাবে মোহাচ্ছন্ন জীবেদের মৃত্যু-ভয় উৎপন্ন হয়।”
“হে মাতঃ! হে স্বায়ম্ভুব মনুর কন্যা! আমি পূর্বেই বর্ণনা করেছি যে, কাল হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবান, প্রকৃতির সাম্য অব্যক্ত অবস্থা বিক্ষুব্ধ হওয়ার ফলে, যাঁর থেকে সৃষ্টির শুরু হয়। অন্তরে পরমাত্মারূপে অবস্থান করে এবং বাইরে কালরূপে বিরাজ করে, পরমেশ্বর ভগবান তাঁর শক্তি প্রদর্শন করেন এবং এই সমস্ত বিভিন্ন তত্ত্বের সমন্বয় সাধন করেন। জড়া প্রকৃতিতে ভগবান যখন তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তিকে আধান করেন, তখন প্রকৃতি মহত্তত্ত্ব প্রসব করেন, যাকে বলা হয় হিরন্ময়। জড়া প্রকৃতি যখন বদ্ধ জীবের অদৃষ্টের দ্বারা ক্ষোভিতা হন, তখন তা সংঘটিত হয়। এইভাবে, বৈচিত্র প্রকাশ করার পর, জ্যোতির্ময় মহত্তত্ত্ব, যার মধ্যে সমগ্র ব্রহ্মান্ড নিহিত রয়েছে, যা সমগ্র জগতের অঙ্কুর-স্বরূপ এবং প্রলয়ের সময় যা বিনষ্ট হয়ে যায় না, তা প্রলয়ের সময় তার জ্যোতিকে আবৃত করে যে তম, তাকে পান করেছিল অর্থাৎ লোপ করেছিল। সত্ত্বগুণ, যা স্বচ্ছ, শান্ত, ভগবৎ উপলব্ধির স্থান এবং যাকে সাধারণত বাসুদেব বা চিত্ত বলা হয়, তা মহত্তত্ত্বে প্রকাশিত হয়। মহত্তত্ত্বের প্রকাশ হওয়ার পর, এই সমস্ত বৃত্তিগুলির একসাথে উদয় হয়। জল যেমন পৃথিবীর স্পর্শে আসার পূর্বে, তার স্বাভাবিক অবস্থায় স্বচ্ছ, মধুর এবং শান্ত থাকে, তেমনই শুদ্ধ চেতনার বিশিষ্ট লক্ষণ হচ্ছে শান্তত্ব, স্বচ্ছত্ব এবং অবিকারিত্ব। মহত্তত্ত্ব থেকে অহঙ্কারের উদ্ভব হয়, যা ভগবানের স্বীয় শক্তি থেকে উৎপন্ন। অহঙ্কার প্রধানত তিন প্রকার ক্রিয়াশক্তি সমন্বিত- বৈকারিক, তৈজস এবং তামস। এই তিন প্রকার অহঙ্কার থেকে মন, জ্ঞানেন্দ্রিয়, কর্মেন্দ্রিয় এবং পঞ্চ মহাভূতের উদ্ভব হয়। সঙ্কর্ষণ নামক পুরুষ, যিনি হচ্ছেন সহস্র শির-সমন্বিত ভগবান অনন্তদেব, তিনি ত্রিবিধ অহঙ্কারের কারণ, যার থেকে ভূত, ইন্দ্রিয় এবং মনের উৎপত্তি হয়েছে। এই অহঙ্কারে কর্তৃত্ব, কারণত্ব এবং কার্যত্বের লক্ষণ রয়েছে। সত্ত্ব, রজ এবং তমোগুণের প্রভাব অনুসারে শান্তত্ব, ঘোরত্ব এবং বিমূঢ়ত্ব লক্ষণসমূহ তাতে প্রত্যক্ষ হয়। বৈকারিক অহঙ্কার থেকে আর এক প্রকার বিকার সংঘটিত হয়। তার থেকে মনের উদয় হয় এবং মনের সঙ্কল্প এবং বিকল্প থেকে কামের উৎপত্তি হয়। জীবের মন ইন্দ্রিয়সমূহের অধীশ্বর অনিরুদ্ধ নামে পরিজ্ঞাত হয়। তাঁর অঙ্গকান্তি শরৎকালের নীল কমলের মতো বর্ণ-বিশিষ্ট। যোগীগণ ধীরে ধীরে তাঁকে প্রাপ্ত হন।”
“হে সতী! তৈজস অহঙ্কারের বিকারের ফলে, বুদ্ধিতত্ত্বের উৎপত্তি হয়। বুদ্ধির কার্য হচ্ছে দ্রব্য যখন গোচরীভূত হয়, তখন তাদের প্রকৃতি নিরূপন করা এবং ইন্দ্রিয়গুলিকে সাহায্য করা। সংশয়, ভ্রান্ত জ্ঞান, সঠিক জ্ঞান, স্মৃতি এবং নিদ্রা- পৃথক পৃথক বৃত্তিভেদে বুদ্ধির কয়েকটি লক্ষণ বলে কথিত হয়। তৈজস অহঙ্কার থেকে দুই প্রকার ইন্দ্রিয়ের উদ্ভব হয়- জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং কর্মেন্দ্রিয়। কর্মেন্দ্রিয় প্রাণশক্তির উপর আশ্রিত এবং জ্ঞানেন্দ্রিয় বুদ্ধির উপর আশ্রিত। তামস অহঙ্কার যখন পরমেশ্বর ভগবানের বীর্যের দ্বারা উত্তেজিত হয়, তখন শব্দ-তন্মাত্রের প্রকাশ হয় এবং শব্দ থেকে আকাশ এবং শ্রবণেন্দ্রিয়ের উৎপত্তি হয়। পন্ডিতগণ এবং যাঁদের প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞান রয়েছে, তাঁরা বস্তুর অর্থবাচক এবং বক্তার উপস্থিতির ইঙ্গিতকারী আকাশের সূক্ষ্মরূপ বলে শব্দের সংজ্ঞা প্রদান করেন। আকাশের কার্য এবং লক্ষণ হচ্ছে সমস্ত প্রাণীদের বাহ্য এবং আভ্যন্তরীণ অস্তিত্বের স্থান এবং অবকাশ প্রদান করা, যথা- প্রাণবায়ু, ইন্দ্রিয় এবং মনের কার্যক্ষেত্র হওয়া। শব্দ থেকে উদ্ভুত আকাশ কালের গতির প্রভাবে বিকার প্রাপ্ত হয়ে, তা থেকে স্পর্শ-তন্মাত্রের উৎপত্তি হয় এবং তা থেকে বায়ু এবং স্পর্শেন্দ্রিয়ের উৎপত্তি হয়। কোমলতা, কঠোরতা, শীতলতা এবং উষ্ণতা- এইগুলি স্পর্শের লক্ষণ। এই স্পর্শ হচ্ছে বায়ুর তন্মাত্র। আন্দোলন, মিশ্রন, শব্দ এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয় অনুভূতির বিষয়ের প্রতি সংযোগ করার এবং অন্যান্য সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলিকে যথাযথভাবে কার্য করানোর মাধ্যমে বায়ুর ক্রিয়া প্রদর্শিত হয়। বায়ু এবং স্পর্শেন্দ্রিয়ের মিথষ্ক্রিয়ার ফলে, দৈবের প্রভাবে রূপের উৎপত্তি হয়। এই রূপের বিকাশের ফল-স্বরূপ অগ্নি উৎপন্ন হয় এবং দর্শনেন্দ্রিয় বিভিন্ন বর্ণের বিভিন্ন রূপ দর্শন করে।”
“হে মাতঃ! আকৃতি, গুণ এবং ব্যক্তিত্বের দ্বারা রূপের বৃত্তি বোঝা যায়। অগ্নির রূপ তার জ্যোতির দ্বারা উপলব্ধ হয়। অগ্নিকে জানা যায় তার জ্যোতি, রন্ধন করার ক্ষমতা, পরিপাক, শীতলতা বিনাশ, বাষ্পীকরণ এবং ক্ষুধা, তৃষ্ণা এবং ভোজন ও পানের উদ্রেকের দ্বারা। অগ্নি এবং দর্শনেন্দ্রিয়ের মিথষ্ক্রিয়ার ফলে, দৈবের ব্যবস্থাপনায় রস-তন্মাত্রের উদ্ভব হয়। রস থেকে জলের উদ্ভব হয় এবং রস গ্রহণকারী জিহ্বাও উদ্ভুত হয়। রস যদিও মূলত এক, কিন্তু অন্যান্য পদার্থের সংসর্গে তা কষায়, মধুর, তিক্ত, কটু, অম্ল ও লবন ইত্যাদি বহু প্রকারে বিভক্ত হয়েছে। আর্দ্রীকরণ, বিভিন্ন মিশ্রণকে পিন্ডীকরণ, তৃপ্তি উৎপাদন, জীবিতকরণ, মৃদুকরণ, তাপ নিবারণ, বার বার উদ্ধৃত হলেও জলাশয়ে পুনঃ পুনঃ উদ্‌গমন এবং তৃষ্ণা নিবারণ এইগুলি জলের বৃত্তি। জলের সঙ্গে রস-তন্মাত্রের মিথষ্ক্রিয়ার ফলে, দৈব ব্যবস্থাপনায় গন্ধ-তন্মাত্রের উদ্ভব হয়। তা থেকে মাটি এবং ঘ্রাণেন্দ্রিয় উৎপন্ন হয়, যার দ্বারা আমরা পৃথিবীর গন্ধ অনুভব করতে পারি। গন্ধ এক হওয়া সত্ত্বেও, দ্রব্যের সংসর্গের মাত্রা অনুসারে- মিশ্র, দুর্গন্ধ, শান্ত, উগ্র, অম্ল ইত্যাদি পৃথক পৃথক ভাগে বিভক্ত হয়েছে। পরমব্রহ্মের স্বরূপকে আকার প্রদান করা, বাসস্থান নির্মাণ করা, জল রাখার পাত্র তৈরী করা ইত্যাদি কার্য মাটির লক্ষণ। পক্ষান্তরে বলা যায় যে, পৃথিবী সমস্ত তত্ত্বের আশ্রয়স্থল। যে ইন্দ্রিয়ের বিষয় হচ্ছে শব্দ তাকে বলা হয় শ্রবণেন্দ্রিয় এবং যার বিষয় হচ্ছে স্পর্শ তাকে বলা হয় তগেন্দ্রিয়। যে ইন্দ্রিয়ের বিষয় হচ্ছে রূপ যা অগ্নির বিশেষ গুণ, তাকে বলা হয় দর্শনেন্দ্রিয়। যে ইন্দ্রিয়ের বিষয় হচ্ছে রস যা জলের বিশেষ গুণ, তাকে বলা হয় রসনেন্দ্রিয়। যে ইন্দ্রিয়ের বিষয় হচ্ছে গন্ধ যা পৃথিবীর বিশেষ গুণ, তাকে বলা হয় ঘ্রাণেন্দ্রিয়। যেহেতু কারণ কার্যেও বিদ্যমান থাকে, তাই পূর্ববর্তী ভূতের গুণগুলি পরবর্তী ভূতে দেখা যায়। সেই কারণে আকাশ আদি ভূত চতুষ্টয়ের বিশেষ গুণগুলি মাটিতে পাওয়া যায়। মহত্তত্ত্ব আদি এই সমস্ত সপ্ত তত্ত্ব যখন অমিশ্রিত অবস্থায় ছিল, তখন সৃষ্টির আদি কারণ পরমেশ্বর ভগবান কাল, কর্ম এবং গুণ সহ ব্রহ্মান্ডে প্রবেশ করেছিলেন। ভগবানের উপস্থিতির ফলে সেই সপ্ত তত্ত্ব সক্রিয় এবং মিলিত হওয়ার ফলে, এক অচেতন অন্ডের উৎপত্তি হয়েছিল। সেই অন্ড থেকে বিরাট পুরুষ প্রকট হয়েছিলেন।”
“এই ব্রহ্মান্ডকে বলা হয় জড়া প্রকৃতির প্রকাশ। তাতে জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ, অহঙ্কার এবং মহত্তত্ত্বের যে আবরণ রয়েছে, তা ক্রমান্বয়ে পূর্বটির থেকে পরবর্তী আবরনটি দশ গুণ অধিক এবং তার শেষ আবরণটি হচ্ছে প্রধানের আবরণ। এই ব্রহ্মান্ডে ভগবানের বিরাটরূপ বিরাজ করছে, যার দেহের একটি অংশ হচ্ছে চতুর্দশ ভুবন। পরমেশ্বর ভগবান বিরাট পুরুষ সেই স্বর্ণময় অন্ডকোষে প্রবেশ করলেন, যা জলে শায়িত ছিল এবং তিনি তাকে বিভিন্ন প্রকারে বিভক্ত করলেন। সর্ব প্রথমে তার মুখ প্রকট হয়েছিল এবং তার পর অগ্নিদেব সহ বাগেন্দ্রিয় প্রকাশিত হয়েছিল। অগ্নিদেব হচ্ছেন সেই ইন্দ্রিয়র অধিষ্ঠাতৃ দেবতা। তার পর দুইটি নাসারন্ধ্র প্রকাশিত হয়েছিল এবং তাতে ঘ্রাণেন্দ্রিয় ও প্রাণবায়ুর প্রকাশ হয়েছিল। ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের সঙ্গে বায়ুদেবের আবির্ভাব হয়েছিল, যিনি সেই ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাতা। তার পর বিরাট পুরুষের চক্ষুদ্বয় প্রকট হয়েছিল এবং তার মধ্যে ছিল দর্শনেন্দ্রিয়। সেই ইন্দ্রিয়ের প্রকাশের সঙ্গে, সেই ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাতা সূর্যদেবের আবির্ভাব হয়েছিল। তার পর তাঁর দুইটি কর্ণ প্রকাশিত হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে ছিল শ্রবণেন্দ্রিয় এবং সেই সঙ্গে দিকসমূহের অধিষ্ঠাতা দিক-দেবতাদের আবির্ভাব হয়েছিল। তারপর ভগবানের বিরাট পুরুষ বিশ্বরূপ তাঁর ত্বক প্রকাশ করেন এবং তার পর তাঁর রোম, তাড়ি এবং গুম্ফ প্রকাশিত হয়। তার পর সমস্ত ওষধি প্রকট হয় এবং তার পর তাঁর জননেন্দ্রিয় প্রকাশিত হয়। তার পর বীর্য এবং জলের অধিষ্ঠাতৃদেব প্রকট হয়েছেন। তার পর গুহ্যদ্বার ও মল ত্যাগের ইন্দ্রিয় এবং তার পর মৃত্যুর দেবতার প্রকাশ হয়, যাঁকে সমগ্র ব্রহ্মান্ড জুড়ে সকলে ভয় করে। তার পর ভগবানের বিরাটরূপের দুইটি হাত প্রকাশিত হয়েছিল এবং সেই সঙ্গে বস্তু ধরার এবং ফেলার ক্ষমতার উদয় হয়েছিল এবং তার পর ইন্দ্রদেবের আবির্ভাব হয়েছিল। তার পর পদদ্বয় প্রকাশিত হয়েছিল এবং সেই সঙ্গে গমনাগমনের প্রক্রিয়া এবং তার পর ভগবান শ্রীবিষ্ণু প্রকট হয়েছিলেন। বিরাটরূপের ধমনী প্রকাশিত হয় এবং তার পর রক্ত উৎপন্ন হয়, তার পর নদী সমূহের (ধমনীর অধিষ্ঠাতৃদেব) এবং তার পর উদর প্রকাশিত হয়।”
“তার পর ক্ষুধা ও পিপাসার অনুভূতির উদয় হয়েছিল এবং তার পর সমুদ্রের প্রকাশ হয়েছিল। তার পর হৃদয় প্রকট হয় এবং হৃদয় থেকে মন প্রকাশিত হয়। মনের পর চন্দ্র প্রকট হয়। তার পর বুদ্ধির প্রকাশ হয় এবং বুদ্ধির পর ব্রহ্মা প্রকট হন। তার পর অহঙ্কার প্রকট হয় এবং তার পর শিব। শিবের আবির্ভাবের পর চেতনা এবং চেতনার অধিষ্ঠাতৃ দেবতার প্রকাশ হয়। যখন দেবতারা এবং বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাতাগণ এইভাবে প্রকট হলেন, তখন তাঁরা তাঁদের আবির্ভাবের উৎসকে জাগাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা করতে অক্ষম হয়ে, তাঁরা বিরাট পুরুষকে জাগাবার জন্য একে একে তাঁর দেহে পুনঃ প্রবেশ করেছিলেন। অগ্নিদেব বাগেন্দ্রিয় সহ তাঁর মুখে প্রবেশ করেছিলেন, কিন্তু বিরাট পুরুষকে তিনি জাগাতে পারলেন না। তখন বায়ুদেব ঘ্রাণেন্দ্রিয় সহ তাঁর নাসিকায় প্রবেশ করলেন, কিন্তু তবুও বিরাট পুরুষ জাগরিত হলেন না। সূর্যদেব তখন দর্শনেন্দ্রিয় সহ বিরাট পুরুষের চক্ষুদ্বয়ে প্রবেশ করেছিলেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও বিরাট পুরুষ উঠলেন না। তেমনই, দিকসমূহের অধিষ্ঠাতৃ দেবতাগণ শ্রবণেন্দ্রিয় সহ তাঁর কর্ণে প্রবেশ করেছিলেন, কিন্তু তবুও তিনি উঠলেন না। ত্বকের অধিষ্ঠাতৃ দেবতা তখন ওষধিসমূহ সহ রোম-সমন্বিত বিরাট পুরুষের ত্বকে প্রবেশ করেছিলেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও বিরাট পুরুষ জাগরিত হলেন না। তখন জলের দেবতা বীর্য সহ তাঁর জননেন্দ্রিয়তে প্রবেশ করলেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও বিরাট পুরুষ জাগরিত হলেন না। মৃত্যুর দেবতা তখন অপান বায়ু সহ বিরাট পুরুষের পায়ুতে প্রবেশ করলেন কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি তাঁকে কর্মে অনুপ্রাণিত করতে পারলেন না। তখন ইন্দ্রদেব হাতের শক্তি সহ তাঁর হস্তে প্রবেশ করলেন, কিন্তু বিরাট পুরুষ তা সত্ত্বেও জাগরিত হলেন না। ভগবান বিষ্ণু তখন গমনাগমনের ক্ষমতা সহ তাঁর পায়ে প্রবেশ করলেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও বিরাট পুরুষ উঠে দাঁড়ালেন না। তখন নদীসমূহ রক্ত এবং রক্ত সঞ্চালনের ক্ষমতা সহ তাঁর ধমনীতে প্রবেশ করলেন, কিন্তু তবুও বিরাট পুরুষকে নাড়াতে পারলেন না। সমুদ্র তখন ক্ষুধা এবং তৃষ্ণা সহ তাঁর উদরে প্রবেশ করলেন, তবুও বিরাট পুরুষ জাগরিত হলেন না। চন্দ্রদেব তখন মন সহ তাঁর হৃদয়ে প্রবেশ করলেন, কিন্তু তবুও বিরাট পুরুষ জাগরিত হলেন না। ব্রহ্মা তখন বুদ্ধি সহ তাঁর হৃদয়ে প্রবেশ করলেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও বিরাট পুরুষকে উঠতে রাজী করানো গেল না। রুদ্রদেব তখন অহঙ্কার সহ তাঁর হৃদয়ে প্রবেশ করলেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও বিরাট পুরুষ নড়লেন না। কিন্তু যখন চেতনের অধিষ্ঠাতৃ দেবতা বা অন্তঃকরণের নিয়ন্তা চিত্ত সহ তাঁর হৃদয়ে প্রবেশ করলেন, ঠিক তখন বিরাট পুরুষ কারণ-বারি থেকে উত্থিত হলেন। কেউ যখন নিদ্রিত থাকে, তখন তার সমস্ত জড় ক্ষমতাগুলি- যথা প্রাণশক্তি, জ্ঞানেন্দ্রিয়, কর্মেন্দ্রিয়, মন, এবং বুদ্ধি- তাকে জাগরিত করতে পারে না। সে তখনই জাগরিত হয়, যখন পরমাত্মা তাকে সাহায্য করে। অতএব, ভগবানের ঐকান্তিক সেবার দ্বারা লব্ধ ভক্তি, বৈরাগ্য এবং পারমার্থিক জ্ঞানের মাধ্যমে এই শরীরে বিরাজমান পরমাত্মার ধ্যান করা উচিত, যদিও তিনি তা থেকে ভিন্ন।”

Leave a Reply

July 2025
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  

Blog Stats

  • 140,959 hits