শ্রীশৌনক বললেন- “পরমেশ্বর ভগবান জন্মরহিত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তির দ্বারা কপিল মুনি রূপে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। সমগ্র মানব-জাতির কল্যাণার্থে দিব্য জ্ঞান প্রদান করার জন্য তিনি অবতরণ করেছিলেন। এমন কেউ নেই যিনি ভগবানের থেকে বেশি জানেন। তাঁর থেকে অধিক পূজনীয় অথবা তাঁর থেকে উত্তম যোগী কেউ নেই। তাই তিনিই হচ্ছেন বেদের প্রভু এবং সর্বদা তাঁর সম্বন্ধে শ্রবণ করার ফলেই ইন্দ্রিয়ের প্রকৃত তৃপ্তি সাধন হয়। তাই কৃপা করে স্বচ্ছন্দ আত্মা পরমেশ্বর ভগবানের সমস্ত কার্যকলাপ এবং লীলাসমূহ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করুন, যিনি তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তির দ্বারা এই সমসত্ত কার্যকলাপ সম্পাদন করেন।”
শ্রীসূত গোস্বামী বললেন- “পরম শক্তিমান ঋষি মৈত্রেয় ছিলেন ব্যাসদেবের সখা। দিব্য জ্ঞান সম্বন্ধে বিদুরের প্রশ্নে অনুপ্রাণিত এবং প্রসন্ন হয়ে মৈত্রেয় বলেছিলেন,, কর্দম যখন বনে প্রস্থান করেছিলেন, তখন ভগবান কপিল তাঁর মাতা দেবহূতির প্রসন্নতা বিধানের জন্য বিন্দু-সরোবরের তীরে অবস্থান করেছিলেন। পেরমতত্ত্বের চরম লক্ষ্যের মার্গ প্রদর্শক কপিলদেব যখন কর্মে নিরত হয়ে অবস্থান করছিলেন, তখন দেবহূতি ব্রহ্মার বাণী স্মরণ করে তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন- হে প্রভো! আমি আমার অসৎ ইন্দ্রিয়ের বিষয়-অভিলাষ থেকে অত্যন্ত শ্রান্ত হয়েছি, সেই অভিলাষ পূর্ণ করতে করতে আমি তমসাবৃত সংসার-কূপে পতিত হয়েছি। হে ভগবান! অজ্ঞানের অন্ধকার থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আপনিই আমার একমাত্র উপায়, কেননা আপনি হচ্ছেন আমার দিব্য নেত্র, যা আপনার কৃপার প্রভবেই কেবল বহু জন্ম-জন্মান্তরের পর আমি লাভ করেছি। আপনি পরমেশ্বর ভগবান, আপনি সমস্ত জীবের আদি এবং অধীশ্বর সমগ্র বিশ্বের অজ্ঞান অন্ধকার দূর করার জন্য আপনি সূর্যের মতো উদিত হয়েছেন। হে প্রভু! আপনি আমার প্রতি প্রসন্ন হয়ে, আমার মহা মোহ দূর করুন। আমার অহঙ্কারের ফলে, আমি আপনার মায়ার দ্বারা বদ্ধ হয়েছি এবং আমার দেহকে আমি এবং দেহের সঙ্গে সম্পর্কিত বস্তুসমূহকে আমার বলে মনে করছি। আমি আপনার শ্রীপাদপদ্মের শরণ গ্রহণ করেছি, কেননা আপনিই একমাত্র শরণ্য। আপনি সেই কুঠার, যার দ্বারা সংসার-বৃক্ষ ছেদন করা যায়। আমি তাই আপনাকে আমার প্রণতি নিবেদন করছি, কেননা আপনি সমস্ত তত্ত্বজ্ঞানী পুরুষদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। আমি আপনার কাছে পুরুষ ও প্রকৃতি এবং আত্মা ও জড়ের মধ্যে যে সম্পর্ক, সেই সম্বন্ধে জানতে চাই।”
মৈত্রেয় বললেন- “তাঁর মায়ের অধ্যাত্ম উপলব্ধির নিষ্কলুষ বাসনা শ্রবণ করে, ভগবান তাঁকে সেই প্রশ্ন করার জন্য অন্তরে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন এবং ঈষৎ হাস্য সহকারে অধ্যাত্মবাদীদের মার্গ সম্বন্ধে ব্যাখ্যা করেছিলেন।”
পরমেশ্বর ভগবান উত্তর দিলেন- “যে যোগ-পদ্ধতি ভগবান এবং জীবের সম্পর্ক নির্ধারিত করে, যা জীবের চরম মঙ্গল সাধন করে এবং যা জড়-জাগতিক সমস্ত সুখ এবং দুঃখের নিবৃত্তি সাধন করে, সেটিই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ যোগের পন্থা। হে পরম পবিত্র মাতা! আমি পুরাকালে মহান ঋষিদের কাছে যে যোগ-পদ্ধতি বিশ্লেষণ করেছিলেন, সেই প্রাচীর যোগের পন্থা আমি এখন আপনার কাছে বলব। এইটি সর্বতোভাবে উপযোগী এবং ব্যবহারিক। যেই অবস্থায় জীবের চেতনা প্রকৃতির তিনটি গুণের দ্বারা আকৃষ্ট হয়, তাকে বলা হয় বদ্ধ জীবন কিন্তু সেই চেতনা যখন পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি আসক্ত হয়, তখন তিনি মুক্ত হন। মানুষ যখন ‘আমি’ এবং ‘আমার’ এই ভ্রান্ত পরিচিতি-প্রসূত কাম, লোভ ইত্যাদি কলুষ থেকে সম্পূর্ণরূপে নির্মল হন, তখন তাঁর মন শুদ্ধ হয়। সেই শুদ্ধ অবস্থায় তিনি তথাকথিত জড় সুখ এবং দুঃখের অতীত হন। তখন জীবাত্মা অণু-সদৃশ হলেও নিজেকে জড়া প্রকৃতির অতীত, জ্যোতির্ময়, অখন্ডিতরূপে দর্শন করতে পারে। আত্ম উপলব্ধির সেই অবস্থায়, মানুষ ভক্তিযুক্ত জ্ঞান এবং বৈরাগ্যের দ্বারা সব কিছু যথাযথভাবে দর্শন করেন, তখন তিনি জড় বিষয়ের প্রতি উদাসীন হন এবং তাঁর উপর জড়া প্রকৃতির প্রভাব ক্ষীণবল হয়। পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি ভক্তিযুক্ত না হলে, কোন প্রকার যোগীই আত্ম উপলব্ধিতে সিদ্ধি লাভ করতে পারেন না, কেননা সেইটি হচ্ছে একমাত্র মঙ্গলজনক পন্থা। প্রতিটি তত্ত্বজ্ঞানী ব্যক্তিই ভালভাবে জানেন যে, জড় আসক্তি আত্মার সব চাইতে বড় বন্ধন। কিন্তু সেই আসক্তি যখন স্বরূপ-সিদ্ধ ভক্তদের প্রতি প্রয়োগ করা হয়, তখন তার কাছে মুক্তির দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়। সাধুর লক্ষন হচ্ছে তিনি সহনশীল, দয়ালু এবং সমস্ত জীবের সুহৃৎ। তাঁর কোন শত্রু নেই, তিনি শান্ত, তিনি শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে আচরণ করেন এবং তিনি সমস্ত সদ্গুণের দ্বারা বিভূষিত। এই প্রকার সাধুরা একনিষ্ঠ ভক্তি সহকারে অবিচলিতভাবে ভগবানের সেবা করেন। ভগবানের জন্য তাঁরা তাঁদের আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধব পরিত্যাগ করেন। নিরন্তর আমার কথা শ্রবণ এবং কীর্তন করে, সাধুরা কোন প্রকার জড়-জাগতিক তাপ অনুভব করেন না, কেননা তাঁরা সর্বদাই মদ্গত চিত্ত।”
“হে মাতঃ! হে সাধ্বি! এইগুলি সমস্ত আসক্তি থেকে মুক্ত মহান ভক্তদের গুণাবলী। আপনার অবশ্য কর্তব্য এই প্রকার সাধুদের প্রতি আসক্ত হওয়ার চেষ্টা করা, কেননা তার ফলে জড় আসক্তি-জনিত সমস্ত দোষ নিবৃত্ত হয়। শুদ্ধ ভক্তদের সঙ্গে পরমেশ্বর ভগবানের লীলা-বিলাস এবং কার্যকলাপের আলোচনা হৃদয় ও কর্ণের প্রীতি সম্পাদন করে এবং সন্তুষ্টি বিধান করে। এই প্রকার জ্ঞানের আলোচনার ফলে, ধীরে ধীরে মুক্তির পথে অগ্রসর হওয়া যায়। এইভাবে মুক্ত হওয়ার পর, যথাক্রমে প্রথমে শ্রদ্ধা, পরে রতি ও অবশেষে প্রেম-ভক্তির উদয় হয়। এইভাবে ভক্ত সঙ্গে ভগবদ্ভক্তিতে যুক্ত হয়ে, নিরন্তর ভগবানের কার্যকলাপ সম্বন্ধে চিন্তা করার ফলে, ইহলোকে এবং পরলোক ইন্দ্রিয় সুখভোগের প্রতি বিরক্তির উদয় হয়। এই কৃষ্ণভক্তির পন্থা হচ্ছে সব চাইতে সহজ-সরল যোগ অনুশীলনের পন্থা; কেউ যখন ভগবদ্ভক্তিতে যথাযথভাবে যুক্ত হন, তিনি তখন তাঁর মনকে সংযত করতে সক্ষম হন। এইভাবে প্রকৃতির গুণের সেবায় যুক্ত না হয়ে, কৃষ্ণভাবনামৃত বিকশিত করে, বৈরাগ্যযুক্ত জ্ঞান লাভ করে এবং পরমেশ্বর ভগবানের সেবায় মনকে একাগ্র করে, যোগ অনুশীলনের দ্বারা সে এই জীবনেই আমার সঙ্গ লাভ করে, কেননা আমি হচ্ছি পরমতত্ত্ব পরমেশ্বর ভগবান।”
ভগবানের এই বাণী শুনে, দেবহূতি জিজ্ঞাসা করলেন- “আমি কি প্রকার ভক্তি বিকাশ করব এবং অভ্যাস করব, যার ফলে আমি অনায়াসে এবং শ্রীঘ্রই আপনার শ্রীপাদপদ্মের সেবা প্রাপ্ত হতে পারি? আপনি বিশ্লেষণ করেছেন যে, যোগের লক্ষ হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবান এবং তার উদ্দেশ্য হচ্ছে সম্পূর্ণরূপে জড়-জাগতিক অস্তিত্বের নিবৃত্তি সাধন করা। দয়া করে আপনি বলুন সেই যোগ কি প্রকার এবং কতভাবে সেই অলৌকিক যোগকে বোঝা যায়? হে আমার প্রিয় পুত্র কপিল! আমি একজন স্ত্রীলোক। আমার পক্ষে পরমতত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করা অত্যন্ত কঠিন কেননা আমার বুদ্ধি অল্প। কিন্তু আপনি যদি দয়া করে বিশ্লেষণ করেন, তা হলে মন্দবুদ্ধি হওয়া সত্ত্বেও আমি তা বুঝতে পারব এবং তার ফলে দিব্য সুখ অনুভব করতে পারব।”
শ্রীমৈত্রেয় বললেন- “তাঁর মায়ের কথা শুনে, কপিলদেব তাঁর উদ্দেশ্য অবগত হয়েছিলেন এবং তাঁর প্রতি কৃপাপরবশ হয়েছিলেন কেননা তাঁর দেহ থেকে তাঁর জন্ম হয়েছিল। তিনি তাঁর কাছে সাংখ্য দর্শন বর্ণনা করেছিলেন, যা গুরুপরম্পরায় ভক্তি এবং যোগের সমন্বয়।”
কপিলদেব বললেন- “ইন্দ্রিয়সমূহ দেবতাদের প্রতীক এবং তাদের স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে বৈদিক নির্দেশ অনুসারে কার্য করা। ইন্দ্রিয়গুলি যেমন দেবতাদের প্রতীক, তেমনই মন পরমেশ্বর ভগবানের প্রতিনিধি। মনের স্বাভাবিক বৃত্তি হচ্ছে সেবা করা। সেই সেবার ভাব যখন কোন রকম উদ্দেশ্য ব্যতীত ভগবানের সেবায় যুক্ত হয়, তখন তা মুক্তির থেকেও অনেক অধিক শ্রেয়স্কর। ভক্তি জীবের সূক্ষ্ম দেহকে অতিরিক্ত প্রয়াস ব্যতীতই ক্ষয় করে ফেলে, ঠিক যেমন জঠরাগ্নি সমস্ত ভুক্ত দ্রব্যকে জীর্ণ করে দেয়। যে শুদ্ধ ভক্ত সর্বদাই আমার শ্রীপাদপদ্মের সেবায় যুক্ত, তিনি কখনও আমার সঙ্গে এক হয়ে যেতে চান না। এই প্রকার ঐকান্তিক ভক্ত সর্বদাই আমার লীলাবিলাসের এবং কার্যকলাপের কীর্তন করেন। হে মাতঃ! আমার ভক্তেরা সর্বদাই উদীয়মান প্রভাতী সূর্যের মতো অরুণ লোচনযুক্ত আমার প্রসন্ন মুখমন্ডল-সমন্বিত রূপ অবলোকন করেন। তাঁরা আমার সর্ব মঙ্গলময় বিভিন্ন রূপ দর্শন করতে চান এবং অনুকূলভাবে আমার সঙ্গে বাক্যালাপ করতে চান। ভগবানের হাস্যোজ্জ্বল এবং আকর্ষক রূপ দর্শন করে এবং তাঁর অত্যন্ত মধুর বাণী শ্রবণ করে, শুদ্ধ ভক্তেরা তাঁদের চেতনা হারিয়ে ফেলেন। তাঁদের ইন্দ্রিয়গুলি অন্য সমস্ত কার্যকলাপ থেকে মুক্ত হয়ে, ভগবানের প্রেমময়ী সেবায় মগ্ন হয়। তার ফলে তাঁদের মুক্তি লাভের স্পৃহা না থাকলেও, তাঁরা আপনা থেকেই মুক্ত হয়ে যান। এইভাবে সম্পূর্ণরূপে আমার চিন্তায় মগ্ন থাকার ফলে, ভক্তেরা স্বর্গলোকের এমন কি সত্যলোকের সর্ব শ্রেষ্ঠ ঐশ্বর্যও কামনা করেন না। তাঁরা যোগের অষ্ট-সিদ্ধিও কামনা করেন না, এমন কি তাঁরা বৈকুন্ঠলোকে পর্যন্ত উন্নীত হতে চান না। কিন্তু সেইগুলি না চাইলেও, এই জীবনেই তাঁরা সমস্ত ভাগবতী সম্পদ ভোগ করেন।”
“হে মাতঃ! ভক্তেরা যে দিব্য ঐশ্বর্য লাভ করেন, তা কখনও নষ্ট হয় না; কোন রকম অস্ত্র এমন কি কালচক্রও সেই ঐশ্বর্য বিনষ্ট করতে পারে না। যেহেতু ভক্তেরা আমাকে তাঁদের সখা, আত্মীয়, পুত্র, গুরু, সুহৃৎ এবং ইষ্টদেবতা বলে গ্রহণ করেন, তাই তাঁদের ঐশ্বর্য থেকে তাঁরা কখনও বঞ্চিত হন না। যাঁরা ইহলোকে ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, পশু, গৃহ অথবা দেহের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত বস্তু, এমন কি স্বর্গলোকে উন্নীত হওয়ার বাসনা পর্যন্ত পরিত্যাগ করে, অনন্য ভক্তি সহকারে সর্ব ব্যাপ্ত বিশ্বেশ্বর আমাকে ভজনা করে, আমি তাঁদের সংসার-সমুদ্রের পরপারে নিয়ে যাই। আমি ব্যতীত অন্য কারও শরণ গ্রহণ করা ফলে, কেউই ভীষণ জন্ম-মৃত্যুর ভয় থেকে মুক্ত হতে পারে না, কেননা আমি হচ্ছি সর্ব শক্তিমান, সমস্ত সৃষ্টির মূল উৎস এবং সমস্ত আত্মার পরম আত্মা, পরমেশ্বর ভগবান। আমার ভয়ে বায়ু প্রবাহিত হয়, সূর্য কিরণ বিতরণ করে, মেঘের রাজা ইন্দ্র বারি বর্ষণ করে, অগ্নি দহন করে এবং মৃত্যু বিচরণ করে। যোগীগণ তাঁদের শাশ্বত লাভর জন্য দিব্য জ্ঞান এবং বৈরাগ্যযুক্ত ভক্তিযোগে আমার শ্রীপাদপদ্মের শরণ গ্রহণ করেন এবং আমি যেহেতু পরমেশ্বর ভগবান, তাই তাঁরা নির্ভয়ে আমার ধামে প্রবেশ করার যোগ্যতা অর্জন করেন। তাই যাঁদের মন ভগবানের চরণে নিবেদিত হয়ে স্থির হয়েছে, তাঁরাই সুদৃঢ় নিষ্ঠা সহকারে ভগবদ্ভক্তির অনুশীলন করেন। জীবনের চরম সিদ্ধি লাভের সেটিই একমাত্র উপায়।”
পঞ্চবিংশতি অধ্যায়- ভগবদ্ভক্তির মহিমা
30 Jun 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, তৃতীয় স্কন্ধ- সৃষ্টির স্থিতি