চতুর্বিংশতি অধ্যায়- কর্দম মুনির বৈরাগ্য

মৈত্রেয় ঋষি বললেন- “প্রশংসনীয়া মনুকন্যা দেবহূতির বৈরাগ্যপূর্ণ বাণী শ্রবণ করে, দয়ালু কর্দম মুনি ভগবান শ্রীবিষ্ণুর বাণী স্মরণপূর্বক বলতে লাগলেন- হে প্রশংসনীয়া রাজকন্যা, তুমি নিরাশ হয়ো না। অচ্যুত পরমেশ্বর ভগবান অচিরেই তোমার পুত্ররূপে তোমার গর্ভে প্রবেশ করবেন। তুমি পবিত্র ব্রত পালন করেছ। ভগবান তোমার কল্যাণ সাধন করবেন। তাই এখন তুমি গভীর শ্রদ্ধা, ইন্দ্রিয় সংযম, ধর্ম অনুশীলন, তপশ্চর্যা এবং ধন দান করার মাধ্যমে ভগবানের আরাধনা কর। তোমার দ্বারা আরাধিত হয়ে, পরমেশ্বর ভগবান আমার যশ বিস্তার করে তোমর পুত্ররূপে জন্ম গ্রহণ করবেন। তিনি তোমাকে ব্রহ্মজ্ঞান শিক্ষা দান করে, তোমার হৃদয়-গ্রন্থি ছেদন করবেন।”
শ্রীমৈত্রেয় বললেন- “দেবহূতি তাঁর পতি প্রজাপতি কর্দমের আদেশের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধান্বিতা ছিলেন। হে মহর্ষি! এইভাবে তিনি সকলের হৃদয়ে বিরাজমান ব্রহ্মান্ডের পতি পরমেশ্বর ভগবানের আরাধনা করতে শুরু করেছিলেন। বহু বৎসর পর, পরমেশ্বর ভগবান মধুসূদন কর্দম মুনির বীর্যে প্রবিষ্ট হয়ে, দেবহূতির গর্ভ থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন, ঠিক যেভাবে যজ্ঞের কাষ্ঠ থেকে অগ্নি প্রকাশিত হয়। তখন পৃথিবীতে তাঁর অবতরণের সময়, দেবতারা গগন-মন্ডলে বর্ষায়মান মেঘের মতো তাঁদের বাদ্যযন্ত্র বাজাতে লাগলেন। স্বর্গের গায়ক গন্ধর্বেরা ভগবানের মহিমা কীর্তন করে গান গাইতে লাগলেন এবং অপ্সরারা পরম আনন্দে নাচতে লাগলেন। ভগবানের আবির্ভাবের সময় গগন-মার্গে মুক্তরূপে বিচরণকারী দেবতারা পুষ্প-বৃষ্টি করেছিলেন। তখন সমস্ত দিক-মন্ডল, জলরাশি এবং সকলের চিত্ত অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিল। মরীচি আদি ঋষিগণ সহ স্বয়ম্ভু ব্রহ্মা সরস্বতী নদী পরিবেষ্টিত কর্দম মুনির আশ্রমে গিয়েছিলেন।”
মৈত্রেয় বলতে লাগলেন- “হে শত্রু সংহারক! জ্ঞান আহরণে প্রায় সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র অজ ব্রহ্মা বুঝতে পেরেছিলেন যে, পরমেশ্বর ভগবানের এক অংশ সাংখ্য যোগ নামক পূর্ণ জ্ঞান বিশ্লেষণ করার জন্য, তাঁর শুদ্ধ সত্ত্বময় স্বরূপে দেবহূতির গর্ভে আবির্ভূত হয়েছেন। অবতাররূপে তার বাঞ্ছিত কার্যকলাপের জন্য ব্রহ্মা তাঁর প্রহৃষ্ট ইন্দ্রিয় এবং নির্মল অন্তঃকরণের দ্বারা ভগবানকে আরাধনা করার পর, তিনি কর্দম এবং দেবহূতিকে বললেন- হে প্রিয় পুত্র কর্দম! তুমি যেহেতু নিষ্কপটে, শ্রদ্ধা সহকারে, পূর্ণরূপে আমার নির্দেশ পালন করেছ, তার ফলে তুমি যথাযথভাবে আমার পূজা করেছ। তুমি আমার সমস্ত নির্দেশ পালন করেছ এবং তার দ্বারা তুমি আমাকে সম্মান প্রদর্শন করেছ। পুত্রের কর্তব্য ঠিক এইভাবে পিতার সেবা করা। মানুষের কর্তব্য হচ্ছে পিতা অথবা গুরুদেবের আদেশ ‘যথা আজ্ঞা’ বলে সম্মান সহকারে পালন করা।”
শ্রীব্রহ্মা তখন কর্দম মুনির নয়টি কন্যার প্রশংসা করে বললেন- “তোমার এই সমস্ত সুশোভনা কন্যারা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত সাধ্বী। তারা যে-তাদের বংশধরদের দ্বারা বিভিন্নভাবে এই সৃষ্টি বৃদ্ধি করবে, সেই সম্বন্ধে আমার কোন সন্দেহ নেই। অতএব, আজই তুমি তোমার কন্যাদের স্বভাব এবং রুচি অনুসারে, শ্রেষ্ঠ ঋষিদের হস্তে তাদের সম্প্রদান কর, তা হলে সারা ব্রহ্মান্ড জুড়ে তোমার যশোরাশি বিস্তৃত হবে। হে কর্দম! আমি জানি যে, আদি পুরুষ পরমেশ্বর ভগবান তাঁর যোগমায়ার প্রভাবে এখন অবতরণ করেছেন। তিনি জীবেদের সমস্ত বাসনা পূর্ণকারী এবং এখন তিনি কপিল মুনির রূপ ধারণ করেছেন। সুবর্ণ বর্ণ কেশ-সমন্বিত, কমল-নয়ন এবং পদ্ম চিহ্নযুক্ত পাদপদ্ম সমন্বিত কপিলদেব যোগের দ্বারা এবং শাস্ত্রজ্ঞানের ব্যবহারিক প্রয়োগের দ্বারা জাগতিক কর্মের বাসনা সমূলে বিনষ্ট করবেন।”
শ্রীব্রহ্মা তখন দেবহূতিকে বললেন- “হে মনুকন্যা! যিনি কৈটভাসুরকে বধ করেছিলেন, সেই পরমেশ্বর ভগবান এখন তোমার গর্ভে প্রবিষ্ট হয়েছেন। তিনি তোমার সমস্ত অবিদ্যা এবং সংশয়ের গ্রন্থি ছেদন করবেন। তার পর তিনি সারা পৃথিবীতে বিচরণ করবেন। তোমার পুত্র সমস্ত সিদ্ধ জীবাত্মাদের অধীশ্বর হবেন। তিনি প্রকৃত জ্ঞন প্রদানে দক্ষ আচার্যদের দ্বারা অনুমোদিত হবেন এবং মানুষদের মধ্যে তিনি কপিল নামে বিখ্যাত হবেন। দেবহূতির পুত্র নামে তিনি তোমার যশ বৃদ্ধি করবেন।”
শ্রীমৈত্রেয় বললেন- “কর্দম মুনি এবং তাঁর পত্নী দেবহূতিকে এইভাবে বলে, ব্রহ্মান্ডের নির্মাতা ব্রহ্মা, যিনি হংস নামেও পরিচিত, তিনি তাঁর বাহন হংসে চড়ে চার কুমার এবং নারদ সহ ত্রিভুবনের সর্বোচ্চ লোকে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। হে বিদুর, ব্রহ্মার প্রস্থানের পর, তাঁর নির্দেশ অনুসারে, কর্দম মুনি বিশ্বের প্রজা স্রষ্টা সেই নয়জন মহর্ষিদের তাঁর নয়টি কন্যা সম্প্রদান করেছিলেন। কর্দম মুনি মরীচিকে কলা, অত্রিকে অনসূয়া, অঙ্গিরাকে শ্রদ্ধা এবং পুলস্ত্যকে হবির্ভু নামক কন্যা দান করেছিলেন। পুলহকে গতি, ক্রতুকে পতিব্রতা ক্রিয়া, ভৃগুকে খ্যাতি এবং বশিষ্ঠকে অরুন্ধতী নামক কন্যা সমর্পণ করেছিলেন। তিনি শান্তি-নাম্নী কন্যাকে অথর্বার নিকট সম্প্রদান করেছিলেন। এই শান্তির জন্য যজ্ঞ অনুষ্ঠান ভালভাবে সম্পাদিত হয়। এইভাবে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণদের বিবাহকার্য সম্পাদন করার পর, তিনি তাঁদের সস্ত্রীক লালন-পালন করতে লাগলেন। হে বিদুর! এইভাবে বিবাহিত হয়ে, ঋষিরা কর্দম মুনির থেকে বিদায় গ্রহণ করে, আনন্দিত অন্তরে তাঁদের নিজ-নিজ আশ্রমে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। দেবশ্রেষ্ঠ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণু অবতীর্ণ হয়েছেন জেনে, কর্দম মুনি নির্জনে তাঁর সমীপবর্তী হয়ে, তাঁকে প্রণতি নিবেদন করে বলতে লাগলেন- “আহা, যে-সমস্ত দুর্দশাক্লিষ্ট জীবাত্মারা তাদের পাপ কর্মের ফলে, সংসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নানা প্রকার দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করছে, দীর্ঘ কাল পরে ব্রহ্মান্ডের দেবতারা তাদের প্রতি প্রসন্ন হয়েছেন। বহু জন্ম ধরে, বহু পরিপক্ক যোগীরা পূর্ণ সমাধিযোগে নির্জন স্থানে পরমেশ্বর ভগবানের শ্রীপাদপদ্ম দর্শন করার চেষ্টা করেন। আমাদের মতো সাধারণ গৃহস্থদের লঘুতা গণ্য না করে, সেই পরমেশ্বর ভগবান কেবল তাঁর ভক্তদের পক্ষপাতিত্ব করার জন্যই আমাদের গৃহে প্রকট হয়েছেন। হে ভগবান, আপনি সর্বদাই আপনার ভক্তদের সম্মান বৃদ্ধি করেন, তাই আপনি আপনার প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করার জন্য এবং প্রকৃত জ্ঞানের পন্থা উপদেশ দেওয়ার জন্য আমার গৃহে অবতীর্ণ হয়েছেন। হে ভগবন্! যদিও আপনার কোন জড় রূপ নেই, তবুও আপনার অনন্ত রূপ রয়েছে। সেই সব কয়টি রূপই আপনার চিন্ময় বিগ্রহ, যা আপনার ভক্তদের অত্যন্ত প্রিয়। হে ভগবান! আপনার শ্রীপাদপদ্ম সর্বদাই পরমতত্ত্ব সম্বন্ধে জানতে আগ্রহী সমস্ত মহর্ষিদের অভিবাদনের যোগ্য। আপনি ঐশ্বর্য, বৈরাগ্য, দিব্য যশ, জ্ঞান, বীয় এবং শ্রী- এই ষড়বিধ ঐশ্বর্যে পরিপূর্ণ, তাই আমি আপনার শ্রীপাদপদ্মের শরণাগত হয়েছি। আমি কপিলরূপে অবতীর্ণ পরমেশ্বর ভগবানের শরণ গ্রহণ করি, যিন স্বতন্ত্রভাবে শক্তিমান এবং দিব্য, যিনি পরম পুরুষ এবং মহত্তত্ত্ব ও মহাকাল, যিনি ত্রিগুণাত্মিকা বিশ্বের সর্বজ্ঞ পালনকর্তা এবং যিনি প্রলয়ের পর সমগ্র জড় জগৎকে আত্মসাৎ করে নেন। সমস্ত জীবের প্রভু আপনার কাছে আজ আমার কিছু জিজ্ঞাসা করার রয়েছে। যেহেতু আপনি আমাকে আমার পিতৃ-ঋণ থেকে মুক্ত করেছেন এবং আমার সমস্ত বাসনা পূর্ণ হয়েছে, তাই আমি সন্ন্যাস আশ্রম অবলম্বন করতে চাই। এই গৃহস্থ জীবন ত্যাগ করে, শোক-রহিত হয়ে, আপনাকে সর্বদাই স্মরণ করে, আমি ইতস্তত বিচরণ করতে চাই।”
পরমেশ্বর ভগবান কপিলদেব বললেন- “হে মুনে, সরাসরিভাবে অথবা শাস্ত্রে আমি যা কিছু বলি, তা জগতের সকলের কাছে সর্বতোভাবে প্রামাণিক। আমি পূর্বে আপনাকে বলেছিলাম যে, আপনার পুত্ররূপে আমি জন্ম গ্রহণ করব, তা সত্য প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে আমি অবতরণ করেছি। এই জগতে আমার আবির্ভাবের বিশেষ উদ্দেশ্য হচ্ছে সাংখ্য দর্শন বিশ্লেষণ করা, যা অনর্থপূর্ণ জড় বাসনার বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার অভিলাষী মুমুক্ষুদের দ্বারা অত্যন্ত সমাদৃত। আত্ম উপলব্ধির এই দুর্জ্ঞেয় পন্থা কালের প্রভাবে এখন লুপ্ত হয়ে গেছে, সেই দর্শন মানব-সমাজে পুনরায় প্রবর্তন করার জন্য এবং বিশ্লেষণ করার জন্য, আমি কপিলরূপে এই দেহ ধারণ করেছি বলে জানবেন। এখন আমার দ্বারা আদিষ্ট হয়ে, আপনার সমস্ত কার্যকলাপ আমাতে অর্পণ করে, আপনি যেখানে ইচ্ছা সেখানে যেতে পারেন। অজেয় মৃত্যুকে জয় করে, অমৃতত্ত্ব লাভের জন্য আপনি আমার ভজনা করুন। আপনি আপনার বুদ্ধির দ্বারা আপনার হৃদয়ে, সমস্ত জীবের অন্তরে স্বপ্রকাশ পরমাত্মারূপে বিরাজমান আমাকে সর্বদা দর্শন করবেন। তার ফলে আপনি শোক এবং ভয় থেকে মুক্ত নিত্য জীবন প্রাপ্ত হবেন। আমি আমার মাতাকেও পারমার্থিক জীবনের দ্বার-স্বরূপ এই পরম জ্ঞান বর্ণনা করব, যাতে তিনিও সমস্ত সকাম কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে আত্ম উপলব্ধি করতে পারেন এবং পূর্ণতা লাভ করতে পারেন। তার ফলে তিনিও সমস্ত জড়-জাগতিক ভয় থেকে মুক্ত হতে পারবেন।”
শ্রীমৈত্রেয় বললেন- “এইভাবে তাঁর পুত্র কপিল কর্তৃক পূর্ণরূপে উপদিষ্ট হয়ে, প্রজাপতি কর্দম মুনি তাঁকে পরিক্রমা করে প্রসন্ন চিত্তে তৎক্ষণাৎ বনে গমন করেছিলেন। সর্বদা পরমেশ্বর ভগবানকে স্মরণ করার জন্য এবং সর্বতোভাবে তাঁর শরণ গ্রহণ করার জন্য, কর্দম মুনি মৌনব্রত অবলম্বন করেছিলেন। নিঃসঙ্গ হয়ে, একজন সন্ন্যাসরূপে তিনি পৃথিবীর সর্বত্র বিচরণ করতে লাগলেন, অগ্নি এবং আশ্রয়ের সঙ্গে তাঁর কোন সম্পর্ক ছিল না। তিনি তাঁর মনকে কার্য-কারণের অতীত, প্রকৃতির তিনটি গুণের প্রকাশক, গুণাতীত এবং ঐকান্তিক ভক্তির দ্বারা অনুভূত পরমেশ্বর ভগবান পরব্রহ্মে স্থির করেছিলেন।”
“এইভাবে তিনি ক্রমশ অহঙ্কার থেকে মুক্ত হয়েছিলেন এবং মমতাশূন্য হয়েছিলেন। অবিচলিত, সকলের প্রতি সমদর্শী এবং দ্বৈত ভাব-রহিত হয়ে, তিনি যথাযথবাবে আত্ম-দর্শন করেছিলেন। তাঁর মন অন্তর্মুখী হয়েছিল এবং তিনি তরঙ্গের দ্বারা অবিচলিত সমুদ্রের মতো প্রশান্ত হয়েছিলেন। এইভাবে তিনি বদ্ধ জীবন থেকে মুক্ত হয়ে, সর্বান্তর্যামী সর্বজ্ঞ পরমেশ্বর ভগবান বাসুদেবের দিব্য প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত হয়েছিলেন। তিনি দেখলেন যে, পরমেশ্বর ভগবান সকলেই হৃদয়ে অবস্থিত এবং সকলেই তাঁর মধ্যে অবস্থিত, কেননা তিনিই হচ্ছেন সকলের পরমাত্মা। নিষ্কলুষ ভগবদ্ভক্তি সম্পাদন করার ফলে, সমস্ত দ্বেষ এবং ইচ্ছা থেকে মুক্ত হয়ে, সকলের প্রতি সমদর্শী হয়ে, কর্দম মুনি ভাগবতী গতি প্রাপ্ত হয়েছিলেন।”

Leave a Reply

June 2025
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30  

Blog Stats

  • 140,959 hits