মৈত্রেয় বললেন- “তাঁর পিতা-মাতা প্রস্থান করলে, সাধ্বী দেবহূতি, যিনি তাঁর পতির মনোভাব বুঝতে পারতেন, নিরন্তর গভীর প্রীতি সহকারে তাঁর পতির সেবা করেছিলেন, ঠিক যেমন পার্বতী দেবী তাঁর পতি শিবের সেবা করেন। হে বিদুর! দেবহূতি অন্তরে এবং বাহিরে পবিত্র হয়ে অন্তরঙ্গভাবে, গভীর শ্রদ্ধা সহকারে, সংযত চিত্তে প্রীতি এবং মধুর বাক্যের দ্বারা তাঁর পতির সেবা করেছিলেন। অবিচলিতভাবে এবং উদ্যম সহকারে কার্য করে, সমস্ত কাম, দম্ভ, দ্বেষ, লোভ, পাপাচরণ এবং অহঙ্কার পরিত্যাগ করে, তিনি তাঁর অত্যন্ত তেজস্বী পতির সন্তুষ্টি বিধান করেছিলেন। মনুর কন্যা, যিনি ছিলেন তাঁর পতির প্রতি সম্পূর্ণরূপে অনুরক্ত, তিনি তাঁর পতিকে বিধাতার থেকেও বড় বলে মনে করতেন। তাই, তিনি তাঁর কাছ থেকে মহা আশীর্বাদ প্রত্যাশা করেছিলেন। দীর্ঘ কাল ব্রত আচরণপূর্বক তাঁর সেবা করার ফলে, তাঁর শরীর দূর্বল এবং ক্ষীণ হয়েছিল। তাঁর সেই অবস্থা দেখে দেবর্ষিশ্রেষ্ঠ কর্দম ব্যথিত হয়েছিলেন এবং গভীর প্রেমে গদগদ স্বরে তাঁকে বলতে লাগলেন- হে স্বায়ম্ভুব মনুর সম্মানীয়া কন্যা! আজ আমি তোমার গভীর অনুরাগময়ী ভক্তি এবং প্রেমপূর্ণ সেবায় অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছি। দেহধারীদের কাছে তাদের দেহ অত্যন্ত প্রিয়, কিন্তু তমি সেই দেহকেও আমার জন্য ক্ষয় করতে দ্বিধাবোধ করনি দেখে, আমি অত্যন্ত আশ্চর্য হয়েছি। আমি স্বধর্মে রত থেকে তপস্যা, ধ্যান এবং কৃষ্ণভক্তির আচরণ করে, ভগবানের আশীর্বাদ লাভ করেছি। তুমি যদিও ভয় এবং শোক-রহিত এই উপলব্ধিগুলি এখনও অনুভব করনি, তবুও সেইগুলি আমি তোমাকে দান করব, কেননা তুমি ভক্তি সহকারে আমার সেবা করেছ। দেখ, আমি তোমাকে দিব্য দৃষ্টি প্রদান করছি, যার দ্বারা তুমি দেখতে পাবে সেইগুলি কত সুন্দর। ভগবানের কৃপা ব্যতীত অন্য উপভোগে কি লাভ? পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণুর ভ্রূকুটি সঞ্চালনে সমস্ত জড় বিষয় ধ্বংস হয়ে যায়। তোমার পতিব্রতা ধর্মের প্রভাবে, তুমি দিব্য উপহারসমূহ প্রাপ্ত হয়েছ এবং এই সমস্ত দিব্য সম্পদ অতি সম্ভ্রান্ত কুলে জন্মগ্রহণকারী এবং প্রভূত ধন-সম্পদের অধিকারী ব্যক্তিদের পক্ষেও দুর্লভ।”
“সর্ব প্রকার দিব্য জ্ঞানে অদ্বিতীয় তাঁর পতির বাণী শ্রবণ করে, অবলা দেবহূতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিলেন। তাঁর মুখমন্ডল স্মিত হাস্য এবং ঈষৎ সঙ্কোচপূর্ণ দৃষ্টিপাতের ফলে, আরও সুন্দর হয়ে উঠেছিল এবং তিনি প্রণয় ও বিনয়-জনিত গদগদ স্বরে বলতে লাগলেন- হে প্রিয় পতি! হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ! আমি জানি যে, আপনি সর্ব সিদ্ধি লাভ করেছেন এবং আপনি সমস্ত অচ্যুত যোগ-শক্তির অধিকারী, কেননা আপনি যোগমায়ার আশ্রয়ে রয়েছেন। কিন্তু এক সময় আপনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, আমাদের দৈহিক মিলন সার্থক হবে, কেননা মহান পতি প্রাপ্ত হয়ে, সাধ্বী স্ত্রীর সন্তান লাভ করা একটি মস্ত বড় গুণ। হে প্রভু! আমি আপনার প্রতি কামার্তা হয়েছি। তাই দয়া করে আপনি শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে ব্যবস্থা করুন, যাতে অতৃপ্ত রতিস্পৃহা হেতু আমার কৃশ শরীর আপনার যোগ্য হতে পারে। সেই উদ্দেশ্য সাধনের উপযুক্ত একটি গৃহের কথাও আপনি বিবেচনা করুন।”
মৈত্রেয় ঋষি বললেন- “হে বিদুর! তাঁর প্রিয় পত্নীর প্রীতি সাধনের উদ্দেশ্যে, কর্দম মুনি তাঁর যোগ-শক্তি প্রয়োগ করে, তৎক্ষণাৎ ইচ্ছা অনুসারে গমনশীল এক প্রাসাদ-সদৃশ বিমান সৃষ্টি করেছিলেন। সেইটি ছিল সব রকম রত্নে খচিত, মণি-মাণিক্যের স্তম্ভে শোভিত এবং সমস্ত বাসনা পূরণকারী এক আশ্চর্যজনক প্রাসাদ। সেইটি সব রকম আসবাবপত্র এবং ঐশ্বর্যের দ্বারা সুশোভিত ছিল এবং যা কালক্রমে ক্রমশ বর্ধনশীল ছিল। সেই প্রাসাদটি সর্ব প্রকার প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দ্বারা সুসজ্জিত ছিল এবং তা সর্ব ঋতুতে সুখদায়ক ছিল। তার চারিদিকে পতাকা, পট্রিকা, এবং বিভিন্ন বর্ণের শিল্পকলার দ্বারা সজ্জিত ছিল। তা সুন্দর পুষ্প-মালায় সুসজ্জিত ছিল, যার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে মধুকরেরা গুঞ্জন করছিল এবং তা দুকুল, ক্ষৌম, কৌশেয় প্রভৃতি নানাবিধ বস্ত্রের দ্বারা সুসজ্জিত ছিল। সেই প্রাসাদে উপর্যুপরি বিরচিত সাতটি তলায় স্থানে স্থানে শয্যা, পালঙ্ক, ব্যজন ও আসনাদির দ্বারা সুসজ্জিত থাকায়, অত্যন্ত মনোহর প্রতিভাত হয়েছিল। সেই প্রাসাদের দেওয়ালগুলি নানাবিধ শিল্প-কার্যের দ্বারা ভূষিত থাকায় তার শোভা আরও বর্ধিত হয়েছিল। সেই প্রাসাদের মেঝে ছিল মরকত মণির দ্বারা রচিত এবং সেখানে প্রবাল দ্বারা রচিত বেদিসমূহ বিরাজ করছিল। প্রবাল নির্মিত দ্বারদেশ এবং হীরক খচিত কপাট সমন্বিত হওয়ায়, সেই প্রাসাদ অত্যন্ত সৌন্দর্যমন্ডিত ছিল। ইন্দ্রনীল মণি রচিত প্রাসাদের চূড়ায়, স্বর্ণ-কুম্ভসমূহ মুকুটের মতো শোভা পাচ্ছিল। হীরকময় দেওয়ালে শ্রেষ্ঠ পদ্মরাগ মণিসমূহ খচিত থাকায়, মনে হচ্ছিল যেন তারা চক্ষুষ্মান। তা বিচিত্র চন্দ্রাতপের দ্বারা সজ্জিত ছিল এবং তাতে বহুমূল্য সোনার তোরণ ছিল। সেই প্রাসাদে ইতস্তত বহু জীবন্ত হংস এবং পারাবত ছিল এবং বহু কৃত্রিম হংস ও পারাবতও ছিল, যেগুলিকে দেখতে এতই জীবন্ত বলে মনে হত যে, প্রকৃত জীবন্ত হংস ও পারাবতের ঝাঁক সেইগুলিকে তাদেরই মতো জীবন্ত পক্ষী বলে মনে করে, তাদের উপর বার বার উড়ে বসতো এবং তার ফলে সেই প্রাসাদ পক্ষীর কলরবে মুখরিত ছিল। সেই প্রাসাদের ক্রীড়াস্থল, বিশ্রামকক্ষ, শয়নকক্ষ, প্রাঙ্গন এবং বহিরাঙ্গন এমন আরামদায়কভাবে সজ্জিত ছিল যে, তা স্বয়ং কর্দম মুনিরও বিস্ময় উৎপাদন করেছিল।”
“কর্দম মুনি যখন দেখলেন যে, দেবহূতি অপ্রসন্ন চিত্তে সেই বিশাল, ঐশ্বর্যমন্ডিত প্রাসাদটিকে দেখছেন, তখন তিনি তাঁর মনোভাব বুঝতে পেরেছিলেন, কেননা তিনি সকলেরই হৃদয়ের ভাবনা জানতে সক্ষম ছিলেন। তাই তিনি তাঁর পত্নীকে বলেছিলেন- হে প্রিয় দেবহূতি! তোমাকে অত্যন্ত ভীতা বলে মনে হচ্ছে। তুমি স্বয়ং ভগবান বিষ্ণুর সৃষ্ট এই বিন্দু সরোবরে স্নান কর, যা মানুষের সমস্ত বাসনা পূর্ণ করতে পারে এবং তার পর এই বিমানে আরোহন কর। কমল-নয়না দেবহূতি তাঁর পতির সেই বাক্য স্বীকার করেছিলেন। তাঁর বসত ছিল মলিন এবং তাঁর মাথার চুল ছিল জটাযুক্ত, তাই তাঁকে দেখতে খুব একটা আকর্ষণীয়া লাগছিল না। তাঁর দেহ ধূলি-পঙ্কের ঘন আস্তরণে সমাচ্ছন্ন ছিল এবং তাঁর স্তনযুগল বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল। তিনি সেই অবস্থাতেই সরস্বতীর পবিত্র জলে পূর্ণ সেই সরোবরে প্রবেশ করেছিলেন। সেই সরোবরের মধ্যে একটি গৃহে তিনি এক হাজার বালিকাকে দেখতে পেলেন, তারা সকলেই ছিলেন কিশোর বয়স্কা এবং পদ্মগন্ধা। তাঁকে দেখে সেই বালিকারা তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে করজোড়ে বললেন, “আমরা আপনার পরিচারিকা। দয়া করে আমাদের বলুন, আমরা আপনার জন্য কি করতে পারি?” সেই বালিকারা দেবহূতির প্রতি অত্যন্ত সম্মান প্রদর্শন করে, অতি মূল্যবান তৈলাদির দ্বারা তাঁর গাত্র মর্দন করিয়ে স্নান করিয়েছিল এবং তার পর তাঁর পরিধানের জন্য নতুন এবং সূক্ষ্ম নির্মল বস্ত্র দিয়েছিল। তার পর তারা তাঁকে শ্রেষ্ঠ এবং বহুমূল্য অলঙ্কার দ্বারা সাজিয়েছিল, যা উজ্জ্বল জ্যোতি বিকিরণ করছিল। তার পর তারা তাঁকে সর্ব গুণ-সমন্বিত উত্তম আহার্য এবং আসব নামক এক প্রকার মধুর পানীয় পান করিয়েছিলেন। তার পর তিনি আয়নায় তাঁর নিজের প্রতিবিম্ব দর্শন করলেন। তাঁর দেহ সব রকম মল থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হয়েছিল এবং তিনি একটি মাল্যের দ্বারা অলঙ্কৃত ছিলেন। তাঁর পরনে ছিল এক নির্মল বস্ত্র এবং তিনি শুভ তিলক চিহ্নের দ্বারা বিভূষিত ছিলেন। তাঁর পরিচারিকাদের দ্বারা তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধা সহকারে সেবিত হচ্ছিলেন। মস্তক সহ তাঁর সারা শরীর সম্পূর্ণরূপে স্নাত হয়েছিল, তিনি সর্বাঙ্গে নানা অলঙ্কারে বিভূষিতা ছিলেন। তাঁর গলায় ছিল একটি পদকযুক্ত এক বিশেষ হার। তাঁর হাতে বলয় এবং পদযুগলে শব্দায়মান স্বর্ণ-নূপুর শোভা পাচ্ছিল। তিনি তাঁর কটিদেশে বহু রত্ন-খচিত এক স্বর্ণ-মেখলা পরিধান করেছিলেন এবং গলদেশে এক মহামূল্যের মুক্তোর মালা ও নানাবিধ মঙ্গল দ্রব্য নিয়ে তাঁকে আরও বিভূষিত করা হয়েছিল। তাঁর মুখমন্ডল সুন্দর দন্ত এবং মনোহর ভ্রূযুগলের দ্বারা উদ্ভাসিত ছিল। তাঁর সুস্নিগ্ধ অপাঙ্গযুক্ত নেত্র পদ্মকলির সৌন্দর্যকে পরাস্ত করছিল। তাঁর মুখমন্ডল কুঞ্চিত কৃষ্ণ কেশদামে আবৃত ছিল। যখন তিনি ঋষিদের মধ্যে অগ্রগণ্য তাঁর পরম প্রিয় পতি কর্দম মুনিকে স্মরণ করেছিলেন, তখন তিনি তাঁর পরিচারিকাগণ সহ তৎক্ষণাৎ তাঁর সমক্ষে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁর পতির সমক্ষে সহস্র পরিচারিকা পরিবৃতা হয়ে এবং তাঁর পতির যোগ-শক্তি দর্শন করে, তিনি বিস্মিতা হয়েছিলেন।”
“কর্দম মুনি দেখলেন যে, দেবহূতি স্নান করে নির্মল হয়ে, এমন সুন্দরভাবে শোভা পাচ্ছিলেন যে, তিনি যেন তাঁর পূর্বের পত্নী নন। তিনি তাঁর পূর্বের রাজকন্যার মতো সৌন্দর্য ফিরে পেয়েছিলেন। অত্যন্ত সুন্দর বসনে আবৃত তাঁর মনোহর কুচযুগল শোভা পাচ্ছিল এবং এক হাজার বিদ্যাধরী তাঁর সেবা করার প্রতীক্ষা করছিল।”
“হে শত্রুহারি, পত্নীর প্রতি কর্দম মুনির অনুরাগ তখন বর্ধিত হয়েছিল এবং তিনি তাঁকে সেই প্রাসাদোপম বিমানে আরোহন করিয়েছিলেন। বিদ্যাধারীগণ কর্তৃক সেবিতা প্রিয়তমা পতœীর প্রতি আপাত দৃষ্টিতে আসক্ত হলেও, কর্দম মুনির মহিমা লুপ্ত হয়নি, যা ছিল তাঁর আত্মসংযম। সেই প্রাসাদ-সদৃশ বিমানে কর্দম মুনি পরিচারিকাগণ কর্তৃক পরিবেষ্টিত হয়ে শোভা পাচ্ছিলেন, ঠিক যেমন আকাশে কুমুদ প্রকাশক চন্দ্র তারকা-বেষ্টিত হয়ে শোভা পায়। সেই প্রাসাদোপম বিমানে তিনি মেরু পর্বতের প্রমোদ উপত্যকায় ভ্রমণ করেছিলেন, যা কাম উদ্দীপক শীতল, সুগন্ধিত মন্দ বায়ুর প্রভাবে আরও অধিক সুন্দর হয়েছিল। সেই সমস্ত উপত্যকায় দেবতাদের কোষাধ্যক্ষ কুবের সুন্দরী রমণীগণ পরিবৃত হয়ে এবং সিদ্ধদের দ্বারা বন্দিত হয়ে, সাধারণত আনন্দ উপভোগ করেন। কর্দম মুনিও তাঁর পত্নী ও সুন্দরী রমণীদের দ্বারা পরিবৃতা হয়ে সেখানে গিয়েছিলেন এবং বহু বহু বছর ধরে আনন্দ উপভোগ করেছিলেন। তাঁর পত্নী কর্তৃক সন্তুষ্ট হয়ে, তিনি সেই বিমানে কেবল মেরু পর্বতেই নয়, বৈশ্রম্ভক, সুরসন, নন্দন, পুষ্পভদ্রক ও চৈত্ররথ প্রভৃতি উদ্যানে এবং মানস সরোবরে আনন্দ উপভোগ করেছিলেন। বায়ু যেমন অপ্রতিহতভাবে সর্বত্র বিচরণ করতে পারে, ঠিক সেইভাবে তিনি বিভিন্ন লোকে বিচরণ করেছিলেন। তাঁর সেই অত্যন্ত শ্রেষ্ঠ, দীপ্তিশালী এবং ইচ্ছানুসারে গমনশীল বিমানে চড়ে তিনি যখন গগন-মার্গে বিচরণ করছিলেন, তখন তিনি দেবতাদেরও অতিক্রম করেছিলেন। যাঁরা পরমেশ্বর ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের শরণ গ্রহণ করেছেন, সেই দৃঢ় সংকল্পচিত্ত ব্যক্তিদের পক্ষে কি কোন বস্তু দুর্লভ হতে পারে? তাঁর শ্রীপাদপদ্ম সংসার ভয় নাশকারী গঙ্গার মতো পবিত্র নদীর উৎস। তাঁর পত্নীকে বহু আশ্চর্যে পূর্ণ ব্রহ্মান্ডের বিভিন্ন মন্ডল প্রদর্শন করিয়ে, মহা যোগী কর্দম মুনি তাঁর নিজের আশ্রমে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। তাঁর আশ্রমে ফিরে এসে, তিনি রমণ উৎসুকা মনুকন্যা দেবহূতিকে রতি সুখ প্রদান করার জন্য নিজেকে নয়রূপে বিভক্ত করেছিলেন। এইভাবে তিনি তাঁর সঙ্গে বহু বৎসর ধরে আনন্দ উপভোগ করেছিলেন, যা তাঁর কাছে এক মুহূর্তের মতো প্রতীত হয়েছিল। দেবহূতিও সেই বিমানে রমণেচ্ছা বর্ধনকারী পরম উৎকৃষ্ট শয্যায় তাঁর অত্যন্ত রূপবান পতির সঙ্গে রমণরতা থাকায়, কত সময় যে অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিল, তা বুঝতে পারেননি। সেই দম্পত্তি যখন কাম-সুখের জন্য অত্যন্ত লালায়িত হয়ে রমণ-সুখ উপভোগ করছিলেন, তখন এক শত শরৎ ঋতু অল্প কালের মতো অতিবাহিত হয়েছিল।”
“শক্তিশালী কর্দম মুনি সকলের মনের কথা জানতেন এবং তিনি সকলের বাসনা পূর্ণ করতে পারতেন। আত্ম-তত্ত্ববিৎ কর্দম মনি দেবহূতিকে তাঁর অর্ধাঙ্গিনীরূপে বিবেচনা করেছিলেন। নিজেকে নবধা বিভক্ত করে, তিনি দেবহূতির গর্ভে নয়বার বীর্যপাত করেছিলেন। তার ঠিক পরেই, সেই দিনই, দেবহূতি নয়টি কন্যা-সন্তান প্রসব করেছিলেন। সেই কন্যারা সকলেই ছিল সর্বাঙ্গসুন্দরী এবং তাদের দেহ থেকে রক্ত-পদ্মের সুগন্ধ নির্গত হচ্ছিল।”
“তিনি যখন দেখলেন যে, তাঁর পতি গৃহ ত্যাগ করতে উদ্যত হয়েছেন, তখন তিনি বাইরে ঈষৎ হাস্যন্বিতা হলেও, অন্তরে অত্যন্ত বিচলিত এবং সন্তপ্ত হয়েছিলেন। সেখানে দাঁড়িয়ে তাঁর মণি-সদৃশ শোভাযুক্ত পদনখের দ্বারা তিনি ভূমি লিখন করতে (দাগ কাটতে) লাগলেন। অধোমুখী হয়ে, অশ্রুধারা সংবরণ করে, তিনি সুমধুর বচনে ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন।”
দেবহূতি বললেন- “হে প্রভো! আপনি আমার কাছে যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা সবই আপনি পূর্ণ করেছেন, কিন্তু আমি যেহেতু আপনার শরণাগত, তাই কৃপা করে আপনি আমাকে অভয় দান করুন। হে ব্রাহ্মণ, আপনার কন্যারা তাদের উপযুক্ত পতি অন্বেষণ করে তাদের পতিগৃহে চলে যাবে। কিন্তু সন্ন্যাসী হয়ে আপনি বনে চলে যাওয়ার পর, কে আমাকে সান্ত্বনা দেবে? এতকাল পর্যন্ত আমি ভগবৎ তত্ত্বজ্ঞানের অনুশীলন না করে, কেবল ইন্দ্রিয়-তৃপ্তি সাধনের বিষয়ে আমার সময় বৃথা অতিবাহিত করেছি। আমি ইন্দ্রিয়ের বিষয়ে আসক্ত হয়ে আপনাকে ভাল বেসেছিলাম, আপনার চিন্ময় স্থিতি সম্বন্ধে আমি তখন জানতে পারিনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও আপনার প্রতি আমার যে-আসক্তি, তা আমাকে সমস্ত ভয় থেকে মুক্ত করুক। ইন্দ্রিয় তৃপ্তি-পরায়ণ ব্যক্তিদের সঙ্গ অবশ্যই সংসার বন্ধনের মার্গ। কিন্তু সেই সঙ্গ যদি অজ্ঞাতসারেও সাধুদের সঙ্গে করা হয়, তা হলে তা মুক্তির কারণ-স্বরূপ হয়ে থাকে। যে ব্যক্তির কর্ম তাকে ধর্মাভিমুখী করে না, যার ধর্ম অনুষ্ঠান জড় বিষয়ের প্রতি বিরক্তির উৎপাদন করে না এবং যার বৈরাগ্য পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি প্রেমময়ী সেবায় পর্যবসিত হয় না, সেই ব্যক্তি জীবিত হলেও মৃত। হে ভগবন্! আমি অবশ্যই পরমেশ্বর ভগবানের দুরতিক্রম্য মায়াশক্তির দ্বারা প্রবলভাবে প্রতারিত হয়েছি, কেননা সংসার বন্ধন থেকে মুক্তি প্রদানকারী আপনার সঙ্গ লাভ করা সত্ত্বেও, আমি মুক্তির অন্বেষণ করিনি।”
ত্রয়োবিংশতি অধ্যায়- দেবহূতির অনুতাপ
25 Jun 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, তৃতীয় স্কন্ধ- সৃষ্টির স্থিতি