শ্রীমৈত্রেয় বললেন- “সম্রাটের অশেষ গুণাবলী এবং কার্যকলাপের মহিমা বর্ণনা করে, ঋষি মৌন হলেন এবং সম্রাট মনু নিজের প্রশংসা শ্রবণ করে, লজ্জিত হয়ে ঋষিকে বললেন। বেদরূপ ব্রহ্মা বৈদিক জ্ঞান বিস্তার করার জন্য তাঁর মুখ থেকে আপনার মতো ব্রাহ্মণদের সৃষ্টি করেছিলেন, যাঁরা তপস্যা, জ্ঞান এবং যোগে যুক্ত এবং ইন্দ্রিয় সুখের প্রতি পরাঙ্মুখ। ব্রাহ্মণদের রক্ষার জন্য সহস্রপাৎ পরমেশ্বর তাঁর সহস্র বাহু থেকে আমাদের অর্থাৎ ক্ষত্রিয়দের সৃষ্টি করেছেন। সেই হেতু ব্রাহ্মণদের বলা হয় তাঁর হৃদয় এবং ক্ষত্রিয়দের বলা হয় তাঁর বাহু। সেই জন্য ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয় পরস্পরকে রক্ষা করার মাধ্যমে নিজেদের রক্ষা করেন; এবং পরমেশ্বর ভগবান, যিনি কার্য ও কারণরূপ হওয়া সত্ত্বেও অব্যয়, প্রকৃত পক্ষে তিনিই পরস্পরের মাধ্যমে তাঁদেরকে রক্ষা করেন। আপনার দর্শনের ফলেই কেবল আমার সমস্ত সন্দেহ দূর হয়েছে, কেননা আপনি অত্যন্ত কৃপাপূর্বক প্রজাপালনে আগ্রহী রাজার কর্তব্য সম্বন্ধে স্পষ্টভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। আমার সৌভাগ্যক্রমে আমি আপনার দর্শন লাভ করেছি, কেননা যারা তাদের মনকে দমন করেনি এবং ইন্দ্রিয়গুলিকে সংযত করেনি, তাদের পক্ষে আপনার দর্শন লাভ করা দুষ্কর। এইটি আমার পরম সৌভাগ্য যে, আমি আপনার পবিত্র পদধূলি আমার মস্তক দ্বারা স্পর্শ করতে পেরেছি। আমার সৌভাগ্যের ফলে আমি আপনার উপদেশ লাভ করেছি এবং এইভাবে আপনি আমার উপর মহৎ কৃপা বর্ষণ করেছেন। আমি ভগবানকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি, আমি অনাবৃত কর্ণ-কুহরের দ্বারা আপনার বিশুদ্ধ বাণী শ্রবণ করতে পেরেছি।”
“হে মহর্ষি! কৃপাপূর্বক আমার প্রতি প্রসন্ন হয়ে, আপনি আমার বিনীত নিবেদন শ্রবণ করুন, কেননা আমার কন্যার প্রতি স্নেহবশত আমার মন ব্যাকুল হয়েছে। আমার এই কন্যাটি প্রিয়ব্রত ও উত্তানপাদের ভগ্নী। সে বয়স, চরিত্র এবং সদ্গুণ-সমন্বিত উপযুক্ত পতির অন্বেষণ করছে। যে মুহূর্তে সে নারদ মুনির কাছ থেকে আপনার উন্নত চরিত্র, বিদ্যা, রূপ, বয়স ও গুণাবলীর কথা শ্রবণ করে, তখন থেকে সে আপনাকেই পতিত্বে বরণ করবে বলে দৃঢ় সঙ্কল্প করেছে। অতএব, হে ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ! দয়া করে আপনি একে গ্রহণ করুন, কেননা আমি শ্রদ্ধা সহকারে আপনার কাছে একে নিবেদন করছি। আমার এই কন্যা সর্বতোভাবে আপনার পত্নী হওয়ার উপযুক্ত এবং সে আপনার গৃহস্থ আশ্রমের সমস্ত কর্তব্য কর্মের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবে। যেহেতু বিষয়ের প্রতি বিরক্ত ব্যক্তিরও আপনা থেকে উপস্থিত বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়, অতএব যে কামাসক্ত তার সম্বন্ধে আর কি বলার আছে। যে ব্যক্তি আপনা থেকে আগত কাম্য বস্তুর অনাদর করে, পরে কৃপণের কাছে ভিক্ষা করে, তিনি মহা প্রতিষ্ঠাশালী হলেও তাঁর যশ ক্ষয় হয় এবং অন্যদের অবজ্ঞ করার জন্য তাঁর সম্মানও বিনষ্ট হয়।”
স্বায়ম্ভুব মনু বললেন- “হে জ্ঞানবান! আমি শুনেছি যে, আপনি বিবাহ করতে প্রস্তুত আছেন। দয়া করে আপনি আমার দ্বারা অর্পিত এই কন্যার পাণিগ্রহণ করুন, কেননা আপনি আজীবন ব্রহ্মচর্য পালনের ব্রত গ্রহণ করেননি।”
মহর্ষি উত্তর দিলেন, “আমি বিবাহ করতে ইচ্ছুক, সেই কথা সত্য। আপনার কন্যাও অন্য কারও কাছে প্রতিশ্রুতা নয় কিংবা বিবাহিতা নয়। অতএব বৈদিক বিধি অনুসারে আমাদের বিবাহ সম্পন্ন হতে পারে। আপনার কন্যার বিবাহের বাসনা, যা বৈদিক শাস্ত্রের দ্বারা অনুমোদিত, তা পূর্ণ হোক। তিনি এতই সুন্দরী যে, তাঁর অঙ্গকান্তির দ্বারা তাঁর অলঙ্কারেরও শোভা তিরস্কৃত হয়, সুতরাং কোন্ পুরুষ সমাদরপূর্বক তাঁর পাণিগ্রহণ না করবে? আমি শুনেছি যে, আপনার কন্যা যখন প্রাসাদের ছাদের উপর কন্দুক নিয়ে খেলা করছিল, তখন তাঁর পায়ের নূপুরের শব্দে তাঁর সৌন্দর্য আরও অধিক শোভাযুক্ত হয়েছিল এবং কন্দুকের প্রতি নিবদ্ধ তাঁর দৃষ্টি চঞ্চল হয়েছিল, তখন বিশ্বাবসু নামক গন্ধর্ব তাঁকে দর্শন করে, সম্মোহবশত বিমূঢ় চিত্ত হয়ে তাঁর বিমান থেকে পড়ে গিয়েছিলেন। রমণীকুলের ভূষণ-স্বরূপ, স্বায়ম্ভুব মনুর কন্যা এবং উত্তানপাদের ভগিনী এই কন্যাটিকে কোন্ বুদ্ধিমান ব্যক্তি সাদরে গ্রহণ করবে না? যারা লক্ষ্মীদেবীর চরণ-কমলের সেবা করেন, তারা এঁকে দর্শন পর্যন্ত করতে পারে না, অথচ ইনি স্বেচ্ছায় আমাকে পতিরূপে বরণ করার জন্য এখানে এসেছেন। অতএব এই সাধ্বী কন্যাকে আমি একটি শর্তে পত্নীরূপে গ্রহণ করব- যতদিন পর্যন্ত না তিনি আমার বীর্য ধারণ করেন, ততদিন পর্যন্ত আমি তাঁর ভজনা করব এবং তার পর পরমহংসেরা ভগবদ্ভক্তির যে-পন্থা অবলম্বন করেন, আমি সেই জীবন গ্রহণ করব। সেই পন্থা ভগবান শ্রীবিষ্ণু বর্ণনা করেছিলেন এবং তা হিংসা-রহিত। যাঁর থেকে এই বিচিত্র জগৎ উদ্ভূত হয়েছে, যিনি তা পালন করছেন এবং অন্তে যাঁর মধ্যে তা লীন হয়ে যাবে, সেই অনন্ত পরমেশ্বর ভগবান আমার পরম প্রভু। তিনি এই জগতে জীবেদের জন্মদানকারী প্রজাপতিদেরও উৎস।”
শ্রীমৈত্রেয় বললেন- “হে মহান যোদ্ধা বিদুর! মহর্ষি কর্দম কেবল এই পর্যন্ত বলেই তাঁর আরাধ্য অরবিন্দনাভ ভগবান বিষ্ণুর চিন্তা করে মৌন হলেন। তাঁর স্মিত হাস্যের দ্বারা শোভিত মুখমন্ডল তখন দেবহূতির মন হরণ করেছিল এবং তিনি তখন সেই মহর্ষির ধ্যান করতে শুরু করেছিলেন। সম্রাট তাঁর মহিষী এবং তাঁর কন্যার অভিপ্রায় স্পষ্টরূপে অবগত হয়ে, অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে বহু গুণান্বিত সেই মুনিকে তাঁর উপযুক্ত কন্যা সম্প্রদান করেছিলেন। মহারানী শতরূপা প্রীতিভরে বহুমূল্য অলঙ্কার, বসন এবং গৃহের বিবিধ উপকরণ যৌতুক-স্বরূপ দম্পতিকে প্রদান করেছিলেন। এইভাবে তাঁর কন্যাকে উপযুক্ত পাত্রে সম্প্রদান করে, স্বায়ম্ভুব মনু তাঁর দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর মন তখন বিচ্ছেদ বেদনায় ব্যথিত হয়েছিল এবং তখন তিনি স্নেহভরে তাঁর দুই বাহুর দ্বারা তাঁর কন্যাকে আলিঙ্গন করেছিলেন। কন্যার বিরহ সহ্য করতে না পেরে, সম্রাট “হে মাত! হে বৎসে!” এইভাবে সম্বোধন করতে করতে অশ্রুজলে তাঁর কন্যার মস্তক সিক্ত করেছিলেন। মহর্ষির অনুমতি নিয়ে সম্রাট তাঁর পত্নী সহ রথে আরোহন করে, তাঁর অনুগামীগণ সহ রাজধানী অভিমুখে যাত্রা করলেন। পথে তিনি ঋষিদের হিতসাধিনী সরস্বতী নদীর উভয় তটে প্রশান্ত ঋষিদের আশ্রমের শোভা-সম্পদ দেখতে পেলেন। তাঁর আগমন বার্তা পেয়ে আনন্দে উচ্ছল হয়ে, ব্রহ্মবর্ত থেকে তাঁর প্রজারা তাঁদের প্রভুকে স্বাগত জানাবার জন্য সংগীত, বাদ্য এবং স্তুতি সহকারে এগিয়ে এসেছিলেন। সর্ব সম্পদ সমন্বিত বর্হিষ্মতী নগরী এই নাম প্রাপ্ত হয়েছিলেন কেননা ভগবান শ্রীবিষ্ণু যখন বরাহরূপে প্রকট হয়েছিলেন, তখন তাঁর রোম এই স্থানে পতিত হয়। তিনি যখন দেহ কম্পন করেছিলেন, তখন তাঁর রোম এই স্থানে পতিত হয়ে, চির হরিৎ কুশ এবং কাশ ঘাসে রূপান্তরিত হয়, যার দ্বারা ঋষিরা যজ্ঞে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী অসুরদের পরাভূত করার জন্য শ্রীবিষ্ণুর উপাসনা করেছিলেন। যাঁর কৃপায় মনু এই ভূমন্ডলের উপর আধিপত্য লাভ করেছিলেন, কুশ এবং কাশ নির্মিত আসন বিছিয়ে তিনি সেই পরমেশ্বর ভগবানের আরাধনা করেছিলেন। যে বর্হিষ্মতী নগরীতে মনু পূর্বে বাস করতেন, সেখানে আগমন করে তিনি ত্রিতাপ দুঃখ-নাশক প্রাসাদে প্রবেশ করলেন। স্বায়ম্ভুব মনু তাঁর পত্নী এবং প্রজাগণ সহ জীবন উপভোগ করেছিলেন এবং ধর্ম-বিরুদ্ধ অবাঞ্ছিত কার্যকলাপের দ্বারা বিচলিত না হয়ে, তিনি তাঁর বাসনাসমূহ পূর্ণ করেছিলেন। সস্ত্রীক সুরগায়কেরা তাঁর সৎ কীর্তিসমূহের গান করতেন এবং তিনি প্রত্যুষে, তিনি প্রেমাসক্ত চিত্তে ভগবানের মহিমা কীর্তন শ্রবণ করতেন।”
স্বায়ম্ভুব মনু ছিলেন একজন রাজর্ষি। যদিও তিনি জড় সুখভোগে লিপ্ত ছিলেন, তবুও সর্বদা কৃষ্ণভাবনাময় পরিবেশে জড় সুখ উপভোগ করার জন্য তিনি নিকৃষ্টতম জীবনে অধঃপতিত হননি। তার ফলে, যদিও ধীরে ধীরে এক মন্বন্তর-ব্যাপী তাঁর দীর্ঘ আয়ু সমাপ্ত হয়ে এসেছিল, তবুও ক্ষণিকের জন্যও তার ব্যর্থ অপচয় হয়নি, কেননা তিনি সর্বদা ভগবানের লীলা শ্রবণ, মনন, লেখন এবং কীর্তনে মগ্ন ছিলেন। তিনি সর্বদা বাসুদেবের কথা চিন্তা করে এবং বাসুদেবের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়ে যুক্ত থেকে, তাঁর জীবনকাল একাত্তর চতুর্যুগ (৭১ x ৪৩,২০,০০০ বৎসর) অতিক্রম করেছিলেন। এইভাবে তিনি গতিত্রয় অতিক্রম করেছিলেন।”
“অতএব হে বিদুর! যাঁরা ভক্তিযোগে সর্বতোভাবে শ্রীকৃষ্ণের শরণ গ্রহণ করেছেন, তাঁদের শারীরিক, মানসিক, দৈবিক এবং অন্যান্য মানুষ ও জীবদের দ্বারা প্রদত্ত ক্লেশ কিভাবে পীড়া দিতে পারে? ঋষিগণ কর্তৃক জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তরে, সমস্ত জীবের প্রতি কৃপা-পরবশ হয়ে তিনি (স্বায়ম্ভুব মনু) সাধারণ মানুষের এবং বিভিন্ন বর্ণ ও আশ্রমের নানাবিধ পবিত্র কর্তব্য সম্বন্ধে উপদেশ দিয়েছিলেন। আমি কীর্তনের যোগ্য আদিরাজ মনুর এই অদ্ভুত চরিত্র তোমার কাছে বর্ণনা করলাম, এখন তাঁর কন্যা দেবহূতির প্রভাবের বর্ণনা শ্রবণ কর।”
দ্বাবিংশতি অধ্যায়- কর্দম মুনি ও দেবহূতির পরিণয়
25 Jun 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, তৃতীয় স্কন্ধ- সৃষ্টির স্থিতি