ত্রিংশতি অধ্যায়- ভগবান কপিলদেব কর্তৃক অশুভ সকাম কর্মের বর্ণনা

পরমেশ্বর ভগবান বললেন- “মেঘপুঞ্জ যেমন শক্তিশালী বায়ুর প্রভাব জানে না, ঠিক তেমনই জড় চেতনায় আচ্ছন্ন ব্যক্তি কালের অসীম বিক্রম জানতে পারে না, যার দ্বারা সে চালিত হয়। তথাকথিত সুখের জন্য জড়বাদীরা অত্যন্ত কষ্ট স্বীকার করে যে-সব প্রয়োজনীয় বস্তু উপার্জন করে, কালরূপে পরমেশ্বর ভগবান তা সবই বিনাশ করেন এবং সেই জন্য বদ্ধ জীবেরা শোক করে। পথভ্রষ্ট জড়বাদী ব্যক্তি জানে না যে, তার দেহটি অনিত্য এবং তার দেহের সঙ্গে সম্পর্কিত গৃহ, ক্ষেত্র এবং সম্পদ- সেই সবও অনিত্য। অজ্ঞানতাবশত সে সব কিছুকে নিত্য বলে মনে করে। জীব এই সংসারে যে যেই যোনিতে জন্ম গ্রহণ করে, সেই যোনিতেই সে বিশেষ সন্তোষ লাভ করে এবং সেই অবস্থায় সে কখনও বিরক্ত হয় না। যে বিশেষ যোনিতে বদ্ধ জীব রয়েছে, তাতেই সে সন্তুষ্ট থাকে। মায়ার আবরণাত্মক প্রভাবের দ্বারা বিমোহিত হয়ে, নরকে থাকলেও, তার সেই শরীরকে সে ত্যাগ করতে চায় না, কারণ সেই নারকীয় অবস্থাকেই সে সুখকর বলে মনে করে। দেহ, স্ত্রী, পুত্র, পশু, ধন, বন্ধু প্রভৃতির প্রতি গভীর আসক্তির ফলে, জীব তার জড়-জাগতিক জীবনে এই প্রকার সন্তোষ অনুভব করে। এই প্রকার সঙ্গ প্রভাবে বদ্ধ জীব নিজেকে কৃতার্থ বলে মনে করে। উৎকন্ঠায় সর্বক্ষণ দগ্ধ হওয়া সত্ত্বেও, এই প্রকার মূর্খেরা তাদের তথাকথিত কুটুম্বদের ভরণ-পোষণের জন্য দুরাশাগ্রস্থ হয়ে, সর্বদা নানা প্রকার পাপকার্যে লিপ্ত হয়। যে রমণী মায়ার দ্বারা তাকে মোহিত করে, তাকেই সে তার হৃদয় এবং ইন্দ্রিয় অর্পণ করে। নির্জন স্থানে সে তার আলিঙ্গন এবং গোপন আলাপের দ্বারা তার সঙ্গসুখ উপভোগ করে এবং শিশুদের আধ-আধ মিষ্টি বুলিতে সে মুগ্ধ হয়ে থাকে। আসক্ত গৃহব্রত ব্যক্তি কূটনীতি এবং রাজনীতিতে পূর্ণ পারিবারিক জীবনে অবস্থান করে। সর্বদা দুঃখ বিস্তার করে এবং ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির কার্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে, সে তার দুঃখ-দুর্দশার নিবৃত্তি সাধনের জন্যই কেবল কর্ম করে। যদি সে সেই দুঃখ-দুর্দশার নিবৃত্তি সাধনে সমর্থ হয়, তখন সে নিজেকে সুখী বলে মনে করে। সে ইতস্তত হিংসা আচরণ করে ধন-সম্পদ অর্জন করে এবং যদিও তার পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য সে তা করে, কিন্তু সে নিজে কেবল সেই অর্থের দ্বারা কেনা খাদ্যের স্বল্প মাত্র অংশই আহার করে এবং এইভাবে যাদের জন্য সে অন্যায়ভাবে ধন সংগ্রহ করেছিল, তাদেরই জন্য সে নরকগামী হয়। যখন তার জীবিকায় সে ব্যর্থ হয়, তখন সে বার বার তার অবস্থান উন্নতি সাধনের চেষ্টা করে, কিন্তু তার সমস্ত চেষ্টায় সে যখন ব্যর্থ হয় এবং বিনষ্ট হয়, তখন সে অত্যধিক লোভের কারণে, অন্যের ধন গ্রহণ করে। যখন সেই দুর্ভাগা তার পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণে অক্ষম হয়ে হতশ্রী হয়, তখন সে তার ব্যর্থতার কথা চিন্তা করে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে শোক করে। তাদের পালন-পোষনে তাকে অসমর্থ দেখে, তার পত্নী এবং অন্যান্য আত্মীয়েরা তাকে আর আগের মতো সম্মান করে না, ঠিক যেমন নির্দয় কৃষকেরা বৃদ্ধ বলদকে অযত্ন করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেই মূর্খ সংসার জীবনের প্রতি বিরক্ত হয় না। যাদের সে এক সময় পালন করেছিল, তাদেরই দ্বারা অবজ্ঞাভরে সে পালিত হয়। জরার প্রভাবে বিরূপাকৃতি হয়ে, সে মৃত্যুর প্রতীক্ষা করে। এইভাবে সে গৃহে ঠিক একটি পোষা কুকুরের মতো থাকে এবং অবহেলাভরে তাকে যা দেওয়া হয়, তাই সে খায়। অগ্নিমান্দ্য, অরুচি আদি নানা রকম রোগগ্রস্ত হয়ে, সে কেবল অল্প একটু আহার করে এবং অক্ষম হওয়ার ফলে, কোন রকম কাজ করতে পারে না। সেই রুগ্ন অবস্থায়, ভিতরের বায়ুর চাপে, তার চক্ষু ঠিকরে বেরিয়ে আসে এবং কফের দ্বারা তার শ্বাসনালী রুদ্ধ হয়ে যায়। তার নিঃশ্বাস নিতে তখন খুব কষ্ট হয় এবং তার গলা দিয়ে ‘ঘুর-ঘুর’ শব্দ বের হয়। এইভাবে সে মৃত্যুশয্যায় শয়ন করে। তার আত্মীয় এবং বন্ধুরা তাকে ঘিরা শোক করতে থাকে এবং যদিও সে তাদের সঙ্গে কথা বলতে চায়, তবুও কালপাশের বশবর্তী হয়ে সে আর তাদের কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। এইভাবে, অসংযত ইন্দ্রিয়ের দ্বারা কুটুম্বভরণে ব্যাপৃত ব্যক্তি তার আত্মীয়-স্বজনদের এইভাবে ক্রন্দন করতে দেখে গভীর দুঃখে তার প্রাণ ত্যাগ করে। সে অসহ্য বেদনায় অচেতন হয়ে অত্যন্ত করুণ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। মৃত্যুর সময়, সক্রোধনেত্র ভয়ঙ্কর যমদূতদের সে তার কাছে আসতে দেখে এবং তখন মহাভয়ে সে মল-মূত্র ত্যাগ করতে থাকে। রাজ্যের পাহারাদারেরা যেমন অপরাধীকে দন্ড দেওয়ার জন্য গ্রেপ্তার করে, তেমনই যে-ব্যক্তি অপরাধজনক ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির কার্যে যুক্ত ছিল, তাকে যমদূতেরা একটি শক্ত দড়ি দিয়ে তার গলায় বাঁধে এবং তার সূক্ষ্ম দেহকে আবৃত করে, যাতে তাকে অত্যন্ত কঠোর দন্ড দেওয়া যায়। এইভাবে যমদূতেরা যখন তাকে নিয়ে যায়, তখন তার হৃদয় বিদীর্ণ হয় এবং তার সর্ব শরীর কাঁপতে থাকে। পথিমধ্যে কুকুরেরা তাকে কামড়াতে থাকে এবং তখন সে তার সমস্ত পাপকর্মের কথা স্মরণ করে। এইভাবে সে অত্যন্ত ব্যথিত হয়। অপরাধীকে তীব্র সূর্য-কিরণে, তপ্ত বালুকার রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে হয়, যার দুপাশে দাবানল জ্বলে। সে যখন হাঁটতে অসমর্থ হয়, তখন যমদূতেরা তার পিঠে চাবুক দিয়ে আঘাত করে এবং সে ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় পীড়িত হলেও দুর্ভাগ্যবশত সেখানে কোন জল নেই, আশ্রয় নেই এবং বিশ্রামের কোন স্থান নেই। যমালয়ের পথে যেতে যেতে সে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ে যায় এবং কখনও কখনও সে অচেতন হয়ে পড়ে, কিন্তু তাকে জোর করে উঠতে বাধ্য করা হয়। এইভাবে শ্রীঘ্রই তাকে যমরাজের সামনে নিয়ে আসা হয়। এইভাবে দুই-তিন মুহূর্তের মধ্যে তাকে নিরানব্বই হাজার যোজন পথ অতিক্রম করতে হয় এবং তার পর তাকে তৎক্ষণাৎ ঘোর যন্ত্রণাদায়ক দন্ড দান করা হয়, যা ভোগ করতে সে বাধ্য হয়। তাকে জ্বলন্ত অঙ্গারের মধ্যে রেখে, তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দগ্ধ করা হয়, কখনও কখনও তার নিজের মাংস তাকে খেতে বাধ্য করা হয় অথবা অন্যেরা তার মাংস খায়। নরকের কুকুর এবং শকুনিরা তার নাড়ি সকল টেনে বার করে এবং তা সত্ত্বেও সে জীবিত থাকে এবং তা দেখে। সর্প, বৃশ্চিক, দংশক ইত্যাদি প্রাণী তাকে দংশন করে এবং তার ফলে সে অত্যন্ত বেদনা অনুভব করে। তার পর তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি খন্ড খন্ড করে কাটা হয় এবং হস্তীর দ্বারা বিদীর্ণ করা হয়। তাকে পর্বতশৃঙ্গ থেকে ছুঁড়ে ফেলা হয় এবং জলে অথবা গুহায় তাকে অবরুদ্ধ করা হয়। পুরুষ এবং স্ত্রী, যাদের জীবন অবৈধ যৌন আচরণের মাধ্যমে অতিবাহিত হয়েছিল, তাদের তামিস্র, অন্ধতামিস্র এবং রৌরব নামক নরকে নানা প্রকার যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়।”
“হে মাতঃ! কখনও কখনও বলা হয় যে, এই পৃথিবীতেই নরক অথবা স্বর্গের অনুভব হয়, কারণ কখনও কখনও এই পৃথিবীতেও নারকীয় যন্ত্রণা ভোগ করতে দেখা যায়। যে মানুষ পাপ কর্মের দ্বারা নিজেকে এবং তার পরিবারের সদস্যদের ভরণ-পোষণ করেছিল, এই শরীর ত্যাগ করার পর, তাকে নারকীয় যন্ত্রণা ভোগ করতে হয় এবং তার আত্মীয়-স্বজনদেরও যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। তার বর্তমান শরীর ত্যাগ করার পর, সে একলা নরকের গভীরতম অন্ধকার প্রদেশে প্রবেশ করে এবং অন্য প্রাণীদের প্রতি হিংসা করে সে যে-ধন অর্জন করেছিল, সেই পাপকে পাথেয়রূপে সে সঙ্গে নিয়ে যায়। এইভাবে পরমেশ্বর ভগবানের ব্যবস্থাপনায় কুটুম্ব পোষণকারী ব্যক্তিকে তার পাপ কর্মের ফল ভোগ করার জন্য নারকীয় অবস্থায় নিক্ষেপ করা হয়, তার অবস্থা তখন হৃত-সর্বস্ব ব্যক্তির মতো হয়। অতএব, যে ব্যক্তি অবৈধ উপায়ের দ্বারা তার পরিবার এবং আত্মীয়-স্বজন পালনে অত্যন্ত উৎসুক, সে অন্ধতামিস্র নামক নরকের গভীরতম অন্ধকার প্রদেশে প্রবেশ করে। সমস্ত কষ্টকর নারকীয় অবস্থা ভোগ করার পর এবং নিম্নতম পশু-জীবন থেকে মনুষ্য জন্মের পূর্ব পর্যন্ত সমস্ত স্তর ক্রমশ অতিক্রম করে এবং এইভাবে দন্ডভোগ করার মাধ্যমে পাপ থেকে মুক্ত হয়ে, সে পুনরায় এই পৃথিবীতে মনুষ্যরূপে জন্ম গ্রহণ করে।”

Leave a Reply

July 2025
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  

Blog Stats

  • 140,943 hits