শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “মহর্ষি মৈত্রেয়ের কাছে ভগবানের বরাহ অবতারের কথা শ্রবণ করার পর, ব্রতনিষ্ঠ বিদুর কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁর কাছে অনুরোধ করেন, যাতে তিনি কৃপাপূর্বক ভগবানের অন্যান্য অপ্রাকৃত লীলাসমূহ বর্ণনা করেন, কেননা তিনি (বিদুর) তখনও পূর্ণরূপে তৃপ্ত হতে পারেননি।”
শ্রীবিদুর বললেন- “হে মুনিশ্রেষ্ঠ! পরম্পরাক্রমে আমি শুনেছি যে, আদি দৈত্য হিরণ্যাক্ষ যজ্ঞমূতি পরমেশ্বর ভগবান (বরাহদেব) কর্তৃক নিহত হয়েছিল। হে ব্রাহ্মণ! ভগবান যখন ক্রীড়াচ্ছলে পৃথিবীকে উদ্ধার করছিলেন, তখন কি কারণে দৈত্যরাজের সঙ্গে বরাহদেবের যুদ্ধ হয়েছিল? আমার মন অত্যন্ত জিজ্ঞাসু হয়েছে, তাই আমি ভগবানের অবতারের বর্ণনা শ্রবণ করে তৃপ্ত হতে পারছি না। আপনি কৃপা করে এক শ্রদ্ধাবান ভক্তের কাছে আরও বেশি করে বর্ণনা করুন।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “হে বীর! আপনি ভক্তের উপযুক্ত প্রশ্ন করেছেন, কেননা তা পরমেশ্বর ভগবানের অবতারের সম্বন্ধে। তিনিই হচ্ছেন মরণশীল ব্যক্তিদের জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তির উপায়। মহর্ষি (নারদের) কাছ থেকে এই সমস্ত বিষয় শ্রবণ করে, মহারাজ উত্তানপাদের পুত্র (ধ্রুব) পরমেশ্বর ভগবান সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করেছিলেন এবং মৃত্যুর মস্তকে পদার্পণ করে ভগবদ্ধামে আরোহণ করেছিলেন। বরাহরূপী ভগবানের সঙ্গে দৈত্য হিরণ্যাক্ষের যুদ্ধের ইতিহাস বহু বছর আগে যখন দেবতাদের দ্বারা জিজ্ঞাসিত হয়ে দেবশ্রেষ্ঠ ব্রহ্মা বর্ণনা করেছিলেন, তখন আমি তা শ্রবণ করেছিলাম।”
দক্ষকন্যা দিতি কামশরে পীড়িতা হয়ে, সন্ধ্যাকালে তাঁর পতি মরীচিপুত্র কশ্যপের কাছে সন্তান লাভের মানসে, সন্ধ্যাবেলায় মৈথুনে লিপ্ত হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। সূর্য যখন অস্থ যাচ্ছিল, তখন সেই মহর্ষি যজ্ঞশালায় অগ্নিজিহ্ব শ্রীবিষ্ণুর উদ্দেশ্যে আহুতি প্রদান করার মাধ্যমে পূজা করে সমাধিস্থ ছিলেন। সেই স্থানে সুন্দরী দিতি তাঁর বাসনা ব্যক্ত করে বললেন- ‘হে বিদ্বান শ্রেষ্ঠ, মত্ত হস্তী যেমন কদলী বৃক্ষকে পীড়িত করে, তেমনই কন্দর্প তাঁর শরাসন গ্রহণ করে আমাকে বলপূর্বক পীড়িত করছেন। তাই আপনি আমার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে সম্পূর্ণ অনুগ্রহ প্রদর্শন করুন। আমার সপত্নীদের সমৃদ্ধি দর্শন করে আমি অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছি এবং তাই আমি সন্তান কামনা করি। এই কার্য সম্পন্ন করে আপনি সুখী হবেন। পতির আশীর্বাদে পত্নী জগতে সম্মান লাভ করেন এবং আপনার মতো পতি সন্তান লাভ করে যশস্বী হবেন, কেননা আপনার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই জগতে প্রজা বৃদ্ধি করা। পুরাকালে, আমাদের অত্যন্ত ঐশ্বর্যশালী ও দুহিতৃবৎসল পিতা দক্ষ আমাদের প্রত্যেককেই পৃথক-পৃথকভাবে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- তোমরা কাকে পতিত্বে বরণ করতে চাও। আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী পিতা দক্ষ আমাদের অভিলাষ জানতে পেরে, তাঁর তেরজন কন্যাকেই আপনার হস্তে অর্পণ করেছেন এবং তখন থেকেই আমরা সকলে আপনার অনুব্রতা। হে কমললোচন! কৃপা করে আমার বাসনা পূর্ণ করার দ্বারা আমার মঙ্গল-বিধান করুন। আর্ত ব্যক্তি যখন কোন মহাপুরুষের শরণ গ্রহণ করে, তখন তার নিবেদন বিফল হয় না।”
“হে বীর (বিদুর)! মরীচিতনয় কশ্যপ বহুভাষিণী, দীনা ও কামের দ্বারা কলুষিতা দিতিকে সান্ত্বনা দিয়ে, এইভাবে বলেছিলেন। হে ভয়ভীতা! তুমি যা অভিলাষ করছ তা আমি অবিলম্বে পূর্ণ করব, কেননা যে স্ত্রী থেকে ত্রিবর্গ সিদ্ধি লাভ হয়, তার কামনা কে না পূর্ণ করে? জলযানের সাহায্যে যেমন সমুদ্র পার হওয়া যায়, তেমনই পত্নীর সঙ্গে বাস করার মাধ্যমে ভয়ঙ্কর ভবসমুদ্র উত্তীর্ণ হওয়া যায়। হে মানিনি! পত্নী এতই সহায়তা-পরায়ণা হয় যে, পতিত সমস্ত পবিত্র কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করার ফলে তাকে পতির অর্ধাঙ্গিনী বলা হয়। পত্নীর উপর সমস্ত দায়িত্ব ন্যস্ত করে, মানুষ নিশ্চিন্তে বিচরণ করতে পারে। দুর্গপতি যেমন অনায়াসে আক্রমণকারী দস্যুদের পরাজিত করে, তেমনই পত্নীর আশ্রয় নিয়ে মানুষ ইন্দ্রিয়সমূহকে জয় করতে পারে, যা অন্যান্য আশ্রমীদের পক্ষে দুর্জয়। হে গৃহেশ্বরী! আমরা তোমার মতো হতে পারব না এবং সারা জীবন এমনকি জন্মান্তরেও প্রত্যুপকার করে তোমার ঋণ শোধ করতে পারব না। এমনকি যারা ব্যক্তিগত গুণাবলীর প্রশংসাকারী, তাদের পক্ষেও তোমার ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। যদিও তোমার ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়, তবুও অচিরেই সন্তান লাভের জন্য তোমার কামবাসনা আমি তৃপ্ত করব। কিন্তু তোমাকে কিছুক্ষণ প্রতীক্ষা করতে হবে যাতে অন্যেরা আমার নিন্দা না করে। এই বিশেষ সময়টি সবচাইতে অশুভ, কেননা এই সময় ভয়ঙ্কর দর্শন ভূতপ্রেত ও ভূতপতি রুদ্রের অনুচরেরা বিচরণ করছে। হে সাধ্বি! ভূতপতি শিব এই সন্ধ্যাকালে ভূতগণ পরিবেষ্টিত হয়ে, তাঁর বাহন বৃষভের পিঠে চড়ে ভ্রমণ করেন। ভগবান শিবের নির্মল স্বর্ণাভ দেহ ভস্মের দ্বারা আচ্ছাদিত। তাঁর জটাজুট শ্মশানের ঘূর্ণিবায়ুর ধুলির প্রভাবে ধুম্র বর্ণ। তিনি তোমার দেবর এবং তিনি তাঁর ত্রিনয়নের দ্বারা সব কিছু দর্শন করছেন। ভগবান শিব কাউকে তাঁর আত্মীয় বলে মনে করেন না, অথচ এমন কেউ নেই যিনি তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত নন; তিনি কাউকেই আদরণীয় বা নিন্দনীয় বলে মনে করেন না। আমরা তাঁর উচ্ছিষ্ট অন্ন শ্রদ্ধা সহকারে পূজা করি এবং আমাদের ব্রত হচ্ছে তাঁর পরিত্যক্ত বস্তু গ্রহণ করা। যদিও এই জড় জগতে কেউই ভগবান শিবের সমান অথবা তাঁর থেকে মহত্তর নন এবং যদিও মহাত্মাগণ তাঁদের অবিদ্যারাশি দূর করার জন্য তাঁর অনবদ্য চরিত্র অনুসরণ করেন, তবুও তিনি সমস্ত ভগবদ্ভক্তদের মুক্তি দেওয়ার জন্য স্বয়ং পিশাচের মতো আচরণ করেন। কুকুরের ভক্ষ্য এই শরীরকে যারা আত্মবৃদ্ধি করে এবং বস্ত্র, অলঙ্কার, মাল্য ও অনুলেপনের দ্বারা তার লালন-পালন করে, সেই সমস্ত মূর্খেরা তিনি (শিব) যে আত্মারাম তা না জেনে তাঁর কার্যকলাপের উপহাস করে। ব্রহ্মার মতো দেবতারাও তাঁর দ্বারা অনুষ্ঠিত ধর্ম-আচরণ অনুসরণ করেন। তিনি জড়জাগতিক সৃষ্টির কারণস্বরূপ মায়ার নিয়ন্তা। তিনি মহান এবং তাই তাঁর পিশাচবৎ আচরণ কেবল অভিনয় মাত্র।”
মৈত্রেয় বললেন- “দিতি তাঁর পতির দ্বারা এইভাবে বিজ্ঞাপিত হওয়া সত্ত্বেও কামোন্মতা বেশ্যার মতো লজ্জাহীনা হয়ে, ব্রহ্মর্ষি কশ্যপের বসন ধারণ করেছিলেন। তাঁর পত্নীর উদ্দেশ্য অবগত হয়ে, তিনি নিষিদ্ধ কর্ম করতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং পূজনীয় নিয়তির প্রতি প্রণতি নিবেদন করে, তিনি নির্জন স্থানে তার সঙ্গে শয়ন করেছিলেন। তারপর সেই ব্রাহ্মণ জলে স্নান করে, প্রাণায়ামপূর্বক বাক্ সংযম করেছিলেন এবং সনাতন ব্রহ্মজ্যোতির ধ্যান করে পবিত্র গায়ত্রী মন্ত্র জপ করেছিলেন। হে ভারত! তারপর দিতি তাঁর দোষযুক্ত আচরণের জন্য লজ্জাবশত অধোমুখী হয়ে তাঁর পতির সমীপবর্তী হয়েছিলেন, এবং তাঁকে বলেছিলেন- “হে ব্রাহ্মণ! সমস্ত জীবেদের পতি রুদ্রের কাছে আমি মহা অপরাধ করেছি, সেই জন্য তিনি যেন আমার গর্ভ বিনষ্ট না করেন। সেই রুদ্ররূপ ভগবান শিবকে আমি আমার প্রণতি নিবেদন করি, যিনি যুগপৎ ভয়ঙ্কর মহান দেবতা এবং সমস্ত জড় বাসনার পূর্ণকারী। তিনি সর্বমঙ্গলময় এবং ক্ষমাশীল, কিন্তু দন্ড দিতে তাঁর ক্রোধ তাঁকে তৎক্ষণাৎ উদ্যত করতে পারে। তিনি আমার ভগিনী সতীর পতি হওয়ার ফলে আমার ভগ্নীপতি, তাই তিনি আমাদের প্রতি প্রসন্ন হোন। তিনি সমস্ত রমণীদের পূজনীয় প্রভু। তিনি সমগ্র ঐশ্বর্যের বিগ্রহ এবং অসভ্য ব্যাধদেরও ক্ষমার্হ রমণীদের প্রতি তিনি কৃপা প্রদর্শন করতে পারেন।”
মৈত্রেয় বললেন- “পতি রুষ্ট হয়েছেন বলে ভয়ে কম্পিত কলেবরা তাঁর স্ত্রীকে মহর্ষি কশ্যপ এইভাবে সম্বোধন করলেন। দিতি বুঝতে পেরেছিলেন যে, তিনি তাঁর পতিকে প্রতিদিনকার সন্ধ্যা-নিয়ম সমাপনকার্যে নিবৃত্ত করে অপরাধ করেছিলেন, তবুও তিনি সংসারে তাঁর সন্তানদের কল্যাণ কামনা করেছিলেন।”
বিদ্বান কশ্যপ বললেন- “যেহেতু তোমার চিত্ত দূষিত ছিল, সন্ধ্যাকালীন মুহূর্ত ছিল অপবিত্র, তাছাড়া তুমি আমার আদেশ লঙ্ঘন করেছ এবং দেবতাদের অবজ্ঞা করেছ, তাই সব কিছুই অশুভ ছিল। হে ক্রোধশীলা! তোমার অভিশপ্ত গর্ভ থেকে দুটি কুলাঙ্গার পুত্র জন্মগ্রহণ করবে। হে ভাগ্যহীনা! তারা ত্রিলোকের সকলের নিরন্তর শোকের কারণ হবে। তারা দীন, নিষ্পাপ প্রাণীদের হত্যা করবে, নারীদের অত্যাচার করবে এবং মহাত্মাদের ক্রোধ উৎপাদন করবে। সেই সময় সমস্ত জীবের শুভাকাঙ্ক্ষী জগদীশ্বর ভগবান অবতীর্ণ হয়ে, ঠিক যেভাবে ইন্দ্র তাঁর বজ্রের দ্বারা পর্বতসমূহকে চূর্ণ করেন, সেইভাবে তাদের সংহার করবেন।”
দিতি বললেন- “আমার পুত্রেরা যে সুদর্শন চক্রধারী পরমেশ্বর ভগবানের হস্তের দ্বারা উদারতাপূর্বক নিহত হবে, তা অত্যন্ত শুভ। হে স্বামীন্! তারা যেন কখনও ব্রাহ্মণ ভগবদ্ভক্তদের ক্রোধের দ্বারা নিহত না হয়। যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণের দ্বারা অভিশপ্ত হয়েছে অথবা সর্বদা অন্য প্রাণীদের ভয় প্রদান করে, নারকীরাও তাকে কৃপা করে না, অথবা যেই যোনিতে তার জন্ম হয়, সেই যোনির প্রাণীরাও তার প্রতি অনুগ্রহ করে না।”
জ্ঞানবান কশ্যপ বললেন- “তোমার শোক, অনুতাপ, যথাযথ বিচার, পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি তোমার ঐকান্তিক ভক্তি এবং শিব ও আমার প্রতি তোমার শ্রদ্ধার ফলে, তোমার পুত্রের (হিরণ্যকশিপুর) পুত্রদের মধ্যে একজন (প্রহ্লাদ) ভগবানের এক সর্বমান্য ভক্ত হবেন এবং তাঁর কীর্তি ভগবানেরই কীর্তির মতো বিস্তার লাভ করবে। তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করার জন্য, সাধুরা বৈরী ভাব থেকে মুক্ত হওয়ার অভ্যাস করে, তাঁর মতো চরিত্র লাভের চেষ্টা করবে, ঠিক যেভাবে নিম্ন স্তরের স্বর্ণকে সংশোধনের উপায়ের দ্বারা শোধন করা হয়। তাঁর প্রতি সকলেই প্রসন্ন হবেন, কেননা যে ভক্ত ভগবান ব্যতীত অন্য আর কিছু কামনা করেন না, তাঁর প্রতি সমগ্র বিশ্বের নিয়ন্তা পরমেশ্বর ভগবান সর্বদা প্রসন্ন থাকেন। সেই সর্বশ্রেষ্ঠ ভগবদ্ভক্ত মহাত্মা, সহানুভব ও মহাত্মাদের মধ্যে সবচাইতে মহৎ হবেন। তাঁর পরিপক্ক ভক্তির ফলে, তিনি অবশ্যই চিন্ময়ভাব-সমাধিতে অবস্থিত হবেন এবং এই জড় জগৎ ত্যাগ করার পর চিৎ জগতে প্রবেশ করবেন। তিনি ধার্মিক, সুশীল, সমস্ত সদ্গুণের আধার হবেন। তিনি পরসুখে সুখী, পরদুঃখে দুঃখী এবং অজাতশত্রু হবেন। চন্দ্র যেমন গ্রীষ্মকালীন সূর্যের তাপ দূর করেন, তেমনই তিনি জগতের শোক হরণ করবেন। লক্ষ্মীরূপা ললনার ভূষণস্বরূপ, ভক্তের ইচ্ছা অনুসারে রূপধারণকারী, কুন্ডল-শোভিত মুখমন্ডল, কমলনয়ন পরমেশ্বর ভগবানকে তোমার পৌত্র সর্বদা অন্তরে ও বাইরে দর্শন করবেন।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “তাঁর পৌত্র একজন মহান ভক্ত হবেন এবং তাঁর পুত্রেরা শ্রীকৃষ্ণের দ্বারা নিহত হবে জেনে দিতি মনে মনে অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিলেন।”
চতুর্দশ অধ্যায়- সায়ংকালে দিতির গর্ভধারণ
02 Jun 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, তৃতীয় স্কন্ধ- সৃষ্টির স্থিতি