শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্! মহর্ষি মৈত্রের কাছ থেকে এই সমস্ত পুণ্যতম বার্তা শ্রবণ করার পর, বিদুর ভগবান বাসুদেবের কথা সম্বন্ধে প্রশ্ন করেছিলেন, যা তিনি আদরপূর্বক শুনতে চেয়েছিলেন।”
বিদুর বললেন-“হে মহর্ষি! ব্রহ্মার পুত্র স্বায়ম্ভুব তাঁর প্রিয়তম পত্নীকে লাভ করার পর কি করেছিলেন? হে সাধুশ্রেষ্ঠ! আদি রাজরাজেশ্বর (মনু) ছিলেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরির মহান ভক্ত এবং তাই তাঁর উদাত্ত চরিত্র ও কার্যকলাপ শ্রবণযোগ্য। দয়া করে আপনি তা বর্ণনা করুন। আমি তা শুনতে অত্যন্ত উৎসুক। যাঁরা সদ্গুরুর কাছ থেকে পরিশ্রমপূর্বক দীর্ঘকাল পর্যন্ত শ্রবণে প্রবৃত্ত, তাঁদের শুদ্ধ ভক্তদের চরিত্র ও কার্যকলাপ সম্বন্ধে শুদ্ধ ভক্তদের মুখ থেকে শ্রবণ করা উচিত। শুদ্ধ ভক্তোরা নিরন্তর তাঁদের হৃদযে ভক্তদের মুক্তিদাতা পরমেশ্বর ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের ধ্যান করেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “পরমেশ্বর ভগবান প্রসন্ন হয়ে বিদুরের অঙ্কে তাঁর শ্রীপাদপদ্ম স্থাপন করেছিলেন, কেননা বিদুর ছিলেন অত্যন্ত বিনীত ও স্নিগ্ধ। মহর্ষি মৈত্রেয় বিদুরের কথায় অত্যন্ত প্রীত হয়েছিলেন এবং তাঁর মনোভাবের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি বলতে শুরু করেছিলেন।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বিদুরকে বললেন- “মানবজাতির পিতা মনু তাঁর পত্নীসহ আবির্ভূত হয়ে, সমস্ত বৈদিক জ্ঞানের উৎস ব্রহ্মার প্রতি যুক্তকরে প্রণতি নিবেদন করার পর, এইভাবে বলেছিলেন। আপনি সমস্ত জীবের পিতা এবং তাদের জীবিকা নির্বাহের উৎস, কেননা তারা সকলে আপনার থেকে উৎপন্ন হয়েছে। দয়া করে আপনি আমাদের আদেশ করুন, কিভাবে আমরা আপনার সেবা করতে পারি। হে পূজনীয়! আপনি আমাদের কার্যক্ষমতা অনুসারে কর্তব্য সম্পাদন করার নির্দেশ দান করুন, যাতে আমরা তা অনুসরণ করে ইহলোকে যশোলাভ করতে পারি এবং পরলোকে সদ্গতি প্রাপ্ত হতে পারি।”
ব্রহ্মা বললেন- “হে প্রিয় পুত্র! হে ক্ষিতীশ্বর ! তুমি নিষ্কপটে আন্তরিকভাবে শিক্ষা লাভের জন্য আমার কাছে আত্মসমর্পণ করেছ, তাই আমি তোমার প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছি। আমি তোমাদের উভয়ের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করি। হে বীর! পিতার সঙ্গে পুত্রের সম্পর্কের আদর্শ দৃষ্টান্ত তুমি প্রদান করেছ। গুরুজনদের প্রতি এই প্রকার শ্রদ্ধা বাঞ্ছনীয়। যিনি ঈর্ষার সীমার অতীত এবং সংযতচিত্ত, তিনি মহানন্দে পিতার আদেশ স্বীকার করেন এবং তাঁর পূর্ণ ক্ষমতা অনুসারে তা পালন করেন। যেহেতু তমি আমার অত্যন্ত আজ্ঞাপালনকারী পুত্র, তাই আমি তোমাকে আদেশ দিচ্ছি, তোমার পত্নীর গর্ভে তোমারই মতো গুণাবলীসম্পন্ন সন্তান উৎপাদন কর। ভগবদ্ভক্তির সিদ্ধান্ত অনুসারে পৃথিবী শাসন কর এবং এইভাবে যজ্ঞ অনুষ্ঠানের দ্বারা ভগবানের আরাধনা কর। হে রাজন্! তুমি যদি জড় জগতে জীবেদের যথাযথভাবে রক্ষাণাবেক্ষণ করতে পার, তাহলে সেটি হবে আমার প্রতি তোমার শ্রেষ্ঠ সেবা। পরমেশ্বর ভগবান যখন দেখবেন যে, তুমি বদ্ধ জীবেদের সুন্দরভাবে রক্ষাণাবেক্ষণ করছ, তখন হৃষীকেশ শ্রীকৃষ্ণ নিশ্চয়ই তোমার প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হবেন। জনার্দন (শ্রীকৃষ্ণ) রূপে পরমেশ্বর ভগবান সমস্ত যজ্ঞের ফল গ্রহণ করেন। তিনি যদি সন্তুষ্ট না হন, তাহলে উৎকর্ষসাধনের উদ্দেশ্যে মানুষের সমস্ত পরিশ্রম ব্যর্থ হয়। তিনি হচ্ছেন পরম আত্মা এবং তাই যারা তাঁর সন্তুষ্টিবিধান না করে, তারা অবশ্যই স্বার্থ রক্ষায় অবহেলা করে।”
শ্রীমনু বললেন- “হে সর্বশক্তিমান প্রভু! হে সর্ব পাপনাশক! আমি আপনার আদেশ পালন করব। দয়া করে আপনি আমাকে বলুন, আমার স্থান কোথায় এবং আমার থেকে উৎপন্ন প্রজাদের স্থান কোথায়। হে দেবাদিদেব! আপনি কৃপা করে প্রলয়-সলিলে নিমগ্ন পৃথিবীকে উদ্ধার করার প্রযত্ন করুন, কেননা তা হচ্ছে সমস্ত জীবেদের বাসস্থান। আপনার প্রচেষ্টা ও পরমেশ্বর ভগবানের কৃপায় তা করা সম্ভব হবে।”
শ্রীমৈত্রেয় বললেন- “এইভাবে জলমগ্ন দেখে, ব্রহ্মা দীর্ঘকাল ধরে চিন্তা করেছিলেন, কিভাবে তাকে উদ্ধার করা যায়। ব্রহ্মা ভাবলেন, আমি যখন সৃষ্টিকার্যে মগ্ন ছিলাম, তখন পৃথিবী জলপ্লাবিত হয়ে সমুদ্রের গভীরে গমন করেছে। সৃষ্টি রচনার কার্যে যুক্ত আমরা এখন কি করতে পারি? সবচাইতে ভাল হয় যদি সর্বশক্তিমান ভগবান আমাদের নির্দেশ দেন। হে নিষ্পাপ বিদুর! ব্রহ্মা যখন এইভাবে চিন্তা করছিলেন, তখন সহসা তাঁর নাসারন্ধ্র থেকে একটি বরাহরূপ বহির্গত হয়েছিল। সেই বরাহটির আয়তন ছিল অঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ। হে ভারত! ব্রহ্মার সমক্ষে সেই বরাহ আকাশস্থ হয়ে, এক মহাকায় হস্তীর মতো এক বিশাল আকার ধারণ করেছিল। আকাশে অবস্থিত আশ্চর্যজনক সেই বরাহরূপ দর্শন করে বিস্ময়াভিভূত হয়ে, মরীচি প্রমুখ ব্রাহ্মণ, কুমারগণ ও মনুসহ ব্রহ্মা নানা প্রকার তর্ক-বিতর্ক করতে লাগলেন। কোন অসাধারণ ব্যক্তি কি ছদ্মবেশে শূকররূপে আবির্ভূত হয়েছেন? একটি অত্যন্ত আশ্চর্যজনক বিষয় যে, তিনি আমার নাসারন্ধ্র থেকে আবির্ভূত হয়েছেন। প্রথমে এই বরাহ অঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ দৃষ্ট হয়েছিল এবং ক্ষণিকের মধ্যেই তা বিশাল পাষাণের মতো হয়েছে। তার ফলে আমার মন বিক্ষুব্ধ হয়েছে। ইনি কি পরমেশ্বর ভগবান বিষ্ণু? ব্রহ্মা যখন তাঁর পুত্রগণসহ এইভাবে চিন্তা করেছিলেন, তখন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণু বিশাল পর্বতের মতো প্রচন্ড গর্জন করেছিলেন। সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর ভগবান তাঁর অসাধারণ স্বরের দ্বারা পুনরায় গর্জন করে, ব্রহ্মা ও অন্য সমস্ত উত্তম ব্রাহ্মণদের আনন্দবিধান করেছিলেন এবং সেই ধ্বনি চতুর্দিকে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। যখন জনলোক, তপোলোক ও সত্যলোকের অধিবাসী মহান মুনি ও ঋষিগণ ভগবান বরাহদেবের সেই প্রচন্ড গর্জন শ্রবণ করেছিলেন, যা ছিল পরম করুণাময় ভগবানের সর্ব মঙ্গলময় বানী, তখন তাঁরা তিন বেদ থেকে পবিত্র মন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন। মহান ভক্তদের বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণের উত্তরে, একটি গজেন্দ্রের মতো ক্রীড়া করতে করতে তিনি পুনরায় গর্জন করে জলে প্রবেশ করেছিলেন। ভগবান হচ্ছেন বৈদিক মন্ত্রের প্রতিপাদ্য বিষয় এবং তাই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভক্তদের প্রার্থনা তাঁরই উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয়েছিল। পৃথিবীকে উদ্ধার করার জন্য জলে প্রবেশ করার পূর্বে, ভগবান বরাহদেব তাঁর পুচ্ছ উত্তোলন করে আকাশে উত্থিত হলেন, তখন তাঁর কাঁধের কঠোর কেশসমূহ কম্পিত হচ্ছিল। তাঁর দৃষ্টিপাত ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং তিনি তাঁর খুরের দ্বারা ও উজ্জ্বল শুভ্রবর্ণ দন্তের দ্বারা আকাশের মেঘরাশি ছিন্নভিন্ন করেছিলেন। তিনি ছিলেন স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু এবং তাই তিনি চিন্ময়, তবুও শূকর-শরীর ধারণ করার জন্য তিনি ঘ্রাণের দ্বারা পৃথিবীর অন্বেষণ করেছিলেন। তাঁর দশন ছিল অত্যন্ত ভয়ঙ্কর এবং তিনি তাঁর স্তবকারী ব্রাহ্মণ ভক্তদের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছিলেন। এইভাবে তিনি জলে প্রবেশ করেছিলেন। বিশাল পর্বতের মতো জলে নিপতিত হয়ে, বরাহদেব মহাসমুদ্রের মধ্যভাগ বিদীর্ণ করেছিলেন, তখন দুটি অতি উচ্চ তরঙ্গ সমুদ্রের বাহুর মতো প্রকট হয়েছিল এবং মনে হয়েছিল সমুদ্র যেন তরঙ্গরূপ দীর্ঘ বাহু বিস্তার করে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, ‘হে যজ্ঞেশ্বর! আমাকে এইভাবে বিভক্ত করবেন না! দয়া করে আপনি আমাকে রক্ষা করুন!’ ভগবান বরাহদেব তীক্ষ্ণ বাণের মতো খুরের দ্বারা জলকে বিদীর্ণ করেছিলেন এবং অসীম সমুদের সীমা প্রাপ্ত হয়েছিলেন। সেখানে তিনি সমস্ত জীবের আশ্রয়স্থল পৃথিবীকে সৃষ্টির পূর্বের মতো শায়িত দেখেছিলেন এবং তখন তিনি স্বয়ং তাকে উত্তোলন করেছিলেন। ভগবান বরাহদেব অবলীলাক্রমে পৃথিবীকে তাঁর দশনাগ্রে ধারণ করে জল থেকে উত্তোলন করলেন। তখন তাঁর রূপে চতুর্দিক আলোকিত হয়েছিল। সেই সময় তাঁর ক্রোধ সুদর্শন চক্রের মতো উদ্দীপ্ত হয়েছিল। তিনি তৎক্ষণাৎ দৈত্য হিরণ্যাক্ষকে বধ করেছিলেন, যদিও সে ভগবানের সঙ্গে যুদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল। তারপর ভগবান বরাহদেব জলের মধ্যে সেই দৈত্যকে সংহার করলেন, ঠিক যেমন একটি সিংহ হস্তীকে সংহার করে। ভগবানের গন্ডদেশ ও জিহ্বা দৈত্যের রক্তে আরক্তিম হয়েছিল, ঠিক যেমন গজেন্দ্র গৈরিক মৃত্তিকা খনন করার সময় আরক্তিম হয়ে ওঠে। তখন ভগবান এক গজেন্দ্রের মতো ক্রীড়া করতে করতে তাঁর শুভ্র দশনাগ্রভাগে পৃথিবীকে ধারণ করেছিলেন। তাঁর অঙ্গকান্তি ছিল তমালের মতো নীলাভ এবং তাই, ব্রহ্মা প্রমুখ মহর্ষিগণ বুঝতে পেরেছিলেন যে, তিনি হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান এবং তাঁরা তাঁকে তাঁদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করেছিলেন।”
“গভীর শ্রদ্ধা সহকারে সমস্ত ঋষিরা তখন বলেছিলেন- “হে অজিত! হে যজ্ঞভাবন্! আপনি সর্বতোভাবে জয়যুক্ত হোন! আপনি সমস্ত বেদের মূর্তিমান বিগ্রহরূপে বিচরণ করছেন। আপনার বিগ্রহের রোমকূপে মহাসাগরসমূহ নিমজ্জিত হয়ে রয়েছে। কোন কারণবশত (পৃথিবীকে উত্তোলন করার জন্য) আপনি এখন বরাহরূপ পরিগ্রহ করেছেন। হে ভগবান! আপনার শ্রীমূতি যজ্ঞ অনুষ্ঠানের দ্বারা পূজনীয়, কিন্তু যারা দুরাত্মা তারা তা দর্শন করতে পারে না। গায়ত্রী এবং অন্য সমস্ত বৈদিক মন্ত্র আপনার ত্বকের স্পর্শে বিরাজমান। আপনার শরীরের রোমাবলীতে কুশ ঘাস, আপনার নেত্রে ঘৃত এবং আপনার চার পায়ে চার প্রকার কর্ম বিরাজ করে। হে ভগবান! আপনার জিহ্বা স্রুক, আপনার নাসিকা স্রুব, আপনার উদর ইড়া এবং আপনার কর্ণ-বিবর চমস। আপনার মুখে ব্রহ্মভাগ পাত্র প্রাশিত্র, আপনার গলা গ্রহা নামক সোমপাত্র এবং আপনি যা চর্বণ করেন তা হচ্ছে অগ্নিহোত্র। অধিকন্তু, হে প্রভু! বারবার আপনার অবতরণ হচ্ছে সর্বপ্রকার দীক্ষার বাসনা। আপনার গ্রীবা তিন প্রকার ইচ্ছার স্থান এবং আপনার দশন দীক্ষার ফল এবং সমস্ত বাসনার সমাপ্তি। আপনার জিহ্বা দীক্ষার প্রারম্ভিক কর্ম, আপনার মস্তক হোমরহিত অগ্নি ও উপাসনার অগ্নি এবং আপনার প্রাণ সমস্ত বাসনার সন্তুষ্টি। হে ভগবান! সোম নামক যজ্ঞ আপনার বীর্য! আপনার বৃদ্ধি প্রাতঃকালীন শাস্ত্রীয় আচার অনুষ্ঠান। আপনার ত্বক আদি সপ্ত ধাতু অগ্নিষ্টোম যজ্ঞের সপ্ত উপাদান। আপনার দেহসন্ধি বার দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত বিভিন্ন প্রকার যজ্ঞের প্রতীক। তাই আপনি সোম ও অসোম উভয় প্রকার সমস্ত যজ্ঞের বিষয় এবং যজ্ঞের দ্বারাই কেবল আপনি আবদ্ধ হন। হে প্রভু! আপনি পরমেশ্বর ভগবান এবং সমস্ত প্রার্থনার দ্বারা, বৈদিক মন্ত্রের দ্বারা ও যজ্ঞের উপকরণের দ্বারা আপনি পূজনীয়। আমরা আপনাকে আমাদের প্রণতি নিবেদন করি। মন যখন দৃশ্য ও অদৃশ্য সব রকম জড় কলুষ থেকে মুক্ত হয়, তখন আপনাকে উপলব্ধি করা যায়। ভক্তিময়ী জ্ঞানের পরম গুরু আপনাকে আমরা আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। হে পৃথিবী ধারণকারী, আপনি আপনার দশনাগ্রভাগে পর্বতসহ যে পৃথিবী ধারণ করেছেন তা জল থেকে বহির্গত মত্ত গজরাজের দন্তধৃত সপত্র পদ্মফুলের মতো শোভা পাচ্ছে। হে ভগবান! মহান পর্বতশ্রেণীর শৃঙ্গসমূহ যেমন মেঘরাজির দ্বারা অলঙ্কৃত হয়ে শোভা পায়, তেমনই আপনার দশন-অগ্রভাগের দ্বারা পৃথিবীকে ধারণ করার ফলে, আপনার অপ্রাকৃত বিগ্রহ সৌন্দর্যমন্ডিত হয়েছে। হে ভগবান! স্থাবর ও জঙ্গম সমস্ত জীবের বাসস্থান হওয়ার ফলে, এই পৃথিবী আপনার পত্নী এবং আপনি হচ্ছেন পরম পিতা। মাতা ধরিত্রীসহ আমরা আপনাকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। পৃথিবীর মধ্যে আপনি আপনার স্বীয় শক্তি নিহিত করেছেন, ঠিক যেমন একজন সুদক্ষ যাজ্ঞিক অরণি কাষ্ঠে অগ্নি স্থাপন করেন। হে ভগবান, আপনি ছাড়া আর কে জলের ভিতর থেকে পৃথিবীকে উদ্ধার করতে পারে? কিন্তু আপনার পক্ষে তা খুব একটা আশ্চর্যজনক নয়। কেননা আপনি অত্যন্ত আশ্চর্যজনকভাবে বিশ্বের নির্মাণকার্য সম্পাদন করেছেন। আপনার মায়ার দ্বারা আপনি এই আশ্চর্যজনক জগৎ সৃষ্টি করেছেন। হে পরমেশ্বর ভগবান! নিঃসন্দেহে আমরা সকলে জন, তপ ও সত্যলোক নামক অত্যন্ত পূণ্যবান লোকসমূহের নিবাসী, কিন্তু তা সত্ত্বেও আপনার শরীরের কম্পনের ফলে আপনার কেশরের অগ্রভাগ থেকে যে জলকণা পতিত হয়েছে, তার দ্বারা অভিষিক্ত হয়ে আমরা পবিত্র হয়েছি। হে ভগবান, আপনার আশ্চর্যজনক কার্যকলাপের কোন সীমা নেই। যারা আপনার আশ্চর্যজনক কার্যকলাপের সীমা জানতে চায়, তারা নিশ্চয়ই মহামূর্খ। এই জগতে সকলেই প্রভাবশালী যোগশক্তির দ্বারা আবদ্ধ। কৃপা করে আপনি সেই সমস্ত বদ্ধ জীবদের প্রতি আপনার অহৈতুকী কৃপা প্রদান করুন।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “এইভাবে মহর্ষি ও ব্রহ্মবাদীগণ কর্তৃক স্তুত হয়ে, ভগবান তাঁর খুর দ্বারা পৃথিবীকে স্পর্শ করে, তাকে জলের উপর স্থাপন করলেন। এইভাবে সমস্ত জীবের পালনকর্তা, পরমেশ্বর ভগবান বিষ্ণু জলের ভিতর থেকে পৃথিবীকে উদ্ধার করে, তাকে জলের উপর স্থাপন করে, তাঁর স্বীয় ধামে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন।”
“কেউ যদি ভক্তি সহকারে বরাহদেবের এই মঙ্গলময়ী কাহিনী শ্রবণ ও বর্ণনা করেন, তাহলে সকলের হৃদয়ে বিরাজমান পরমেশ্বর ভগবান অত্যন্ত প্রসন্ন হন। পরমেশ্বর ভগবান যখন কারও প্রতি প্রসন্ন হন, তখন তাঁর অপ্রাপ্য আর কিছুই থাকে না। চিন্ময় উপলব্ধির দ্বারা মানুষ বুঝতে পারে যে, ভগবদ্ভক্তি ব্যতীত অন্য সব কিছুই নিরর্থক। যিনি ভগবানের প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত হন, তিনি প্রতিটি জীবের হৃদয়ে বিরাজমান স্বয়ং ভগবান কর্তৃক পূর্ণতার সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হন। যে মানুষ নয়, সে ছাড়া এই জগতে অন্য আর কে আছে, যে জীবনের পরম পুরুষার্থ সম্বন্ধে আগ্রহী নয়? এমন কে আছে, যে ভগবানের লীলাকথারূপ অমৃত প্রত্যাখ্যান করতে পারে, যা নিজেই মানুষকে তাঁর সব রকম জাগতিক ক্লেশ থেকে মুক্ত করতে পারে।”
ত্রয়োদশ অধ্যায়- শ্রীবরাহদেবের আবির্ভাব
01 Jun 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, তৃতীয় স্কন্ধ- সৃষ্টির স্থিতি