শ্রীমৈত্রেয় বললেন- “হে বিদুর! কশ্যপের পত্নী দিতি বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁর গর্ভস্থ সন্তান দেবতাদের ও অন্যদের পীড়াদায়ক হবে, তাই তিনি কশ্যপের শক্তিশালী বীর্য শত বৎসর ধরে ধারণ করেছিলেন। দিতির গর্ভের তেজের দ্বারা সমস্ত গ্রহে সূর্য ও চন্দ্রের প্রকাশ রুদ্ধ হয়েছিল এবং বিভিন্ন লোকের দেবতারা সেই তেজের দ্বারা বিচলিত হয়ে ব্রহ্মান্ডের স্রষ্টা ব্রহ্মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘সর্বদিকে এই অন্ধকারাচ্ছন্নতার কারণ কি?’ ”
ভাগ্যবান দেবতারা বললেন- “হে মহান্! এই অন্ধকার যা আমাদের উদ্বেগের কারণ হয়েছে, তা আপনি দেখুন। আপনি এই অন্ধকারের কারণ জানেন, যেহেতু কালের প্রভাব আপনাকে স্পর্শ করতে পারে না, তাই আপনার কাছে কিছুই অজ্ঞাত নেই। হে দেবাদিদেব! হে বিশ্বের পালনকর্তা! হে অন্য লোকের দেবতাদের মুকুটমণি। আপনি চিৎ ও জড় উভয় জগতেরই সমস্ত জীবেদের অভিপ্রায় জানেন। হে বল ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানে আদি উৎস, আপনাকে প্রণতি নিবেদন করি। আপনি পরমেশ্বর ভগবান থেকে পৃথকীকৃত রজোগুণ স্বীকার করেছেন। বহিরঙ্গা শক্তির সহায়তায় আপনি অব্যক্ত উৎস থেকে আবির্ভূত হয়েছেন। আপনাকে আমরা সর্বতোভাবে প্রণতি নিবেদন করি। হে ভগবান, এই সমস্ত গ্রহ আপনার মধ্যে অবস্থিত এবং সমস্ত জীব আপনার থেকে উৎপন্ন হয়েছে। তাই আপনি এই বিশ্বের কারণ এবং যে ব্যক্তি অবিচলিতভাবে আপনার ধ্যান করেন, তিনি ভক্তি লাভ করেন। যাঁরা তাঁদের শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে তাদের মন ও ইন্দ্রিয়সমূহ সংযত করেছেন, সেই পরিপক্ক যোগীদের কখনও এই জগতে পরাজয় হয় না। কেননা এই প্রকার যোগসিদ্ধির প্রভাবে তাঁরা আপনার কৃপা লাভ করেছেন। বৃষ যেমন তার নাসিকা সংলগ্ন রজ্জুর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তেমনই ব্রহ্মান্ডের সমস্ত জীব বৈদিক নির্দেশের দ্বারা সঞ্চালিত হয়। বৈদিক শাস্ত্রের নির্দেশ কেউ লঙ্ঘন করতে পারে না। যে প্রধান পুরুষ সেই বেদ প্রদান করেছেন, তাঁকে আমরা আামাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।”
দেবতারা ব্রহ্মার কাছে প্রার্থনা করলেন- “দয়া করে আপনি আমাদের প্রতি কৃপাপূর্বক দৃষ্টিপাত করুন, কেননা আমরা দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় পতিত হয়েছি। এই অন্ধকারের ফলে আমাদের সমস্ত কর্ম লুপ্ত হয়েছে। অতিমাত্রায় ইন্ধন প্রয়োগের ফলে আগুন যেমন আচ্ছাদিত হয়ে যায়, তেমনই দিতির গর্ভে কশ্যপের বীর্য থেকে উৎপন্ন ভ্রূণ সমগ্র ব্রহ্মান্ড জুড়ে এই পরিপূর্ণ অন্ধকার সৃষ্টি করেছে।”
শ্রীমৈত্রেয় বললেন- “দিব্য শব্দ-স্পন্দনের দ্বারা যাঁকে জানা যায়, সেই বিধাতা ব্রহ্মা দেবতাদের প্রার্থনায় প্রসন্ন হয়ে, তাঁদের সন্তুষ্টি-বিধানের চেষ্টা করেছিলেন।”
শ্রীব্রহ্মা বললেন- “সনক, সনাতন, সনন্দন ও সনৎকুমার, আমার এই চার মানসপুত্র তোমাদের পূর্বে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তারা কোন নির্দিষ্ট বাসনা ছাড়াই কখনও কখনও জড় আকাশে ও চিদাকাশে বিচরণ করে থাকেন। এইভাবে সমগ্র ব্রহ্মান্ডে ভ্রমণ করে তাঁরা পরব্যোমে প্রবেশ করেছিলেন, কেননা তাঁরা সব রকম জড় কলুষ থেকে মুক্ত ছিলেন। চিদাকাশে পরমেশ্বর ভগবানের ও তাঁর শুদ্ধ ভক্তদের নিবাসস্থান বৈকুন্ঠ নামক চিন্ময় লোক রয়েছে। সেই স্থান জড় জগতের সমস্ত লোকের অধিবাসীদের দ্বারা পূজিত। বৈকুন্ঠলোকে সমস্ত অধিবাসীরা পরমেশ্বর ভগবানের মতো রূপ সমন্বিত। তাঁরা সকলেই ইন্দ্রিয়তৃপ্তির বাসনাশূন্য হয়ে, পরমেশ্বর ভগবানের ভক্তিময়ী সেবায় যুক্ত। বৈকুন্ঠলোকে আদি পুরুষ পরমেশ্বর ভগবান বিরাজ করেন এবং তাঁকে বৈদিক শাস্ত্রের মাধ্যমে জানা যায়। তিনি শুদ্ধ সত্ত্বময়, যাতে রজ ও তমোগুণের কোন স্থান নেই। তিনি ভক্তদের ধর্মীয় প্রগতি বিধান করেন। সেই বৈকুন্ঠলোকে অত্যন্ত মঙ্গলময় অনেক বন রয়েছে। সেই সমস্ত বনের বৃক্ষগুলি অভীষ্টপূরণকারী কল্পবৃক্ষ এবং সমস্ত ঋতুতে সেইগুলি ফুল ও ফলে পরিপূর্ণ থাকে, কেননা বৈকুন্ঠলোকে সব কিছুই চিন্ময় ও সবিশেষ। বৈকুন্ঠলোকের অধিবাসীরা তাঁদের পত্নী ও পার্ষদগণসহ বিমানে বিচরণ করেন এবং নিরন্তর ভগবানের চরিত ও লীলাসমূহ গান করেন, যা সর্বদাই অমঙ্গলজনক প্রভাব থেকে মুক্ত। শ্রীভগবানের মহিমা যখন তাঁরা কীর্তন করেন, তখন মধুপূর্ণ মাধবীতলার প্রস্ফুটিত ফুলের গন্ধকেও তা উপহাস করে। যখন ভ্রমরদের অধিপতি উচ্চস্বরে গুঞ্জন করে ভগবানের মহিমা কীর্তন করে, তখন কপোত, কোকিল, সারস, চক্রবাক, চাতক, হংস, শুক, তিত্তির, ময়ূর প্রভৃতি বিহঙ্গকুলের কলরব ক্ষণকালের জন্য স্তব্ধ হয়। ভগবানের মহিমা শ্রবণ করার জন্য, এই সমস্ত অপ্রাকৃত বিহঙ্গেরা তাদের নিজেদের গান বন্ধ করে দেয়। যদিও মন্দার, কুন্দ, কুরবক, উৎপল, চম্পক, অর্ণ, পুন্নাগ, নাগকেশর, বকুল, কমল ও পারিজাত বৃক্ষসমূহ অপ্রাকৃত সৌরভমন্ডিত পুষ্পে পূর্ণ, তবুও তারা তুলসীর তপশ্চর্যার জন্য তাঁকে বহু সম্মান করে। কেননা ভগবান তুলসীকে বিশেষ মর্যাদা প্রদর্শন করেছেন এবং তিনি স্বয়ং তুলসীপত্রের মালা কন্ঠে ধারণ করেন। বৈকুন্ঠবাসীরা মরকত, বৈদূর্য ও স্বর্ণ নির্মিত তাঁদের বিমানে আরোহন করে বিচরণ করেন। যদিও তাঁরা গুরু নিতম্বিনী, স্মিত হাস্যোজ্জ্বল সমন্বিত সুন্দর মুখমন্ডল শোভিত পত্নী পরিবৃতা, কিন্তু তবুও তাঁদের হাস্য-পরিহাস ও সৌন্দর্যের আকর্ষণ তাঁদের কামভাব উদ্দীপ্ত করতে পারে না। বৈকুন্ঠলোকের রমণীরা লক্ষ্মীদেবীর মতোই সুন্দরী। এই প্রকার অপ্রাকৃত সৌন্দর্যমন্ডিত রমণীরা হস্তে লীলাপদ্ম ধারণ করেন এবং তাঁদের চরণের নূপুর থেকে কিঙ্কিণি-ধ্বনি উত্থিত হয়, পরমেশ্বর ভগবানের কৃপাদৃষ্টি লাভের আশায় কখনও কখনও তাঁরা সুবর্ণ সংযুক্ত স্ফটিকময় দেওয়ালগুলি সম্মার্জন করেন। লক্ষ্মীদেবী দাসী পরিবৃতা হয়ে প্রবাল খচিত দিব্য জলাশয়ের তীরে তাঁর বাগানে তুলসীদল নিবেদন করে পরমেশ্বর ভগবানের পূজা করেন। ভগবানের পূজা করার সময়, তাঁরা যখন জলে উন্নত নাসিকা-সমন্বিত তাঁদের সুন্দর মুখমন্ডলের প্রতিবিম্ব দর্শন করেন, তখন তাঁদের কাছে তা আরও অধিক সুন্দর বলে মনে হয়, কেননা তাঁদের মুখ ভগবান কর্তৃক চুম্বিত হয়েছে। দুর্ভাগা মানুষেরা বৈকুন্ঠলোকের বর্ণনা সম্বন্ধে আলোচনা না করে, যা শ্রবণের অযোগ্য ও বুদ্ধিকে বিভ্রান্ত করে, সেই সমস্ত অনর্থক বিষয় সম্বন্ধে শ্রবণ করে, তা অত্যন্ত শোকের বিষয়। যারা বৈকুন্ঠ-বিষয়ের বর্ণনা ত্যাগ করে জড় জগৎ সম্বন্ধে আলোচনা করে, তারা অজ্ঞানের গভীরতম প্রদেশে প্রক্ষিপ্ত হয়।”
শ্রীব্রহ্মা বললেন- “প্রিয় দেবতাগণ! মনুষ্যজীবন এতই মহত্ত্বপূর্ণ যে, আমরাও সেই জীবন প্রাপ্ত হওয়ার বাসনা করি, কেননা মনুষ্যজীবনে ধর্মতত্ত্ব ও জ্ঞান পূর্ণরূপে লাভ করা যায়। কেউ যদি মনুষ্যজীবন লাভ করা সত্ত্বেও পরমেশ্বর ভগবান ও তাঁর ধাম হৃদয়ঙ্গম না করে, তাহলে বুঝতে হবে যে, সে বহিরঙ্গা প্রকৃতির প্রভাবের দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত। যাঁদের দেহ প্রেমানন্দে বিকার প্রাপ্ত হয় এবং যাঁরা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করেন, এবং ভগবানের মহিমা শ্রবণ করার ফলে ঘর্মাক্ত হন, তাঁরা ধ্যান ও অন্যান্য তপস্যার অপেক্ষা না করলেও ভগবানের রাজ্যে উন্নীত হন। ভগবানের রাজ্য জড় জগতের ঊর্ধ্বে অবস্থিত এবং তা ব্রহ্মা আদি দেবতাদেরও স্পৃহনীয়। এইভাবে সনক, সনাতন, সনন্দন ও সনৎকুমার নামক মহর্ষিগণ তাঁদের যোগশক্তির প্রভাবে চিৎ জগতে উপরোক্ত বৈকুন্ঠলোক পৌছে অভূতপূর্ব আনন্দ অনুভব করেছিলেন। তাঁরা দেখেছিলেন যে, সেই পরব্যোম সর্বোত্তম ভক্তদের দ্বারা চালিত পরম অলঙ্কৃত বিমানসমূহের দ্বারা দীপ্তিমান এবং স্বয়ং ভগবানের দ্বারা অধিকৃত। ভগবানের আবাস বৈকুন্ঠপুরীর ছয়টি দ্বার তারা অতিক্রম করলেন। সেখানকার সাজসজ্জার প্রতি একটুও আশ্চর্য অনুভব না করে, তাঁরা সপ্তম দ্বারে গদাধারী, সমবয়স্ক ও জ্যোতির্ময় দুজন দ্বারপালকে দর্শন করলেন, যাঁরা অত্যন্ত মূল্যবান কেয়ূর, কুন্ডল, কিরীট আদি অলঙ্কারে ভূষিত ছিলেন। সেই দ্বারপালদ্বয় মত্ত ভ্রমরবেষ্টিত বনমালার দ্বারা ভূষিত ছিলেন, যা তাঁদের নীল বর্ণ বাহুচতুষ্টয়ের মধ্যে বিন্যস্ত ছিল। তাঁদের বঙ্কিম ভ্রূভঙ্গি, অসন্তুষ্ট নাসাপুট ও আরক্তিম লোচনের দ্বারা উভয়কেই কিছুটা ক্ষুব্ধ বলে মনে হচ্ছিল। সনকাদি ঋষিদের গতি সর্বত্র অবারিত ছিল। তাঁরা ‘আপন’ ও ‘পর’, এইরূপ বৈষম্য জ্ঞানরহিত ছিলেন। উন্মুক্ত অন্তরে তাঁরা স্বর্ণ ও হীরক নির্মিত অন্য ছয়টি দ্বার যেভাবে অতিক্রম করেছিলেন, সেইভাবে তাঁরা সপ্তম দ্বারেও প্রবেশ করলেন। সেই চারজন দিগম্বর বালক-ঋষিরা যদিও ছিলেন সমস্ত জীবেদের মধ্যে সবচাইতে বৃদ্ধ ও আত্ম-তত্ত্ববেত্তা, তবুও তাঁদের দেখতে ঠিক পাঁচ বছরের শিশুর মতো। কিন্তু ভগবানের অসন্তোষকারক স্বভাব সমন্বিত সেই দ্বারপালেরা যখন ঋষিদের দেখলেন, তখন তাঁরা তাঁদের মহিমার অবজ্ঞা করে তাঁদের পথ অবরোধ করলেন, যদিও ঋষিদের প্রতি তাঁদের এই ব্যবহার ছিল অনুচিত। সবচাইতে যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও কুমারেরা যখন বৈকুন্ঠস্থ দেবতাদের দৃষ্টির সমক্ষে শ্রীহরির সেই দুইজন দ্বারপালদের দ্বারা প্রতিহত হলেন, তখন তাঁদের পরম প্রিয় প্রভু ভগবান শ্রীহরিকে দর্শন করার গভীর আকাঙ্ক্ষার ফলে তাঁরা ক্রুদ্ধ হলেন এবং তাঁদের চক্ষু সহসা রক্তিম হয়ে উঠল।”
মহর্ষিগণ বললেন- “এই দুজন কে? যাঁরা ভগবানের সেবায় অধিষ্ঠিত, তাঁদের মধ্যে ভগবানেরই মতো গুণাবলীর বিকাশ হয়; কিন্তু ভগবানের সেবার সর্বোচ্চ পদে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও এদের সেই বিষম স্বভাব কেন? এরা বৈকুন্ঠে বাস করছে কিভাবে? বৈরীভাবপন্ন মানুষের ভগবানের ধামে প্রবেশ সম্ভব হয়েছে কিভাবে? ভগবানের কোন শত্রু নেই। তাহলে কে তাঁর প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হতে পারে? সম্ভবত এই দুই ব্যক্তি ভন্ড; তাই তারা অন্যদেরও তাদেরই মতো বলে মনে করে। বৈকুন্ঠলোকে সেখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে পরমেশ্বর ভগবানের পূর্ণ সামঞ্জস্য রয়েছে, ঠিক যেমন ক্ষুদ্র আকাশের সঙ্গে মহাকাশের সামঞ্জস্যের মতো। তাহলে এই সামঞ্জস্যের ক্ষেত্রে এই ভয়ের বীজ কেন? এই দুই ব্যক্তি বৈকুন্ঠবাসীদের মতো বেশধারণ করেছে, কিন্তু এদের এই অসামঞ্জস্য এলো কোথা থেকে? তাই আমরা বিচার করে দেখব, এই দুজন কলুষিত ব্যক্তিদের কিভাবে দন্ড দেওয়া উচিত। এই দন্ডবিধান উপযুক্ত হওয়া উচিত, যার ফলে পরিণামে এদের উপকার হবে। যেহেতু এরা বৈকুন্ঠে ভেদ ভাব দর্শন করছে, তাই তারা কলুষিত এবং এদের এখান থেকে জড় জগতে স্থানান্তরিত করা উচিত, যেখানে জীবদের তিন প্রকার শত্রু রয়েছে। বৈকুন্ঠের সেই দুইজন দ্বারপাল, যাঁরা অবশ্যই ভগবানের ভক্ত ছিলেন, তাঁরা যখন বুঝতে পারলেন যে, সেই ব্রাহ্মণেরা তাঁদের অভিশপ দিতে যাচ্ছেন, তখন তাঁরা অত্যন্ত ভীত হয়ে কাতরভাবে সেই মুনিদের পায়ে ধরে ভূমিতে নিপতিত হয়েছিলেন, কেননা কোন অস্ত্রের দ্বারাও ব্রাহ্মণের অভিশাপ নিবারণ করা যায় না।”
ঋষিদের দ্বারা অভিশপ্ত হয়ে দ্বারপালেরা বললেন- “আপনাদের মতো মহর্ষিদের সম্মান না করার দরুন আপনারা যে আমাদের দন্ড দিয়েছেন, তা উচিতই হয়েছে। কিন্তু আমরা প্রার্থনা করি যে, আমাদের অনুতাপ দর্শন করে আপনারা এই অনুগ্রহ করুন, আমাদের উত্তরোত্তর অধোগামী হওয়ার সময়েও যেন ভগবৎ বিস্মৃতিজনিত মোহ আমাদের অভিভূত না করে। নাভি থেকে পদ্ম উদ্ভুত হওয়ার ফলে যাঁর নাম পদ্মনাভ এবং ধর্মপরায়ণ ব্যক্তিদের আনন্দস্বরূপ পরমেশ্বর ভগবান জানতে পেরেছিলেন যে, তাঁর ভৃত্যেরা মহর্ষিদের অপমান করেছেন। সেই মুহূর্তে পরমহংস মুনিদের অন্বেষণীর চরণ-যুগল চালন করতে করতে তাঁর পত্নী লক্ষ্মীদেবীসহ তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।”
“পূর্বে যাঁকে কেবল সমাধিযোগে তাঁদের হৃদয়াভ্যন্তরে দর্শন করেছিলেন, সেই পরমেশ্বর ভগবানকে সনক প্রমুখ ঋষিগণ তাঁদের চক্ষুর দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে দর্শন করলেন। তিনি যখন এগিয়ে আসছিলেন, তখন তাঁর পার্ষদেরা ছত্র, পাদুকা আদি উপকরণসহ তাঁর সঙ্গে আসছিলেন। তাঁর দুই পার্শ্বে হংসের মতো শ্বেতবর্ণ চামরদ্বয় এবং মস্তকে ছত্র শোভিত ছিল। চার পাশে মুক্তা বিলম্বিত ছত্র বায়ু সঞ্চারে সঞ্চালিত হচ্ছিল এবং তা দেখে মনে হচ্ছিল যেন পূর্ণ চন্দ্র থেকে অমৃতের বিন্দু বায়ুর প্রবাহে ঝড়ে পড়ছে। ভগবান সমস্ত আনন্দের উৎস। তাঁর মঙ্গলময় উপস্থিতি সকলের কল্যাণের জন্য এবং তাঁর স্নেহপূণ্য হাস্য ও দৃষ্টিপাত হৃদয়ের অন্তঃস্থলকে স্পর্শ করে। ভগবানের সুন্দর দেহের বর্ণ হচ্ছে শ্যাম এবং তাঁর প্রশস্ত বক্ষ লক্ষ্মীদেবীর নিবাসস্থল, যিনি স্বর্গলোকের শীর্ষ স্থান সমগ্র চিন্ময় জগৎকে গৌরবান্বিত করেন। এইভাবে মনে হচ্ছিল যেন ভগবান স্বয়ং তাঁর চিন্ময় বৈকুন্ঠধামের সৌন্দর্য ও সৌভাগ্য বিতরণ করছিলেন। তাঁর বিশাল নিতম্ব প্রদেশে পীত বসনের উপর কটিভূষণ শোভা পাচ্ছে, তাঁর বক্ষস্থলে বনমালা সুশোভিত যাতে অলিকুল গুঞ্জন করে এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য প্রদান করছিল। তাঁর সুন্দর মণিবন্ধে বলয় শোভা পাচ্ছিল, তাঁর এক হাত তাঁর বাহন গরুড়ের স্কন্ধে ন্যস্ত ছিল এবং অন্য হাতে তিনি একটি পদ্ম ঘুরাচ্ছিলেন। তাঁর মুখমন্ডল মকরাকৃতি কুন্ডলের শোভা বর্ধনকারী গন্ডস্থলের দ্বারা সৌন্দর্যমন্ডিত ছিল, যা বিদ্যুতের শোভাকেও ধিক্কার দিচ্ছিল। তাঁর নাসিকা ছিল উন্নত এবং তাঁর মস্তক মণিময় মুকুটের দ্বারা সুশোভিল ছিল। তাঁর সুদৃঢ় বাহু চতুষ্টয়ের মধ্যে এক অপূর্ব কন্ঠহার লম্বিত ছিল এবং তাঁর কন্ঠদেশ কৌস্তভ মণিতে শোভিত ছিল। নারায়ণের অনুপম সৌন্দর্য তাঁর ভক্তদের বুদ্ধির দ্বারা বহু গুণে পরিবর্ধিত হয়ে এতই আকর্ষণীয় হয়েছিল যে, তা লক্ষ্মীদেবীর সবচাইতে সুন্দর হওয়ার গর্বকে খর্ব করেছিল। হে প্রিয় দেবতাগণ! এইভাবে যে ভগবান নিজেকে প্রকাশ করেছিলেন তিনি আমার, শিবের এবং তোমাদের সকলের পূজনীয়। ঋষিগণ অতৃপ্ত নয়নে তাঁকে দর্শন করে আনন্দভরে তাঁর শ্রীপাদপদ্ম তাঁদের মস্তক অবনত করে প্রণতি নিবেদন করেছিলেন। ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের অঙ্গুলি থেকে তুলসীপত্রের সৌরভ যখন বায়ু বাহিত হয়ে, সেই ঋষিদের নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করেছিল, নির্বিশেষ ব্রহ্ম উপলব্ধির প্রতি আসক্ত হওয়া সত্ত্বেও, তাঁরা তখন তাঁদের দেহ এবং মনে এক পরিবর্তন অনুভব করেছিলেন। ভগবানের সুন্দর মুখমন্ডল তাঁদের কাছে নীল পদ্মকোশের মতো মনে হয়েছিল এবং ভগবানের স্মিত হাস্য তাঁদের কাছে প্রস্ফুটিত কুন্দফুলের মতো মনে হয়েছিল। ভগবানের সেই মুখ দর্শন করে, মহর্ষিরা পূর্ণরূপে পরিতৃপ্ত হয়েছিলেন এবং তাঁরা যখন পুনরায় তাঁকে দর্শন করতে চেয়েছিলেন, তখন তাঁরা পদ্মরাগ মণির মতো রক্তিম তাঁর শ্রীপাদপদ্মের নখ দর্শন করেছিলেন। এইভাবে তাঁরা বার বার ভগবানের চিন্ময় বিগ্রহ অবলোকন করেছিলেন এবং তার ফলে তাঁরা ভগবানের সবিশেষ রূপের ধ্যান করেছিলেন। এইটি ভগবানের সেই রূপ যাঁর ধ্যান যোগীরা করে থাকেন এবং এই রূপ তাঁদের কাছে পরম আনন্দদায়ক। এই রূপ কাল্পনিক নয়, বাস্তব, যা মহান যোগীরা অনুমোদন করে গেছেন। ভগবান অষ্ট ঐশ্বর্যযুক্ত কিন্তু অন্যদের পক্ষে সেই সিদ্ধি পূর্ণরূপে লাভ করা সম্ভব নয়।”
কুমারগণ বললেন- “হে প্রিয়তম প্রভু! আপনি যদিও সমস্ত জীবের অন্তরে বিরাজ করেন, তবুও আপনি দুরাত্মাদের কাছে প্রকাশিত হন না। কিন্তু আপনি যদিও অনন্ত, তবুও আজ আপনাকে আমরা প্রত্যক্ষভাবে দর্শন করলাম। আমাদের পিতা ব্রহ্মার যে উপদেশ আমরা কর্ণ-বিবরের দ্বারা শ্রবণ করেছিলাম, এখন আপনার কৃপাপূর্ণ উপস্থিতির ফলে আমরা তা যথাযথভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারলাম। আমরা জানি যে, আপনি হচ্ছেন পরমতত্ত্ব পরমেশ্বর ভগবান, যিনি বিশুদ্ধ সত্ত্বে তাঁর দিব্য রূপ প্রকাশ করেন। আপনার এই চিন্ময়, নিত্য স্বরূপ অপ্রতিহতা ভক্তির মাধ্যমে লব্ধ কেবল আপনার কৃপার দ্বারাই ভগবদ্ভক্তির প্রভাবে নির্মলহৃদয় মহর্ষিগণ হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন। যে সমস্ত ব্যক্তি অত্যন্ত নিপুণ এবং সব কিছু যথাযথভাবে বুঝতে সক্ষম, সবচাইতে বুদ্ধিমান সেই সব ব্যক্তিরা পরমেশ্বর ভগবানের কীর্তনীয় ও শ্রবণীয় মঙ্গলময় লীলাসমূহ শ্রবণে প্রবৃত্ত হন। এই প্রকার ব্যক্তিরা মুক্তির মতো সর্বশ্রেষ্ঠ জড়জাগতিক অনুগ্রহকেও গ্রাহ্য করেন না। অতএব অপেক্ষাকৃত কম মহত্ত্বপূর্ণ স্বর্গ-সুখের কথা কি আর বলার আছে?”
“হে প্রভু! আপনার কাছে আমরা প্রার্থনা করি যে, আমাদের হৃদয় এবং মন যেন সর্বদা আপনার শ্রীপাদপদ্মের সেবায় যুক্ত থাকে, তুলসীদল যেমন আপনার শ্রীপাদপদ্মে নিবেদিত হওয়ার ফলে সৌন্দর্যমন্ডিত হয়ে ওঠে, তেমনই আমাদের বাণীও যেন আপনার লীলাসমূহ বর্ণনা করার ফলে সৌন্দর্যমন্ডিত হয় এবং আমাদের কর্ণ-বিবর যেন অঅপনার অপ্রাকৃত গুণাবলীর কীর্তনে সর্বদা পূর্ণ থাকে, তাহলে যে কোন নারকীয় পরিস্থিতিতে আমাদের জন্ম হোক না কেন, তাতে কোন ক্ষতি নেই। হে প্রভু! তাই আমরা আপনার শাশ্বত ভগবৎ স্বরূপকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি, যা আপনি অত্যন্ত কৃপাপূর্বক আমাদের সম্মুখে প্রকাশ করেছেন। ভাগ্যহীন, মন্দ-বুদ্ধি ব্যক্তিরা আপনার অপ্রাকৃত নিত্য স্বরূপ দর্শন করতে পারে না, কিন্তু সেই রূপ দর্শন করে আমাদের মন এবং নেত্র পরম তৃপ্তি অনুভব করছে।”
পঞ্চদশ অধ্যায়- ভগবদ্ধামের বর্ণনা
03 Jun 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, তৃতীয় স্কন্ধ- সৃষ্টির স্থিতি