ব্রহ্মা বললেন- “হে প্রভু! বহু বহু বছরের তপস্যার পর আজ আমি আপনাকে জানতে পেরেছি। হায়, দেহধারী জীবেরা কি দুর্ভাগা যে, তারা আপনাকে জানার অযোগ্য! হে প্রভু, আপনিই একমাত্র জ্ঞাতব্য বিষয়, কেননা আপনার অতীত আর কোন পরমতত্ত্ব নেই। যদি আপনার থেকেও শ্রেষ্ঠ কোন বস্তু থাকে, তবে তা পরমতত্ত্ব নয়। আপনি জড় তত্ত্বের সৃষ্টি শক্তি প্রদর্শন করে পরম পুরুষরূপে বিরাজ করেন। যে রূপ আমি দর্শন করছি তা জড় কলুষ থেকে চিরকাল মুক্ত এবং ভক্তদের কৃপা করার জন্য অন্তরঙ্গা শক্তির প্রকাশরূপে তা আবির্ভূত হয়েছে। এই অবতার অন্য বহু অবতারদের উৎস এবং আপনার নাভিদেশ থেকে উদ্ভুত কমলে আমার জন্ম হয়েছে। হে প্রভু! আপনার এই নিত্য আনন্দময় এবং জ্ঞানময় স্বরূপ থেকে শ্রেষ্ঠ অন্য কোন রূপ আমি দেখি না। চিদাকাশে আপনার নির্বিশেষ ব্রহ্মজ্যোতির কোন সাময়িক পরিবর্তন হয় না এবং আপনার অন্তরঙ্গা শক্তির কোন অবক্ষয় হয় না। আমি আপনার কাছে আত্মসমর্পণ করছি, কেননা আমি আমার জড় দেহ এবং ইন্দ্রিয়ের গর্বে মত্ত, অথচ আপনি সমগ্র জগতের পরম কারণ হওয়া সত্ত্বেও জড়াতীত। আপনার এই বর্তমান স্বরূপ, অথবা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্য যে কোন রূপ, সমগ্র জগতের জন্য সমানভাবে মঙ্গলময়। যেহেতু আপনি আপনার এই নিত্য শাশ্বতরূপ প্রকাশ করেছেন, যে রূপে আপনার ভক্তেরা আপনার ধ্যান করে, আমি তাই আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। যারা নরকগামী, তারা আপনার সবিশেষ রূপের উপেক্ষা করে, কেননা তারা জড় বিষয়ের চিন্তায় মগ্ন।”
“হে প্রভু! বৈদিক শব্দ-তরঙ্গরূপ বায়ুর দ্বারা বাহিত আপনার চরণকমলের সৌরভ যাঁরা তাঁদের কর্ণরন্ধ্রের দ্বারা আঘ্রাণ করেছেন, তাঁরা আপনার প্রেমময়ী সেবা অঙ্গীকার করেন। তাঁদের হৃদয়পদ্ম থেকে আপনি কখনও বিচ্ছিন্ন হন না। হে প্রভু! এই জগতের মানুষেরা সব রকম জাগতিক চিন্তায় হতবুদ্ধিগ্রস্ত হয়ে পড়ে- তারা সর্বদাই ভয়ভীত থাকে। তারা সর্বক্ষণ তাদের ধন, দেহ এবং আত্মীয়স্বজনদের রক্ষা করার চেষ্টা করে, তাই তারা সর্বক্ষণ শোক এবং অবৈধ বাসনায় পূর্ণ থাকে। তারা ‘আমি’ ও ‘আমার’ এই নশ^র ধারণার ভিত্তিতে লোভের বশবর্তী হয়ে সমস্ত উদ্যোগ করে। যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা আপনার নিরাপদ শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় গ্রহণ করে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা এই প্রকার দুশ্চিন্তায় পূর্ণ থাকে।”
“হে প্রভু! যারা আপনার সর্ব মঙ্গলময় দিব্য লীলাসমূহ কীর্তন ও শ্রবণে বঞ্চিত, তারা অবশ্যই অত্যন্ত দুর্ভাগা এবং বিবেকহীন। তারা অতি অল্পক্ষণের জন্য ইন্দ্রিয় সুখ উপভোগ করে, অশুভ কার্যকলাপে লিপ্ত হয়। হে মহান অভিনেতা! হে প্রভু! এই সমস্ত হতভাগ্য জীবেরা নিরন্তর ক্ষুধা, তৃষ্ণা, প্রচন্ড ঠান্ডা, পিত্ত, কফ উৎপাদক শীত, প্রবল গ্রীষ্ম, বৃষ্টি আদি নানাবিধ উপদ্রবের দ্বারা সর্বদা বিচলিত হয় এবং তীব্র যৌন আবেদন ও অনর্গল ক্রোধের দ্বারা নিরন্তর অভিভূত হয়। আমি তাদের প্রতি করুণা অনুভব করি এবং তাদের এই দুর্দশা দেখে আমি অত্যন্ত দুঃখ অনুভব করি। হে প্রভু! আত্মার পক্ষে জড়জাগতিক দুঃখ-কষ্টের বাস্তবিক অস্তিত্ব নেই। তবুও যতক্ষণ পর্যন্ত বদ্ধ জীব দেহাত্মবুদ্ধিতে আবদ্ধ থেকে ইন্দ্রিয় সুখভোগের চেষ্টায় লিপ্ত থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে আপনার বহিরঙ্গা শক্তির প্রভাবে, জড় জগতের দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্ত হতে পারে না। এই প্রকার অভক্তেরা তাদের ইন্দ্রিয়গুলিকে অত্যন্ত কষ্টদায়ক ও কঠোর পরিশ্রমে নিযুক্ত করে। রাত্রে তারা অনিদ্রা রোগ ভোগ করে, কেননা তাদের বুদ্ধি নিরন্তর নানা প্রকার মনোধর্ম-প্রসূত জল্পনা-কল্পনা দ্বারা তাদের নিদ্রা ভঙ্গ করতে থাকে। আধিদৈবিক শক্তির দ্বারা তাদের সমস্ত প্রকার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। এমনকি মহান ঋষিরাও যদি চিন্ময় বিষয়ের প্রতি বিমুখ হয়, তাহলে তারাও এই সংসারে আবর্তিত হতে থাকে।”
“হে প্রভু! আপনার ভক্তেরা যথাযথভাবে শ্রবণ করার মাধ্যমে আপনাকে দর্শন করতে পারেন এবং তাদের হৃদয় তখন নির্মল হয় এবং সেখানে আপনি আপনার আসন গ্রহণ করেন। অপনার ভক্তদের প্রতি আপনি এতই কৃপাময় যে, যেই রূপে তাঁরা নিরন্তর আপনাকে চিন্তা করেন, তাঁদের কাছে আপনি আপনার সেই প্রকার দিব্য এবং শাশ্বত স্বরূপ প্রকাশ করেন। হে প্রভু! মহা আড়ম্বরে, বিবিধ উপচার সহকারে আপনার পূজা করলেও যারা নানা প্রকার জড় কামনা-বাসনায় পূর্ণ, সেই সমস্ত দেবতাদের পূজায় আপনি ততটা প্রসন্ন হন না। আপনার অহৈতুকী কৃপা প্রদর্শন করার জন্য আপনি সকলের হৃদয়ে পরমাত্মারূপে বিরাজ করেন এবং আপনি সকলের নিত্য শুভাকাঙ্ক্ষী, কিন্তু অভক্তদের কাছে আপনি অলভ্য। বৈদিক বিধির অনুষ্ঠান, দান, তপশ্চর্যা, চিন্ময় পরিচর্যা, ব্রত সহকারে আপনার আরাধনা এবং আপনার সন্তুষ্টিবিধানের জন্য আপনাকে কর্মফল নিবেদন করা ইত্যাদি যে সমস্ত পূণ্য কর্ম, তা সবই মঙ্গলজনক। এই প্রকার ধর্ম অনুষ্ঠান কখনও ব্যর্থ হয় না। আমি পরম চিন্ময় ভগবানকে আমার প্রণতি নিবেদন করি, যিনি তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তির দ্বারা নিত্য বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। তাঁর নির্বিশেষ রূপ আত্ম উপলব্ধির মনীষার দ্বারা হৃদয়ঙ্গম করা যায়। আমি তাঁকে আমার প্রণতি নিবেদন করি, যিনি তাঁর লীলার দ্বারা ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি, স্থিতি, এবং প্রলয়ের মাধ্যমে আনন্দ উপভোগ করেন। আমি পরমেশ্বর ভগবানের শরণ গ্রহণ করি, যার অবতার, গুণাবলী এবং কার্যকলাপ লৌকিক ব্যবহারের রহস্যময় অনুকরণ। কেউ যদি দেহত্যাগ করার সময় অজ্ঞাতসারেও তাঁর দিব্য নাম উচ্চারণ করেন, তাহলে তিনি অবশ্যই তৎক্ষণাৎ তাঁর জন্ম-জন্মান্তরের সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়ে তাঁকে লাভ করেন।”
“হে প্রভু! আপনি এই ব্রহ্মান্ডরূপী বৃক্ষের আদি মূল। সেই বৃক্ষটি প্রথমে জড়া প্রকৃতির তিনটি স্কন্ধ ভেদ করে বর্ধিত হয়েছে। সেই তিনটি স্কন্ধ হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা আমি, সংহারকর্তা শিব এবং সর্বশক্তিমান পালনকর্তা আপনি এবং আমরা তিন জনে বহু শাখায় বর্ধিত হয়েছি। তাই জগৎরূপী বৃক্ষস্বরূপ আপনাকে আমি আমার প্রণতি নিবেদন করি। সরাসরিভাবে আপনার দ্বারা জনসাধারণের পথ প্রদর্শনের জন্য যে সমস্ত প্রকৃত মঙ্গলময় কার্যকলাপ সূচিত হয়েছে সেগুলির অনুসরণ না করে, তারা অর্থহীন কার্যকলাপে যুক্ত হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত এই সমস্ত মূর্খ কার্যকলাপে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা বলবৎ থাকে, ততক্ষণ তাদের জীবন সংগ্রামের সমস্ত পরিকল্পনা ছিন্নভিন্ন হবে। আমি তাই শাশ্বত কালরূপে ক্রিয়াশীল আপনাকে আমার প্রণতি নিবেদন করি। হে প্রভু! অবিশ্রান্ত কাল এবং সমস্ত যজ্ঞের ভোক্তা আপনাকে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। যদিও আমি এমন স্থানে অধিষ্ঠিত যা দুই পরার্ধকাল পর্যন্ত বিদ্যমান থাকে, যদিও আমি ব্রহ্মান্ডের অন্য সমস্ত লোকের অধিপতি এবং যদিও আমি আত্ম উপলব্ধির জন্য বহু বহু বছর ধরে তপস্যা করেছি, তবুও আমি আপনাকে আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করি। হে প্রভু! আপনার নিজের ইচ্ছায়, অপ্রাকৃত লীলাবিলাসের জন্য আপনি তির্যক, মনুষ্য, দেবতা আদি বিভিন্ন যোনিতে আবির্ভূত হন। আপনি কখনও জড় কলুষের দ্বারা প্রভাবিত হন না। ধর্ম সংস্থাপনের দায়িত্ব সম্পাদনের জন্যই আপনি আবির্ভূত হন, তাই হে পরমেশ্বর ভগবান, এইভাবে বিভিন্ন রূপে প্রকাশিত হওয়ার জন্য আমি আপনাকে আমার প্রণতি নিবেদন করি। হে প্রভু! প্রবল তরঙ্গমালায় উদ্বেলিত প্রলয় বারিতে আপনি নিদ্রা-সুখ উপভোগ করেন। শেষ শয্যায় শয়ন করে আপনি বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের আপনার নিদ্রার আনন্দ প্রদর্শন করেন। সেই সময়, সমগ্র ব্রহ্মান্ড আপনার উদরে অবস্থান করে। হে আমার পূজনীয়! আপনার কৃপায় ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি করার জন্য আমি আপনার নাভিপদ্মরূপ গৃহ থেকে উৎপন্ন হয়েছি। আপনি যখন নিদ্রা-সুখ উপভোগ করছিলেন, তখন ব্রহ্মান্ডের সমস্ত গ্রহগুলি আপনার চিন্ময় উদরে অবস্থিত ছিল। এখন, নিদ্রা অবসানে প্রভাতের প্রস্ফুটিত পদ্মের মতো আপনার নেত্র উন্মীলিত হয়েছে। পরমেশ্বর ভগবান আমার প্রতি প্রসন্ন হোন। তিনিই এই জগতের সমস্ত জীবের একমাত্র বন্ধু ও পরমাত্মা এবং সকলের চরম সুখের জন্য তাঁর ষড় ঐশ্বর্যের দ্বারা তিনি সকলকে পালন করেন। তিনি আমাকে কৃপা করুন যাতে আমি পূর্বের মতো সৃষ্টি করার জন্য তাঁর শক্তিতে আবিষ্ট হয়ে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন হতে পারি, কেননা আমিও তাঁর শরণাগত আত্মাদের একজন। পরমেশ্বর ভগবান সর্বদাই শরণাগত আত্মাদের কল্যাণ সাধন করেন। তাঁর কার্যকলাপ সর্বদাই তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তি রমাদেবী বা লক্ষ্মীদেবীর দ্বারা সম্পন্ন হয়। আমি প্রার্থনা করি, জড় জগতের সৃষ্টিকার্যের মাধ্যমে আমি যেন কেবল তাঁর সেবায় যুক্ত হতে পারি। আমি প্রার্থনা করি যে, আমার এই কার্যকলাপের দ্বারা আমি যেন জড়া প্রকৃতি কর্তৃক প্রভাবিত হয়ে না পড়ি; কেননা তার ফলে নিজেকে স্রষ্টা বলে মনে করার অহঙ্কারকে আমি ত্যাগ করতে সক্ষম হব। পরমেশ্বর ভগবানের শক্তি অনন্ত। তিনি যখন প্রলয় বারিতে শয়ন করেছিলেন, তখন তাঁর নাভি-সরোবর থেকে যে পদ্মা বিকশিত হয়েছিল, তাতে ব্রহ্মান্ডের সামগ্রিক শক্তিরূপে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। আমি এখন জগৎরূপে প্রকাশিত তাঁর বৈচিত্র্যপূর্ণ শক্তিসমূহের প্রকাশে নিযুক্ত আছি। তাই আমি প্রার্থনা করি যে, আমার জড়জাগতিক কার্য সম্পাদন করার সময় আমি যেন বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণের মার্গ থেকে বিদ্যুত না হই। সেই পুরাণ পুরুষ ভগবান অপার করুণাময়। আমি কামনা করি যে, তিনি যেন তাঁর নয়ন-কমল উন্মীলিত করে স্মিত হাস্য সহকারে আমার প্রতি তাঁর আশীর্বাদ বর্ষণ করেন। তিনি কৃপাপূর্বক সুমধুর বাক্যে উপদেশ প্রদান করার মাধ্যমে সমগ্র জগতের উত্থান সাধন করতে পারেন এবং আমাদের বিষাদ দূর করতে পারেন।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “হে বিদুর! ব্রহ্মা তার আবির্ভাবের উৎস পরমেশ্বর ভগবানকে দর্শন করে তাঁর কৃপা লাভের জন্য মন এবং বাণীর ক্ষমতা অনুসারে প্রার্থনা করেছিলেন। এইভাবে প্রার্থনা করে তিনি নীরব হয়েছিলেন, যেন তাঁর তপস্যা, জানবার প্রচেষ্টা এবং ধ্যান করার ফলে তিনি পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। ভগবান দেখেছিলেন যে, ব্রহ্মা বিভিন্ন গ্রহলোকের সৃষ্টি ও পরিকল্পনার ব্যাপারে অত্যন্ত চিন্তিত হয়েছিলেন এবং প্রলয়-বারি দর্শনে অত্যন্ত বিষাদগ্রস্ত হয়েছিলেন। তিনি ব্রহ্মার অভিপ্রায় বুঝতে পেরে গম্ভীর, চিন্তাশীল বাক্যের দ্বারা ব্রহ্মার মোহ অপনোদন করেছিলেন।”
পরমেশ্বর ভগবান তখন বললেন- “হে বেদগর্ভ ব্রহ্মা! সৃষ্টিকার্য সম্পাদনের বিষয়ে তুমি বিষাদগ্রস্ত অথবা উদ্বিগ্ন হয়ো না। তুমি আমার কাছে যা প্রার্থনা করছ, তা পূর্বেই তোমাকে প্রদান করা হয়েছে। হে ব্রহ্মা, আমার অনুগ্রহ লাভের জন্য তুমি তপস্যায় ও ধ্যানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং তত্ত্বজ্ঞানের অনুশীলন কর। সেই কর্মের দ্বারা তুমি তোমার হৃদয়াভ্যন্তর থেকে সব কিছু জানতে পারবে। হে ব্রহ্মা! তুমি যখন ভক্তিযোগে সমাহিত হবে, তখন তোমার সৃষ্টিকার্যে, তোমার মধ্যে এবং সমগ্র বিশ্ব জুড়ে আমাকে দেখতে পাবে এবং তুমি দেখবে যে, তুমি, সমগ্র জগৎ ও সমস্ত জীব- সকলেই আমার মধ্যে অবস্থিত। তুমি সমস্ত জীবাত্মার এবং সমগ্র বিশ্ব আমাকে দর্শন করবে, ঠিক যেমন আগুন কাঠের মধ্যে অবস্থান করে। সেই প্রকার দিব্য দৃষ্টিসম্পন্ন হওয়ার ফলেই কেবল তুমি সর্বপ্রকার মোহ থেকে মুক্ত হতে পারবে। তুমি যখন স্থূল ও সূক্ষ্ম দেহের ধারণা থেকে মুক্ত হবে এবং তোমার ইন্দ্রয়গুলি জড়া প্রকৃতির সমস্ত প্রভাব থেকে মুক্ত হবে, তখন তুমি আমার সাহচর্যে তোমার শুদ্ধ স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারবে। তখন তুমি শুদ্ধ চেতনায় অবস্থিত হবে। যেহেতু তুমি অসংখ্যরূপে প্রজা বৃদ্ধি করার বাসনা করেছ এবং তোমার বিভিন্ন সেবা বিস্তার করার ইচ্ছা করেছ, তাই এই বিষয়ে তোমার কখনও কোন কষ্ট হবে না, কেননা তোমার প্রতি আমার অহৈতুকী কৃপা চিরকালের জন্য নিরন্তর বাড়তে থাকবে। তুমি আদি ঋষি এবং যেহেতু প্রজা সৃষ্টির কাজে নিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমার মন সর্বদাই আমাতে নিবিষ্ট, তাই পাপ প্রসবকারী রজোগুণ কখনই তোমাকে স্পর্শ করতে পারবে না। যদিও বদ্ধ জীবদের পক্ষে আমাকে জানা দুষ্কর, আজ তুমি আমাকে জানতে পেরেছ, কেননা তুমি জান যে আমার রূপ কোন জড় পদার্থ, বিশেষ করে পাঁচটি স্থূল এবং তিনটি সূক্ষ্ম তত্ত্ব থেকে নির্মিত হয়নি। তুমি যখন বিচার করছিলে, যে কমলটি থেকে তোমার জন্ম হয়েছে তার নালটির কোন উৎস আছে কিনা, তখন তুমি সেই পদ্মনালেও প্রবেশ করেছিলে, তবে তুমি কিছুই খুঁজে পাওনি। কিন্তু সেই সময়ে আমি তোমার অন্তরে আমার স্বরূপ প্রকাশ করেছিলাম। হে ব্রহ্মা! আমার চিন্ময় লীলার মহিমা বর্ণনা করে তুমি যে প্রার্থনা করেছ, আমাকে জানার জন্য তুমি যে তপস্যা করেছ এবং আমার প্রতি তোমার দৃঢ় নিষ্ঠা, এই সবই আমার অহৈতুকী কৃপা বলে জেনো। তুমি যে চিন্ময় গুণাবলী অনুসারে আমার বর্ণনা করেছ, তার ফলে আমি তোমার প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছি। বিষয়াসক্ত মানুষেরা এই বর্ণনাকে প্রাকৃত বলে মনে করে। আমি তোমাকে বর দান করছি, তোমার কার্যকলাপের দ্বারা তুমি যে সমস্ত জগৎকে মহিমান্বিত করতে চাও, তোমার সে বাসনা সফল হবে।”
“যে মানুষ ব্রহ্মার মতো প্রার্থনা করে এবং এইভাবে আমার পূজা করে, অচিরেই তার সমস্ত বাসনা পূর্ণ হবে, কেননা আমিই হচ্ছি সর্ব বর প্রদাতা। তত্ত্বজ্ঞানীদের অভিমত হচ্ছে যে, সর্ব প্রকার প্রথাগত শুভকর্ম, তপশ্চর্যা, যজ্ঞ, দান, যোগ, সমাধি ইত্যাদির চরম লক্ষ্য- আমার সন্তুষ্টিবিধান করা। আমি সমস্ত জীবের পরমাত্মা। আমি পরম পরিচালক এবং প্রিয়তম। মানুষ ভ্রান্তিবশত স্থূল এবং সূক্ষ্ম শরীরের প্রতি আসক্ত হয়, কিন্তু তাদের কর্তব্য কেবল আমার প্রতি অনুরক্ত হওয়া। আমার নির্দেশ অনুসরণ করে, পূর্ণ বৈদিক জ্ঞানের দ্বারা এবং সর্ব কারণের পরম কারণ আমার থেকে সরাসরিভাবে তুমি যে দেহ প্রাপ্ত হয়েছ, তা দ্বারা তুমি এখন পূর্বের মতো প্রজা সৃষ্টি কর।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “ব্রহ্মান্ডের স্রষ্টা ব্রহ্মাকে এইভাবে বিস্তার করার নির্দেশ দিয়ে আদি পুরুষ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীনারায়ণ অন্তর্হিত হলেন।”
নবম অধ্যায়- সৃজনী শক্তির জন্য ব্রহ্মার প্রার্থনা
27 May 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, তৃতীয় স্কন্ধ- সৃষ্টির স্থিতি