শ্রীবিদুর বললেন- “হে মহর্ষি! দয়া করে আপনি আমাকে বলুন ভগবানের অন্তর্ধানের পর লোকপিতামহ ব্রহ্মা কিভাবে তাঁর শরীর এবং মন থেকে জীবেদের শরীর সৃষ্টি করেছিলেন। হে মহাজ্ঞানী! দয়া করে আপনি আমার সমস্ত সন্দেহ নিরসন করুন এবং আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত আমি আপনাকে যে সব প্রশ্ন করেছি, সে সম্বন্ধে আমাকে জ্ঞানদান করুন।”
সূত গোস্বামী বললেন- “হে ভৃগুপুত্র! বিদুর কর্তৃক এইভাবে জিজ্ঞাসিত হয়ে মহর্ষি মৈত্রেয় অত্যন্ত অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। সব কিছুই তাঁর হৃদয়ে ছিল এবং তিনি এইভাবে একে একে সেই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে শুরু করলেন।”
মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন- “ হে বিদুর! পরমেশ্বর ভগবানের উপদেশ অনুসারে ব্রহ্মা এইভাবে একশত দিব্য বর্ষ ধরে তপস্যা করেছিলেন এবং নিজেকে ভগবদ্ভক্তিতে যুক্ত করেছিলেন। তারপর ব্রহ্মা দেখলেন, যে পদ্মে তিনি অবস্থিত ছিলেন এবং যে জলের ভিতর সেই কমলটি উদ্ভুত হয়েছিল, তারা উভয়ই প্রচন্ড বায়ুর প্রভাবে কম্পিত হচ্ছিল। দীর্ঘ তপস্যা এবং আত্ম-উপলব্ধির চিন্ময় জ্ঞান লাভ করার ফলে ব্রহ্মা ব্যবহারিক জ্ঞানের পূর্ণনা প্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং তাই তিনি জলসহ সেই বায়ু সম্পূর্ণরূপে পান করেছিলেন। তারপর তিনি দেখলেন, যে পদ্মে তিনি সমাসীন ছিলেন তা সারা ব্রহ্মান্ড জুড়ে ব্যাপ্ত, তখন তিনি চিন্তা করেছিলেন, পূর্বে প্রলয়ের সময় এই কমলে যে গ্রহসমূহ লীন হয়েছিল, সেইগুলি তিনি কিভাবে সৃষ্টি করবেন। এইভাবে পরমেশ্বর ভগবানের সেবায় যুক্ত হয়ে, ব্রহ্মা সেই পদ্মের কর্ণিকাতে প্রবেশ করলেন এবং সমগ্র ব্রহ্মান্ড জুড়ে বিস্মৃত সেই পদ্মটিকে তিনি প্রথমে তিনটি ভাগে এবং তারপর চৌদ্দটি বিভাগে বিভক্ত করলেন। ব্রহ্মা হচ্ছেন ব্রহ্মান্ডের সবচইতে মহান ব্যক্তি, কেননা তাঁর পরিপক্ক চিন্ময় জ্ঞানের প্রভাবে তিনি পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি অহৈতুকী ভক্তিপরায়ণ। তাই তিনি বিভিন্ন প্রকার জীবের বাসের জন্য চতুর্দশ ভুবন সৃষ্টি করেছিলেন।”
বিদুর মৈত্রেয়ের কাছে জিজ্ঞাসা করলেন- “হে প্রভু! হে তত্ত্বজ্ঞানী মহর্ষি! দয়া করে শাশ্বত কাল সম্বন্ধে আপনি বর্ণনা করুন, যা অদ্ভুতকর্মা পরমেশ্বর ভগবানের একটি রূপ। সেই শাশ্বত কালের লক্ষণ কি? কৃপা করে বিস্তারিতভাবে তা আপনি আমাদের কাছে বর্ণনা করুন।”
মৈত্রেয় বললেন- “শাশ্বত কাল হচ্ছে জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণের পারস্পারিক ক্রিয়ার আদি উৎস। তা অপরিবর্তনীয় ও অসীম, এবং তা প্রাকৃত সৃষ্টিতে ভগবানের লীলার নিমিত্ত মাত্র। এই জগৎ জড়া প্রকৃতিরূপে পরমেশ্বর ভগবানের নির্বিশেষ প্রকাশ অব্যক্ত কালের দ্বারা ভগবান থেকে বিচ্ছিন্ন। তা বিষ্ণুমায়ার প্রভাবে ভগবানের বস্তুগত অভিব্যক্তিরূপে অবস্থিত। এই জড় সৃষ্টি এখন যেমন আছে, পূর্বেও তেমনই ছিল এবং ভবিষ্যতেও তেমনই থাকবে। গুণের পারস্পারিক ক্রিয়ার ফলে স্বাভাবিকভাবে যে সৃষ্টি হয়, এ ছাড়া আরও ন’টি বিভিন্ন প্রকার সৃষ্টি রয়েছে। শাশ্বত কাল, জড় উপাদান এবং কোন ব্যক্তির গুণগত কর্মের ফলে তিনি প্রকার প্রলয় রয়েছে। নয় প্রকার সৃষ্টির প্রথমটি হচ্ছে মহত্তত্ত্ব বা সমগ্র জড় উপাদানজনিত সৃষ্টি, যাতে পরমেশ্বর ভগবানের উপস্থিতির ফলে প্রকৃতির গুণগুলি পরস্পরের সঙ্গে ক্রিয়া করে। দ্বিতীয় সৃষ্টিতে, অহঙ্কারের উদ্ভব হয় যাতে জড় উপাদানসমূহ, ভৌতিক জ্ঞান এবং প্রাকৃত কর্মের উদয় হয়। তৃতীয় সৃষ্টিতে তন্মাত্র বা ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছে এবং তার থেকে উপাদানসমূহের উদ্ভব হয়েছে। চতুর্থ সৃষ্টিতে জ্ঞান এবং কর্মক্ষমতা সৃষ্টি হয়েছে। সাত্ত্বিক অহঙ্কার থেকে জাত দেবতাগণ এবং মন হচ্ছে পঞ্চম সৃষ্টি। ষষ্ঠ সৃষ্টি হচ্ছে অজ্ঞান অন্ধকার, যার ফলে জীব বুদ্ধিহীনের মতো আচরণ করে।”
“উপরোক্ত এই সমস্ত সৃষ্টিগুলি ভগবানের বহিরঙ্গা শক্তির প্রাকৃত সৃষ্টি। এখন আমার কাছে রজোগুণের অবতার ব্রহ্মার বিষয়ে শ্রবণ কর, সৃষ্টি রচনার বিষয়ে যাঁর মেধা ভগবানেরই মতো। সপ্তম সৃষ্টি স্থাবরসমূহের সৃষ্টি, তা ছয় প্রকার- বনস্পতি (পুষ্পবিহীন ফলবান বৃক্ষ), ওষধি (যে গাছ ফল পাকলে মরে যায়), লতা, ত্বক্সার (বেনু বৃক্ষ), বীরুধ (আরোহনে অক্ষম লতা), এবং দ্রুম (পুষ্পসমূহের দ্বারা ফলবান)। সমস্ত স্থাবর প্রাণী আহারার্থে ঊর্ধ্বে সঞ্চরণশীল। তারা প্রায় অচেতন, কিন্তু তাদের অন্তরে বেদনার অনুভূতি আছে। তারা বিভিন্নরূপে প্রকাশিত। অষ্টম সৃষ্টি নিম্ন স্তরের প্রাণীদের সৃষ্টি। তারা বিভিন্ন প্রকারের এবং তাদের সংখ্যা আটাশ। তারা অত্যন্ত মূর্খ এবং অজ্ঞ। তারা ঘ্রাণের দ্বারা তাদের অভীষ্ট বস্তুকে জানতে পারে, কিন্তু তাদের হৃদয়ে কোন বস্তুর স্মরণ করতে অক্ষম। হে বিশুদ্ধতম বিদুর! নিম্ন স্তরের পশুদের মধ্যে গাভী, ছাগল, মহিষ, কৃষ্ণসার, শূকর, গবয়, হরিণ, ভেড়া, উট এরা সকলে দুই খুরবিশিষ্ট। অশ্ব, খচ্চর, গর্দভ, গৌর, শরভ এবং চমরী এরা এক খুরবিশিষ্ট। এখন তুমি আমার কাছে পঞ্চ নখবিশিষ্ট পশুদের কথা শ্রবণ কর। কুকুর, শৃগাল, ব্যাঘ্র, বৃক, বিড়াল, শশক, শজারু, সিংহ, বানর, হস্তী, কূর্ম, কুমির, গোসাপ ইত্যাদি পঞ্চ নখবিশিষ্ট প্রাণী। ক্রৌঞ্চ, শকুনি, বক, বাজ, ভাস, ভল্লুক, ময়ূর, হংস, সারস, চক্রবাক, কাক, পেঁচক, ইত্যাদি হচ্ছে পক্ষী। নিম্নগামী খাদ্যনালী-বিশিষ্ট যে মনুষ্যশ্রেণী, তা শুধু এক প্রকার এবং তারা হচ্ছে নবম সৃষ্টি। মানুষদের মধ্যে রজোগুণের প্রাধান্য অত্যন্ত অধিক। তাই মানুষ নানা রকম দুঃখ-দুর্দশার মধ্যেও সর্বদা কর্মতৎপর এবং তারা সর্বতোভাবে নিজেদের সুখী বলে মনে করে। হে সত্তম বিদুর! এই শেষ তিনটি সৃষ্টি এবং দেবতাদের সৃষ্টি (দশম সৃষ্টি) হচ্ছে বৈকৃত সৃষ্টি, যা পূর্ব বর্ণিত প্রাকৃত সৃষ্টি থেকে ভিন্ন। চতুঃসনদের সৃষ্টি প্রাকৃত ও বৈকৃত উভয়াত্মক। বৈকারিক দেবসৃষ্টি আট প্রকার- (১) দেব, (২) পিতৃ, (৩) অসুর, (৪) গন্ধর্ব ও অপ্সরা, (৫) যক্ষ ও রাক্ষস, (৬) সিদ্ধ, চারণ ও বিদ্যাধর, (৭) ভূত, প্রেত ও পিশাচ এবং (৮) কিন্নর ইত্যাদি। ব্রহ্মান্ডের স্রষ্টা ব্রহ্মা এঁদের সৃষ্টি করেন।”
“এখন আমি মনু বংশধরদের কথা বর্ণনা করব। পরমেশ্বর ভগবানের রজোগুণের অবতার সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা অব্যর্থ সংকল্প সহকারে প্রতি কল্পে ভগবানের শক্তির দ্বারা ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি করেন।”
দশম অধ্যায়- সৃষ্টির বিভাগ
27 May 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, তৃতীয় স্কন্ধ- সৃষ্টির স্থিতি