অষ্টম অধ্যায়- গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণু থেকে ব্রহ্মার আবির্ভাব

মহর্ষি মৈত্রেয় বিদুরকে বললেন- “মহারাজ পুরুর রাজবংশ শুদ্ধ ভক্তদের সেবা করার যোগ্য, কেননা এই বংশের সন্তান-সন্ততিরা পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি অনুরক্ত। আপনিও এই পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন। এটি অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় যে, আপনার প্রয়াসের ফলে পরমেশ্বর ভগবানের অপ্রাকৃত লীলাসমূহ প্রতিক্ষণ নব নবায়মানভাবে আস্বাদনযোগ্য হচ্ছে। আমি এখন ভাগবত পুরাণ কীর্তন করব, যা অতি অল্প সুখের আশায় মহা দুঃখে পতিত জীবদের মঙ্গল সাধনের জন্য স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান মহান ঋষিদের শুনিয়েছিলেন।”
“কিছুকাল পূর্বে, ঐকান্তিকভাবে জানতে ইচ্ছুক হয়ে, চতুঃসনশ্রেষ্ঠ সনৎকুমার অন্যান্য মহর্ষিগণসহ ঠিক আপনারই মতো ব্রহ্মান্ডের নিম্নভাগে আসীন সঙ্কর্ষণের কাছে বাসুদেব-তত্ত্ব সম্বন্ধে প্রশ্ন করেছিলেন। সেই সময় ভগবান সঙ্কর্ষণ তাঁর পরমারাধ্য ভগবানের ধ্যানে মগ্ন ছিলেন, যাঁকে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বাসুদেবরূপে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে থাকেন। কিন্তু সেই মহান ঋষিদের পারমার্থিক উন্নতি সাধনের জন্য তিনি নয়ন-কমল ঈষৎ উন্মীলিত করে বলতে লাগলেন, ‘ঋষিগণ গঙ্গার জলের মাধ্যমে সর্বোচ্চ লোক থেকে সর্বনিম্ন লোকে এসেছিলেন এবং তাই তাঁদের জটা সিক্ত ছিল। তাঁরা ভগবানের চরণকমল স্পর্শ করেছিলেন, যা নাগরাজের কন্যারা পতি লাভের কামনায় প্রেমভরে নানাবিধ উপহার সহকারে পূজা করেন। সনৎকুমার প্রমুখ কুমারগণ, যাঁরা সকলেই ভগবানের অপ্রাকৃত লীলাসমূহ সম্বন্ধে অবগত ছিলেন, তাঁরা গভীর অনুরাগ এবং প্রেমপূর্ণ শব্দাবলীর দ্বারা সুন্দর ছন্দে ভগবানের মহিমা কীর্তন করেছিলেন। সেই সময় ভগবান সঙ্কর্ষণের সহস্র উন্নত ফণায় স্থিত কিরীটের উজ্জ্বল মণির কিরণে চতুর্দিক উদ্ভাসিত হয়েছিল। ভগবান সঙ্কর্ষণ এই প্রকার নিবৃত্তি পরায়ণ মহর্ষি সনৎকুমারকে শ্রীমদ্ভাগবতের এই তাৎপর্য বিশ্লেষণ করেছিলেন। তারপর সনৎকুমারও সাংখ্যায়ন ঋষি কর্তৃক জিজ্ঞাসিত হয়ে, যেভাবে তিনি ভগবান সঙ্কর্ষণের কাছে শুনেছিলেন, সেইভাবে শ্রীমদ্ভাগবতের ব্যাখ্যা করেছিলেন। মহর্ষি সাংখ্যায়ন ছিলেন সমস্ত পরমহংসদের মধ্যে প্রধান এবং তিনি যখন শ্রীমদ্ভাগবত অনুসারে ভগবানের মহিমা কীর্তন করছিলেন, তখন আমার গুরুদেব পরাশর এবং বৃহস্পতি উভয়েই তাঁর কাছ থেকে শ্রবণ করেছিলেন। মহর্ষি পুলস্ত্য কর্তৃক উপদিষ্ট হয়ে পূর্বোক্ত মহর্ষি পরাশর এই সর্বশ্রেষ্ঠ পুরাণ (শ্রীমদ্ভাগবত) আমাকে বলেছিলেন। হে বৎস, যেহেতু তুমি আমার শ্রদ্ধাপরায়ণ অনুগামী, তাই যেভাবে আমি শ্রবণ করেছি, তোমার কাছেও আমি তা বর্ণনা করব।”
“ত্রিভুবন যখন জলমগ্ন ছিল, তখন গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণু একাকী মহানাগ অনন্তের শয্যায় শায়িত ছিলেন। যদিও প্রতীত হচ্ছিল যে, তিনি বহিরঙ্গা শক্তির ক্রিয়ার অতীত তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তিতে নিদ্রিত ছিলেন, তবুও তাঁর নেত্র পূর্ণরূপে নিমীলিত ছিল না। ঠিক যেমন কাঠের মধ্যে আগুনের দাহিকা শক্তি থাকে, তেমনই ভগবান সমস্ত জীবেদের তাদের সূক্ষ্ম শরীরে নিমজ্জিত করে, প্রলয় বারিতে অবস্থান করেছিলেন। তিনি তাঁর নিজের দ্বারা সংবর্ধিত কাল নামক শক্তিতে শয়ন করেছিলেন। ভগবান তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তিতে সহস্র চতুর্যুগ শয়ন করেছিলেন এবং তাঁর বহিরঙ্গা শক্তির দ্বারা প্রতীত হয়েছিল যেন তিনি জলের মধ্যে শয়ন করে আছেন। যখন কাল শক্তির দ্বারা প্রেরিত হয়ে জীবসমূহ তাদের স্বকাম কর্মের বিকাশ করার জন্য বেরিয়ে আসতে শুরু করে, তখন ভগবান তাঁর চিন্ময় দেহকে নীলাভরূপে দর্শন করলেন। সৃষ্টির সূক্ষ্ম বিষয়ে ভগবানের মনোযোগ অভিনিবিষ্ট ছিল, যা রজোগুণের দ্বারা ক্ষোভিত হয় এবং তার ফলে সৃষ্টির সূক্ষ্মরূপ তাঁর নাভিদেশ ভেদ করে উদ্ভুত হয়। জীবের সকাম কর্মের এই সমগ্র স্বরূপ ভগবান শ্রীবিষ্ণুর নাভি ভেদ করে একটি পদ্মের কলির মতো আকার ধারণ করল এবং ভগবানের ইচ্ছায় তা একটি সূর্যের মতো সব কিছুকে উদ্ভাসিত করে, বিশাল প্রলয় বারি শুকিয়ে দিল। সেই সর্বলোকময় পদ্মফুলে ভগবান বিষ্ণু স্বয়ং পরমাত্মারূপে প্রবেশ করেন এবং এইভাবে যখন তা প্রকৃতির সমস্ত গুণের দ্বারা পরিপূর্ণ হয়, তখন বৈদিক জ্ঞানের মূর্ত বিগ্রহ, যাঁকে স্বয়ম্ভু বলা হয়, তিন উৎপন্ন হয়েছিলেন। ব্রহ্মা পদ্মফুল থেকে আবির্ভূত হন এবং পদ্মের কর্ণিকায় অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি এই জগৎকে দর্শন করতে পারলেন না। তাই, তিনি সর্বত্র ভ্রমণ করে চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করলেন এবং তার ফলে তিনি চারটি মুখ লাভ করলেন। সেই পদ্মে সমাসীন ব্রহ্মা সৃষ্টি সম্বন্ধে, সেই পদ্ম সম্বন্ধে অথবা নিজের সম্বন্ধে যথাযথভাবে বুঝতে পারলেন না। কল্পান্তে প্রলয়কালীন বায়ু জলকে উদ্বেলিত করেছিল এবং উত্তাল তরঙ্গে সেই পদ্মটি ঘূর্নিত হচ্ছিল। ব্রহ্মা তাঁর অজ্ঞানতাবশত ভাবতে লাগলেন, এই কমলের উপরে বিরাজমান আমি কে? কোথা থেকে এইটি বিকশিত হয়েছে? এর নীচে জলের অভ্যন্তরে নিশ্চয়ই কিছু রয়েছে যার থেকে এই কমলটি উদ্ভুত হয়েছে। এইভাবে বিচার করে ব্রহ্মা পদ্মনালের ছিদ্র দিয়ে জলে প্রবেশ করলেন। কিন্তু সেই নালে প্রবেশ করে বিষ্ণুর নাভির নিকটবর্তী হওয়া সত্ত্বেও, তিনি তার মূল খুঁজে পেলেন না।”
“হে বিদুর! ব্রহ্মা তার অস্তিত্ব সম্বন্ধে এইভাবে অন্বেষণ করতে করতে তাঁর অন্তিম কাল উপনীত হল, যা হচ্ছে ভগবান বিষ্ণুর হস্তধৃত শাশ্বত চক্র এবং যা মৃত্যুর ভয়ের মতো জীবের অন্তরে ভয় উৎপন্ন করে। তারপর অভীষ্ট লক্ষ্য লাভে অকৃতকার্য হয়ে, তিনি সেই অন্বেষণ থেকে বিরত হয়ে, সেই পদ্মের উপর ফিরে গেলেন। এইভাবে সমস্ত ইন্দ্রিয় বিষয় থেকে নিবৃত্ত হয়ে, তিনি তাঁর মনকে পরমেশ্বর ভগবানের চিন্তায় কেন্দ্রীভূত করেন। ব্রহ্মার একশত বৎসর পরে তাঁর ধ্যান যখন পূর্ণ হল, তখন তিনি অভীষ্ট জ্ঞান লাভ করেছিলেন এবং তার ফলে তিনি তাঁর অন্তরের অন্তঃস্থলে পরম পুরুষকে দর্শন করেছিলেন, তাঁর মহান প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যাঁকে তিনি পূর্বে দর্শন করতে পারেননি। ব্রহ্মা সেই জলে এক বিশাল পদ্মসদৃশ শয্যা দেখতে পেয়েছিলেন, যা ছিল শেষনাগের শরীর এবং তাতে পরমেশ্বর ভগবান একাকী শায়িত ছিলেন। চর্তুদিক শেষনাগের মাথার মণির কিরণে উদ্ভাসিত ছিল এবং সেই জ্যোতি সেখানকার সমস্ত অন্ধকার দূর করেছিল। ভগবানের চিন্ময় শরীরের কান্তি প্রবাল পর্বতের সৌন্দর্যকে উপহাস করছিল। সেই প্রবালের পর্বত সান্ধ্য আকাশের দ্বারা অত্যন্ত সুন্দরভাবে সজ্জিত ছিল, কিন্তু ভগবানের পীত বসন সেই সৌন্দর্যকে উপহাস করছিল। পর্বতের চুড়াটি স্বর্ণময় ছিল, কিন্তু ভগবানের মণিরত্ন খচিত মুকুট সেই পর্বতের সুবর্ণময় শৃঙ্গকে উপহাস করছিল। সেই পর্বতের ঝরণা, ওষধি আদি ও পুষ্পময় দৃশ্যাবলী যেন সেই পর্বতের গলার মালা বলে মনে হচ্ছিল, কিন্তু মনিরত্ন, মুক্তো, তুলসীপত্র ও পুষ্পমালায় বিভূষিত ভগবানের সুবিশাল শরীর, হস্ত ও পদ সেই পর্বতের সৌন্দর্যকে উপহাস করেছিল। তাঁর চিন্ময় দেহ, দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে অপরিমিত ছিল এবং তা স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল এই ত্রিভুবন বিস্তৃত ছিল। তাঁর দিব্য বিগ্রহ অনুপম বসন এবং বিচিত্র অলঙ্কারে বিভূষিত হওয়ার ফলে স্বতঃপ্রকাশিত হয়েছিল। ভগবান তাঁর চরণারবিন্দ উত্তোলিত করে দেখাচ্ছিলেন। সমস্ত জড় কলুষ থেকে মুক্ত ভক্তিযোগের দ্বারা লভ্য সমস্ত পুরস্কারের উৎস তাঁর চরণকমল। এই সমস্ত পুরস্কার তাঁদেরই জন্য যাঁরা শুদ্ধ ভক্তির দ্বারা তাঁর আরাধনা করেন। তাঁর হস্ত ও চরণের চন্দ্রসদৃশ নখ থেকে বিচ্ছুরিত অপ্রাকৃত জ্যোতির প্রভা ফুলের পাপড়ির মতো মনে হচ্ছিল। তিনি তাঁর সুন্দর হাসির দ্বারা ভক্তদের সেবা গ্রহণ করে তাঁদের ক্লেশ দূর করেন। কুন্ডল শোভিত তাঁর মুখমন্ডলের প্রতিবিম্ব অত্যন্ত মনোহর কেননা তা তাঁর অধরের কিরণ এবং তাঁর নাসিকা ও ভ্রূযুগলের সৌন্দর্যের দ্বারা উদ্ভাসিত ছিল। হে প্রিয় বিদুর! ভগবানের নিতম্বদেশ কদম্বফুলের কেশর বর্ণের রেণুর মতো পীত বর্ণের বসনের দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল ও তাকে বেষ্টন করেছিল অত্যন্ত সুন্দরভাবে অলঙ্কৃত একটি মেখলা। তাঁর বক্ষঃস্থল শ্রীবৎস চিহ্ন এবং এক অমূল্য কন্ঠহারের দ্বারা বিভূষিত ছিল। চন্দন বৃক্ষা যেমন সুগন্ধ পুষ্প ও শাখাসমূহের দ্বারা সুশোভিত হয়, তেমনই ভগবানের শ্রীবিগ্রহ মূল্যবান মণিরত্ন ও মুক্তাসমূহের দ্বারা অলঙ্কৃত ছিল। তিনি হচ্ছেন শত সহস্র শাখা সমন্বিত অব্যক্ত মূল বৃক্ষের মতো। তিনি জগতের অন্য সকলের প্রভু। চন্দন বৃক্ষ যেমন বহু সর্পের দ্বারা বেষ্টিত থাকে, তেমনই ভগবানের শ্রীঅঙ্গও অনন্তদেবের ফণার দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। বিশাল পর্বতের মতো ভগবান সমস্ত স্থাবর ও জঙ্গম জীবসমূহের নিবাসরূপে শোভা পাচ্ছিলেন। তিনি সর্পদের বন্ধু কেননা শ্রীঅনন্তদেব তাঁর সখা। পর্বদের যেমন শত সহস্র শিখর আছে, তেমনই ভগবান শত সহস্র মুকুট শোভিত অনন্তনাগের ফণার দ্বারা বিভূষিত ছিলেন এবং পর্বত যেমন কখনও কখনও মনিরত্নে পূর্ণ থাকে, তেমনই ভগবানের অপ্রাকৃত শ্রীবিগ্রহও মূল্যবান রত্নসমূহের দ্বারা পূর্ণরূপে বিভূষিত ছিল। পর্বত যেমন কখনও কখনও সমুদ্রের জলে নিমজ্জিত হয়, তেমনই ভগবানও কখনও কখনও প্রলয় বারিতে নিমজ্জিত হচ্ছিলেন। এইভাবে পর্বতসদৃশ ভগবানকে দর্শন করে ব্রহ্মা স্থির করলেন যে, তিনিই হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরি। তিনি দেখলেন যে, তাঁর বক্ষঃস্থলে বৈদিক জ্ঞানে গীতিমালা গুঞ্জনকারী বনমালা অত্যন্ত সুন্দরভাবে শোভা পাচ্ছে। সুদর্শন চক্র তাঁকে এমনভাবে রক্ষা করছে যে, সূর্য, চন্দ্র, বায়ু, অগ্নি প্রভৃতিও তাঁর কাছে পৌছাতে পারে না। ব্রহ্মান্ডের ভাগ্যবিধাতা ব্রহ্মা যখন এইভাবে ভগবানকে দর্শন করলেন, তখন তিনি সমগ্র সৃষ্টির প্রতিও দৃষ্টিপাত করলেন। ব্রহ্মা ভগবান বিষ্ণুর নাভি সরোবর, পদ্মফুল, প্রলয় বারি, প্রলয় বায়ু ও আকাশ দর্শণ করলেন। সব কিছু তখন তাঁর গোচরীভূত হয়েছিল। এইভাবে রজোগুণের দ্বারা প্রণোদিত হয়ে ব্রহ্মা সৃষ্টি করতে অনুপ্রাণিত হন এবং তারপর পরমেশ্বর ভগবান কর্তৃক নির্দিষ্ট সৃষ্টির পাঁচটি কারণ দর্শন করে তিনি সৃজনোন্মুখ মনোবৃত্তির অভীষ্ট মার্গে তাঁর সশ্রদ্ধ প্রার্থনা নিবেদন করতে শুরু করলেন।”

Leave a Reply

May 2025
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,943 hits