সপ্তম অধ্যায়- বিদুরের অতিরিক্ত প্রশ্ন

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্! কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেবের বিজ্ঞ পুত্র বিদুর মহর্ষি মৈত্রেয়ের এই উপদেশ শ্রবণ করে মধুর বাক্যে তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন- হে মহান ব্রাহ্মণ্! যেহেতু পরমেশ্বর ভগবান পূর্ণ চিন্ময় এবং অপরিবর্তনীয়, তাহলে তিনি কিভাবে জড়া প্রকৃতির গুণ এবং কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পর্কিত? এইগুলি যদি তাঁর লীলা হয়, তাহলে অবিকারীর কার্যকলাপ কিভাবে সম্পন্ন হয় এবং প্রকৃতির গুণরহিত গুণাবলী কিভাবে প্রদর্শন করেন? বালকেরা অন্য বালকদের সঙ্গে খেলার অথবা বিচিত্র আমোদ প্রমোদে উৎসাহী, কেননা তারা বাসনার দ্বারা অনুপ্রাণিত। কিন্তু পরমেশ্বর ভগবানের বেলায় সেই রকম কোন বাসনার সম্ভাবনা নেই, কেননা তিনি আত্মতৃপ্ত এবং সর্বদাই সব কিছুর প্রতি অনাসক্ত। তার স্বরক্ষিত ত্রিগুণাত্মিকা মায়াশক্তির দ্বারা ভগবান এই বিশ্ব সৃজন করিয়েছেন। তাঁর দ্বারা তিনি এই সৃষ্টি পালন করেন এবং পক্ষান্তরে, তা ধ্বংসও করেন। এইভাবে পুনঃ পুনঃ সৃষ্টি এবং ধ্বংস কার্য সম্পাদিত হয়। শুদ্ধ আত্মা বিশুদ্ধ চৈতন্যসম্পন্ন এবং তা কখনই দেশ, কাল, অবস্থা, স্বপ্ন, অথবা অন্যকারণের দ্বারা অচেতন হয় না। তাহলে কিভাবে সে অবিদ্যার দ্বারা আচ্ছন্ন হয়? ভগবান পরমাত্মারূপে প্রতিটি জীবের হৃদয়ে অবস্থিত। তাহলে জীবের কার্যকলাপ কেন দুর্ভাগ্যজনক অবস্থায় এবং দুঃখ-দুর্দশায় পর্যবসিত হয়? হে মহান মনীসীগণ! এই অবিদ্যাজনিত সঙ্কটের প্রভাবে আমার মন অত্যন্ত মোহাচ্ছন্ন হয়েছে এবং তাই আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি, আপনি যেন কৃপা করে আমার এই মোহ দূর করেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্! তত্ত্ব-জিজ্ঞাসু বিদুর কর্তৃক এইভাবে জিজ্ঞাসিত হয়ে মৈত্রেয় মুনি যেন প্রথমে একটু আশ্চর্য হয়েছিলেন, কিন্তু তারপর তিনি নিঃসঙ্কোচে উত্তর দিতে শুরু করেছিলেন, কেননা তিনি তিনি ছিলেন সম্পর্ণরূপে ভগবৎ ভাবনাময়।”
শ্রীমৈত্রেয় বললেন- “কোন কোন বদ্ধ জীব এই ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করে যে, পরমব্রহ্ম বা পরমেশ্বর ভগবান মায়া কর্তৃক মোহাচ্ছন্ন হন, আবার সেই সঙ্গে তারাও এও মানে যে, ভগবান বদ্ধ নন। এই সিদ্ধান্ত সমস্ত যুক্তির বিরোধী। স্বপ্নে যেমন মানুষ কখনও কখনও দেখে যে, তার মাথা কেটে ফেলা হয়েছে, তেমনই জীব তাঁর প্রকৃত স্বরূপ বিস্মৃত হয়, যদিও তা মিথ্যা প্রতীতি মাত্র। জলে যেমন চন্দ্রের প্রতিবিম্বের কম্পন আদি জলের ধর্ম দৃষ্ট হয়, তেমনই জড়ের সঙ্গে সম্পর্কের প্রভাবে আত্মাকে জড় তত্ত্ব বলে প্রতীত হয়। কিন্তু, বিষয়ের প্রতি অনাসক্ত হয়ে ভগবদ্ভক্তির পন্থা অনুশীলনের ফলে, পরমেশ্বর ভগবান বাসুদেবের কৃপার প্রভাবে নিজের স্বরূপ সম্বন্ধে এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত হওয়া যায়। ইন্দ্রিয়গুলি যখন দ্রষ্টা-পরমাত্মা পরমেশ্বর ভগবানকে প্রাপ্ত হয়ে সম্পূর্ণরূপে পরিতৃপ্ত হয়, তখন সুযুপ্ত ব্যক্তির মতো তাঁর সমস্ত ক্লেশ সর্বতোভাবে বিদূরিত হয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অপ্রাকৃত নাম, রূপ ইত্যাদি শ্রবণ এবং কীর্তনের দ্বারাই কেবল মানুষ অন্তহীন দুঃখ-দুর্দশাপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হতে পারে। তাই, যাঁরা ভগবানের সুগন্ধযুক্ত চরণরেণুর সেবার প্রতি আসক্ত হয়েছেন, তাঁদের সম্বন্ধে আর কি বলার আছে?”
বিদুর বললেন- “হে মহাশক্তিশালী ঋষি! হে প্রভু! আপনার প্রত্যয় উৎপাদনকারী বাক্যরূপ অস্ত্রের দ্বারা পরমেশ্বর ভগবান এবং জীব সম্বন্ধে আমার সমস্ত সংশয় এখন সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন হয়েছে। আমার মন এখন পূর্ণরূপে এই দুই বিষয়ে প্রবেশ করছে। হে বিদ্বান মহর্ষি! আপনার ব্যাখ্যা অত্যন্ত সাধু এবং যথোচিত। ভগবানের বহিরঙ্গা শক্তির গতি ব্যততি বদ্ধ জীবের দুঃখ-দুর্দশার অন্য আর কোন ভিত্তি নেই। এই জগতে যারা সবচাইতে মূর্খ এবং যাঁরা প্রকৃতির অতীত পরমেশ্বর ভগবানকে প্রাপ্ত হয়েছেন, তাঁরা উভয়েই সুখ প্রাপ্ত হন; আর যারা এই দুয়ের মধ্যবর্তী স্তরে রয়েছেন, তারা জড়জাগতিক দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করে। কিন্তু, হে প্রভু! আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ, কেননা আমি এখন বুঝতে পেরেছি যে, এই জড় জগৎ আপাতদৃষ্টিতে বাস্তব বলে প্রতীয়মান হলেও প্রকৃতপক্ষে তা অসার। এখন আমার দৃঢ় নিশ্চয় হয়েছে যে, আপনার শ্রীচরণের সেবার দ্বারা আমি এই ভ্রান্ত ধারণা পরিত্যাগ করতে সক্ষম হব। শ্রীগুরুদেবের চরণযুগলের সেবার দ্বারা মধু দৈত্যের অপরিবর্তনীয় শত্রু পরমেশ্বর ভগবানের সেবাজনিত চিন্ময় আনন্দ লাভ হয় এবং তার ফলে জড়জাগতিক ক্লেশ-মোচন হয়। অল্প সুকৃতিসম্পন্ন ব্যক্তিদের পক্ষে বৈকুন্ঠ-পথগামী শুদ্ধ ভক্তদের সেবা করার সুযোগ লাভ করা দুষ্কর। শুদ্ধ ভক্তেরা সমস্ত দেবতাদের দেবতা এবং সমস্ত জীবের নিয়ন্ত্রণকারী পরমেশ্বর ভগবানের মহিমা সর্বতোভাবে কীর্তন করেন। সমগ্র জড় শক্তি মহত্তত্ত্ব সৃষ্টি করার পর এবং ইন্দ্রিয়সমূহ-সহ বিরাট বিশ্বরূপ প্রকাশ করার পর, পরমেশ্বর ভগবান তাতে প্রবেশ করলেন। কারণসমুদ্রশায়ী পুরুষাবতারকে বলা হয় জড় সৃষ্টির আদি পুরুষ এবং তাঁর বিরাট রূপের মধ্যে লোকসমূহ এবং তাদের অধিবাসীগণ বিরাজ করেন, তাঁর বহু সহস্র হস্ত ও পদ রয়েছে। হে মহান ব্রাহ্মণ! আপনি সেই বিরাট-পুরুষের ইন্দ্রিয়সমূহ, ইন্দ্রিয়ের বিষয়, দশ প্রকার প্রাণবায়ু, তিন প্রকার জীবনীশক্তি সম্বন্ধে বর্ণনা করেছেন। এখন আপনি দয়া করে বিশেষ বিশেষ বর্ণের বিভিন্ন বিভূতি সম্বন্ধে বিশ্লেষণ করুন। হে প্রভু! আমি মনে করি যে, এই সকল বিভূতিতেই পুত্র, পৌত্র, দৌহিত্র এবং কুটুম্বগণসহ বিভিন্ন ভাবাপন্ন প্রজাসমূহের অবস্থান এবং তাদের দ্বারাই এই বিশ্ব-ব্রহ্মান্ড ব্যাপ্ত রয়েছে। হে বিদ্বান ব্রাহ্মণ! আপনি দয়া করে বলুন দেবতাদের নায়ক প্রজাপতি ব্রহ্মা কিভাবে মন্বন্তরের নেতা বিভিন্ন মনুদের নিযুক্ত করেন। দয়া করে মনুদের কথা এবং তাঁদের বংশধরদের কথাও বর্ণনা করুন। হে মৈত্রেয়! পৃথিবী এবং তঁর ঊর্ধ্বে ও নিম্নে যে লোকসমূহ বর্তমান, তাদের আকার, অবস্থান এবং পরিমাণ দয়া করে বর্ণনা করুন। দয়া করে আপনি মনুষ্যেতর, মনুষ্য, দেবতা, সরীসৃপ, পক্ষী, জরায়ুজ, স্বেদজ, অন্ডজ এবং উদ্ভিদ ইত্যাদির সৃষ্টি এবং অনুবিভাগসমূহ আমাদের কাছে বর্ণনা করুন। দয়া করে প্রকৃতির তিন গুণের অবতার ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বরের বর্ণনা করুন। কৃপাপূর্বক পরমেশ্বর ভগবানের অবতার এবং তাঁর উদার কার্যকলাপেরও বর্ণনা করুন। হে মহর্ষি! লক্ষণ, আচরণ এবং শম, দম আদি স্বভাব অনুসারে মানবসমাজের বর্ণ এবং আশ্রম বিভাগ, মহান ঋষিদের জন্ম ও কর্ম এবং বেদের বিভাগ সম্বন্ধেও আপনি দয়া করে বর্ণনা করুন। আপনি দয়া করে বিধি-বিধানসহ যজ্ঞের বিস্তার, অষ্টাঙ্গ যোগের পন্থা, নৈষ্কর্ম্য জ্ঞান, সাংখ্যদর্শন এবং ভগবদ্ভক্তির পন্থা বর্ণনা করুন। দয়া করে পাষন্ড মার্গের অপূর্ণতা এবং বৈষ্যম্য, প্রতিলোম এবং গুণ ও কর্ম অনুসারে বিভিন্ন যোনিতে জীবের গতিবিধি আপনি বর্ণনা করুন। ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মোক্ষ এই চতুর্বর্গের পরস্পর অবিরুদ্ধ নিমিত্তসমূহ, জীবিকা নির্বাহের বিভিন্ন উপায় এবং বৈদিক শাস্ত্রে যেভাবে অর্থশাস্ত্র বর্ণিত হয়েছে, তা আপনি দয়া করে আমাদের কাছে বর্ণনা করুন। হে ব্রাহ্মণ! আপনি দয়া করে শ্রাদ্ধবিধি, পিতৃলোকের সৃষ্টি, গ্রহ, নক্ষত্র ও তারকাবলীর কালচক্র এবং তাদের অবস্থান সম্বন্ধে বর্ণনা করুন। কৃপাপূর্বক দান, তপস্যা এবং জলাশয় খনন প্রভৃতি কর্মের যে ফল এবং প্রবাসী ও বিপদগ্রস্ত মানুষের যে কর্তব্য, তা আপনি বর্ণনা করুন। হে নিষ্পাপ! যেহেতু সমস্ত জীবের নিয়ন্তা পরমেশ্বর ভগবান সমস্ত ধর্মের এবং ধর্মাচরণে প্রত্যাশী সমস্ত ব্যক্তির পিতা, দয়া করে অপনি বলুন সেই ভগবানকে কিভাবে সম্পূর্ণরূপে সন্তুষ্ট করা যায়।”
“হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ! গুরুগণ অত্যন্ত দীনবৎসল। তাঁদের অনুগামীদের প্রতি, শিষ্যদের প্রতি এবং পুত্রদের প্রতি তাঁরা অত্যন্ত দয়ালু এবং গুরুদেব তাদের দ্বারা জিজ্ঞাসিত না হয়েও তাদের সমস্ত জ্ঞান প্রদান করেন। দয়া করে আপনি বর্ণনা করুন জড়া প্রকৃতির তত্ত্বের কত প্রকার প্রলয় হয় এবং প্রলয়কালে ভগবান যখন যোগনিদ্রায় শয়ন করেন, তখন তাঁর সেবা করার জন্য কারা বেঁচে থাকেন? জীব এবং পরমেশ্বর ভগবানের তত্ত্ব কি, তাঁদের স্বরূপ কি? বৈদিক জ্ঞানে বিশেষ বৈশিষ্ট্য কি? এবং গুরু ও শিষ্যের প্রয়োজন কি? ভগবানের নিষ্কলঙ্ক ভক্তেরা এই প্রকার জ্ঞানের উৎস সম্বন্ধে উল্লেখ করেছেন। সেই সমস্ত ভক্তদের সহাযতা ব্যতীত ভক্তিযোগ এবং বৈরাগ্য সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করা কিভাবে সম্ভব?”
“হে মহর্ষি! পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরির লীলাবিলাস সম্বন্ধে জানতে ইচ্ছুক হয়ে আমি এই সমস্ত প্রশ্ন করেছি। আপনি সকলের সুহৃৎ, তাই দয়া করে নষ্ট-দৃষ্টি ব্যক্তির কল্যাণের জন্য আপনি এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দান করুন। হে নিষ্পাপ! আপনার দেওয়া এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর সমস্ত জড় ক্লেশ থেকে অব্যাহতি প্রদান করবে। এই প্রকার দান সমস্ত বৈদিক যজ্ঞ, তপস্যা, দান ইত্যাদি থেকে শ্রেষ্ঠ।”
শ্রীশুকদেব গোস্বামী বললেন- “সর্বদাই পরমেশ্বর ভগবানের কথা বর্ণনা করতে উৎসাহী মুনিশ্রেষ্ঠ মৈত্রেয় বিদুর কর্তৃক এইভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে, পুরাণের বর্ণনা অনুসারে ব্যাখ্যা করতে লাগলেন। ভগবানের অপ্রাকৃত মহিমা বর্ণনা করে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন।”

Leave a Reply

May 2025
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,963 hits