ষষ্ঠ অধ্যায়- বিশ্বরূপের সৃষ্টি

মৈত্রেয় ঋষি বললেন- “এইভাবে ভগবান মহত্তত্ত্ব আদি তাঁর নিজস্ব শক্তির পরস্পর অমিলিতভাবে অবস্থানের জন্য বিশ্ব রচনার প্রসুপ্ত ভাব শ্রবণ করলেন। পরম শক্তিমান ভগবান তখন দেবী কালীসহ ত্রয়োবিংশতি তত্ত্বের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন। এই কালী তাঁর বহিরঙ্গা প্রকৃতি, যিনি বিভিন্ন উপাদানগুলিকে সংশ্লিষ্ট করেন। তারপর পরমেশ্বর ভগবান যখন তাঁর শক্তির দ্বারা ঐ সমস্ত তত্ত্বে প্রবেশ করলেন, তখন সমস্ত জীব বিভিন্ন কার্যকলাপে প্রবৃত্ত হল, ঠিক যেমন মানুষ ঘুম থেকে উঠে কর্মে প্রবৃত্ত হয়। যখন ত্রয়োবিংশতি তত্ত্বসমূহ ভগবানের ইচ্ছাশক্তির দ্বারা সক্রিয় হয়েছিল, তখন ভগবানের বিশ্বরূপ সৃষ্টি হয়েছিল। ভগবান যখন তাঁর অংশের দ্বারা বিশ্ব সৃষ্টির উপাদানে প্রবেশ করলেন, তখন সেইগুলি বিরাটরূপে পরিণত হল, যাতে সমস্ত লোকসমূহ এবং চরাচর জগৎ অবস্থান করে। হিরন্ময় নামক বিরাট পুরুষ এক হাজার দিব্য বৎসর ব্রহ্মান্ডের জলে বাস করেছিলেন এবং সমস্ত জীবেরাও তাঁর সঙ্গে শায়িত ছিল। মহত্তত্ত্বের সমগ্র শক্তি, বিরাটরূপে স্বয়ং নিজেকে জীবের জ্ঞান-শক্তি, ক্রিয়া-শক্তি এবং আত্ম-শক্তিতে বিভক্ত করে, পুনরায় সেগুলিকে যথাযথভাবে এক, দশ এবং তিন প্রকারে বিভিক্ত করলেন। বিরাট পুরুষ পরমাত্মার প্রথম অবতার এবং অংশ। তিনি অসংখ্য জীবাত্মার আত্মা এবং তাঁর মধ্যে সমগ্র সৃষ্টি বিরাজ করে, যা এইভাবে সংবর্ধিত হয়। তিন, দশ এবং একের দ্বারা বিরাট পুরুষের প্রতিনিধিত্ব হয়, অর্থাৎ তিনিই শরীর, মন ও ইন্দ্রিয়। তিনি দশ প্রকার প্রাণশক্তির দ্বারা চালিত সমস্ত গতিবিধির নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি এবং তিনিই এক হৃদয়, যেখানে প্রাণশক্তি উৎপন্ন হয়। পরমেশ্বর ভগবান বিশ্ব সৃষ্টির দায়িত্বসম্পন্ন সমস্ত দেবতাদের পরমাত্মা। দেবতাগণ কর্তৃক এইভাবে প্রার্থিত হয়ে তিনি নিজে নিজে বিচার করেছিলেন এবং তাঁদের অবগতির জন্য বিরাটরূপের প্রকাশ করেছিলেন।”
মৈত্রেয় বললেন- “পরমেশ্বর ভগবান তাঁর বিরাটরূপ প্রকাশ করার পর কিভাবে নিজেকে বিভিন্ন দেবতারূপে পৃথকীকৃত করেছিলেন, তা এখন আপনি আমার কাছে শ্রবণ করুন। তাঁর মুখ থেকে অগ্নি বা তাপ পৃথকরূপে প্রকাশিত হলে, সমস্ত লোকপালগণ তাঁদের স্বীয় স্থানসহ তাতে প্রবেশ করলেন। সেই বাক্‌শকি দ্বারাই জীব বাক্যের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করে। যখন বিরাট পুরুষের তালু পৃথকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল, তখন লোকপাল বরুণ তাতে প্রবেশ করলেন। এইভাবে জীবের জিহ্বার দ্বারা সব কিছুর স্বাদ গ্রহণ করার ক্ষমতা লাভ হয়। ভগবানের দুই নাসারন্ধ যখন পৃথকভাবে প্রকাশিত হয়, তখন অশ্বিনীকুমারদ্বয় তাঁদের উপযুক্ত সেই স্থানে প্রবিষ্ট হন। তার ফলে জীব প্রত্যেক বস্তুর ঘ্রাণ গ্রহণ করতে পারে। তারপর, বিরাট পুরুষের চক্ষুদ্বয় পৃথকভাবে প্রকাশিত হয়। আলোকের পরিচালক সূর্যদেব দৃষ্টিরূপ নিজ অংশসহ তাতে প্রবেশ করলেন এবং তার ফলে জীব রূপ দর্শন করতে পারে। বিরাটরূপ থেকে যখন পৃথকভাবে ত্বকের প্রকাশ হয়, তখন বায়ুর পরিচালক লোকপাল অনিল স্পর্শেন্দ্রিয়সহ তাতে প্রবেশ করলেন। তার ফলে জীবের স্পর্শজ্ঞান লাভ হয়। যখন বিরাটরূপের কর্ণদ্বয় প্রকাশিত হয়, তখন দিকসমূহের নিয়ন্ত্রণকারী দেবতাগণ স্বীয় শ্রবণেন্দ্রিয়রূপ অংশসহ তাতে প্রবেশ করলেন, তার ফলে সমস্ত জীব শব্দ শ্রবণ করার ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়। যখন ত্বক পৃথকরূপে প্রকাশিত হয়, তখন স্পর্শের নিয়ন্ত্রণকারী দেবতা তাঁর অংশসহ তাতে প্রবেশ করলেন। তার ফলে জীবের স্পর্শজনিত সুখ এবং কণ্ডূয়ন বা চুলকানির অনুভব হয়। সেই বিরাট পুরুষের উপস্থ ইন্দ্রিয় পৃথকভাবে প্রকাশিত হলে, প্রজাপতি ব্রহ্মা শুক্ররূপ অংশসহ সেই ইন্দ্রিয়ে প্রবিষ্ট হলেন। তার ফলে জীব মৈথুন আনন্দ উপভোগ করতে পারে। বিরাট পুরুষের পায়ু পৃথকরূপে প্রকাশিত হলে পায়ু ইন্দ্রিয়সহ লোকপাল সূর্য তাঁর অধিদেবতারূপে তাতে প্রবিষ্ট হন। তার ফলে জীব মল ত্যাগ করতে সক্ষম হয়। তারপর যখন বিরাট পুরুষের হস্তদ্বয় পৃথকরূপে প্রকাশিত হয়, তখন স্বর্গলোকের শাসক ইন্দ্র তাতে প্রবেশ করলেন। তার ফলে জীব তার জীবিকা নির্বাহ করতে সক্ষম হয়। তারপর বিরাটরূপের পদদ্বয় পৃথকভাবে প্রকাশিত হয় এবং তার ফলে বিষ্ণু নামক দেবতা (পরমেশ্বর ভগবান নন) গমনরূপ অংশসহ তাতে প্রবেশ করেন। তার ফলে জীব তার গন্তব্যস্থলে পৌছাতে সক্ষম হয়। বিরাটরূপের বৃদ্ধি যখন পৃথকরূপে প্রকাশিত হয়, তখন বেদের অধিষ্ঠাতা ব্রহ্মা তাঁর বোধরূপ অংশসহ তাতে প্রবেশ করেন। তার ফলে জীব জ্ঞাতব্য বিষয় উপলব্ধি করতে পারে। তারপর, বিরাট পুরুষের হৃদয় পৃথকরূপ প্রকাশিত হয় এবং চন্দ্রদেব মনরূপ স্বীয় অংশসহ তাতে প্রবেশ করলেন। জীব সেই মনের দ্বারা সংকল্প আদি ক্রিয়া সম্পন্ন করে। তারপর, বিরাট পুরুষের অহঙ্কার পৃথকরূপে প্রকাশিত হলে, অহঙ্কারের নিয়ন্তা রুদ্র অহং বৃত্তিরূপ অংশসহ তাতে প্রবিষ্ট হন। সেই অহং বৃত্তির দ্বারা জীব কর্তব্যকর্ম সম্পাদন করে। তারপর, তাঁর চেতনা যখন ভিন্নরূপে প্রকাশিত হয়, তখন মহত্তত্ত্ব তার আংশিক চেতনাসহ তাতে প্রবেশ করে। এইভাবে জীব বিশেষ বিশেষ জ্ঞান প্রাপ্ত হতে সক্ষম হয়। তারপর, বিরাটরূপে মস্তক থেকে স্বর্গলোক প্রকাশিত হয়, পদদ্বয় থেকে পৃথিবী এবং নাভিদেশ থেকে আকাশ উৎপন্ন হয়। সেই সমস্ত স্থানে জড়া প্রকৃতির গুণ অনুসারে দেবতা প্রভৃতি প্রকট হয়। সত্ত্বগুণের সর্বোত্তম বৈশিষ্ট্যমন্ডিত হয়ে দেবতা স্বর্গলোকে অধিষ্ঠিত হয়, আর রজোগুণের দ্বারা প্রভাবিত মানব তাদের অধীনস্থ জীবসহ পৃথিবীতে বাস করে। যে সমস্ত জীব রুদ্রের পার্ষদ, তারা জড়া প্রকৃতির তৃতীয় গুণ তমোগুণের দ্বারা আচ্ছন্ন। তারা পৃথিবী এবং স্বর্গলোকের মধ্যবর্তী অন্তরীক্ষে অবস্থিত। হে কুরুশ্রেষ্ঠ! বিরাট পুরুষের মুখ থেকে বৈদিক জ্ঞান প্রকাশিত হয়। যাঁরা এই বৈদিক জ্ঞানের প্রতি উন্মুখ, তাঁদের বলা হয় ব্রাহ্মণ এবং তাঁরা সমাজের অন্যান্য বর্ণের প্রকৃত শিক্ষক ও পারমার্থিক পথপ্রদর্শক। তারপর সেই বিরাট পুরুষের বাহুযুগল থেকে পালন করার বৃত্তি এবং সেই বৃত্তির অনুসরণকারী ক্ষত্রিয় উৎপন্ন হয়। ক্ষত্রিয়দের ধর্ম হচ্ছে চোর এবং দুষ্কৃতকারীদের উপদ্রব থেকে সমাজকে রক্ষা করা। সমস্ত মানুষের জীবিকা, অর্থাৎ শস্য উৎপাদন এবং প্রজাদের মধ্যে তার বিতরণ করার বৃত্তি ভগবানের বিরাটরূপের ঊরুদ্বয় থেকে উদ্ভুত হয়েছে। এই কার্য সম্পাদন করার ভার গ্রহণ করেন যে সমস্ত ব্যবসায়ী মানুষ, তাঁদের বলায় হয় বৈশ্য। তারপর, পরমেশ্বর ভগবানের পদদ্বয় থেকে ধর্ম অনুষ্ঠানের সিদ্ধির জন্য পরিচর্যার বৃত্তি উৎপন্ন হয়। সেই বিরাট পুরুষের পদদ্বয়ে শূদ্রেরা অবস্থিত, যারা সেবা বৃত্তির দ্বারা ভগবানকে সন্তুষ্ট করে। এই সমস্ত বিভিন্ন প্রকার স্ব-স্ব বৃত্তিসহ সামাজিক বিভাগ পরমেশ্বর ভগবান থেকে উৎপন্ন হয়েছে। তাই পারমার্থিক উপলব্ধি এবং মুক্ত জীবন লাভের জন্য গুরুদেবের নির্দেশ অনুসারে, স্বীয় বৃত্তি আচরণের দ্বারা পরমেশ্বর ভগবানের আরাধনা করা কর্তব্য।”
“হে বিদুর! পরমেশ্বর ভগবানের অন্তরঙ্গা শক্তির দ্বারা প্রকাশিত বিরাটরূপের দিব্য কাল, কর্ম এবং শক্তির মাহাত্ম্য কে নিরূপণ করতে পারে বা মাপতে পারে? আমার অযোগ্যতা সত্ত্বেও, আমার গুরুদেবের শ্রীমুখ থেকে আমি যতটা শ্রবণ করতে পেরেছি এবং আমি নিজে যা বুঝতে পেরেছি, তারা দ্বারা আমি বিশুদ্ধ বাণীর মাধ্যমে ভগবানের মহিমা কীর্তন করছি। যদি আমি তা না করি, তাহলে আমার বাক্‌শক্তি অসত্য থেকে যাবে। পুণ্যশ্লোক ভগবানের কার্যকলাপ এবং গুণাবলী কীর্তন করাই মানবজীবনের সর্বোচ্চ সিদ্ধি। ভগবানের এই সমস্ত কার্যকলাপ মহান ঋষিগণ এমনই সুন্দরভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন যে, কেবল তার সমীপবর্তী হওয়ার ফলেই শ্রবণেন্দ্রিয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধিত হয়। হে বৎস! আদি কবি ব্রহ্মা এক সহস্র দিব্য বৎসর ধ্যান করার পর, কেবল এইটুকুই জানতে পেরেছিলেন যে, পরমাত্মার মহিমা অচিন্ত্য। পরমেশ্বর ভগবানের আশ্চর্যজনক শক্তি ইন্দ্রজাল সৃষ্টিকারী মায়াবাদীদের পর্যন্ত সম্মোহিত করে। ভগবানের এই শক্তি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভগবানেরও অজ্ঞাত, অতএব অপর ব্যক্তির আর কি কথা। বাণী, মন এবং অহঙ্কার তাদের নিয়ন্ত্রণকারী দেবতাগণসহ ভগবানকে জানতে অসমর্থ হয়েছে। তাই আমাদের প্রকৃতিস্থ হয়ে তাঁর প্রতি শুধু আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করতে হবে।”

Leave a Reply

May 2025
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,943 hits